জয়পুর—বিলাসবতীর গৃহ (বিলাসবতী এবং মদনিকা।) বিলা। বাঃ, তোর, ভাই, কি বুদ্ধি? ধন্য যা হউক। মদ। (সহাস্য বদনে) সে বড় মিছা কথা নয়! আমি উদয়পুরে যে সকল কাণ্ড করে এসেছি, তা মনে হলে আপনা আপনি হেসে মত্যে হয়। হা! হা! হা! বিলা। তাই ত? কি আশ্চর্য্য। ভাল, ধনদাস কি তোকে যথার্থই চিনতে পারে নাই! মদ। তা পারলে কি ও আমাকে আর এ অঙ্গুরীটি দিত? বিলা। ভাল, ভাই, তুই লোকের কাছে কি বলে আপনার পরিচয়টা দিতিস্? মদ। কেন? উদয়পুরের লোককে বলতেম, আমার জয়পুরে বাড়ী। আয় জয়পুরের লোককে বলতেম, আমার উদয়পুরে বাড়ী। আর যেখানে দেখতেম, দুই দেশেরই লোক আছে, সেখানে আদতে যেতেম না। বিলা। বাঃ, তোর কি বুদ্ধি ভাই! মদ। হা! হা! রাজমন্ত্রী, রাজা মানসিংহের দূত, রাজকুমারী, আমি কার সঙ্গে না দেখা করেছি? আর কত বেশ যে ধরতেম, তার আর কি বলবো? বিলা। তাই ত? ভাল, মদনিকে, রাজকুমারী কৃষ্ণা না কি বড় সুন্দরী? মদ। আহা! সুন্দরী বল্যে সুন্দরী! ও কথা, ভাই, আর জিজ্ঞাসা করো না? আমি বলি, এমন রূপলাবণ্য পৃথিবীতে আর কোথায়ও নাই। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ।) বিলা। ও কি লো? তুই যে একবারে বিরসবদন হলি? কেন? তিনি কি এতই তোর মনঃ ভুলিয়েছেন? ই! ই! অবাক্ কল্যে মা! মদ। ভাই, বলবো কি? রাজনন্দিনী কৃষ্ণার কথা মনে হলে প্রাণ যেন কেঁদে উঠে। আহা! সে মুখ যে একবার দেখে, সে কি আর ভুলতে পারে। বিলা। বলিস্ কি গো? তিনি কি এমন সুন্দরী? কি আশ্চর্য‍্য! আয়, ভাই, আমরা এখানে বসি। তবে আমাকে রাজকুমারীর কথাটা ভাল করে বল দেখি, শুনি। মদ। কেন? তাঁর কথা শুনে আর তোমার কি উপকার হবে, বল? বিলা। কে জানে, ভাই? তোর মুখে তাঁর কথা শুনে আমার এমনি ইচ্ছা হচ্যে, যে উদয়পুরে গিয়ে তাকে একবার দেখে আসি। মদ। যে, ভাই, কৃষ্ণকুমারীকে কখন দেখে নাই, বিধাতা তাকে বৃথা চক্ষুঃ দিয়েছেন!—সে যাক মেনে, এখন মহারাজ কদিন এখানে আসেন নাই, বল দেখি। বিলা। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) ও কথা আর কেন জিজ্ঞাসা করিস্? আজ তিন দিন। মদ। বটে? তবে তিনি ধনদাসের ফিরে আসবার দিন অবধি আর এখানে আসেন নাই। বোধ করি, তিনি এ বিবাহের বিষয়ে বড় ক্ষুণ্ণ হয়েছেন! তা হবেনই ত। তাঁর দূতকে আমি যে জুতো খাইয়ে এসেছি,— হা! হা! ধনদাস, ভাই, আর এ জন্মেও কারো ঘটকালি করবে না। হা! হা! হা! বিলা। হা! হা