উদয়পুর—রাজ-উদ্যান (তপস্বিনীর প্রবেশ।) তপ। (স্বগত) কি আশ্চর্য! আমি ত্রিপতিতে ভগবান্ গোবিন্দরাজের মন্দিরে কৃষ্ণকুমারীর বিষয়ে যে কুস্বপ্নটা দেখেছিলাম, তা কি যথার্থই হলো? রাজা মানসিংহ ও রাজা জগৎসিংহ উভয়েই যখন রাজনন্দিনীর পাণিগ্রহণ আশার এ নগরে দূত প্রেরণ করেছেন, তখন এ মাতঙ্গদ্বয় কি বিনা যুদ্ধে নিরস্ত হবে? না এদের ভয়ঙ্কর বিগ্রহে বনস্থলীর সামান্য দুর্দ্দশা ঘটবে? হায়, হায়, কি বিধাতার বিড়ম্বনা! (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) দীনবন্ধো, তুমিই সত্য! কৃষ্ণাও দেখছি রাজা মানসিংহের প্রতি নিতান্ত অনুরাগিণী হয়ে উঠেছে। তা যাই, এ সব কথা রাজমহিষীকে একবার জানান কর্ত্তব্য। [ প্রস্থান। (কৃষ্ণকুমারীর প্রবেশ।) কৃষ্ণা। (স্বগত) সে দূতীটি পাখী হয়ে উড়ে গেল না কি? আমি যে তার অন্বেষণে কত স্থানে লোক পাঠিয়েছি, তার আর সংখ্যা নাই। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া } কি আশ্চর্য‍্য! এ যে কি মায়াবলে আমাকে এত উতলা করে গেল, আমি ত তার কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। হা রে, অবোধ মনঃ! কেন বৃথা এত চঞ্চল হোস্? নিশার স্বপ্ন কি কখন সফল হয়? এ দূতীটি কি আমাকে ছলনা করে গেল? তাই বা কেমন করে বলি! ওদের রাজার দূত পর্য‍্যন্ত এসেচে। (চিন্তা করিয়া) ভগবতী কপালকুণ্ডলাকে আমার মনের কথাগুলি বলে কি ভাল করেছি?—তা এরূপ রহস্য কি মনে গোপন করে রাখা যায়। যেমন কীট ফুলের মুকুল কেটে নির্গত হয়, এও তাই করে। ঐ যে ভগবতী মার সঙ্গে কথা কইতে কইছে এই দিকে আসচেন। বুঝি আমার কথাই হচ্যে! ও মা, ছি! ছি! কি লজ্জা। মা শুনলে বলবেন কি? আমি মাকে এ মুখ আর কেমন করে দেখাবে? বিধাতা যে এ অদৃষ্টে কি লিখেছেন, কিছুই বলা যায় না। যাই, এখন সঙ্গীতশালায় পালাই। [ প্রস্থান। (অহল্যাদেবীর সহিত তপস্বিনীর পূনঃ প্রবেশ।) অহ। বলেন কি, ভগবতি? আপনি কি এ কথা কৃষ্ণার মুখে শুনেছেন? তপ। আজ্ঞা, হাঁ। সেই আপনিই বলেছে। অহ। কি আশ্চর্য!— তপ। মহিষি, লজ্জা যুবতীর হৃদয়মন্দিরে দৌবারিক স্বরূপ। তার পরাভব করা কি সহজ কর্ম? আমি যে কত কৌশলে এ বিষয়ে কৃতকার্য‍্য হয়েছি, তা আপনাকে আর কি বলবো? অহ। আহা! এই জন্যেই বুঝি মেয়েটিকে এত বিরসবদন দেখতে পাই! ভাল, ভগবতি, কৃষ্ণা যে রাজা মানসিংহের উপর এত অনুরাগিণী হলো, এর কারণ কিছু বুঝতে পেরেছেন? তপ। মহিষি, ও সকল দৈব ঘটনা! ঐ যে সূর্য্যমুখী ফুলটি দেখছেন, এটি ফুটলেই সূর্য্যদেবের পানে চেয়ে থাকে; কিন্তু কেন যে চায়, তা কেউ বলতে পারে না। অহ। সূর্য্যদেবের উজ্জ্বল কান্তি দেখে সূর্যমুখী তাঁর অধীন হয়; আমার কৃষ্ণা ত আর রাজা মানসিংহকে দেখে