(প্রহসন)। ৺মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রণীত। চতুর্থ সংস্করণ। কলিকাতা বেণীমাধব দে এণ্ড কোং বটতলা। ১৮৮৩। CALCUTTA A recollector C. bose. Printer. Vidya Ratna Press. 283 Upper Chitpoor Road. নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। ভক্তপ্রসাদ বাবু। পঞ্চানন বাচস্পতি। আনন্দ বাবু। গদাধর। হানিফ্গাজি। রাম। পুঁটি। ফতেমা (হানিফের পত্নী।) ভগী। পঞ্চী। বিজ্ঞাপন । সর্ব্বসাধারণজনগণকে এতদ্দ্বারা জ্ঞাত করা যাইতেছে, যে, মৃত মহাত্মা মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রণীত পুস্তক সমুদয়ের গ্রন্থস্বত্ত্ব আমি ক্রয় করিয়াছি। এক্ষণে ঐ সকল পুস্তক আমার এবং আমার উত্তরাধিকারীগণের স্বত্ত্ব হইয়াছে; অতএব যিনি এতৎপুস্তক সমুদয় বিনানুমতিতে মুদ্রিত কি প্রকাশিত করিবেন। তিনি গ্রন্থস্বত্বের আইনানুসারে দণ্ডার্হ হইবেন। কলিকাতা। দুষ্পাঠ্যই, আশ্বিন ১২৮১ সাল। } শ্রীরাজ কিশোর দে বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ। প্রথমাঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক। পুষ্করিণী তটে বাদামতলা। গদাধর এবং হানিফ্ গাজীর প্রবেশ হানি। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) এবার যে পিরির দরগায় কত ছিন্নি দিছি তা আর বল্‌বো কি। তা ভাই কিছুতেই কিছু হয়ে উঠ্লো না। দশ ছালা ধানও বাড়ী আন্‌তি পাল্‌লাম না—খোদা তালার মর্জ্জি! গদা। বিষ্টি না হল্যে কি কখন ধান হয় রে? তা দেখ্ এখন কত্তাবাবু কি করেন। হানি। আর কি কর্‌বেন? উনি কি আর খাজনা ছাড়বেন? গদা। তবে তুই কি কর্‌বি? হানি। আর মোর্ মাথা করবো? এখনে মলিই বাঁচি। এবার যদি লাঙ্গলখান্ আর গরু দুটো যায় তা হলি তো আমিও গেলাম্। হা আল্লা! বাপ্ দাদার ভিটেটাও কি আখেরে ছাড়তি হলো! গদা। এই যে কত্তাবাবু এদিকে আস্চেন। তা আমিও তোর হয়ে দুই এক কথা বল্তে কসুর করব‍্যো না। দেখ্ কি হয়! (ভক্তবাবুর প্রবেশ।) হানি। কত্তাবাবু, সালাম করি! ভক্ত। (বৃক্ষমূলে উপবেশন করিয়া) হ্যাঁরে হান্ফে, তুই বেটা তো ভারি বজ্জাত্। তুই খাজনা দিস্‌নে কেন রে, বল তো? (মালা জপন।) হানি। আগ্যে কত্তা, এবারহার ফসলের হাল আপনি তো সব ওয়াকিক্ হয়েছেন। ভক্ত। তোদের ফসল হৌক আর না হৌক তাতে আমার কি বয়ে গেল? হানি। আগ্যে, আপনি হচ্যেন্ কত্তা— ভক্ত। মর্ বেটা, কোম্পানীর সরকার তো আমাকে ছাড়বে না। তা এখন বল্‌—খাজনা দিবি কি না। হানি। কত্তাবাবু, বন্দী অনেক কাল্যে রাইওৎ, এখনে আপনি আমার উপর মেহেরবানি না কল্যি আমি আর যাবো কনে। আমি এখনে বারোটি গোঙা পয়সা ছাড়া আর এক কড়াও দিতি পারি না। ভক্ত। তুই বেটা তো কম্ বজ্জাত্ নস্ রে। তোর ঠেঁয়ে এগারো সিকে পাওয়া যাবে, তুই এখন্ তাতে কেবল তিন সিকে দিতে চাস্। গদা——— গদা। আজ্ঞেএএএ ভক্ত। এ পাজি বেটাকে ধরে নে যেয়ে জমাদারের জিম্বে করে দে আয় তো। গদা। যে অজ্ঞে (হানিফের প্রতি) চল্ রে। হানি। কত্তা বাবু, আমি বড় কাঙাল রাইওৎ! আপনার খায়্যে পরেই মানুষ হইছি, এখনে আর যাবো কনে? ভক্ত। নে যা না—আবার দাঁড়াস্ কেন? গদা। চল্‌ না। হানি। দোয়াই কত্তার, দোয়াই জমীদারের। (গদার প্রতি জনান্তিকে) তুই ভাই আমার হয়ে দুএট্টা কথা বল্না কেন? গদা। আচ্ছা। তবে তুই একটু সরে দাঁড়া। (ভক্তের প্রতি জনান্তিকে) কত্তাবাবু— হানি। কি রে— গদা। আপনি হান্ফেকে এবারকার মতন্ মাফ্ করুন্। ভক্ত। কেন? গদা। ও বেটা এবার যে ছুঁড়ীকে নিকে করেছে তাকে কি আপনি দেখেছেন? হানি। না। হানি। মশায়, তার রূপের কথা আর কি বল্‌বো। বয়েস বছর উনিশ, এখনও ছেলে পিলে হয় নি, আর রঙ যেন কাঁচা সোণা। ভক্ত। (মালা শীঘ্র জপিতে জপিতে) অ্যাঁ, অ্যাঁ, বলিস্ কিরে? গদা। আজ্ঞে, আপনার কাছে কি আর মিথ্যে বল্চি আপনি তাকে দেখতে চান্ তো বলুন। ভক্ত। (চিন্তা করিয়া) মুসলমান মাগীদের মুখ দিয়ে যে প্যাঁজের গন্ধ ভক্‌তক্ করে বেরোয় তা মনে হল্যে বমি এসে। গদা। কত্তাবাবু, সে তেমন নয়। ভক্ত। (চিন্তা করিয়া) মুসলমান! যবন! ম্লেচ্ছ! পরকালটাও কি নষ্ট করবো? গদা। মশায়, মুসলমান হলো তো বয়ে গেল কি? আপনি না আমাকে কতবার বলেছেন যে শ্রীকৃষ্ণ ব্রজে গোয়ালাদের মেয়েদের নিয়ে কেলি কত‍্যেন! ভক্ত। দীনবন্ধো, তুমিই যা কর। হাঁ, স্ত্রীলোক—তাদের আবার জাত কি? তারা তো সাক্ষাৎ প্রকৃতিস্বরূপা, এমন তো আমাদের শাস্ত্রেও প্রমাণ পাওয়া যাচ্যে,;—বড় সুন্দরী বটে, অ্যাঁ? আচ্ছা ডাক, হান্ফকে ডাক। গদা। ও হানিফ্ এ দিকে আয়। হানি। অ্যাঁ, কি? ভক্ত। ভাল, আমি যদি আজ তিন সিকে নিয়ে তোকে ছেড়ে দি, তবে তুই বাদ্‌বাকি টাকা কবে দিবি বল্ দেখি? হানি। কত্তামশায়, আল্লাতালা চায় তো মাস দ্যাড়েকের বিচেই দিতি পারবো। ভক্ত। আচ্ছা, তবে পয়সা গুলো দেওয়ান্জীকে দেগে। হানি। (সহর্ষে) য‍্যাগ্যে কত্তা, (স্বগত) বাঁচ্লাম! বারো গোণ্ডা পয়সা তো গাঁটি আছে, আর আট সিকে কাছায় বান্ধ্যে আনেছি, যদি বড় পেড়াপিড়ি কত্তো তা হলি সব দিয়ে