হা! বোধ হয় না। মদ। দেখ, সখি, মহারাজ, বোধ করি, আজ এখানে আসবেন এখন। তুমি, ভাই, যদি তাঁকে আজ পায়ে না ধরিয়ে ছাড়, তবে আমি আর এ জন্মে তোমার সঙ্গে কথা কইবো না। বিলা। ও মা, সে কি লো? ছি! ছি! তাও কি কখন হয়? মদ। হবে না কেন? বুদ্ধি থাকলেই সব হয়? এই যে এসো না, তোমাকে, না হয়, মানভঙ্গের পালাটা অভিনয় করে দেখিয়ে দি। (উপবেশন) আমি যেন মানিনী নায়িকা, বসে আছি; তুমি নায়ক হয়ে এসে আমাকে সাধ। (বদনবৃিতকরণ।) বিলা। হা! হা! হা! বেশ লো বেশ! তুই, ভাই, কত রঙ্গই জানিস্? তা আমি এখন কি করবো, বল? মদ। (গাত্রোত্থান করিয়া) কি আপদ্! তুমিই না হয়, মান করে বসো। আমি নায়ক হয়ে সাধি। বিলা। (উপবেশন করিয়া) আচ্ছা—এই আমি বসলেম। মদ। এখন মান কর। বিলা। এই কল্যেম। (বদনাবৃতকরণ।) মদ। হে সুন্দরি, তোমার বদনশশীকে অভিমানরূপ রাহুগ্রাসে দেখে আজ আমার চিত্তচকোর———— বিলা। হা! হা! হা! মদ। ছি! ছি! ও কি? ঐ ত সব নষ্ট কল্যে।—এমন সময়ে কি হাসতে হয়? বিলা। ঐ না, মহারাজ এই দিকে আসছেন? মদ। তাই ত। দেখো, ভাই, মহারাজ এলে যেন এমন করে হেসে উঠ না আমি এখন যাই। এত দিনের পর আজ ধনদাসের মাথা খাবার যোগাড় হয়েছে। [ প্রস্থান। (রাজা জগৎসিংহের প্রবেশ।) রাজা। (স্বগত) আজ তিন দিন এখানে আসি নাই। আর কেমন করেই বা আসবো? আমার কি আর নিশ্বাস ত্যাগ করবার সাবকাশ ছিল।—এ তিন দিনে প্রায় নব্বই হাজার সৈন্য এসে এ নগরে একত্র হয়েছে। আর ধনকুলসিংহও প্রায় আট, দশ হাজার লোক সঙ্গে করে আসচেন। শত সহস্র বীর। দেখি, এখন মানসিংহ আপন রাজ‍্য কেমন করে রক্ষা করে? এ গৃহে ত পুষ্প-ধনুঃ আর পঞ্চ শর ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্রের কথা নাই। এ ভগবান্ কন্দর্পের রণভূমি! তা কই, বিলাসবতী কোথায়! (প্রকাশে) ওহে, বসন্ত এলে কি কোকিল নীরবে থাকে? (অবলোকন করিয়া) এই যে—কেন প্রিয়ে, তুমি এত বিরসবদন হয়ে বসে রয়েছো কেন? এ কি—এ কয়েক দিন না আসাতে তুমি কি আমার উপর বিরক্ত হয়েছ? (নিকটে উপবেশন।) দেখ, ভাই, তুমি কখন এমন ভেবো না, যে আমি সাধ করে তোমার কাছে আসি নাই।—কি আশ্চর্য্য! আমার সঙ্গে কথা কইলে কি, ভাই, তোমার জাত যাবে? একটা কথাই কও। এ কি? একবারে নিস্তব্ধ!