পঞ্চমাঙ্ক — তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
উদয়পুর—কৃষ্ণকুমারীর মন্দির।
(অহল্যাদেবী এবং তপস্বিনীর প্রবেশ।)
অহ। (চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিয়া) ভগবতি, কৈ, আমার কৃষ্ণা ত এখানে নাই?
তপ। বোধ করি, তবে রাজনন্দিনী এখনও সঙ্গীতশালা থেকে আসেন নাই। তা আপনি এত উতলা হলেন কেন?
অহ। (নিরুত্তরে রোদন।)
তপ। (হস্ত ধরিয়া) ছি, ছি। ও কি মহিষি? স্বপ্ন কি কখন সত্য হয়! তা হলে এ পৃথিবীতে যে কত শত দরিদ্র রাজা হতো; আর কত রাজা দরিদ্র হতেন, তার সীমা নাই।শত কত লোক যে, কত কি স্বপ্নে দেখে, তা কি সব সত্য হয়?
অহ। ভগবতি, আমার প্রাণটা কেমন কচ্যে; আপনি আমার কৃষ্ণাকে ডাকুন। আমি একবার তাঁর চাঁদবদনখানি ভাল করে দেখি। (রোদন।)
তপ। মহিষি, আপনি এত উতলা হবেন না। আপনি এমন কি অদ্ভূত স্বপ্ন দেখেছেন, বলুন দেখি শুনি।
অহ। ভগবতি, সে স্বপ্নের কথা মনে হলে, আমার সর্ব্বাঙ্গ শিহরে উঠে! (রোদন।)
তপ। কেন, বৃত্তান্তটাই কি?
অহ। আমার বোধ হলো, যেন আমি ঐ দুয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময়ে এক জন ভীমরূপী বীর পুরুষ একখান অসি হস্তে করে এই মন্দিরে এসে প্রবেশ কল্যে——
তপ। কি আশ্চর্য্য! তার পর? অহ। আমার কৃষ্ণা যেন ঐ পালঙ্কের উপর একলা শুয়ে আছে। আর ঐ বীর পুরুষ কল্যে কি, যেন ঐ পালঙ্কের নিকটে এসে তাকে খড়্গাঘাত কত্যে উদ্যত হলো; আমি ভয়ে অমনি চীৎকার করে উঠলেম, আর নিদ্রাভঙ্গ হয়ে গেল। ভগবতি, আমার কপালে কি হবে, বলতে পারি না। (রোদন।)
তপ। আপনি কি জানেন না, মহিষি, যে স্বপ্নে মন্দ দেখলে ভাল হয়, আর ভাল দেখলে মন্দ হয়!
অহ। সে যা হৌক, ভগবতি, আমি আজ রাত্রে আমার কৃষ্ণাকে কখনই এ মন্দিরে শুতে দেবো না।
তপ। (সহাস্য বদনে) কেন মহিষি, তাতে দোষ কি? (নেপথ্যে যন্ত্রধ্বনি) ঐ শুনুন! আমি বলেছিলাম কি না, যে রাজনন্দিনী সঙ্গীতশালায় আছেন। তা চলুন, আমরা সেখানেই যাই। মহিষি, আপনি কৃষ্ণার সম্মুখে কোন মতেই এত উতলা হবেন না। মেয়েটি আপনাকে এ অবস্থায় দেখলে অত্যন্ত বিষণ্ন হবে। তা তাকে আর কেন বৃথা মনঃপীড়া দেবেন? আর বিবেচনা করে দেখুন না কেন, স্বপ্ন নিদ্রাদেবীর, ইন্দ্রজাল বৈ ত নয়। চলুন, আমরা এখন যাই।
[ উভয়ের প্রস্থান।