নাই— তপ। দেবি, মনচক্ষু দিয়ে লোকে কি না দেখতে পায়? বিশেষ ভগবান্ কন্দর্পের যে কি লীলাখেলা তা কি আপনি জানেন না? দময়ন্তী সতী কি রাজা নলকে আপন চর্ম্মচক্ষে দেখে তাঁর প্রতি অনুরাগিণী হয়েছিলেন? (সচকিতে) আহা, কি মনোহর সৌরভ! দেবি, দেখুন দেখি, এই যে সুগন্ধটি গন্ধবহের সহকারে আকাশে ভাসছে, এর যে কোন্ ফুলে জন্ম, তা আমরা দেখতে পাচ্যি না। কিন্তু আমাদের বিলক্ষণ প্রতীতি হচ্যে, যে সে ফুলটি অতীব সুন্দর। এ যেন নীরবে আমাদের কাছে আপন জন্মদাতা কুসুমের সুচারুতার ব্যাখ্যা কচো। দেবি, যশঃস্বরূপ সৌরভেরও, জানবেন, এই রীতি। মরুদেশের অধিপতি মানসিংহ রায় ত এক জন যশোহীন পুরুষ নন। অহ। আচ্ছা, তা সত্য বটে। (নেপথ্যে যন্ত্রধ্বনি।) তপ। দেখুন মহিষি, রাজনন্দিনীর মনের যা ভাব, তা এখনিই প্রকাশ হবে। নেপথ্যে গীত। [ ভৈরবী—মধ্যমান ] তারে না হেরে আঁখি ঝুরে, প্রাণ হরে কামশরে জরজরে। রজনী দিবসে মানসে নাহি সুখ, মনোদুখ তোরা বিনে, সই, কহিব কাহারে। মলয় পবন দাহন সদা করে, কোকিলের কুহুরবে তায় হৃদয় বিদরে॥ তপ। আহা! ঋতুরাজ বসন্ত উপস্থিত হলে, কোকিলকে কি কেউ নীরব করে রাখতে পারে? সে অবশ্যই আপন মনের কথা বনস্থলে দিবারাত্র পঞ্চস্বরে ব্যক্ত করে। যৌবনকাল এলে মানবজাতির হৃদয়ও সেইরূপ চুপ করে থাকতে পারে না। অহ। সে যা হউক। ভগবতি, আপনার কথাটা শুনে যে আমার মন কত উতলা হয়ে উঠলো, তা বলতে পারি না। হায়, হায়, আমার মতন হতভাগিনী স্ত্রী কি আর আছে। মেয়েটির ভাল করে বিবাহ দেবো, এই সাধটি বড় সাধ ছিল, কিন্তু বিধির বিড়ম্বনায় দেখছি সকলই বিফল হলো। (রোদন।) তপ। কেন, মহিষি? বিফলই হবে কেন? অহ। ভগবতি, আপনি কি ভেবেছেন, যে মহারাজ মরুদেশের রাজাকে মেয়ে দেবেন। একে ত রাজা মানসিংহের সঙ্গে তাঁর বড় সদ্ভাব নাই, তাতে আবার জয়পুরের দূত এখানে আগে এসেছে। তপ। তা হলই বা। যে ধীবর প্রথমে ডুব দেয়, তাকেই কি সাগর উৎকৃষ্ট মুক্তাফল দিয়ে থাকেন? এ কি কথা, মহিষি? আপনাদের কন্যা, আপনারা যাকে ইচ্ছা হয়, তাকেই দেবেন; এতে আবার অগ্রপশ্চাৎ কি? অহ। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) ভগবতি, আমরা কি স্বেচ্ছাধীন।—আহা! ভগবতি, একবার এ দিকে চেয়ে দেখুন। (অগ্রসর হইয়া) এসো, মা, এসো— (কৃষ্ণার পুনঃ প্রবেশ।) তোমার আজ এত বিরস বদন দেখছি কেন? কৃষ্ণা। না, মা, বিরসবদন হবো কেন? অহ। ও কি ও? তুমি কাঁদছো কেন মা? কৃষ্ণা। (নিরুত্তরে রাণীর গলা ধরিয়া রোদন।) অহ। ছি মা, ছি! কেন? তোমার কিসের অভাব, যে তুমি এমন দুঃখিত হলে? তপ। (স্বগত) আহা, এ ব্রতে নূতন ব্রতী কি না! সুতরাং ব্রতের উদ্দেশ্য দেবতাকে না পেলে কি এ আর স্থির হতে পারে। অহ। ছি! ছি! ও