ফ্যালতাম্। (প্রকাশে) সালাম কর্ত্তা [ প্রস্থান। ভক্ত। ওরে গদা—— গদা। আজ্ঞেএএএ। ভক্ত। এ ছুঁড়িকে তো হাত্ কত্যে পারবি? গদা। আজ্ঞে, তার ভাবনা কি? গোটা কুড়িক্ টাকা খরচ কল্যে—— ভক্ত। কু-ড়ি টা-কা! বলিস্ কি? গদা। আজ্ঞে এর কম্ হবে না, বরঞ্চ জেয়াদা নাগলেও নাগদে পারে, হাজারো হোক ছুঁড়ি বউমানুষ কি না। ভক্ত। আচ্ছা, আমি যখন বৈটকখানায় যাবে। তখন আসিস্, টাকা দেওয়া যাবে। গদা। যে আজ্ঞে। ভক্ত। (নেপথ্যাভিমুখে অবলোকন করিয়া) ও কে? বাচস্পতি না? (বাচস্পতির প্রবেশ।) কেও? বাচস্পতি দাদা যে! প্রণাম। এ কি? বাচ। আর দুঃখের কথা কি বলবো, এত দিনের পর মা ঠাকুরুণের পরলোক হয়েছে! (রোদন।) ভক্ত। বল কি? তা এ কবে হলো? বাচ। অদ্য চতুর্থ দিবস। ভক্ত। হয়েছিল কি? বাচ। এমন কিছু নয়, তবে কি না বড় প্রাচীন হয়েছিলেন। ভক্ত। প্রভো, তোমারই ইচ্ছা! এ বিষয়ে ভাই আক্ষেপ করা বৃথা। বাচ। তা সত্য বটে, তবে এক্ষণে আমি এদায় হতে যাতে মুক্ত হই তা আপনাকে কত্যে হবে। যে কিঞ্চিৎ ব্রহ্মত্র ভূমি ছিল, তা তো আপনার বাগানের মধ্যে পড়াতে বাজেআপ্ত হয়ে গিয়েছে। ভক্ত। আরে, যা হয়ে বয়ে গিয়েছে সে কথা আর কেন? বাচ। না, সে তো গিয়েইছে—“গতস্য শোচনা নাস্তি”—সে তো এমনেও নেই, অমনেও নেই, তবে কি না আপনার অনেক ভরসা করে থাকি, তা, যাতে এ দায় হতে উদ্ধার হতে পারি, তা আপনাকে অবশ্যই কর্‌তে হবে। ভক্ত। আমার ভাই এ নিতান্ত কুসময়, অতি অল্প দিনের মধ্যেই প্রায় বিশ হাজার টাকা খাজনা দাখিল কত্যে হবে। বাচ। আপনার এ রাজসংসার। মা কমলার কৃপায় আপনার অপ্রতুল কিসের? কিঞ্চিৎ কটাক্ষ কল্যে আমার মত সহস্র লোক কত দায় হতে উদ্ধার হয়। ভক্ত। আমি যে এ সময়ে ভাই তোমার কিছু উপকার করে উঠি, এমন তো আমার কোন মতেই বোধ হয় না। তা তুমি ভাই অন্যত্তরে চেষ্টা কর। দেখি, এর পরে যদি কিছু কত‍্যে পারি। বাচ। বাবুজী, আপনি হচ‍্যেন ভূস্বামী, রাজা; আপনার সম্মুখে তো আর অধিক কিছু বলা যায় না, তা আপনার যা বিবেচনা হয় তাই করুন্। (দীর্ঘনিশ্বাস) এক্ষণে আমি তবে বিদায় হল্যেম। ভক্ত। প্রণাম। [ বাচস্পতির প্রস্থান। ] আঃ এই বেটারাই আমাকে দেখছি ডুবুলে। কেবল দাও! দাও! দাও! বই আর কথা নাই। ওরে গদা— গদা। আজ্ঞেএএ ভক্ত। ছুঁড়ি দেখতে খুব ভাল তো রে। গদা। কত্তামশায়, আপনার সেই ইচ্ছেকে মনে পড়ে তো। ভক্ত। কোন্ ইচ্ছে? গদা। আজ্ঞে, ঐ যে ভটা্চাজ্যিদের মেয়ে আপ্‌নি যাকে——(অর্দ্ধোক্তি)―তার পরে যে বেরিয়ে গিয়ে কসবায় ছিল। ভক্ত। হাঁ! হাঁ! ছুঁড়িটে দেখ্তে ছিল ভাল বটে (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) রাধেকৃষ্ণ! প্রভো তুমিই সত্য। তা সে ইচ্ছের এখন কি হয়েছে রে? গদা। আজ্ঞে সে এখন বাজারে হয়ে পড়েছে। হান্ফের মাগ ভরি চাইতেও দেখ্তে ভাল। ভক্ত। বলিস্ কি! অ্যাঁ? আজ রাত্রে ঠিক ঠাক্ কত্যে পার্‌বি তো? গদা। আজ্ঞে, আজ না হয় কাল পরসুর মধ্যে করে দেব। ভক্ত। দেখ্, টাকার ভয় করিস্ না। যত খরচ লাগে আমি দেব। গদা। যে আজ্ঞে। (স্বগত) কত্তাটি এমনি খেপে উঠলিই তো আমরা বাঁচি,—গো-মড়কেই মুচির পার্ব্বণ। ভক্ত। (নেপথ্যাভিমুখে অবলোকন করিয়া) ও—কে ও রে? গদা। আজ্ঞে, ও ভগী আর তার মেয়ে পাঁচি। জল আন্‌তে আস্চে। ভক্ত। কোন ভগী রে? গদা। আজ্ঞে পীতেম্বরে তেলীর মাগ। ভক্ত। ঐ কি পীতম্বরের মেয়ে পঞ্চী? এ যে গোবরে পদ্মফুল ফুটেছে! গদা। আজ্ঞে, ও আজ দুদিন হলো শ্বশুরবাড়ী থেকে এসেছে। ভক্ত। (স্বগত) “মেদিনী হইল মাটী নিতম্ব দেখিয়া। অদ্যাপি কাঁপিয়া উঠে থাকিয়া থাকিয়া”॥ আহা! কুচ হৈতে কত উচ্চ মেরুচূড়া ধরে। শীহরে কদম্বফুল দাড়িম্ব বিদরে॥” গদা। (স্বগত) আবার ভাব্ লাগ্‌লো দেখচি। বুড়ো হলে লোভাত্তি হয়; কোন ভাল মন্দ জিনিস্ সাম্‌নে দিয়ে গেলে অরি রক্ষে থাকে না। ভক্ত। ওরে গদা— গদা। আজ্ঞেএএ। ভক্ত। এ দিকে কিছু কত‍্যে টত‍্যে পারিস্? গদা। আজ্ঞে, ও বড় সহজ কথা নয়। ওর বড়মানুষের ঘরে বিয়ে হয়েছে শুনেছি। (কলসী লইয়া ভগী এবং পঞ্চীর প্রবেশ।) ভক্ত। ওগো বড়বউ, ও মেয়েটি কে গা? ভগী। সে কি কত্তাবাবু? আপনি আমার পাঁচিকে চিন্‌তে পারেন না? ভক্ত। এই কি তোমার সেই পাঁচি? আহা ভাল ভাল, মেয়েটি বেঁচে থাকুক্। তা এর বিয়ে হয়েছে কোথায়? ভগী। আজ্ঞে খানাকুল কৃষ্ণনগরে পালেদের বাড়ী। ভক্ত। হাঁ, হাঁ, তারা খুব বড়মানুষ বটে। তা জামাইটি কেমন গা? ভগী। (সগর্ব্বে) আজ্ঞে, জামাইটা দেখ্তে বড় ভাল। আর কলকেতায় থেকে লেখা পড়া শেখে। শুনেছি যে লাট সাহেব তারে নাকি বড় ভাল বাসেন্, আর বছর বছর এক এক থানা বই দিয়ে থাকেন। ভক্ত। তবে জামাইটি কলকেতাতেই থাকে বটে? ভগী। আজ্ঞে হাঁ। মেয়েটিকে যে এবার মশায় কত করে এনেছি তার আর কি বলবো। বড়ঘরে মেয়ে দিলে এই দশাই ঘটে। ভক্ত। হাঁ, তা সত্য বটে। (স্বগত) ছুঁড়ির নবযৌবনকাল উপস্থিত, ভাতে আবার স্বামী থাকে বিদেশে। এতেও যদি কিছু না কত্যে পারি তবে আর কিসে পারবো। (প্রকাশে) ও পাঁচি, একবার নিকটে আয়তো তোকে ভাল করে দেখি। সেই তোকে ছোটটি