(খড়্গহন্তে বলেন্দ্রসিংহের প্রবেশ।)
বলে। (স্বগত) আমি যে কত শত বার এই মন্দিরে প্রবেশ করেছি, তার সংখ্যা নাই। কিন্তু আজ প্রবেশ কত্যে যেন আমার পা আর উঠতে চায় না। তা হবেই ত। চোরের মতন সিঁদ কেটে গৃহস্থের ঘরে ঢোকা কি বীর পুরুষের ধর্ম্ম? হায়! মহারাজ কেন আমাকে এ বিষম ঝন্ঝটে ফেললেন? এ নিদারুণ কর্ম্ম কি অন্য কারো দ্বারা হতে পারতো না? ইচ্ছা করে যে কৃষ্ণাকে না মেরে আপনিই মরি। (দীর্ঘনিশ্বাস) কিন্তু তাতে ও কোন ফল দর্শাবে না? (শয্যার নিকটবর্ত্তী হইয়া) কৈ? কৃষ্ণা ত এখানে নাই। বোধ হয়, এখনও শুতে আসে নাই। তা এখন কি করি? (পরিক্রমণ।) (নেপথ্যে গীত।) (স্বগত) আহা! হে বিধাতঃ, আমি কি এমন কোকিলাকে চিরকালের জন্যে নীরব কত্যে এলেম? এ পাপের কি প্রায়শ্চিত্ত আছে? এই যে কৃষ্ণা এ দিকে আসছেন। হায়, হায়! হে বিধাতঃ, তুমি কি নিমিত্ত এ রাজবংশের প্রতি এত প্রতিকূল হলে! এমন নিধি দিয়ে কি আবার তাকে অপহরণ করবে! হায়, হায়! বৎসে, তুমি কেন এ নিষ্ঠুর ব্যাঘ্রের গ্রাসে পড়তে আসচো! (অন্তরালে অবস্থিতি।)
(কৃষ্ণার সহিত তপস্বিনীর পুনঃ প্রবেশ।)
তপ। বাছা, এত রাত্রি পর্য্যন্ত কি গান বাদ্যেতে মত্ত থাকতে হয়? যাও রাজমহিষী যে শয়নমন্দিরে গেলেন। তুমিও গিয়ে শয়ন করগে, আর বিলম্ব করো না।
কৃষ্ণা। ভাল, ভগবতি, মাকে আজ এত উতলা দেখলেম কেন, বলুন দেখি? উনি আমাকে আজ রাত্রে এ মন্দিরে শুতে মানা করছিলেন কেন?
তপ। রাজনন্দিনি, একে ত মায়ের প্রাণ; তাতে আবার তুমি তার একটি মাত্র মেয়ে। আর এখন এ বিবাহের বিষয়ে যে গোলযোগ বেধে উঠেছে———
কৃষ্ণা। (সহাস্য বদনে) তবে মা কি ভাবেন, যে আমাকে কেউ এ মন্দির থেকে চুরি করে নে যাবে?
তপ। বৎসে, তা কি কখন হয়! চন্দ্রলোক থেকে অমৃত অপহরণ করা কি যার তার সাধ্য।
কৃষ্ণা। (গবাক্ষ খুলিয়া) উঃ, ভগবতি, দেখুন, কি অন্ধকার রাত্রি। নিশানাথের বিরহে রজনী দেবী যেন বেশভূষা পরিত্যাগ করে দুঃখসাগরে মগ্ন হয়ে রয়েছেন।
তপ। (সহাস্য বদনে) বাছা, তুমি আবার এ সব কথা কোত থেকে শিখলে! যাও, শয়ন করগে। আমি এখন কুটীরে যাই। রাত্রি প্রায় দুই প্রহর হলো।
কৃষ্ণা। যে আজ্ঞা।
তপ। তবে আমি এখন আসিগে।
[ প্রস্থান।