কি, মা? কৃষ্ণা। মা, আমি কি অপরাধ করেছি, যে তোমরা আমাকে জলে ভাসিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছো? (রোদন।) অহ। বালাই! কেন মা? তোমাকে জলে ভাসিয়ে দেবো কেন? মেয়েরা কি চিরকাল বাপের ঘরে থাকে, মা? (রোদন।) তপ। বৎসে, পক্ষিশাবক কি চিরকাল জন্মনীড়ে থেকে কালাতিপাত করে? এই যে তোমার মা, ইনি কেমন করে পিতৃগৃহ পরিত্যাগ করে পতির গৃহে বাস কচ‍্যেন? তুমিও তো তাই করবে; তাতে আর ক্ষোভ কি? কৃষ্ণা। ভগবতি,—(রোদন।) অহ। স্থির হও, মা স্থির হও। ছি, মা, কেঁদো না। (রোদন।) কৃষ্ণা। মা, আমাকে এত দিন প্রতিপালন করে কি অবশেষে বনবাস দেবে? (রোদন।) তপ। মহিষি, ঐ যে মহারাজ এই দিকে আসচেন! উর্মি আপনাদের ছুজনকে এ দশায় দেখলে অত্যন্ত দুঃখিত হবেন। তা আপনি এক কর্ম্ম করুন, রাজনন্দিনীকে লয়ে একটু সরে যান। অহ। আয়, মা, আমরা এখন যাই। [ অহল্যাদেবী ও কৃষ্ণার প্রস্থান। তপ। (স্বগত) আমি ভেবেছিলাম, যে অনিদ্রা, নিরাহার, কঠোর তপস্যা—এ সকল সংসারমায়াশৃঙ্খল থেকে মুক্তি দান করে। তা কৈ? আমি যে সে মুক্তি লাভ করেছি, এমন ত কোন মতেই বোধ হয় না। আহা! এঁদের দুজনের শোক দেখলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) হে বিধাতঃ, এই মানবহৃদয়ে তুমি যে ইন্দ্রিয়সকলের বীজ রোপণ করেছ, তাদের নির্ম্মূল করা কি মনুষ্যের সাধ্য? বিলাপধ্বনি শুনলে যোগীন্দ্রেরও মন চঞ্চল হয়ে উঠে। (রাজা ভীমসিংহের প্রবেশ।) রাজা। ভগবতি, মহিষী না এখানে ছিলেন? তপ। আজ্ঞা, হাঁ। তিনি এই ছিলেন; বোধ হয়, আবার এখনি এলেন বল্যে। রাজা। তাঁর সঙ্গে আমার কোন বিশেষ কথা আছে। (পরিক্রমণ করিয়া) বোধ হয়, আপনিও শুনে থাকবেন, মরুদেশের অধিপতি রাজা মানসিংহ রায়ও কৃষ্ণার পাণিগ্রহণ ইচ্ছায় আমার নিকট দূত পাঠিয়েছেন। তপ। আজ্ঞা, হাঁ, শুনেছি বটে। রাজা। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) ভগবতি, এ সব কেবল আমার কপাল গুণে ঘটে। তপ। আজ্ঞা, সে কি, মহারাজ? এমত ত সর্ব্বত্রেই হচ্যে। রাজা। ভগবতি, আপনি চিরতপস্বিনী, সুতরাং এ দেশের লোকের চরিত্র বিশেষরূপে জানেন না। এই বিবাহ উপলক্ষে যে কত গোলযোগ হয়ে উঠবে, তার কি সংখ্যা আছে? (অহল্যাদেবীর পুনঃ প্রবেশ।) প্রেয়সি, তোমার কৃষ্ণার বিবাহ যে স্বচ্ছন্দে সম্পন্ন হয়, এমন ত আমার কোন মতেই বিশ্বাস হয় না। অহ। সে কি, নাথ? রাজা। আর বলবো কি বল? এ বিষয়ে মহারাষ্ট্রের অধিপতি আবার রাজা মানসিংহের পক্ষ হয়ে, আমাকে অনুরোধ কচ‍্যেন যে— তপ। নরনাথ, তবে রাজনন্দিনীকে রাজা মানসিংহকেই প্রদান করুন না কেন? তিনিও ত একজন সামান্য রাজা নন— অহ। জীবিতেশ্বর, এ দাসীরও এই প্রার্থনা। রাজা। বল কি, দেবি? রাজা জগৎসিংহ আমার