দেখেছিলেম, এখন তুই আবার ডাগর ডোগরটি হয়ে উঠেছিস। ভগী। যা না মা, ভয় কি? কত্তাবাবুকে গিয়ে দণ্ডবৎ কর, বাবু তোর জেঠা হন্। পঞ্চী। (অগ্রসর হইয়া প্রণাম করিয়া স্বগত) ওমা! এ বুড়ো মিন্‌সেতো কম নয়গা। একি আমাকে খেয়ে ফেল্তে চায় না কি? ওমা, ছি! ও কি গো? এ যে কেবল আমার বুকের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে? মর। ভক্ত। (স্বগত) “শীহরে কদম্ব ফুল দাড়িম্ব বিদরে।” আহাহা! ভগী। আপনি কি বল্ছেন? ভক্ত। না। এমন কিছু নয়। বলি মেয়েটি এখানে কদ্দিন থাক্‌বে! ভগী। ওর এখানে এক মাস থাকবার কথা আছে। ভক্ত। (স্বগত) তা হলেই হয়েছে। ধনঞ্জয় অষ্টাদশ দিনে একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা সমরে বধ করেন্,—আমি কি আর এক মাসে একটা তেলীরমেয়েকে বশ কত‍্যে পারবো না? (প্রকাশে) কৃষ্ণ হে তোমার ইচ্ছে। ভগী। কত্তাবাবু। আপনি কি বল্ছেন? ভক্ত। বলি, পীতাম্বর ভায়া আজ কোথায়? ভগী। সে নুণের জন্যে কেশবপুরের হাটে গেছে। ভক্ত। আসবে কবে? ভগী। আজ্ঞে চার পাঁচ দিনের মধ্যে আস্‌বে বলে গেছে। কত্তাবাবু, এখন আমরা তবে ঘাটে জল আনতে যাই। ভক্ত। হাঁ, এসো গে। ভগী। আয়, মা, আয়। [ ভগী এবং পঞ্চীর প্রস্থান। ভক্ত। (স্বগত) পীতেম্বরে না আসতে২ এ কর্ম্মটা সার্‌তে পার্‌লে হয়। (নেপথ্যাভিমুখে অবলোকন করিয়া) আহা! ছুঁড়ি কি সুন্দরী। কবিরা যে নবযৌবনা স্ত্রীলোককে মরালগামিনী বলে বর্ণনা করেন সে কিছু মিথ্যা নয়। (প্রকাশে) ও গদা— গদা। আজ্ঞে। (স্বগত) এই আবার সাল্যে দেখচি। ভক্ত। কাছে আয় না। দেখ্, এ বিষয়ে কিছু কত‍্যে পারিস্? গদা। কত্তামশায়! এ আমার কর্ম্ম নয়। তবে যদি আমিরি পিসী পারে তা বল্তে পারিনে। ভক্ত। তবে যা, দৌড়ে গিয়ে তোর পিসীকে এসব কথা বল্‌গে। আর দেখ্, এতে যত টাকা লাগে আমি দেবো। গদা। যে আজ্ঞে, তবে আমি যাই। (গমন করিতে২) কর্ত্তা আজকে কল্পতরু, তা দেখি গদার কপালে কি ফলে। [ প্রস্থান। ভক্ত। (স্বগত) প্রভো, তোমারই ইচ্ছা। আহা, ছুঁড়ির কি চমৎকার রূপ গা, আর একটু ছেনালিও আছে। তা দেখি কি হয়। (চাকরের গাড়ু গামছা লইয়া প্রবেশ।) এখন যাই, সন্ধ্যা আহ্নিকের সময় উপস্থিত হলো। (গাত্রোত্থান করিয়া) দীনবন্ধো! তুমি যা কর। আঃ, এ ছুঁড়িকে যদি হাত কত‍্যে পারি। [ উভয়ের প্রস্থান। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক হানিফ্গাজীর নিকেতন সম্মুখে। (হানিফ্ এবং ফতেমার প্রবেশ।) হানি। বলিস কি? পঞ্চাশ টাকা? ফতে। মুই কি আর ঝুট কথা বলছি। হানি। (সরোষে) “এমন গরুখোর হারামজাদা কি হেঁদুদের বিচে আর দুজন আছে? শালা রাইওৎ বেচারিগো জানে মার‍্যে, তাগোর সব লুটে নিয়ে, তার পর এই করে। আচ্ছা দেখি, এ কুম্পানির মুলুকে এনছাফ আছে কি না। বেটা কাফেরকে আমি গোরু খাওয়ায়ে তবে ছাড়বো। বেটার বড় মক্‌দুর। আমি গরিব হলাম বল্যে বয়ে গেলো কি? আমার বাপ দাদা নওয়াবের সরকারে চাকুরী করেছে, আর মেরি বুন্, কখনো বারয়ে গিয়ে তো কশবগিরি করে নি। শালা—— ফতে। আরে মিছে গোসা কর কেন? ঐ দেখ, যে কুটনী মাগীকে মোর কাছে পেট্‌য়েছ্যাল, সে ফের এই দিগে আস্‌তেচে হানি। গস্তানীর মাথাটা ভাঙ্তি পাত্তাম, তা হলি গা টা ঠাণ্ডা হতো। ফতে। চল, মোরা একটু তফাতে দাঁড়াই, দেখি মাগী আস্যে কি করে। [ উভয়ের প্রস্থান। (পুঁটির প্রবেশ।) পুঁটি। (চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিয়া স্বগত) থু, থু! পাতি নেড়ে বেটাদের বাড়ীতেও আস্‌তে গা বমি বমি করে। থু, থু! কুকঁড়র পাখা, প্যাঁজের খোষা। থু, থু। তা করি কি? ভক্তবাবু কি এ কর্ম্মে কখনও ক্ষান্ত হবে। এত যে বুড়, তবু আজো যেন রস উতলে পড়ে। আজ্‌ না হবে তো ত্রিশ বছর এর কর্ম্ম কচ্ছি, এতে যে কত কুলের ঝি বউ, কত রাঁড়, কত মেয়ের পরকাল খেয়েছি তার কিছু ঠিকানা নাই। (সহাস্য বদনে) বাবু এদিকে আবার পরম বৈষ্ণব, মালা ঠকঠকিয়ে বেড়ান্—ফি সোমবারে হবিষ্যি করেন—আ মরি, কি নিষ্ঠে গা! (চিন্তা করিয়া) সে যাক মেনে, দেখি এখন এ মাগীকে পারি কি না। পীতেম্বরে তেলীর মেয়েকে এসব কথা বলতে ভয় পায়। সে তো আর দুঃখী কাঙ্গালের বউ নয় যে দুই চার টাকা দেখলে নেচে উঠ্‌বে। আর ভক্তবাবুর যদি যুবকাল থাক্‌তো তা হলেও ক্ষতি ছিলো না। ছুঁড়ি যদি নারাজ হয়ে রাগ্তো তা হল্যে নয় কথাটা ঠাট্টা করেই উড়িয়ে দিতেম। তা দেখি, এখানে কি হয়। (উচ্চৈঃস্বরে) ও ফতি! তুই বাড়ী আচিস্? নেপথ্যে। ও কে ও? পুঁটি। আমি, একবার বেরো তো। (ফতেমার প্রবেশ।) ফতে। পুঁটি দিদি যে, কি খবর? পুঁটি। হানিফ কোথায়? ফতে। সে ক্ষেতে লাঙ্গল দিতি গেছে। পুঁটি। (স্বগত) আপদ্ গেছে। মিন্‌সে যেন যমের দূত (প্রকাশে) ও ফতি তুই এখন বলিস কি ভাই? ফতে। কি বলবো? পুঁটি। আর কি বলবি? সোণার খাবি, সোণার পরবি, না এখানে বাঁদি হয়ে থাকবি? ফতে। তা ভাই যার যেমন নসিব। তুই মোকে জওয়ান খসম্ ছেড়ে একটা বুড়র কাছে যাতি বলিস্, তা সে বুড় মলি ভাই আমার কি হবে? পুঁটি। আঃ! ও সব কপালের কথা, ও সব কথা ভাবতে গেলে