কৃষ্ণা। (স্বগত) রাজা মানসিংহ একবার যুদ্ধে হেরেছিলেন বটে, কিন্তু শুনেছি, যে তিনি নাকি আবার অনেক সৈন্যসামন্ত লয়ে জয়পুরের রাজাকে আক্রমণ করবার উদ্যোগে আছেন;— তা দেখি, বিধাতা আমার কপালে কি করেন। (দীর্ঘনিশ্বাস) সুভদ্রার জন্যে অর্জ্জুন যেমন যদুকূলের সঙ্গে ঘোরতর যুদ্ধ করেছিলেন, এও বুঝি সেইরূপ হয়ে উঠলো। (গবাক্ষ খুলিয়া) ইঃ, কি ভয়ানক বিদ্যুৎ। যেন প্রলয়কালের বিস্ফুলিঙ্গ পাপাত্মার অন্বেষণে পৃথিবী পর্য্যটন কচ্যে। আর মেঘের গর্জ্জন শুনলে মহামহাবীর পুরুষেরও হৃৎকম্প হয়। উঃ, কি ভয়ঙ্কর ঝড়ই হচ্যে। আজ এ কি মহা প্রলয় উপস্থিত? এ মন্দির পর্ব্বতের ন্যায় অটল; প্রবল ঝড় বইলেও এতে কোন ভয় নাই। কিন্তু যারা কুঁড়ের মত ছোট ছোট ঘরে থাকে, না জানি তাদের আজ কত কষ্ট হচ্যে। আহা! পরমেশ্বর তাদের রক্ষা করুন। হে বিধাতঃ, সেই মনুষ্য, সেই বুদ্ধি, সেই আকার, কিন্তু কেউ বা অপূর্ব্ব উচ্চ সুবর্ণ অট্টালিকায় ইন্দ্রতুল্য ঐশ্বর্য্য ভোগ কচ্যে, আর কেউ বা আশ্রয়বিহীন হয়ে বৃক্ষমূলে অতি কষ্টে কালাতিপাত করে। কিন্তু তাও বলি, অট্টালিকায় বাস কল্যেই যে লোকে সুখী হয়, এমন নয়। আমার ত কিছুরই অভাব নাই, তবে কেন আমি সুখী হই না? মনের সুখই সুখ! (দীর্ঘনিশ্বাস) ভাল, আমার মনটা আজ এত চঞ্চল হলো কেন? পৃথিবীর কোন বস্তুই ভাল লাগচে না। আমার মনঃ যেন পিঞ্জরবদ্ধ পক্ষীর ন্যায় ব্যাকুল হয়েছে। দেখি দেকি, যদি একটু শয়ন করে সুস্থ হতে পারি। তাই যাই। হে মহাদেব, এ অধীনীর প্রতি দয়া করে এর মনের চঞ্চলতা দূর কর। প্রভূ, এ দাসী তোমার নিতান্ত শরণাগত। (শয়ন।)
(বলেন্দ্রসিংহের পুনঃ প্রবেশ।)
বলে। (স্বগত) হায়! হায়! আমি এমন কর্ম্ম কত্যে এলেম, যে পাছে একেবারে রসাতলে প্রবেশ করি, এই ভয়ে পৃথিবীতে পাদক্ষেপণ কত্যেও আশঙ্কা হচ্যে। আমার এমনি বোধ হচ্যে যেন পদে পদে মেদিনী আমাকে গ্রাস কত্যে আসচেন। তা হলেও এক প্রকার ভাল হয়। রজনি দেবি, তুমিই আমার সাক্ষী। আমি এ কর্ম্ম আপন ইচ্ছায় কচ্যি না। (নিকটবর্ত্তী হইয়া) হায়! হায়! আমি এ রাজকুলমৃণাল থেকে এ প্রফুল্ল কনক-পদ্মটি যথার্থই কি ছিন্ন ভিন্ন কত্যে এলেম। এমন সুবর্ণমন্দিরে সিঁদ দিয়ে এর জীবনরূপ ধন অপহরণ করা অপেক্ষা কি আর পাপ আছে! (চিন্তা করিয়া) তা কি করি? জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আজ্ঞা