এক জন পরম আত্মীয় তাতে আবার তাঁর দূতই আগে এসেছে; এখন আমি কি বলে তাঁকে এ বিষয়ে নিরাশ করি? (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) হে বিধাতঃ, তুমি এই যে প্রমাদ-অগ্নির সূত্র কল্যে, এ কি রক্তস্রোতঃ ব্যতীত আর কিছুতে নির্ব্বাণ হবে? অহ। প্রাণেশ্বর, মহারাষ্ট্রপতি যে এতে হাত দেন, এর কারণ কি? তিনি না স্বদেশে ফিরে যেতে উদ্যত ছিলেন? রাজা। দেবি, তুমি সে নরাধমের চরিত্র ত ভাল করে জান না। সে ত এই চায়। একটা ছল ছুড়া পেলে হয়। তপ। ভাল, মহারাজ, তুমি যদি এ বিষয়ে সম্মত না হও, তা হলে মহারাষ্ট্রপতি কি করবেন! রাজা। তা হলে তার দস্যুদল আবার দেশ লুট কত‍্যে আরম্ভ করবে! হায়! হায়! তাতে কি আর দেশে কিছু থাকবে? ভগবতি, আমার কি আর এখন সে অবস্থা আছে, যে আমি এমন প্রবল শত্রুকে নিরস্ত করি? তপ। মহারাজ, মা কমলার প্রসাদে আপনার কিসের অভাব? অহ। (রাজার হস্ত ধারণ করিয়া) নাথ, এতে এত উতলা হইও না। বোধ হচ্যে, ভগবান্ একলিঙ্গের প্রসাদে এ উদ্বেগ অতি ত্বরায়ই শান্ত হবে। রাজা। মহিষি, তুমি ত রাজপুত্রী। তুমি কি জান না, যে এ বিবাহে আমি যাকে নিরাশ করবো, সেই তৎক্ষণাৎ অসিকোষ দূরে নিক্ষেপ করবে? প্রিয়ে, তোমার কৃষ্ণা কি সতীর মতন আপন পিতার সর্ব্বনাশ কত‍্যে এসেছে? হায়, আমি বিধাতার নিকট এমন কি পাপ করেছি, যে তিনি আমার প্রতি এত প্রতিকূল হলেন! আমার এমন অমূল্য রত্নটিও কি অনল হয়ে আমাকে দগ্ধ কত‍্যে লাগলো। আমার হৃদয়নিধি হতে যে আমার সর্ব্বনাশের সূচনা হবে, এ স্বপ্নেরও অগোচর। অহ। (নিরুত্তরে রোদন।) তপ। ও কি? মহিষি, আপনি কি করেন? অহ। ভগবতি, শমন কি আমাকে বিস্মত হয়েছেন? (রোদন।) তপ। বালাই! তিনি আপনার শত্রুকে স্মরণ করুন। মহারাজ, আজ্ঞা হয় ত, আমরা এখন অন্তঃপুরে যাই। অহ। নাথ, আমার কৃষ্ণার এতে দোষ কি, বলুন দেখি? বাছা ত আমার ভাল মন্দ কিছুই জানে না। মহারাজ, তাকে এমন করে বল্যে কি মায়ের প্রাণে সয়?—বাছা, কেনই বা তোর এ অভাগিনীর গর্ভে জন্ম হয়েছিল।— (রোদন।) রাজা। (হস্ত ধরিয়া) দেবি, আমার এ অপরাধ মার্জ্জনা কর। হায়! হায়! আমি কি নরাধম! আমার মতন ভাগ্যহীন পুরুষ, বোধ করি আর নাই। এমন অমৃতও আমার পক্ষে বিষ হলো! তা চল, প্রিয়ে, এখন অন্তঃপুরে যাই। সূর্য্যদেবও অস্তাচলে চললেন। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) হে দিননাথ, তোমাকে যে লোকে এই রাজকুলের নিদান বলে; তা তুমি কি এর দুঃখে মলিন হলে! [ সকলের প্রস্থান। (কৃষ্ণার পুনঃ প্রবেশ।) কৃষ্ণা। (পরিক্রমণ করিয়া স্বগত) আহা! সে এক সময় আর এ এক সময়! আমি কেন বৃথা আবার এখানে এলেম? এ সকল কি আমার আর ভাল লাগে! (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) আহা! আমি