কি কাজ্ চলে? এই দেখ্ পঁচিশটে টাকা এনেছি। যদি এ কম্ম করিস্ তো বল, টাকা—দি; আর না করিস্ তো তাও বল, আমি চল্‌লেম। ফতে। দাঁড়া ভাই, একটু সবুর কর না কেন। পুঁটি। তুই যদি ভাই আমার কথা শুনিস তবে তোর আর দেরি করে কাজ নাই। ফতে। (চিন্তা করিয়া) আচ্ছা ভাই, দে, টাকা দে। পুঁটি। দেখিস্ ভাই, শেষে যেন গোল না হয়। ফতে। তার জন্যে ভয় কি? আমি সাঁজের বেলা তোদের বাড়ীতে যাব এখন্। দে, টাকা দে। তা ভাই, একথা তো কেউ মালুম্ কত্যি পারবে না? পুঁটি। কি সর্ব্বনাশ! তাও কি হয়। আর একথা লোকে টের পেলে আমাদের যত লাজ তোর তো আর তত নয়। আমরা হল্যেম হিঁদু, তুই হলি নেড়েদের মেয়ে, তোদের তো আর কুল মান নাই, তোরা রাঁড় হল্যে আবার বিয়ে করিস্। ফতে। (সহাস্য বদনে) মোরা রাঁড় হল্যি নিকা করি, তোরা ভাই কি করিস্ বল্ দেখি। সে যাহৌক মেনে, এখন দে, টাকা দে। পুঁটি। এই নে। ফতে। (টাকা গণনা করিয়া) এ যে কেবল এক কম্ পাঁচ গণ্ডা টাকা হলো। পুঁটি। ছ টাকা ভাই আমার দস্তুরী। ফতে। না, না, তা হবে না, তুই ভাই দু টাকা নে। পুঁটি। না ভাই, আমাকে না হয় চারটে টাকা দে। ফতে। আচ্ছা, তবে তুই বাকি দুটো টাকা ফিরিয়ে দে। পুঁটি। এই নে—আর দেখ, তুই সাঁজের বেলা ঐ আঁববাগানে যাস্, তার পরে আমি এসে তোকে নে যাবো। ফতে। আচ্ছা, তুই তবে এখন যা। পুঁটি। দেখ্ ভাই, এ কম্ মানুষের টাকা নয়, এ টাকা বজ্জাতি করে হজম্ করা তোর আমার কম্ম নয়, তা এখন আমি চল্‌লেম্। [ প্রস্থান। (হানিফের পুনঃপ্রবেশ।) হানি। (নেপথ্যাভিমুখে অবলোকন করিয়া সরোষে) হারামজাদীর মাথাটা ভাঙ্গি, তা হল্যি গা জুড়য়। হা আল্লা, এ কাফের শালা কি মুসল্‌মানের ইজ্জৎ মাত্যি চায়। দেখিস্ ফতি, যা কয়ে দিছি যেন ইয়াদ থাকে, আর তুই সম্ঝে চলিস্‌; বেটা বড় কাফের, যেন গায়টায় হাত্ না দিতি পায়। ফতে। তার জন্যি কিছু ভাব্তি হবে না। ঐ দেখ, এদিকে কেটা আস্‌তেচে, আমি পালাই। [ প্রস্থান। (বাচস্পতির প্রবেশ।) বাচ। (স্বগত) অনেক কাষ্ঠের দেখছি আবশ্যক হবে, তা ঐ প্রাচীন তেতুল গাছটাই কাটা যাউক না কেন? আহা! বাল্যাবস্থায় যে ঐ বৃক্ষমূলে কত ক্রীড়া করেছি তা স্মরণপথারূঢ় হল্যে মন্‌টা চঞ্চল হয়। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) দূর হোক্, ও সব কথা আর এখন ভাবলে কি হবে। (উচ্চৈস্বরে) ও হানিফ্— হানি। আগ্যে, কি বল্চো? বাচ। ওরে দেখ, একটা তেতুলগাছ কাট্‌তে হবে, তা তুই পারবি? হানি। পারবো না কেন? বাচ। তবে তোর কুড়ালি খান নে আমার সঙ্গে আয়। হানি। ঠাকুর, কত্তাবাবু এই ছরাদের জন্যি তোমাকে কি দেছে না? বাচ। আরে ওকথা আর কেন জিজ্ঞাসা করিস্? যে বিঘে কুড়িক ব্রহ্মত্র ছিল তা তো তিনি কেড়ে নিয়েছেন, আর এই দায়ের সময় গিয়ে জানালেম, তা তিনি বল্যেন্ যে এখন আমার বড় কুসময়, আমি কিছু দিতে পার্ব‍্যো না; তার পরে কত করে বল্যে কয়ে পাঁচটি টাকা বার্ করেচি। (দীর্ঘনিশ্বাস) সকলি কপালে করে! হানি। (চিন্তা করিয়া) ঠাকুর, একবার এদিকে আসো তো, তোমার সাতে মোর থোড়া বাৎ চিত আছে। বাচ। কি বাৎ চিত্, এখানেই বল্না কেন? হানি। আগ্যে না, একবার ঐ দিকে যাতি হবে। বাচ। তবে চল। [ উভয়ের প্রস্থান। (ফতেমার এবং পুঁটির পুনঃ প্রবেশ।) পুঁটি। না ভাই, ও আঁব বাগানে হলো না। ফতে। তবে তুই ভাই মোকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস্ তা বল? পুঁটি। দেখ ঐ যে পুখুরের ধারে ভাঙ্গা শিবের মন্দির আছে, সেইখানে তোকে যেতে হবে, তা তুই রাত্ চারঘড়ীর সময় ঐ গাছতলায় দাঁড়াস্, তার পরে আমি এসে যা কত্যে হয় করে কম্মে দেবো। ফতে। আচ্ছা, তবে তুই যা, দেখিস্ ভাই এ কথা যেন কেউ টের টোর না পায়। পুঁটি। ওলো, তুই কি কায়েত্ না বামণের মেয়ে যে তোর এতো ভয় লো? ফতে। আমি যা হই ভাই, আমার আদ্‌মি একথা টের পাল্যি আমাগো দুজনকেই গলা টিপে মেরে ফেলাবে। পুঁটি। (সত্রাসে) সে সত্তি কথা। উঃ! বেটা যেন ঠিক্ যমদূত। তবে আমি এখন যাই। [ প্রস্থান। ফতে। (স্বগত) দেখি, আজ রাতির বেলা কি তামাশা হয়; এখন যাই, খানা পাকাই গো। [ প্রস্থান। (বাচস্পতি এবং হানিফের পুনঃপ্রবেশ।) বাচ। শিব! শিব! এ বয়েসেও এতো? আর তাতে আরি যবনী। রাম বলো! কলিদেব এত দিনেই যথার্থরূপে এ ভারতভূমিতে আবির্ভূত হলেন্। হানিফ্, দেখ্, যে কথা বল্যেম্‌ তাতে যেন খুব্ সতর্ক থাকিস্। এতে দেখ্ছি আমাদের উভয়েরই উপকার হত্যে পারবে। ফতে। য‍্যাগ্যে, তার জন্যি ভাবতি হবে না। বাচ। এখন্ চল্। তোর কুড়ালি কোথায়? হানি। কুরুল্খান বুঝি ক্ষেতে পড়ে আছে। চল। [ উভয়ের প্রস্থান। ইতি প্রথমাঙ্ক। দ্বিতীয়াঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। ভক্তপ্রসাদ বাবুর বৈটক্খানা। ভক্তবাবু আসীন! ভক্ত। (স্বগত) আঃ! বেলাটা কি আজ্ আর ফুরবে না? (হাই তুলিয়া) দীনবন্ধো! তোমারই ইচ্ছা। পুঁটি বলে যে পঞ্চীছুঁড়িকে পাওয়া দুষ্কর, কি দুঃখের বিষয়! এমন্ কনক পদ্মটি তুলতে পাল্‌লেম্ না হে! সসাগরা পৃথিবীকে জয় কর‍্যে পার্থ কি অবশেষে প্রমীলার হস্তে পরাভূত হল্যেন্। যা হৌক, এখন যে হান্ফের মাগ্‌টাকে পাওয়া গেছে এও এক্‌টা আহ্লাদের বিষয় বটে। ছুঁড়ী দেখ্তে মন্দ নয়, বয়স অল্প, আর নবযৌবন মদে একবারে যেন ঢলে ঢলে পড়ে। শাস্ত্রে বলেছে যে যৌবনে কুক্কুরীও ধন্য! (চতুদিক্ অবলোকন করিয়া) ইঃ! এখনও না হবে তো প্রায় দুই তিন দণ্ড বেলা আছে। কি উৎপাৎ! c}} কেও, আনন্দ নাকি? এসো বাপু এসো, বাড়ী এসেছো কবে? আন। (প্রণাম ও উপবেশন করিয়া) আজ্ঞে, কাল রাত্রে এসে পৌঁছেছি। ভক্ত। তবে কি সংবাদ, বল দেখি শুনি। আন। আজ্ঞে, সকলই সুসংবাদ। অনেক দিন বাড়ী আসা হয় নি বল্যে মাস খানেকের ছুটি নিয়ে এসেছি। ভক্ত। তা বেস্ করেছো। আমার অম্বিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল? আন। আজ্ঞে, অম্বিকার সঙ্গে কল্‌কেতায় তো আমার প্রায় রোজই সাক্ষাৎ হয়। ভক্ত। কেন? তুমি না পাথুরেঘাটায় থাক? আন। আজ্ঞে, থাকতেম্ বটে, কিন্তু এখন উঠে এসে খিদির পুরে বাসা করেছি। ভক্ত। অধিকার লেখা পড়া হচ্যে কেমন? আন। জেঠা মহাশয়, এমন ক্লেবর্ ছোকরা তো হিন্দুকালেজে আর দুটি নাই। ভক্ত। এমন কি ছোকরা বল্‌লে, বাপু? আন। আজ্ঞে ক্লেবর্, অর্থাৎ সুচতুর—মেধাবী। ভক্ত। হাঁ! হাঁ! ও তোমাদের ইংরাজী কথা বটে? ও সকল, বাপু, আমাদের কাণে ভাল লাগে না। জহীন্ কিম্বা চালাক্ বল্‌লে আমরা বুঝতে পারি। ভাল, আনন্দ! তুমি বাপু অতি শিষ্ট ছেলে, তা বল দেখি, অম্বিকা তো কোন অধর্ম্মাচরণ শিখচে না। আন। আজ্ঞে, অধর্ম্মাচরণ কি? ভক্ত। এই দেব ব্রাহ্মণের প্রতি অবহেলা, গঙ্গাস্নানের প্রতি ঘৃণা, এই সকল খ্রীষ্টিয়ানি মত—— আন। আজ্ঞে, এ সকল কথা আমি আপনাকে বিশেষ করে বলতে পারি না। ভক্ত। আমার বোধ হয় অম্বিকা প্রসাদ কখনই এমন কুকর্ম্মাচারী হবে না—সে আমার ছেলে কি না। প্রভো! তুমিই সত্য। ভাল আমি শুনেছি যে কল্‌কেতায় না কি সব একাকার হয়ে যাচ্ছে? কায়স্থ, ব্রাহ্মণ, কৈবর্ত্ত, সোণা-বেণে, কপালি, তাঁতি, জোলা, তেলি, কলু, সকলই না কি একত্রে উঠে বসে, আর খাওয়া দাওয়াও করে? বাপু, এ সকল কি সত্য? আন। আজ্ঞে, বড় যে মিথ্যা তাও নয়।, ভক্ত। কি সর্ব্বনাশ! হিন্দুয়ানির মর্য্যাদা দেখ্চি আর কোন প্রকারেই রৈলো না! আর রৈবেই বা কেমন করে? কলির প্রতাপ দিন্ দিন্ বাড়ছে বই তো নয়। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) রাধেকৃষ্ণ! (গদাধরের প্রবেশ) গদা। আজ্ঞে, আমি গদা। (এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান) ভক্ত। (ইসারা)। গদা। (ঐ)। ভক্ত। (স্বগত) ইঃ আজ্ কি সন্ধ্যা হবে না না কি। (প্রকাশে) ভাল, আনন্দ! শুনেছি—কল্‌কেতায় না কি বড় বড় হিন্দু সকলে মুসলমান বাবুর্চী রাখে? গদা। আজ্ঞে, কেউ কেউ শুনেছি রাখে বটে। ভক্ত। থু! থু! বল কি? হিন্দু হয়ে নেড়ের ভাত্ খায়? রাম! রাম! থু! থু! গদা। (স্বগত) নেড়েদের ভাত্ খেলে জাত যায়, কিন্তু তাদের মেয়েদেয় নিলে কিছু হয় না। বাঃ! বাঃ। কত্তাবাবুর কি বুদ্ধি! ভক্ত। অম্বিকাকে দেখুচি আর বিস্তর দিন কল্‌কেতায় রাখা হবে না। আন। আজ্ঞে, এখন অম্বিকাকে কালেজ থেকে ছাড়ান কোন মতেই উচিত হয় না। ভক্ত। বল কি, বাপু? এর পরে কি ইংরাজী শিখে আপনার কুলে কলঙ্ক দেবে? আর “মরা গরুতেও কি ঘাস্ খায়” এই বলে কি পিতৃ পিতামহের শ্রাদ্ধটাও লোপ কর্‌বে? নেপথ্যে। (শঙ্খ, ঘণ্টা, মৃদঙ্গ, করতাল ইত্যাদি)। ভক্ত। এসো বাপু, ঠাকুরদর্শন করি গে। আন। যে আজ্ঞে চলুন্। [ উভয়ের প্রস্থান গদা। (স্বগত) এখন বাবুরা তো গেলো। (চতুর্দ্দিক অবলোকন করিয়া) দেখি একটু আরাম করি। (গদির উপর উপবেশন)। বাঃ। কি নরম্ বিছানা গা। এর্ উপরে বসলিই গাটা যেন ঘুম্‌ ঘুম্ কত্যে থাকে। (উচ্চৈঃস্বরে) ও রাম্। নেপথ্যে। কে ও? গদা। আমি গদাধর। ও রাম, বলি একছিলিম্ অম্বুরী তামাক টামাক খাওয়া না! নেপথ্যে। রোস্, খাওয়াচ্যি। গদা। (তাকিয়ায় ঠেশ্ দিয়া স্বগত) আহা, কি আরামের জিনিস্। এই বাবু বেটারাই মজা করে নিলে। যারা ভাতের সঙ্গে বাটী বাটী ঘি আর দুদ্ খায়, আর এমনি বালিসের উপর ঠেশ দিয়ে বসে, তাদের কত‍্যে সুখী কি আর আছে? (তামাক লইয়া রামের প্রবেশ।) রাম। ও কি ও? তুই যে আবার ওখানে বসিছিস্? ভক্ত। একবার ভাই বাবুগিরি করে জন্মটা সফল করে নি। দে, হুঁকটা দে। কত্তাবাবুর ফর্‌সিটে আনতিস্ তো আরও মজা হতো। (হুঁকা গ্রহণ) রাম। হা! হা! হা! তুই বাবুদের মতন্ তামাক খেতে কোথায় শিখ্লি রে? এ যে ছাতারের নেত্য। হা! হা! হা! গদা। হা! হা! হা! তুই ভাই একবার আমার গাটা টেপ্‌তো রাম। মর্ শালা, আমি কি তোর চাকোর? হা! হা! হা! গদা। তোর পায় পড়ি ভাই, আয় না। আচ্ছা, তুই এক্‌বার আমার গা টিপে দে, আমি নৈলে আবার তোর গা টিপে দেব এখন। রাম। হা! হা! হা! আচ্ছা তবে আয়। গদা। রোস্, হুঁকটা আগে রেখে দি। এখন আয়। রাম। (গাত্র টেপন)। গদা। হা! হা! হাঁ! মর্, অমন্ করে কি টিপ্‌তে হয়? . রাম। কেমন্, এখন ভাল লাগে তো। হা! হা! হা! গদা। আজ ভাই ভারি মজা কল্যেম্, হা! হা! হা! রাম। (নেপথ্যাভিমুখে অবলোকন করিয়া) পালা রে পালা ঐ দেখ কর্ত্তাবাবু আস্চে। [ হুঁকা লইয়া হাসিতে২ বেগে প্রস্থান। গদা। (গাত্রোত্থান করিয়া স্বগত) বুড় বেটা এমন সময়ে এসে সব নষ্ট কল্যে। ঈস্! আজ বুড়র ঠাট্ দেখলে হাসি পায়। শান্তিপুরে ধুতি, জামদানের মেরজাই, ঢাকাই চাদোর, জরির জুতো, আবার মাথায় তাজ। হা! হা! হা! (ভক্তবাবুর পুনঃপ্রবেশ।) ভক্ত। ও গদা। গদা। আজ্ঞেএএএ। ভক্ত। ওরা কি এসেছে বোধ হয়? গদা। আজ্ঞে, এতক্ষণে এসে থাক্‌তে পার্‌বে, আপনি আসুন। ভক্ত। যা তুই আগে যেয়ে দেখে আয় গে। গদা। যে আজ্ঞে। [ প্রস্থান। ভক্ত। (স্বগত) এই তাজ্‌টা মাথায় দেওয়া ভাল হয়েছে। নেড়ে মাগীরে এই সকল ভাল বাসে; আর এতে এই একটা আরও উপকার হচ্যে যে টিকিটা ঢাকা পড়েছে। (উচ্চৈস্বরে) ও রামা— নেপথ্যে। আজ্ঞে যাই। ভক্ত। আমার হাত্‌বাক্‌সটা আর আরসি খানা আন্‌তো। (স্বগত) দেখি, একটু আতর গায় দি। নেড়েরা আবাল বৃদ্ধ বনিতা আতরের খোস্‌বু বড় পছন্দ করে, আর ছোট শিশিটাও টেঁকে করে সঙ্গে নে যাই। কি জানি মাগীর গায়ে প্যাঁজের গন্ধ টন্ধ থাকে, না হয় একটু আতর মাখিয়ে তা দূর কর্‌বো। (বাক্‌স ও আরসি লইয়া রামের পুনঃপ্রবেশ।) ভক্ত। (আরসিতে মুখ দেখিয়া আতরের শিশি লইয়া বাক্‌স পুনরায় বন্ধ করিয়া) এই নে যা, আর দেখ্, যদি কেউ আসে তো বলিস্ যে আমি এখন জপে আছি। রাম। যে আজ্ঞে। [ প্রস্থান। ভক্ত। (পরিক্রমণ করিয়া স্বগত) আঃ! গদা বেটা যে এখনও আচে না? বেটা কুড়ের শেষ। (গদার পুনঃপ্রবেশ।) কি হলো রে? গদা। আজ্ঞে, পিসী তাকে নে গেছে, আপনি ভক্ত। তবে চল্ যাই। [ উভয়ের প্রস্থান। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। এক উদ্যানের মধ্যে এক ভগ্ন শিবের মন্দির। বাচস্পতি ও হানিফের প্রবেশ। বাচ। ও হানিফ্? হানি। জী। বাচ। এই তো সেই শিবমন্দির; এখনো তো দেখ্ছি কেউ আসেনি। তা চল্, আমরা ঐ অশ্বত্থগাছের উপরে এই বেলা লুকিয়ে বসে থাকি গে। হানি। আপনার যেমন মর্‌জি। বাচ। কিন্তু দেখ্, আমি যতক্ষণ না ইসারা করি, তুই চুপ করে বসে থাকিস্। হানি। ঠাহুর, তাতো থাকপো; লেকিন আমার সাম্‌নে যদি আমার বিবীর গায়ে হাত দেয়, কি কোন রকম বেইজ্জৎ কত্তি যায়, তা হলি তো আমি তখনি সে হারামজাদা বেটার মাথাটা টান্যে ছিঁড়ে ফেলাবো। আমার তো এখনে আর কোন ভয় নেই; আমি দোস্‌রা এলাকায় ঘরের ঠ্যাক্‌না করিছি। বাচ। (স্বগত) বেটা একে সাক্ষাৎ যমদূত, তাতে আবার রেগেছে, না জানি আজ্ একটা কি বিভ্রাটই বা ঘটায়। (প্রকাশে) দেখ্ হানিফ, অমন রাগ্‌লে চলব‍্যে না, তা হলে সব নষ্ট হবে; তুই একটু স্থির হয়ে থাক্। হানি। আরে থোও ম্যানে ঠাহুর! আমার লহু গরম্ হয়ে উঠতেছে, আর হাত দুখানা যেন নিস্‌পিস্ কত্তেছে,—একবার শালারে এখন পালি হয়, তা হলি মনের সাথে তারে কিল্‌য়ে গেরাম ছাড়‍্যে যাব, আর কি? বাচ। না তবে আমি এর মধ্যে ন্যই; আমার কথা যদি না শুনিস্ তবে আমি চল্যেম। (গমনোদ্যত)। হানি। আরে; রও না, ঠাহুর! এত গোসা হতেছ কেন? ভাল, কও দিনি আমি এখানে যদি চুপ করে থাকি তা হলি আখেরে তো শালারে সোধ্ দিতে পারবো? বাচ। হাঁ, তা পারবি বৈ কি। হানি। আচ্ছা, তবে চল তুমি যা বল্‌বে তাই করবো এখনে। বাচ। তবে চল্ ঐ গাছে উঠে চুপ করে বসে থাকিগে। [ উভয়ের প্রস্থান। (ফতেমা ও পুটির প্রবেশ।) ফতে। ও পুঁটি দিদি! মোরে এ কোথায় আনে ফ্যালালি? না ভাই, মোরে বড় ডর লাগে, সাপেই খাবে না কি হবে কিছু কতি পারি নে। পুঁটি। আরে এই যে শিবের মন্দির, আর তো দুকোশ পাঁচকোশ যেতে হবে না। তা এইখেনে দাঁড়া না। কত্তাবাবু ততখন আসুন। ফতে। না ভাই, যে আঁদার, বড় ডর লাগে। এই বনের মদি মোরা দুটিতি কেমন কোরে থাক্পো। পুঁটি। (স্বগত) বলে মিথ্যা নয়। যে অন্ধকার, গাটাও কেমন ছম্ ছম্ করে, আবার শুনেছি এখানে না কি ভূতের ভয়ও আছে। (পশ্চাতে দৃষ্টি করিয়া) আঃ এঁর যে আর আসা হয় না। ফতে। তুই নৈলে থাক ভাই, মুই আর রতি পারবো না। (গমনোদ্যত)। পুঁটি। (ফতের হস্ত ধারণ করিয়া) আমর, ছুঁড়ী! আমি থাক্‌লে কি হবে? (স্বগত) হায়, আমার কি এখন আর সে কাল আছে? তালশাঁস পেকে শক্ত হল্যে আর তাকে কে খেতে চায়? (প্রকাশে) তুই, ভাই, আর একটু খানি দাঁড়া না। কত্তাবাবু এলো বল্যে। ফতে। না ভাই, মুই তোর কড়ি পাতি চাই নে, মোর আদমি একথা মালুম কত্যি পাল্যি মোরে আর আস্তো রাখ্পে না। পুঁটি। আরে, মিছে ভয় করিস্ কেন? সে কেমন করে জান্‌তে পারবে বল্; সে কি আর এখানে দেখ্তে আস্ছে? তা এতো ভয়ই বা কেন? একটু দাঁড়া না। (সচকিতে স্বগত) ওমা, ঐ মন্দিরের মধ্যে কি একটা শব্দ হলো না? রাম! রাম! রাম! (ফতেকে ধারণ।) ফতে। (বিষণ্ণ ভাবে) তুই যদি না ছাড়িস্ ভাই তবে আর কি কর্‌বো; এখনে আল্লা যা করে! তা চল্ মোরা ঐ মস্জিদের মদ্দি যাই; আবার এখানে কেটা কোন দিক্ হতে দেখ্তি পাবে। পুঁটি। না না না, এই ফাঁকেই ভালো। (স্বগত) আঃ, এ বুড় ডেক্‌রা মরেছে না কি? ফতে। (সচকিত্তে) ও পুঁটি দিদি, ঐ দেখ দেখি কে দুজন্ আস্চে, আমি ভাই ঐ মস্জিদের মদ্দি নুকুই। পুঁটি। না লো না, ঐ খানে দাঁড়া না। আমি দেখ্চি, বুঝি