অবহেলা করাও মহাপাপ। (দীর্ঘনিশ্বাস) আমার দেখচি মারীচ রাক্ষসের দশা ঘটলো, কোন দিকেই পরিত্রাণ নাই। তা জন্মের মতন বাছার চন্দ্রবদনখানি একবার দেখে নি! (মুখ দেখিয়া) হে বিধাতঃ, আমি কি রাহু হয়ে এমন পূর্ণ শশীকে গ্রাস কত্যে এলেম? আমি কি প্রয়ের কালরূপে একে চিরকালের নিমিত্তে জলমগ্ন কত্যে এলেম। (নয়ন মার্জ্জন) আহা মা! আমি নিষ্ঠুর চণ্ডাল! নিরপরাধে তোমার প্রাণ নষ্ট কত্যে এসেছি। আহা! বাছা এখন নিরুদ্বেগচিত্তে নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে বিরাম লাভ কচ্যেন; আর বোধ হয়, নানাবিধ মনোহর স্বপ্নদ্বারা পরম সুখানুভব কচ্যেন; কিন্তু নিকটে যে পিতৃব্যস্বরূপ কাল এসে উপস্থিত হয়েছে, তা ভ্রমেও জানেন না। হায়! হায়! যাকে আমি এত প্রাণতুল্য ভালবাসি, যার মমতাগুণে যুদ্ধজীবী জনের কঠিন হৃদয়ে স্নেহরস প্রবাহিত হয়েছে, তাকে কি আমার নষ্ট কত্যে হলো? বলেন্দ্রের অস্ত্রের কি শেষে এই কীর্তি হলো? ধিক্! ধিক্! (চিন্তা করিয়া) তবে আর কেন?—ওঃ! এ স্নেহনিগড় ভগ্ন করা কি মনুষ্যের কর্ম্ম? দ্রৌপদীর বস্ত্রের ন্যায় একে যত খোল, ততই বাড়ে। হে পৃথিবি, তুমি সাক্ষী। হে রজনী দেবি, তুমি সাক্ষী। (মারিতে হস্ত উত্তোলন।)
কৃষ্ণা। (সহসা গাত্রোত্থান করিয়া) অ্যাঁ—অ্যাঁ—কাকা! এ কি? এ কি?
বলে। (অসি ভূতলে নিক্ষেপ।)
কৃষ্ণা। অ্যাঁ—কাকা। এ কি? আপনি যে এমন সময়ে এখানে এসেছেন?
বলে। না, এমন কিছু নয়! কেবল তোমাকে একবার দেখতে এসেছি। তা বৎসে! তা বৎসে! আমাকে বিদায় দেও। আমি চল্যেম।
কৃষ্ণা। কাকা, আপনি একজন মহাবীর পুরুষ; তা আপনার কি এ দাসীর সঙ্গে প্রবঞ্চনা করা উচিত?
বলে। (বদনাবৃত করিয়া নিরুত্তরে রোদন।)
কৃষ্ণা। (অসি অবলোকন করিয়া স্বগত) এ কি? (অসি বক্ষঃস্থলে গোপন ও প্রকাশে) কাকা, আমি আপনার পায়ে ধচ্যি, আপনি আমাকে সকল বৃত্তান্ত খুলে বলুন।
বলে। বাছা, তুমি এ নরাধম নিষ্ঠুরকে আর কাকা বলো না। আমি ত তোমার কাকা নই, আমি চণ্ডাল, আমি তোমার কাল হয়ে এসেছিলাম। (রোদন।)
কৃষ্ণা। সে কি, কাকা?
বলে। হা আমার কুললক্ষ্মী!—হে পৃথিবি, তুমি দ্বিধা হয়ে আমাকে স্থান দান কর! (রোদন।)
কৃষ্ণা। (হস্ত ধারণ) কেন, কাকা, আপনি এত চঞ্চল হলেন কেন?
