চতুর্থাঙ্ক — তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
জয়পুর—নগরপ্রান্তে রাজপথ-সম্মুখে দেবালয়। দেবালয়ের গবাক্ষদ্বারে বিলাসবতী এবং মদনিকা।
মদ। আর কেন, সখি? চল, এখন বাড়ী গিয়ে স্নানাদি করা যাক্গে, বেলা প্রায় দুই প্রহর হলো। বিশেষ দেবদর্শনের ছলে এখানে এসেছি, আর এখানে থাক্লে লোকে বলবে কি?
নেপথ্যে। (রণবাদ্য।)
বিলা। ঐ শোন্ গো, শোন্। মহারাজ বুঝি আবার ফিরে আসচেন।
মদ। তোমার এমনি ইচ্ছাটাই বটে! ভাল করে চেয়ে দেখ দেখি, কে আসচে?
বিলা। সখি, আমি চক্ষের জলে একবারে যেন অন্ধ হয়ে পড়েছি। তা কৈ? আমি ত কাকেও দেখতে পাচ্ছি না।
মদ। এখন, ভাই, কাঁদলে আর কি হবে? ঐ দেখ, মন্ত্রী মহাশয় আসচেন।
(নীচে মন্ত্রীর প্রবেশ।)
মন্ত্রী। বিধাতার নির্ব্বন্ধ কে খণ্ডন কত্যে পারে? হায়, একটা তুচ্ছ অগ্নিকণা এ ঘোরতর দাবানল হয়ে জ্বলে উঠলো! আহা, এতে যে কত সুন্দর তরু আর কত পশু পক্ষী পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে, তার কি আর সংখ্যা আছে। (দীর্ঘ নিশ্বাস) এখন আর আক্ষেপ করা বৃথা! এ জলস্রোতঃ যখন পর্ব্বত থেকে বেরিয়েছে, তখন এর গতি রোধ করা কার সাধ্য? (নেপথ্যাভিমুখে) এ কি? অর্জ্জুনসিংহ, তোমার দল যে এখনও এখানে রয়েছে?
নেপথ্যে। আচ্ছা, এই আমরা চললেম আর কি।
মন্ত্রী। কি সর্ব্বনাশ। তোমার কি কিছুমাত্র ভয় নাই? এ কি এসব ময়দার গাড়ী এখনও পড়ে রয়েছে?
নেপথ্যে। মহাশয়, গরু পাওয়া ভার।
মন্ত্রী। (কর্ণ দিয়া) অ্যাঁ———কি বললে? গরু পাওয়া ভার! কি সর্ব্বনাশ! তোমরা তবে কি কত্যে আছ?
নেপথ্যে। উঠ হে, উঠ, শীঘ্র করে গাড়ী গুলন যূতে ফেল।
ঐ। আজ্ঞা, এই হলো আর কি?
ঐ। ও হে বাদ্যকরেরা, তোমরা ঘুমুতে লাগলে না কি? বাজাও! বাজাও!
ঐ। মহাশয়, অশীর্ব্বাদ করুন, এই আমরা চললেম। বাজাও হে, বাজাও।
ঐ। (রণবাদ্য) মহারাজের জয় হউক!
মন্ত্রী। (স্বগত) দেখিগে, আর কোন্ দল কোথার কি কচ্যে? আঃ এ সব কি একজন হতে হয়ে উঠে? ভগবান্ সহস্রলোচন পারেন কি না, সন্দেহ; আমার ত দুই চক্ষুঃ বৈ নয়!
[ প্রস্থান।
বিলা। মদনিকে, চল, ভাই, আমরা এই ময়দার গাড়ীর পেছনে পেছনে মহারাজের নিকট যাই।
মদ। তুমি, সখি, পাগল হলে না কি? চল বরং বাড়ী যাই। দেখ, বেলা প্রায় দুই প্রহরের অধিক হলো। এখন রাজহংসীরা সরোবরে ভেসে গা শীতল কচ্যে। তা আমাদের আর এখানে থাকা উচিত হয় না।
বিলা। আমার কি আর, ভাই, ঘরে ফিরে যেতে মনঃ আছে?
মদ। হা! হা! হা! তুমি, ভাই, কৃষ্ণযাত্রা আরম্ভ কল্যে নাকি? হা! হা! হা! সখি, কৃষ্ণ বিনে এ পোড়া প্রাণ আর বাঁচে না। হা! হা! হা! ওহে রাধে! এ যমুনা-পুলিনে বসে একলা কাঁদলে কি হবে? তোমার বংশীবদন যে এখন মধুপুরে কুব্জা সুন্দরীকে লয়ে কেলি কচ্যেন। হা! হা! হা!
বিলা। ছি; যাও মেনে, ভাই! ও সব তামাসা এখন আর ভাল লাগে না।
মদ। এ কি? ধনদাস না?