আমাদের কত্তাবাবু ই বা হবে। (দেখিয়া) হাঁ তো, ঐ যে তিনিই বটে, আর সঙ্গে গদা আস্চে। আঃ বাঁচলেম্। ফতে। না ভাই, মুই যাই পুঁটি। আরে, দাঁড়া না; যাবি কোথা? (ভক্ত ও গদাধরের প্রবেশ।) পুঁটি। আঃ কত্তাবাবু, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ধরে গিয়েছে। আপনি দেরি কল্যেন্ বলে আমরা আরো ভাব্ছি লেম্‌, ফিরে যাই। ভক্ত। হ্যাঁ, একটু বিলম্ব হয়েছে বটে—তা এই যে আমার মনোমোহিনী এসেছেন। (স্বগত) আহা যবনী হোলো তায় বয়‍্যে গেল কি? ছুঁড়ি রূপে যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী! এ যে আস্তাকুড়ে সোণার চাঙ্গড়! (প্রকাশে গদার প্রতি) গদা তুই একটু এগিয়ে দাঁড়া তো যেন এদিগে কেউ না এসে পড়ে। গদা। যে আজ্ঞে। ভক্ত। ও পুঁটি, এটি তো বড় লাজুক দেখ্চি রে, আমারদিগে একবার চাইতেও কি নাই? (ফতের প্রতি) সুন্দরি, একবার বদন্ তুলে দুটো কথা কও, আমার জীবন সার্থক হউক। হরি বোল হরিবোল, হরিবোল!—তায় লজ্জা কি? গদা। (স্বগত) আর ও নাম কেন? এখন আল্লা আল্লা বলো। ভক্ত। আহা! এমন খোস-চেহারা কি হান্ফের ঘরে সাজে? রাজরাণী হোলে তবে এর যথার্থশোভা পায়। “ময়ূর চকোর শুক চাতকে না পায়। হায় বিধি পাকা আম দাঁড়কাকে খায়॥” বিধুমুখি, তোমার বদনচন্দ্র দেখে আজ আমার মনকুমুদ প্রফুল্ল হেলো!—আঃ! পুঁটি। (স্বগত) কত্তা আজ বাদে কাল সিঙ্গে ফুকবেন্, তবু রসিকতা টুকু ছাড়েন্ না। ওমা! ছাইতে কি আগুণ এতকালও থাকে গা? (প্রকাশে) কত্তাবাবু ও নেড়েদের মেয়ে, ওরা কি ওসব বোঝে? ভক্ত। আরে, তুই চুপ্ কর্ না কেন? পুঁটি। যে আজ্ঞে। ফতে। পুঁটি দিদি, মুই তোর পায়ে সেলাম করি, তুই মোকে হেথা থেকে নিয়ে চল। পুঁটি। অ-মর্, একশো বার ঐ কথা? বাবু এত করে বল্চ্যে তবু কি তোর আর মন ওঠে না? হাজার হোক্ নেড়ের জাত কি না,—কথায় বলে “তেঁতুল নয় মিষ্টি, নেড়ে নয় ইষ্টি।” কত্তাবাবুকে গেলে কত বামুণ কায়েতে বত্যে যায়, তা তুই নেড়ে বৈত নস্, তোদের জাত আছে, না ধর্ম্ম আছে? বরং ভাগ্যি করে মান্ যে বাবুর চোখে পড়েছিস্! ফতে। না ভাই, মুই অনেক্ষণ ঘর্ ছেড়ে এসেচি, মোর আদ্‌মি আসে এখনি মোকে খোঁজ করবে, মুই যাই ভাই। ভক্ত। (অঞ্চল ধারণ করিয়া) প্রেয়সি, তুমি যদি যাবে, তবে আমি আর বাঁচবো কিসে?—তুমি আমার প্রাণ—তুমি আমার কলিজে—তুমি আমার চদ্দোপুরুষ!—— “তুমি প্রাণ, তুমি ধন, তুমি মন, তুমি জন, নিকটে যেক্ষণ থাক সেই ক্ষণ ভাল লো। যত জন অরি আছে, তুচ্ছ করি তোমা কাছে, ত্রিভুবনে তুমি ভাল আর সব কাল লো॥” তা দেখ ভাই, বুড় বল্যে হেলা করো না; তুমি যদি চলে যাও তা হলে আর আমার প্রাণ থাক্‌বে। গদা। (স্বগত) ভেলা মোর ধন্ রে? এই তো বটে। পুঁটি। কত্তাবাবু, ফতির ভয় হচ্যে যে পাছে ওকে কেউ এখানে দেখ্তে পায়; তা ঐ মন্দিরের মধ্যে গেলেইত ভাল হয়। ভক্ত। (চিন্তিত ভাবে) অ্যাঁ—মন্দিরের মধ্যে? হাঁ; তা ভগ্নশিবে তো শিবত্ব নাই, তার ব্যবস্থাও নিয়েছি। বিশেষ এমন্ স্বর্গের অপ্সরীর জন্যে হিন্দুয়ানি ত্যাগ করাইবা কোন ছার? নেপথ্যে গম্ভীর স্বরে। বটেরে পাষণ্ড নরাধম দুরাচার? (সকলের ভয়)। ভক্ত। (সত্রাসে চতুর্দ্দিকে দেখিয়া) অ্যাঁ—আ—আ—আ—আমি না! ও বাবা! একি? কোথা যাব। পুঁটি। (কম্পিত কলেবরে) রাম—রাম—রাম—রাম! আমি তখনি ত জানি—রাম—রাম—রাম! ভক্ত। ও গদা! কাছে আয় না। গদা। (কম্পিত কলেবরে) আগে বাঁচি, তবে—— (নেপথ্যে হুঙ্কার ধ্বনি।) পুঁটি। ই—ই—ই—ই! (ভূতলে পতন ও মূর্চ্ছা)। ভক্ত। রাধাশ্যাম—রাধাশ্যাম!—ও মাগো—কি হবে! (নেপথ্যে) এই দেখ্ না কি হয়? ভক্ত। (কর যোড় করিয়া সকাতরে) বাবা! আমি কিছু জানি নে, দোহাই বাবা, আমাকে ক্ষমা কর। অষ্টাঙ্গে প্রণি পাত)। (ওষ্ঠ ও চিবুক বস্ত্রাবৃত করিয়া হানিফের দ্রুত প্রবেশ, গদাকে চপেটাঘাত ও তাহার ভূভলে পতন, পরে ভক্তের পৃষ্ঠদেশে বসিয়া মুষ্টাঘাত এবং পুঁটিকে পদপ্রহার করিয়া বেগে প্রস্থান)। ভক্ত। আঁ—আঁ—আঁ! (নেপথ্য হইতে বাচস্পতির রাম্ প্রসাদী পদ—“মায়ের এই তো বিচার বটে, বটে বটে গো আনন্দময়ি, এই তো বিচার বটে” এবং প্রবেশ)। গদা। (দেখিয়া) এই যে দাদাঠাকুর এসেছেন্! আঃ! বাঁচালেম্‌; বামুনের কাছে ভূত আস্‌তে পায় না! (পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাইয়া) বাবা! ভূতের হাত এমন্ কড়া। বাচ। একি! কত্তাবাবু যে এমন করে পড়ে রয়েছেন?