বলে। কৃষ্ণা, আমি তোমার প্রাণ নষ্ট কত্যে এসেছিলাম।
কৃষ্ণা। কেন, কাকা, আপনার কাছে আমি কি অপরাধ করেছি।
বলে। বাছা, তুমি স্বয়ং কমলা অবতীর্ণা। তুমি কি অপরাধ কাকে বলে, তা জান? (রোদন) মরুদেশের রাজা মানসিংহ আর জয়পুরের রাজা জগৎসিংহ, উভয়েই এই প্রতিজ্ঞা করেছেন, যে হয় তোমাকে বিবাহ করবেন, নয় উদয়পুরীকে ভস্মরাশি কর্যে এ রাজ্য লণ্ডভণ্ড করবেন। আমাদের যে এখন কি অবস্থা তা ত তুমি বিলক্ষণ জান। এই জন্যেই———
কৃষ্ণা। কাকা, আমার পিতারও কি এই ইচ্ছা, যে———
বলে। মা, আমি আর কি বলবো? তাঁর অনুমতি ভিন্ন আমি কি এমন চণ্ডালের কর্ম্ম কত্যে প্রবৃত্ত হই?
কৃষ্ণা। বটে? তা এর নিমিত্তে আপনি এত কাতর হচ্যেন কেন? আপনি পিতাকে এখানে একবার ডেকে আনুন গে। আমি তাঁর পাদপদ্মে জন্মের মতন বিদায় হই। কাকা, আমি রাজপুত্রী! রাজকুলপতি ভীমসিংহের মেয়ে। আপনি বীরকেশরী। আপনার ভাইঝি। আমি কি মৃত্যুকে ভয় করি? (আকাশে কোমল বাদ্য) ঐ শুনুন! কাকা, একবার ঐ দুয়ারের দিকে চেয়ে দেখুন। আহা! কি অপরূপ রূপ-লাবণ্য! উনিই পদ্মিনী সতী। উনি আমাকে এর আগে আর একবার দেখা দিয়েছিলেন; জননি, তোমার দাসী এলো বলে। দেখ, কাকা, এ মন্দির সহসা নন্দনকাননের সৌরভে পরিপূর্ণ হলো। আহা! আমার কি সৌভাগ্য!
নেপ। (পদশব্দ।)
বলে। এ কি? এ কি?
(রাজার পশ্চাৎ পশ্চাৎ মন্ত্রীর প্রবেশ।)
রাজা। (ক্ষিপ্তপ্রায় ইতস্ততঃ অবলোকন।)
মন্ত্রী। (কৃষ্ণাকে দেখিয়া স্বগত) এই যে, তবে এখনও হয় নাই। আঃ! রক্ষা হউক! (অগ্রসর হইয়া বলেন্দ্রের প্রতি জনান্তিকে) রাজকুমার, আর দেখেন কি? সর্ব্বনাশ উপস্থিত! মহারাজ হঠাৎ উম্মাদপ্রায় হয়েছেন।
বলে। সে কি? সর্ব্বনাশ। (রাজার নিরাসনে উপবেশন।) হায়, হায়! কি হলো! তা মন্ত্রি, তুমি ওঁকে এখানে আনলে কেন।
মন্ত্রী। কি করি? উনি আপনিই এই দিকে এলেন। সুতরাং, আমাকে ওঁর সঙ্গে আসতে হলো। কি জানি, যদি অন্য কোথাও যান। আর একটা ভাবলেন, যে মহারাজের যখন এ অবস্থা হলো, তখন আর এ গুরুতর পাপকর্ম্মে প্রয়োজন কি। তাই অপনাকে নিবেদন কত্যে এলেম। এর পর আমার অদৃষ্টে যা হবার হবে।—হায়, হায়, রাজকুমার——
রাজা। বলেন্দ্র! ছি ভাই! এমন কর্ম্মও করে। (গাত্রোত্থান করিতে করিতে) কর কি, কর কি? না,—না, না, না,—মানসিংহ, মানসিংহ, মানসিংহ! হুঃঁ! তাকে তো এখনই নষ্ট করবো। আমি এই চল্যেম। (কিঞ্চিৎ গমন) এই যে আমার কৃষ্ণা! কেন, মা? কেন?—মা, একবার বীণাধ্বনি কর।—মা, একটি গান কর।—আহাহা—ঐ, ঐ, হা আমার কুললক্ষ্মী! তুমি কোথা গেলে! (রোদন।)