এই মল্লিকা ফুলটিকে আদর করে বনবিনোদিনী নাম দিয়েছিলাম। এই সুচারু শমীবৃক্ষটিকে সখী বলে বরণ করেছিলাম। (সচকিতে) ও কি? আহা! সখি, তুমি কি এ হতভাগিনীর দুঃখ দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ছো? কেন? তুমি ত চিরসুখি; তোমার খেদের বিষয় কি? মলয়সমীরণ তোমার একান্ত অনুগত, সর্ব্বদাই তোমার সঙ্গে মধুর স্বরে প্রেমালাপ কচ্যে, তা তুমি কি পরের দুঃখ বুঝতে পার? কি আশ্চর্য্য! (চিন্তা করিয়া) হায়, হায়! এ মায়াবিনী যে কি কুলগ্নে এ দেশে এসেছিল, তা বলা যায় না। কি আশ্চর্য‍্য! আমি যাঁকে কখন দেখি নাই; যাঁর নাম কখন শুনি নাই; যাঁর সহিত কখন বাক্যালাপ করি নাই; তাঁর জন্যে আমার প্রাণ অস্থির হয় কেন? কেবল সেই দূতীর কুহকেই আমার মন এত চঞ্চল হলো? আহা! আমি কেনই বা সে চিত্রপট দেখেছিলাম? কেন‍ই বা সে মনোহর মূর্তি আমার হৃদপদ্মে প্রতিষ্ঠিত করেছিলান? লোকে বলে, যে সে মরুদেশ অতি বন্ধ্য স্থল; সেখানে বসুমতী না কি সর্ব্বদা বিধবাবেশ ধরে থাকেন; কুসুমাদিরূপ কোন অলঙ্কার পরেন না। কিন্তু কি আশ্চর্য্য! আমার মনে সে দেশ যেন নন্দনকানন বোধ হচ্যে! আমি তার বিষয় যে কত মনে করি, তা আমার মনই জানে। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) একরার যাই, দেখিগে, সে দূতীর কোন অন্বেষণ পাওয়া গেল কি না! (পরিক্রমণ করিয়া সচকিতে) এ কী? উদ্যান হঠাৎ এমন পদ্মগন্ধে পরিপূর্ণ হলো কেন? (সভয়ে) কি আশ্চর্য্য! আমি যে গতিহীন হলেম! আমার সর্ব্বাঙ্গ যেন সহসা সিহরে উঠলো। (নেপথ্যাভিমুখে অবলোকন করিয়া) ও কি? ও! ও! ও! মূর্চ্ছাপ্রাপ্তি; আকাশে কোমল বাদ্য।) (বেগে তপস্বিনীর প্রবেশ।) তপ। (স্বগত) কি সর্ব্বনাশ! কি সর্ব্বনাশ! (কৃষ্ণাকে ক্রোড়ে ধারণ করিয়া) এ কি এ? সর্ব্বনাশ! ভাগ্যে আমি এই দিক্ দিয়ে যাচ্ছিলাম! উঠ, মা, উঠ! এমন কেন হলো? কৃষ্ণা। (সুপ্তভাবে) দেবি, আপনি ঐ মিষ্ট কথাগুলিন আবার বলুন। আমি ভাল করে শুনি। কি বললেন? আহা! “যে যুবতী এ বিপুল কুলের মান আপন প্রাণ দিয়া রাখে, সুরপুরে তার আদরের সীমা থাকে না।” আহা! এ অভাগিনীর কপালে কি এমন সুখ আছে? তপ। সে কি মা? কি বলচো? (স্বগত) হায়, হায়, দেখ দেখি, বিধাতার কি বিড়ম্বনা! একে ত এ রাক্ষসী বেলা, তাতে আবার কৃষ্ণার নবযৌবন; কে জানে কার দৃষ্টি— কৃষ্ণা। (উঠিয়া সসম্ভ্রমে) ভগবতি, আপনি আবার এখানে কোথ্থেকে এলেন? তপ। কেন, মা, সে কি? কৃষ্ণা। চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিয়া) কি আশ্চর্য্য! ভগবতি, আমি যে এক অদ্ভূত স্বপ্ন দেখছিলাম, তা শুনলে আপনি একেবারে অবাক্ হবেন। তপ। কি স্বপ্ন, মা? কৃষ্ণা। বোধ হলো, যেন আমি কোন সুরর্ণমন্দিরে একখানি কমল-আসনে বসে রয়েছি, এমন সময়ে একটি পরম সুন্দরী স্ত্রী একটি পদ্ম হাতে করে আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে বললেন,—বাছা, তুমি আমাকে প্রণাম কর। আমি সম্পর্কে তোমার জননী হই। তপ। তার পর! কৃষ্ণা। আমি প্রণাম কল্যেম। তার পর তিনি বললেন,—দেখ, বাছা, যে যুবতী এ বিপুল কুলের মান আপন প্রাণ দিয়া রাখে, সুরপুরে তার আদরের সীমা নাই! আমি এই কুলেরই বধূ ছিলাম। আমার নাম পদ্মিনী। তুমি যদি আমার মত কর্ম্ম কর, তা হলে আমারই মতন যশস্বিনী হবে! তপ। তার পর, তার পর? কৃষ্ণা। উঃ, ভগবতি, আপনি আমাকে একবার ধরুন। আমার সর্ব্বশরীর কাঁপচে। তপ। কি সর্ব্বনাশ! চল, মা, তুমি অন্তঃপুরে চল। এখানে আর কাজ নাই। দেখ, মা, আমাকে যা বললে, এ কথা তুমি আর কাকেও বলো না। (আকাশে কোমল বাদ্য।) কৃষ্ণা। আহা হা! ভগবতি, ঐ শুনুন! তপ। কি সর্ব্বনাশ! বৎসে, আমি কি শুনবো? কৃষ্ণা। সে কি, ভগবতি? শুনলেন না, কেমন সুমধুর ধ্বনি! আহা, হা! তপ। চল, মা, এখানে আর থেকে কাজ নাই। তুমি শীঘ্র করে এখান থেকে চল। [ উভয়ের প্রস্থান। তৃতীয় গর্ভাঙ্ক উদয়পুর—নগরতোরণ। (বলেন্দ্রসিংহ এবং কতিপয় রক্ষকের প্রবেশ।) বলে। রঘুবর সিংহ।— প্রথ। (যোড়করে) কি আজ্ঞা, বীরবর। বলে। দেখ, তোমরা সকলে অতি সাবধানে থেকো। আজ কাকেও এ নগরে প্রবেশ কত‍্যে দিও না। প্রথ। যে আজ্ঞা! আপনার বিনা অনুমতিতে, কার সাধ্য, এ নগরে প্রবেশ করে। বলে। আর দেখ, যদি মহারাষ্ট্রপতির শিবিরে কোন গোলযোগ শুনতে পাও, তবে তৎক্ষণাৎ আমাকে সংবাদ দিও। প্রথ। যে আজ্ঞা! বলে। (অবলোকন করিয়া স্বগত) এই মহারাষ্ট্রের শৃগালটা কি সামান্য ধুর্ত্ত। এমন অর্থলোভী, অহিতকারী নরাধম দস্যু কি আর দুটি আছে? কিন্তু মানসিংহের সহিত এর যে সহসা এত সৌহার্দ্দ হলো, এর কারণ জানি কিছুই বুঝতে পারি নাই। (চিন্তা করিয়া) কোন না কোন কারণ অবশ্যই আছে তা নৈলে ও এমন পাত্র নয়, যে বৃথা ক্লেশ স্বীকার করে। কৃষ্ণাকে বে বিবাহ করুক না কেন, ওর তাতে বয়ে গেল কি? [ প্রস্থান। (নেপথ্যে) রণবাদ্য।— দ্বিতী। ভাল, রঘুবর সিংহ— প্রথ। কি হে! দ্বিতী। তোমাকে, ভাই, আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো; তুমি না কি সর্ব্বদাই আমাদের সেনাপতি বলেন্দ্রসিংহের নিকট থাকো; রাজসংসারের বৃত্তান্ত তুমি যত জান, এত আর কেউ জানে না। প্রথ। হাঁ, কিছু কিছু জানি বটে। তা কি জিজ্ঞাসা করবে, বলই না শুনি। দ্বিতী। দেখ, ভাই, আমি শুনেছিলাম, যে এই মহারাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমাদের মহারাজের সন্ধি হয়েছিল; তা উনি যে আবার এসে থানা দিয়ে বসলেন, এর কারণ? প্রথ। সে কি? তুমি