—হয়েছে কি? অ্যাঁ? ভক্ত। (বাচস্পতিকে দেখিয়া গাত্রোত্থান করিয়া) কে ও? বাচ্পোৎ দাদা না কি? আঃ; ভাই; আজ্‌ ভূতের হাতে মরে ছিলেম্ আর কি? তুমি যে এসে পড়েছো, বড় ভাল হয়েছে। পুঁটি। (চেতন পাইয়া) রাম—রাম—রাম! গদা। ও পিসি, সে টা চলে গিয়াছে, আর ভয় নাই, এখন ওঠ্। পুঁটি। (উঠিয়া) গিয়াছে! আঃ, রক্ষে হোলো। তা চল্ বাছা, আর এখানে নয়; আমি বেঁচে থাক্‌লে অনেক রোজগার হবে! (বাচস্পতিকে দেখিয়া) ওমা! এই যে ভট্চাজ্জি মোশাই এখানে এসেছেন। বাচ। কত্তাবাবু, আমি এই দিক্ দিয়ে যাচ্ছিলেন, মানুষের গোঁগানির শব্দ শুনে এলেম্। তা বলুন দেখি ব্যাপারটাই কি? আপ্‌নিই বা এ সময়ে এখানে কেন? আর এরাই বা কেন এসেছে? এতো দেখ্ছি হানিফগাজীর মাগ। ভক্ত। (স্বগত) এক দিকে বাঁচলেন, এখন আর এক দিকে যে বিষম বিভ্রাট! করি কি? (প্রকাশে বিনীত ভাবে) ভাই তুমি তো সকলি বুঝেছ, তা আর লজ্জা দিও না। আমি যেমন কর্ম্ম করেছিলেম্ ভার উপযুক্ত ফলও পেয়েছি। ভা হ্যাদেখ ভাই, তোমার হাতে ধরে বল্চি, এই ভিক্ষাটা আমাকে দেও, যে একথা যেন কেউ টের না পায়। বুড় বয়েসে এমন কথা প্রকাশ হলে আমার কুলমানে একেবারে ছাই পোড়্‌বে। তুমি ভাই, আমার পরম আত্মীয়, আমি আর অধিক কি বল্‌বো। বাচ। সে কি, কত্তাবাবু? আপনি হলেন্ বড়মানুষ—রাজা। আর আমি হলেম দরিদ্র ব্রাহ্মণ, আর সেই ব্রহ্মত্রটুকু যাওয়া অবধি দিনান্তেও অন্ন যোটা ভার, ভা আমি আপনার আত্মিয় হব এমন ভাগ্য কি করেছি?— ভক্ত। হয়েছে—হয়েছে, ভাই! আমি কল্যই তোমার সে ব্রহ্মত্রজমী ফিরে দেবো, আর দেখ, তোমার মাতৃশ্রাদ্ধে আমি যৎসামান্য কিঞ্চিৎ দিয়েছিলেম্, তা আমি তোমাকে নগদ আরও পঞ্চাশটী টাকা দেবো, কিন্তু এই কর্ম্মটি কর‍্যো যেন আজকের কথাটা কোনরূপে প্রকাশ না হয়। ভক্ত। (হাস্যমুখে) কত্তাবাবু, কর্ম্মটা বড় গর্হিত হয়েছে অবশ্যই বল্তে হবে; কিন্তু যখন ব্রাহ্মণে কিঞ্চিৎ দান কত‍্যে স্বীকার হলেন্ তখন্ তার তো এক প্রকার প্রায়শ্চিত্তই করা হলো, তা আমার সে কথার প্রসঙ্গেই বা প্রয়োজন কি?— তার জন্যে নিশ্চিন্ত থাকুন্। (স্বাভাবিক বেশে হানিফ্ গাজির প্রবেশ)। হানি। কত্তাবাবু, সালাম করি। ভক্ত। (অতি ব্যাকুল ভাবে) এ কি! অ্যাঁ এ আবার কি সর্ব্বনাশ উপস্থিত? হানি। (হাস্যমুখে) কত্তাবাবু, আমি ঘরে আস্যে ফতিরি তল্লাস্ কল্লাম, তা সকলে বলে যে সে এই ভাঙ্গা মন্দিরির দিকি পুঁটির সাতে আয়েছে, তাই তারে ঢুঁড়তি ঢুঁড়তি আস্যে পড়িছি। আপ্‌নার যে মোচলমান হতি সাধ্ গেছে, তা জান্‌তি পাল্লি ভাবনা কি ছিল? ফতি তো ফতি, ওর চায়েও সোণার চাঁদ আপ্‌নারে অন্যে দিতি পাত্তাম, তা এর জন্যি আপনি এত তজ্দি নেলেন কেন? তোবা! তোবা! ভক্ত। (চিন্তা করিয়া নম্রভাবে) বাবা হানিফ্, আমি সব বুঝেছি, তা আমি যেমন তোর উপর অহেতু অত্যাচার করেছিলেম্, তেম্‌নি তার বিধিমত শাস্তিও পেয়েছি, আর কেন? এখন ক্ষান্ত দাও। আমি বরঞ্চ তোমাকে কিছু দিতেও রাজি আছি, কিন্তু বাপু একথা যেন আর প্রকাশ না হয়, এই ভিক্ষাটি আমি চাই! হে বাবা, তোর হাতে ধরি! হানি। সে কি, কত্তাবাবু?—আপনি যে নাড়‍্যেদের এত গাল পাড়তেন, এখনে আপনি খোদ্ সেই নাড়্যে হতি বসেছেন, এর চায়ে খুসীর কথা আর কি হতি পারে? তা এ কথা তো আমার জাত কুটুম গো কতিই হবে। ভক্ত। সর্ব্বনাশ!—বলিস কি হানিফ্? ও বাচ্পোৎ দাদা, এইবারেই তো গেলেম্। ভাই, তুমি না রক্ষে কল্যে আর উপায় নাই। তা একবার হানিফ্কে তুমি দুটো কথা বুঝিয়ে বলো। বাচ। (ঈষৎ হাস্য মুখে) ও হানিফ্, একবার এদিকে আয় দেখি, একটা কথা বলি। (হানিফ্কে একপার্শ্বে লইয়া গোপনে কথোপকথন)। ভক্ত। রাধে,—রাধে,—রাধে, এমন বিভ্রাটে মানুষ পড়ে! একে তো অপমানের শেষ, তাতে আবার জাতের ভয়। আমার এমনি হচ্যে যে পৃথিবী দুভাগ হলে আমি এখনি প্রবেশ করি। যা হোক এই নাকে কাণে খত এমন কর্ম্মে আর নয়। ফতি। (অগ্রসর হইয়া সহাস্য বদনে) কেন, কত্তাবাবু?—নাড়্যের মায়্যে কি এখনে আর পছন্দ হচ্ছে না? ভক্ত। দূর হ, হতভাগি, তোর্ জন্যেইত আমার এই সর্ব্বনাশ উপস্থিত! ফতি। সে কি, কত্তাবাবু?—এই, মুই আপনার কল্জে হচ্ছেলাম্, আরো কি কি হচ্ছেলাম্; আবার এখন মোরে দূর কত্তি চাও। ভক্ত। কেবল তোকে দূর? এ জঘন্য কর্ম্মটাই আজ অবধি দূর কল্যেম্। এতোতেও যদি ভক্তপ্রসাদের চেতন না হয়, তবে তাঁর বাড়া গর্দ্দভ আর নাই। গদা। (জনান্তিকে) ও পিসি, তবেই তো গদার পেসা উঠ্লো! পুঁটি। উঠুক্ বাছা; গতর থাকে তো ভিক্ষে মেগে খাবো। কে জানে মা যে নেড়ের মেয়েগুলর সঙ্গে পোষা ভূত থাকে? তা হলে কি আমি এ কাজে হাত দি? বাচ। (অগ্রসর হইয়া) কত্তাবাবু, আপনি হানিফ্কে দুটিশত টাকা দিন্, তা হলেই সব গোল মিটে যায়। ভক্ত। দু-শো টা-কা! ও বাবা, আমি যে ধনে প্রাণে গেলেম্। বাচপোৎ দাদা, কিছু কম্ জম্ কি হয় না? বাচ। আজ্ঞা না, এর কমে কোন মতেই হবে না। ভক্ত। (চিন্তা করিয়া) আচ্ছা তবে চল, তাই দেব। আমি বিবেচনা করে দেখলেম যে এ কর্ম্মের দক্ষিণান্ত এই রূপেই হওয়া উচিত! যা হোক ভাই, তোমাদের হতে আমি আজ বিলক্ষণ উপদেশ পেলেম্। এ উপকার আমি চিরকালই স্বীকার কর্‌বো। আমি যেমন অশেষ দোষে দোষী ছিলেম্, তেমনি ভার সমুচিত প্রতিফলও পেয়েছি। এখন নারায়ণের কাছে এই প্রার্থনা করি যে এমন দুর্ম্মতি যেন আমার কখন না ঘটে। বাহিরে ছিল সাধুর আকার, মনটা কিন্তু ধর্ম্ম ধোয়া। পুণ্য খাতায় জমা শূন্য, ভণ্ডামিতে চারটি পোয়া॥ শিক্ষা দিলে কিলের চোটে, হাড়গুঁড়িয়ে খোয়ের মোয়া। যেমন কর্ম্ম ফল্‌লো ধর্ম্ম, “বুড়সালিকের ঘাড়ে রোঁয়া॥” [ সকলের প্রস্থান। (যবনিকা পতন।) সমাপ্ত কলিকাতা,—অপরচিৎপুররোড শোভাবাজার ২৮৫ নং বিদ্যারত্ন যন্ত্র। Public domainPublic domainfalsefalse