কৃষ্ণা। (রাজার অবস্থাকে শোক জ্ঞান করিয়া) কাকা, পিতা এমন কচ্যেন কেন? পিতঃ, আপনি এ সামান্য বিষয়ে এত আক্ষেপ করেন কেন! জীব মাত্রেই শমনের অধীন। তা এতে দুঃখ কল্যে আর কি হবে? জীবন কখনই চিরস্থায়ী নয়। যে আজ না মরে, সে কাল মরবে। কুলমান রক্ষার জন্যে প্রাণদান অপেক্ষা আর কি পুণ্যকর্ম্ম আছে? (আকাশে কোমল বাদ্য) ঐ শুনুন! রাজসতী পদ্মিনী আমাকে ডাকছেন! উনি এর আগে আমাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছিলেন, যে “কুলমান রক্ষার জন্যে যে যুবতী আপন প্রাণ দান করে, সুরলোকে তার আদরের সীমা নাই।” পিতঃ, আপনি এ দাসীকে জন্মের মতন বিদায় দেন। এই অন্তকালে যে মায়ের পা দুখানি দেখতে পেলেম না, এই একটা বড় দুঃখ মনে রৈল! (রোদন।)
বলে। ছি, মা, ছি! তুমি ও সকল কথা আর মুখে এনো না! তোমার শত্রুর অন্তকাল উপস্থিত হউক।
কৃষ্ণা। কাকা, এমন জীব নাই, যে বিধাতা তার অদৃষ্টে মরণ লেখেন নাই। কিন্তু সকলের ভাগ্যে মৃত্যু যশোদায়ক হয় না। অনেক তরুকে লোকে কেটে পুড়িয়ে ফেলে; কিন্তু আবার কোন কোন তরুর কাষ্ঠে দেবপ্রতিমা নির্ম্মাণ হয়। কুলমান রক্ষার্থে কিম্বা পরের উপকারের জন্যে যে মরে, সে চিরস্মরণীয় হয়।
বলে। তুমি, মা, আর ও সব কথা কইও না। তুমি আমাদের জীবনসর্ব্বস্ব! তোমার অপেক্ষা কি এ রাজপদ প্রিয়তর?
কৃষ্ণা। কাকা, আপনি এমন কথা মুখেও আনবেন না! আপনি আমাকে বাল্যকালাবধি প্রাণতুল্য ভাল বাসেন, তা আপনি এখন আমার সকল অপরাধ মার্জ্জনা করে আমাকে বিদায় দেন! পিতঃ, আপনি নরপতি; বিধাতা আপনাকে কন্তু শত সহস্র প্রাণীর প্রতিপালন কত্যে এই রাজপদে নিযুক্ত করেছেন; তা আপনার তাদের সুখ দুঃখ বিস্মৃত হওয়া কোন মতেই উচিত হয় না। আপনি এ দাসীকে জন্মের মতন বিদায় দেন। আপনি নীরব হলেন কেন? আমি কি অপরাধ করেছি, যে আপনি আর আমার সঙ্গে কথা কবেন না? পিতঃ, আপনার এত আদরের মেয়েকে এইবার শেষ আশীর্ব্বাদ করুন, যেন এ ভবযন্ত্রণা হতে মুক্ত হয়ে সুরপুরীতে যেতে পারি। (চরণে পতন।)
রাজা। এ না মানসিংহের দূত?—এত বড় স্পর্দ্ধা, আমাকে রুদ্ধ করে?
কৃষ্ণা। (উঠিয়া) কেন, পিতঃ, আমি আপনার নিকট কি অপরাধ করেছি?
রাজা। কি অপরাধ?—আমার নিকটে ছলনা? দূর হঃ, দূর হঃ!