কি এর কিছুই শোন নাই? দ্বিতী। না, ভাই! তৃতী। কৈ? আমরা ত এর কিছুই জানি না। প্রথ। মরুদেশের রাজা মানসিংহ, আর জয়পুরের অধিপতি জগৎসিংহ, উভয়েই আমাদের রাজনন্দিনীকে বিবাহ করবার আশায় দূত পাঠিয়েছেন। তৃতী। হাঁ! তা ত জানি। বলি, এ বিষয়ে মহারাষ্ট্রের রাজা হাত দেন কেন? প্রথ। আমাদের মহারাজের সম্পূর্ণ ইচ্ছা, যে মেয়েটি জগৎসিংহকে দেন; কিন্তু এ রাজার সঙ্গে জগৎসিংহের চিরকাল বিবাদ; এঁর ইচ্ছা, যে মহারাজ রাজকুমারীকে মানসিংহকে প্রদান করেন! দ্বিতী। ভাল, ভাই, ইনি যদি বিবাহের ঘটকালি কত্যেই এসেচেন, তবে আবার সঙ্গে এত সৈন্য সামন্তের প্রয়োজন কি? প্রথ। হা! হা! এও বুঝতে পাল্যে না ভাই? এর মত ভিখারী ত আর দুটি নাই। এ ত এমনি গোলযোগই চায়। একটা কিছু উপলক্ষ হলেই, ছলে হোক, বলে হোক, এর ভিক্ষার ঝুলি পূর্ণ হয়। দ্বিতী। তা সত্য বটে। তা আমাদের মহারাজ কি স্থির করেছেন, জান? প্রথ। আর কি স্থির করবেন? জয়পুরের রাজদূতকে বিদায় করবার অনুমতি দিয়েছেন। আর অল্প দিনের মধ্যেই মহারাষ্ট্রপতির সঙ্গে ভগবান্ একলিঙ্গের মন্দিরে সাক্ষাৎ করবেন। তার পর বিবাহের বিষয় কি হয়, বলা যায় না। তৃতী। ভাল, তুমি কি বোধ কর, ভাই, যে জয়পুরের রাজা এতে চুপ করে থাকবেন! দ্বিতী। বলা যায় না। শুনেছি, রাজা না কি বড় রণপ্রিয় নন। তবু যা হউক, রাজপুত্র কি না? এত অপমান কি সহ্য কত‍্যে পারবেন? তৃতী। ওহে, এ দিকে দুজন কে আসছে, দেখ দেখি। প্রথ। সকলে সতর্ক হও হে। যেন মন্ত্রী মহাশয় বোধ হচ্যে। (সত্যদাস এবং ধনদাসের প্রবেশ।) সত্য। রঘুবর সিংহ— প্রথ। (যোড়করে) আজ্ঞা। সত্য। সব মঙ্গল ত? প্রথ। আজ্ঞা, হাঁ! সত্য। আচ্ছা। (ধনদাসের প্রতি) মহাশয়, একটু এই দিকে আসুন। ধন। মন্ত্রী মহাশয়, এ কর্ম্মটা কি ভাল হলো? সত্য। আজ্ঞা, ও কথা আর বলবেন না। মহারাজ যে এতে কি পর্য‍্যন্ত ক্ষুণ্ণ, তা আপনিই কেন বুঝে দেখুন না! কিন্তু কি করেন? এতে ত আর কোন উপায় নাই। ধন। আজ্ঞা, হাঁ, এ কথা যথার্থ বটে। কিন্তু আমার, দেখছি, সর্ব্বনাশ হলো। আমি যে কি কুলগ্নে আপনাদের দেশে এসেছিলাম তা বলতে পারিনে। সত্য। কেন, মহাশয়? ধন। আর কেন মহাশয়? প্রথমতঃ দেখুন, আমার যা কিছু ছিল, সে সব ঐ দস্যুদল লুটে নিলে। তার পর রাজা মানসিংহের দূতের হাতে আমি যে কি পর্য‍্যন্ত অপমান সহ্য করেছি, তা ত আাপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন, আবার— সত্য। মহাশয়, যা হয়েছে; হয়েছে। ও সব কথা আর মনে করবেন না। এখন অনুগ্রহ করে এই অঙ্গুরীটি গ্রহণ করুন। মহারাজ এটি আপনাকে দিতে দিয়েছেন। ধন। মহারাজের প্রসাদ শিরোধার্য‍্য। (অঙ্গুরীয় গ্রহণ।) সত্য। মহাশয়, আপনি এক জন সুচতুর মনুষ্য। অতএব