―তা তুমি যদি ভাই, আমার সঙ্গে একান্তই কথা না করে, তবে বল, আমি ফিরে যাই। আমি শত সহস্র কর্ম্ম ফেলে রেখে তোমার এখানে এলেম, আর তুমি নীরব হয়ে বসে রইলে। বিলা। যাও না কেন; আমি কি তোমাকে বারণ কচ‍্যি? রাজা। কেন, ভাই, আমি কি অপরাধ করেছি, যে তুমি আমার উপর আজ এত দয়াহীন হলে? বিলা। সে কি, মহারাজ? আপনি হচ‍্যেন রাজকুল-চূড়ামণি; তাতে আবার রাজা ভীমসিংহের জামাই হবেন;—আমি এক জন— রাজা। তুমি, দেখছি, ভাই, আমার উপর যথার্থ ই রেগেছো।—ছি! ও কি?তুমি যে আবার নীরব হলে। দেখ, যে ব্যক্তি এত অনুগত, তার উপর কি এত রাগ করা উচিত? (নেপথ্যে যন্ত্রধ্বনি) আহা! এমন সুমধুর ধ্বনি শুনলেও কি তোমার আর রাগ যায় না? (নেপথ্যে গীত।) [ কাফীজংলা—যৎ। ] মনে বুঝে দেখ না, এ মান সহজে যাবে না, তা কি জান না? যে করে তোমারে যতন অতি, চাতুরী তাহার প্রতি; তার প্রতীকার, না হলে আর কোন কথা কবে না! যে দোষে তোমার মানোমোহিনী হয়েছে অভিমানিনী, সে দোষে এ বিধি, হে গুণনিধি, পায়ে ধরে সাধনা! রাজা। হা! হা! হা! সত্য বটে! দেখ, ভাই, তোমার সখীরা আমাকে বড় সৎপরামর্শ দিচ্যে। তা এসো, তোমার পায়েই ধরি! এখন তুমি আমার সব দোষ ক্ষমা কর। (পদধারণ।) বিলা। (ব‍্যগ্রভাবে) করেন কি, মহারাজ? ছি! ছি! আমি কেবল আপনার সঙ্গে পরিহাস কচ্ছিলেম বৈ ত নয়। বলি দেখি, মহারাজ নারীর মান রাখেন কি না। রাজা। আর, ভাই, পরিহাস। ভাগ্যে তোমার রোগের ঔষধ পেলেম, তাই রক্ষা।——যা হউক, এখন ও আমাদের আবার ভাব হলো? বিলা। কেন, সখে, আমাদের ত ভাবের অভাব কখনই ছিল না! (মদনিকার পুনঃ প্রবেশ।) রাজা। আরে এসো। দেখ, সখি, তোমাকে দেখলে আমার ভয় হয়। মদ। ও মা!—সে কি, মহারাজ? আপনি কি কথা আজ্ঞা করেন? রাজা। তুমি, সখি, মদন-কেতু। তুমি যে স্থানে বায়ু-চালনা কত্যে থাক, সেখানে কি আর রক্ষা থাকে। অনবরত কামদেবের রণভেরি বাজতে থাকে, প্রমাদ-প্রেমযুদ্ধ উপস্থিত হয়, আর পঞ্চশরের আঘাতে লোকের প্রাণ বাঁচান ভার হয়ে উঠে। মদ। আপনার তার নিমিত্তে চিন্তা কি, মহারাজ? আপনি যদি মদনের শেলাঘাতে পড়েন, তার উচিত ঔষধ আপনার কাছেই ত রয়েছে। এমন বিশল্যকরণী থাকতে আপনার ভয় কি? রাজা। হা! হা! সাবাশ্, সখি, ভাল কথা বলেছো। তুমি, ভাই, সরস্বতীর পিতামহী!