মন্ত্রী। এ কি সর্ব্বনাশ!—
কৃষ্ণা। হা বিধাতঃ, আমার অদৃষ্টে কি এই ছিল? এ সময়ে পিতাও কি বিমুখ হলেন? কাকা, আমি পিতার নিকটে কি অপরাধ করেছি, যে উনি আমার প্রতি বিরক্ত হলেন? (আকাশে কোমল বাদ্য) আঃ, আমি এই যাই।—কাকা, আপনার চরণে ধরি (চরণে পতন।) আপনিই আমাকে বিদায় দেন।
বলে। উঠ মা, উঠ! ছি, মা, ছি! (হস্ত ধরিয়া উত্তোলন) তুমি আমাদের জীবনসর্বস্ব! তোমাকে বিদায়—(আকাশে কোমল বাদ্য।)
কৃষ্ণা। জননি, এই আমি এলেম। (সহসা খড়্গাঘাত ও শয্যোপরি পতন।)
সকলে। এ কি! এ কি সর্ব্বনাশ! কি সর্ব্বনাশ!
বলে। হে বিখাতঃ, তোমার মনে কি এই ছিল! হে পরমেশ্বর, আমাদের কি করলে! বৎসে, তুমি কি আমাদের যথার্থই ত্যাগ করলে! হায়, হায়! (রোদন।)
(তপস্বিনীর প্রবেশ।)
তপ। এ কি? (অবলোকন করিয়া) কি সর্ব্বনাশ! এ রাজকুললক্ষ্মী এ অবস্থায় কেন? হায়, হায়। এ রত্নদীপ কে নির্ব্বাণ কল্যে?—হায়, হায়! (রোদন।)
বলে। আর ভগবতি, আমাদের কি হবে! এ দিকে এই, আবার ও নিকে মহারাজের দশা দেখেচেন? আহাহা! দাদা, তোমার অদৃষ্টে কি এই ছিল! ভগবতি— তপ। কেন, কেন? মহারাজের কি হয়েছে? উনি অমন কচ্যেন কেন?
বলে। আর ভগবতি, সকলই আমার অদৃষ্টে করে! মহারাজ হঠাৎ মহা উম্মাদ হয়ে উঠেছেন।
তপ। কেন? কারণ কি?
(অহল্যাদেবীর বেগে প্রবেশ।)
অহ। (নেপথ্য হইতে) কৈ? কৈ? আমার কৃষ্ণা কোথায়? (অবলোকনকরিয়া) এ কি? আমার কৃষ্ণা এমন হয়ে রয়েছে কেন?——অ্যাঁ!—এযে রক্ত।—মহারাজ, এমন কে করলে?
তপ। মহিষি, মহারাজকে আপনি আর কেন জিজ্ঞাসা কচ্যেন? ওঁতে কি আর উনি আছেন!
অহ। তবে বুঝি উনিই এ কর্ম্ম করেছেন! ও মা, আমার কি সর্ব্বনাশ হলো! (কৃষ্ণার মুখাবলোকন করিয়া রোদন) আহা! বাছা আমার সুবর্ণলতার ন্যায় পড়ে আছেন! ও মা কৃষ্ণা, আমি তোমার অভাগিনী মা এসে ডাকছি যে। ও মা, তুমি আমাকে কি অপরাধে ছেড়ে চল্যে, মা? উঠ, মা, উঠ। ও মা, ও মা, তুমি কি আমার উপর রাগ করেছো? (রোদন।)
কৃষ্ণা। (মৃদুস্বরে) মা—এসেছো!—আমাকে পায়ের ধূল দেও। মা,—পিতা আমার উপর অত্যন্ত রাগ করেছেন,—তুমি ওঁকে আমার সকল দোষ ক্ষমা কর্ত্যে বলো। মা, আমি তোমার নিকটেও অনেক বিষয়ে অপরাধী আছি, সে সকল ক্ষমা করে আমাকে এ জন্মের মতন বিদায় দেও। মা, তোমার এ দুঃখিনী মেয়েকে এর পর এক এক বার মনে করো (মৃত্যু—আকাশে কোমল বাদ্য।)
অহ। ও মা, তুমি কি অপরাধ করেছিলে, মা! (রোদন) এ কি? আবার: যে মা আমার চুপ করলেন। ও মা, কৃষ্ণা! ও মা! ও মা! ও মা! (মূর্চ্ছা)
তপ। এ আবার কি হলো?—রাজমহিষী যে হঠাৎ অজ্ঞান হলেন। মহিষি, উঠুন, মহিষি, উঠুন, হায়, হায়! একবারে কি সব ছারখার হলো?