আপনাকে অধিক বলা বাহুল্য। আপনি মহারাজ জগৎসিংহকে এ বিষয়ে ক্ষান্ত হতে পরামর্শ দেবেন। এ আত্মবিচ্ছেদের সময় নয়। (চিন্তা করিয়া) দেখুন, আপনি যদি এ কর্ম্ম কত‍্যে পারেন, তা হলে মহারাজ আপনাকে যথেষ্ট পরিতুষ্ট করবেন। ধন। যে আজ্ঞা। আমি চেষ্টার ত্রুটি করবো না। তার পর জগদীশ্বরের হাত। সত্য। আমি কর্ম্মকারকদের প্রতি রাজ-আদেশ পাঠিয়েছি। আপনার পথে কোন ক্লেশ হবে না। ধন। তবে আমি এখন বিদায় হই। সত্য। যে আজ্ঞা, আসুন তবে। [ প্রস্থান। ধন। (স্বগত) দেখি দেকি, অঙ্গুরীটি কেমন? (অবলোকন করিয়া) বাঃ, এটি যে মহারত্ন! এর মূল্য প্রায় লক্ষ টাকা হবে! হা! হা! ধনদাসের ভাগ্য! মাটি ছুঁলে সোনা হয়। হা হা হা! যাকে বিধাতা বুদ্ধি দেন, তাকে সকলই দেন। (চিন্তা করিয়া) এ বিবাহে কৃতকার্য‍্য হলেম না বলে যদি মহারাজ বিরক্ত হন, হলেনই বা: না হয়, ওঁর রাজ্য ত্যাগ করে অন্যত্রে গিয়ে বাস করবো। আর কি! আমার ত এখন আর ধনের অভাব নাই। হা! হা! বুদ্ধিবলেই ধনদাস ধনপতি! তবে কি না, এই একটা বাধা দেখছি; বিলাসবতীর আশাটা তা হলে একবারে ছাড়তে হয়। যে মৃগ লক্ষ্য করে এত দিন বনে বনে পর্য‍্যটন কল্যেম, তাকে এখন এক প্রকার আয়ত্ত করে কেমন করে ফেলে যাই। (চিন্তা করিয়া) কেন? ফেলেই বা যাব কেন, আমি কি আর একটা বেশ্যাকে ভুলাতে পারবে। না! কত কত লোক স্বর্গকন্যাকে বশ করেছে, আর আমি কি একটা সামান্য বারাঙ্গনার মনঃ চুরি কত‍্যে পারবো না! হা! হা! তা দেখি কি হয়। [ প্রস্থান। প্রথ। (অগ্রসর হইয়া) ওহে, তোমরা কেউ এ লোকটিকে চেন? দ্বিতী। চিনবো না কে? ও যে জয়পুরের দূত। আঃ, এক দিন রাত্রে, ভাই, ও যে আমাকে কষ্টটা দিয়েছিল, তা আর কি বলবো? তৃতী। কেন? কেন? দ্বিতী। আমি, ভাই, পুরস্কারের লোভে মদনিকা বলে একটা মেয়েমানুষের তত্ত্বে ওর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। সমস্ত রাতটা ঘুরে ঘুরে মলেম, কিছুই হলো না। শেষ প্রাতঃকালে বাসায় ফিরে যাবার সময় বেটা আমাকে কেবল চারটি গণ্ডা পয়সা হাতে দিয়ে বল্যে কি, যে তুমি মিটাই কিনে খেও। হা! হা! হা! প্রথ। হা! হা! যেমন কর্ম্ম তেমনি ফল! (আকাশমার্গে দৃষ্টিপাত করিয়া) উঃ, রাত্রি যে প্রভাত হলো। নেপথ্যে গীত। [ ভৈরব-কাওয়ালী। ] যাইতেছে যামিনী, বিকসিত নলিনী। প্রিয়তম দিবাকর হেরিয়ে প্রমোদিনী ভানুভামিনী: শশী চলিল তাই হেরে বিষাদে বিমলিনী কুমুদিনী অতি দুখিনী। মধুকর ধায় মধুর কারণে ফুলবনে বিহঙ্গের মধুর স্বরে মোহিত করে প্রমোদ ভরে বিপিনচরে, নব তৃণাসনে হরষিত মনোহরিণী॥ তৃতী। ঐ শুনলে ত? চল, আমরা এখন যাই। (নেপথ্যে রণবাদ্য।) প্রথ। হাঁ—চল—। ঐ যে আর এক দল আসচে। [ সকলের প্রস্থান। ইতি তৃতীয়াঙ্ক।