(নীচে দরিদ্রবেশে ধনদাসের প্রবেশ।)
ধন। (চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিয়া স্বগত) হে বিধাতঃ, তোমার মনে কি এই ছিল! আমি এত কাল রাজসংসারে থেকে নানাবিধ সুখ ভোগ করে, অবশেষে অন্নাভাবে ক্ষুধাতুর কুক্কুরের ন্যায় আমাকে কি দ্বারে দ্বারে ফিরতে হলো? তা তোমারই বা দোষ কি? আমারই কর্ম্মের দোষ। পাপকর্ম্মের প্রতিফল এইরূপেই ত হয়ে থাকে। হায়! হায়! লোভমদে মত্ত হলে লোকের কি আর জ্ঞান থাকে? তা না হলে রঘুপতি কি সীতাকে ফেলে স্বর্ণ-মৃগের অনুসরণ কত্যেন? এই লোভমদে মত্ত হয়ে আমি যে কত কুকর্ম্ম করেছি তার সংখ্যা নাই। (রোদন) প্রভু, আমার অশ্রুজল দিয়া তুমি আমার পাপকলঙ্কে মলিন আত্মাকে ধৌত কর! (রোদন) হায়! হায়! আমার যদি এ জ্ঞান পূর্ব্বে হতো, তবে কি আর আমার এ দুর্দ্দশা ঘটতো।
মদ। আহা! সখি, শুনলে ত? দেখ সখি, ধনদাসের দশা দেখে আমার যে কি পর্য্যন্ত দুঃখ হচ্যে, তা আর কি বলবো? তুমি এই, এখানে একটু থাক, আমি গিয়ে ওর সঙ্গে গোটা দুই কথা কয়ে আসি।
প্রস্থান।
ধন। (স্বগত) ধনসঞ্চয়ের নিমিত্তে লোকে কি না করে। কিন্তু সে ধন কারো সঙ্গে যায় না। হায়, এ কথাটি যে লোকে কেন না বোঝে, এই আশ্চর্য্য। এই যে আমি এত করে একগাছি রত্নমালা গেঁথেছিলাম, সে গাছি এখন কোথায় গেলো? কে ভোগ করবে। হাঃ।
(মদনিকার প্রবেশ।)
মদ। ধনদাস যে।
ধন। অ্যাঁ—কেন—কে ও? মদনিকা? (স্বগত) আরো কি যন্ত্রণা বাকি আছে? (প্রকাশে) দেখ, ভাই, আমি যত দূর দণ্ড পেতে হয়, তা পেয়েছি, তা তুমি আবার—
মদ। না, না, তোমার ভয় নাই। আমি তোমার আর কোন মন্দ করবো না। তোমার দুঃখে আমি যে কি পর্য্যন্ত দুঃখী হয়েছি, তা তোমাকে আর কি বলবো? ধনদাস, আমি, ভাই, সতী স্ত্রী নই বটে, কিন্তু আমার ত নারীর প্রাণ বটে—হাজার হউক, পরের দুঃখ দেখলে আমার মনে বেদনা হয়। তা, ভাই, যা হবার হয়েছে, এখন এই নাও, আমি তোমাকে এই অঙ্গুরীটি দিলেম।
ধন। (সচকিতে) আঃ, এ অঙ্গুরীটি, ভাই, তুমি কোথা পেলে?
মদ। কেন? তুমিই যে আমাকে দিয়েছিলে! এখন ভুলে গেলে না কি? উদয়পুরের মদনমোহনকে তোমার মনে পড়ে কি? (ঈষৎ হাস্য।)
ধন। অ্যাঁ—কাকে বললে, ভাই?
মদ। মদনমোহনকে—যে তোমাকে মদনিকাকে দেখাতে চেয়েছিল। আজ তা হলো ত? এই দেখ—আমিই সেই মদনিকা!
ধন। তুমি কি তবে উদয়পুরে গিয়েছিলে?
মদ। আর কেমন করে বলবো? আমি না হলে এ সকল ঘটনা ঘটায় কে? ধনদাস, তুমি ভেবেছিলে, যে তোমার চেয়ে ধূর্ত্ত আর নাই; কিন্তু এখন টের পেলে ত, যে সকলেরই উপর উপর আছে? ভেবে দেখ দেখি, ভাই; তুমি কত বড় দুষ্ট ছিলে! সে যা হউক, ঢের হয়েছে। এখন যদি তোমার সে দুষ্ট বুদ্ধি গিয়ে থাকে, তবে আমার সঙ্গে এসো। দেখি, আমি যাকে ভেঙেচি, তাকে আবার গড়তে পারি কি না।
ধন। তোমার কথা শুনে ভাই, আমি অবাক্ হয়েচি! তুমিই তবে সেই মদনমোহন? কি আশ্চর্য্য!—আমি কি কিছুমাত্র চিনতে পারি নাই?
মদ। এসো, তুমি আমার সঙ্গে এসো। ঐ দেখ, বিলাসবতী উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর কাছে, ভাই, আর পিরীতের কথার নামও করো না। আর দেখ, এ জন্মে কাকেও মেয়েমানুষ বলে অবহেলা করো না। তার ফল ত দেখলে কি বল? হা হা! হা! (বিলাসবতীর প্রতি) এসো, সখি, তুমি একবার নেবে এসো। আমার ভারি খিচে পয়েছে। চল হে, ধনদাস, চল।
[ সকলের প্রস্থান।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.