——যা হউক, বড় তুষ্ট হলেম। এই নাও। (স্বর্ণহার প্রদান।) মদ। (প্রণাম করিয়া) আমি মহারাজের এক জন ক্ষুদ্র দাসী মাত্র! রাজা। বসো। (মদনিকার উপবেশন।) দেখ, সখি, তুমি ধনদাসের বিষয়ে আমাকে যে সকল কথা বলছিলে, সে কি সত্য? মদ। মহারাজ, আপনি যদি এ দাসীর কথায় প্রত্যয় না করেন, আমার সখীকে বরং জিজ্ঞাসা করুন। রাজা। ধনদাস যে পরম ধূর্ত্ত আর স্বার্থপর, তা আমি এখন বিলক্ষণ টের পেয়েছি; কিন্তু ওর যে এত দূর সাহস, এ, ভাই, আমার কখনই বিশ্বাস হয় না! মদ। মহারাজ, স্বচক্ষে দেখলে, স্বকর্ণে শুনলে ত আপনার বিশ্বাস হবে? রাজা। হাঁ! তা হবে না কেন? এর অপেক্ষা আর সাক্ষ্য কি আছে। মদ। আজ্ঞা, তবে আমি এলেম বলে। [ প্রস্থান। বিলা। নরনাথ, দুষ্ট ধনদাসই এ সব অনর্থের মূল। রাজা। তার সন্দেহ কি? আমার এ বিবাহে কি প্রয়োজন ছিল? বিশেষতঃ (হস্ত ধরিয়া) বিশেষতঃ, তুমি থাকতে, ভাই, আমি কি আর কাকেও ভাল বাসতে পারি! বিলা। ঐ তো, মহারাজ, এই সকল মধু-মাখা কথা কয়েই আপনারা কেবল আমাদের মনঃ চুরি করেন। (নিকটবর্ত্তিনী হইয়া) যথার্থ বলুন দেখি, মহারাজ, এ বিবাহে আপনার এখনও মন আছে কি না? রাজা। রাম বল! এ বিবাহে আমার কি আবশ্যক? তবে কি না, ধনদাসের মন্ত্রণা শুনে আমার, ভাই, অহি-মূষিকের ব্যাপার হয়েছে, মানটা ত রক্ষা করা চাই। সেই জন্যই এ সব উদ্যোগ—— (মদনিকার পুনঃ প্রবেশ।) মদ। মহারাজ, আপনি সত্বর এই দিকে একবার পদার্পণ কল্যে ভাল হয়। ধনদাস আসচে। (বিলাসবতীর প্রতি) ভাই, এখন মহারাজকে একবার প্রমাণটা দেখিয়ে দেও। (রাজার প্রতি) আসুন তবে, মহারাজ! রাজা। (উঠিয়া) আচ্ছা, তবে চল। তুমি যেখানে যেতে বল, সেখানেই যাব। এমন মাজির হাতে নৌকা দেব তার ভয় কি? (উভয়ের অন্তরালে অবস্থিতি।) বিলা। (স্বগত) ধনদাস ধূর্ত্তরাজ, কিন্তু মদনিকা আজ যে ফাঁদ পেতেছে, তা থেকে এ শৃগাল ভায়ার নিষ্কৃতি পাওয়া দুষ্কর। (ধনদাসের প্রবেশ।) এসো, এসো, ধনদাস, বসো। তবে, ভাই, ভাল আছ ত? ধন। (বসিয়া) আর, ভাই, ভাল? কেমন করে ভাল থাকবো, বল? উদয়পুর থেকে ফিরে আসা অবধি, মহারাজ একবারও আমাকে রাজসম্মুখে ডাকেন নাই। আর কত লোকের মুখে যে কত কথা শুনি, তার আর কি বলবো! তবে তুমি যে আমাকে মনে রেখেছো, এই ভাল। বিলা। গগন কি, ভাই, চিরকাল মেঘাবৃত থাকে? ধন। না, তাত থাকে না, তবে কি না তুমি যদি, ভাই, আমার এ মেঘাবৃত গগনের পূর্ণশশী হও, তা হলে আমাকে আর পায় কে? মদ। (জনান্তিকে) মহারাজ, শুনছেন। রাজা। (জনান্তিকে) চুপ—— ধন। (স্বগত) মদনিকা না হবে ত সহস্র বার আমাকে বলেছে, যে বিলাসবতী মনে মনে আমাকেই ভাল বাসে। আর এর ভাব ভঙ্গি দেখলে সে কথাটায় এক প্রকার বিলক্ষণ বিশ্বাসও হয়। (প্রকাশে) তুমি যে, ভাই, চুপ করে রইলে? আমি যে তোমাকে কত ভাল বাসি, তা কি তুমি জান না? বিলা। বিলা। (ব্রীড়া-সহকারে) ত! ভাই, আমি কেমন করে জানবো? ধন। সে কি, ভাই? তুমি কি এও জান না, যে ভেক সর্ব্বদা কমলিনীর সহিত সহবাস করে বটে, কিন্তু সে ফুল যে কি সুধারসের আকর, তা কেবল মধুকরই জানে। তুমি যে কি পদার্থ, তা কি গাড়ল রাজাগুলার কর্ম্ম বোঝা? হা! হা! হা! হা! রাজা। (জনান্তিকে) শুনলে? শুনলে বেটার স্পর্দ্ধার কথা? ইচ্ছা হয় যে এ নরাধমের মাথাটা এই মুহূর্ত্তেই কেটে ফেলি। (অসি নিষ্কোষ করণে উদ্যত।) মদ। (জনান্তিকে? ও কি মহারাজ? আপনি করেন কি? (হস্ত ধারণ।) ধন। দেখ, বিলাসবতি,—— বিলা। কি বল, ভাই? ধন। আমি ভাই, তোমার নিতান্ত চিহ্নিত দাস, আর আমি এ রাজসংসারে কর্ম্ম করে যা কিছু সংগ্রহ করেছি, সে সকলই তোমার। (স্বগত) এ মাগীর কাছে রাজদত্ত যে সকল বহুমূল্য রত্ন আছে, তার কাছে সে কোথায় লাগে? একে একবার হাত করবার কি? এ দেশ থেকে একে একবার নে যেতে পাল্যে হয়। (প্রকাশে) তুমি যে, ভাই, চুপ করে রইলে? বিলা। আমি আর কি বলবো? ধন। দেখ, কাল সকালে তো রাজা সৈন্য লয়ে মরুদেশ আক্রমণ কত্যে যাত্রা করবে। তা সে শস্ত্রবিদ্যায় যত নিপুণ, তা কারই অগোচর নাই! রণভূমি দেখে মূর্চ্ছা না গেলে বাঁচি। হা! হা! হা। তা আমি বেশ জানি, এমন ভীত মানুষ তো আর দুটি নাই। রাজা। (জনান্তিকে) কি! বেটা এত বড় কথা আমাকে বলে? (মারিতে উদ্যত।) মদ। (ধরিয়া জনান্তিকে) করেন কি, মহারাজ? একটু শান্ত হউন, আরো কি বলে, ওগুন না। ধন। আমার বিলক্ষণ বোধ হচ্যে, যে হয় এ যুদ্ধে মারা যাবে, নয় মুখে চুণকালি নিয়ে দেশে ফিরে আসবে!—— রাজা। (জনান্তিকে) ভাল, দেখি, কার মুখে চূণ কালি পড়ে। কৃতঘ্ন! পামর! ধন। তা তুমি যদি, ভাই, বল, তবে আমি সব প্রস্তুত করি। চল আমরা কাল দুজনে এ দেশ থেকে চলে যাই। ও অধম কাপুরুষের কাছে থাকলে তোমার আর কি উপকার হবে? বালির বাঁধের ভরসা কি বল? রাজা। (অগ্রসর হইয়া সরোষে ধনদাসের গলদেশ আক্রমণ করিয়া) রে দুরাচার নরাধম দাসীপুত্র! এই কি তোর কৃতজ্ঞতা! তুই যে দেখচি, চিরউপকারী জনের গলায় ছুরি দিতে পারিস্। ধন। (সভয়ে) কি সর্ব্বনাশ। ইনি যে এখানে ছিলেন তা ত আমি স্বপ্নেও জানতেম না! কি হবে? কোথায় যাব? এই বারে গেলেম, আর কি? এই দুশ্চারিণী মাগীই আমাকে মজালে। রাজা। তোর মুখে যে আর কথাটি নাই? তুই যে কেমন লোক, তা আমি