অহ। (চেতন পাইয়া) ভগবতি, আমি কি স্বপ্ন—মহারাজ, এ কর্ম্ম কে করলে? ঠাকুরপো, তুমিই বল না কেন?—ও কি? (উঠিয়া) তোমরা যে সকলেই চুপ করে রৈলে?
রাজা। আঃ! (অগ্রসর হইয়া) মহিষী যে? (হত ধরিয়া) দেখ, তুমি আমার কৃষ্ণাকে দেখেছো? কৈ?
অহ। মহারাজ, তুমি ও হাত দিয়ে আমাকে ছুঁও না। তোমার হাতে আমার কৃষ্ণার রক্ত লেগে রয়েছে। মহারাজ, আমি তোমার কাছে এ জন্মের মতন বিদায় হলেম। .
[ বেগে প্রস্থান।
মন্ত্রী। ভগবতি, আপনি একবার খান, মহিষী কোথায় গেলেন, দেখুন গে।
[ তপস্বিনীর প্রস্থান।
রাজা। মহিষি, কোথা যাও? কোথা যাও?—গেলে, গেলে, গেলে? তুমিও গেলে। (রোদন) হা কৃষ্ণা! হা কৃষ্ণা! হা কৃষ্ণা! আমি যাই মা, আমি যাই। ভাই বলেন্দ্র, কৃষ্ণা!—কৃষ্ণা! আমার কৃষ্ণা। (রোদন।)
মন্ত্রী। রাজকুমার, আমি চিরকাল এই বংশের অধীন, আমাকে কি শেষে এই দেখতে হলো। (রোদন।)
(অন্তঃপুরে রোদনধ্বনি, তপস্বিনীর পুনঃ প্রবেশ।)
তপ। হায়! হায়! কি হলো!—রাজকুমার, রাজমহিষীও স্বর্গারোহণ কল্যেন। হায়, হায়! আমি এমন সর্ব্বনাশ কোথাও দেখি নাই। এ কি বিধাতার সামান্য বিড়ম্বনা? হায়, হায়, হায়!
বলে। মন্ত্রি, আর কি? সকলই শেষ হলো। (রোদন) হায়! হায়! হায়! মৃত্যু কি আমাকে ভুলে আছেন।—দাদা, ঐ দেখুন, আমাদের রাজকুললক্ষ্মী মহানিদ্রায় অবশ হয়ে আছেন। আর এ রাজ্যে প্রয়োজন কি? হায়, হায়।
রাজা। বলেন্দ্র, ভাই, কৃষ্ণা। কৃষ্ণা!—আমার কৃষ্ণা।
বলে। আহাহা! দাদা, তোমার জ্ঞান শূন্য হয়েছে, তুমি এর কিছুই জানতে পাচ্যো না। হায়! হায়! হায়! তা, ভাই, এ তো তোমার সৌভাগ্য বলতে হবে। হায়, এমন সময়ে জ্ঞান থাকা চেয়ে অজ্ঞান হওয়া ভাল! যাতনা কি সহ্য করা যায়! (রোদন।)
সত্য। রাজকুমার, আর আক্ষেপ করা বৃথা। মহারাজকে এখান থেকে লয়ে যাওয়া যাক। আর আসুন, এ বিষয়ে যা কর্ত্তব্য, দেখা যাক্গে। এ দিকের তো সকলি শেষ হলো। হায়, হায়! হে বিধাতঃ, তোমার কি অদ্ভূত লীলা। আসুন রাজকুমার, আর বিলম্বে প্রয়োজন কি।
(যবনিকা পতন।)
গ্রন্থ সমাপ্ত।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.