এত দিনের পর টের পেলেম। তোর অসাধ্য কর্ম্ম নাই। তা বসুমতী এমন দুরাচার পাষণ্ডের ভার আর সহ্য করবেন না! (অসি নিষ্কোষ।) বিলা। (সমম্ভ্রমে রাজার হস্ত ধরিয়া) মহারাজ, করেন কি? ক্ষমা দেন। এ ক্ষুদ্র প্রাণীর শোণিতে আপনার অসি কলঙ্কিত হবে মাত্র। সিংহ কখন শৃগালকে আক্রমণ করে না। তা মহারাজ, আমাকে এর প্রাণটি ভিক্ষা দেন। রাজা। প্রিয়ে, তোমার কথার অন্যথা কত‍্যে পারি না। আচ্ছা, প্রাণদণ্ড করবো না। (অসি কোষস্থ করিয়া) কিন্তু যাতে আমাকে ওর মুখাবলোকন কত‍্যে না হয়, এমন দণ্ড বিধান করা আবশ্যক।——রক্ষক?—— নেপথ্যে। মহারাজ? (রক্ষকের প্রবেশ।) রাজা। দেখ্, এ দুরাচারকে নগরপালের নিকট এই মুহূর্ত্তে লয়ে যা। আর তাকে বল্‌গে, যে এর মাথা মুড়িয়ে, ঘোল ঢেলে, গালে চূণ কালি দিয়ে, একে দেশান্তর করে দেয়। আর এর যা কিছু সম্পত্তি আছে, সব দরিদ্র ব্রাহ্মণদিগকে বিতরণ করে। রক্ষ। যে আজ্ঞা, ধর্ম্মাবতার! (ধনদাসের প্রতি) চল,—— ধন। (করযোড়ে সজল নয়নে) মহারাজ—— রাজা। চুপ্, বেহায়া। আর আমি তোর কোন কথা শুনতে চাইনে। নে যা একে! এর মুখ দেখলে পাপ হয়। রক্ষ। চল। [ ধনদাসকে লইয়া রক্ষকের প্রস্থান। মদ। (অগ্রসর হইয়া) আহা! প্রাণটা বেঁচেছে যে, এই রক্ষা! এখনই ভায়ার লীলা সম্বরণ হয়েছিল আর কি। হা হা! যা হউক, ইঁদুর ভায়া সমস্ত রাত্রি চুরি করে করে খেয়ে, শেষ রাত্রে ফাঁদে পড়েছেন। হা! হা! হা! বিলা। এ সব, ভাই, তোরই কৌশলে ঘটলো। যা হউক, মহারাজ যে ওর প্রাণটি দিলেন, এই পরম লাভ। তবে কি না, মহারাজের চোক্ দুটি যে এত দিনে খুল্‌লো, এত আহ্লাদের বিষয়। মদ। এ দুরাচার আমাকে যে সব কুপথে ফিরিয়েছে, তা মনে হলে লজ্জা হয়! কিন্তু কি করি, কেবল তোমার অনুরোধে এটাকে অল্প দণ্ড দিয়ে ছেড়ে দিতে হলো। নেপথ্যে। (রণবাদ্য) (মহারাজের জয় হউক) (রাজকুমারের জয় হউক)! রাজা। (সচকিতে) বোধ হয়, কুমার ধনকুল সিংহ এসে উপস্থিত হচ্ছেন। প্রিয়ে, এখন আমাকে বিদায় দিতে হবে। আমাকে এখন যেতে হলো। বিলা। সে কি, মহারাজ? এত শীঘ্র! তবে আবার কখন দেখা হবে, বলুন? রাজা। তা ভাই, কেমন করে বলবো? আমি কাল প্রাতেই যুদ্ধে যাত্রা করবো। যদি বেঁচে থাকি, তবে আবার দেখা হবে, নচেৎ এ জন্মের মত এই সাক্ষাৎ হলো। (হস্ত ধরিয়া) দেখ, ভাই, যদি আমি মরেই যাই, তা হলে আমাকে নিতান্ত ভুল না, একবার মনে করো, আর অধিক কি বলবো। বিলা। (নিরুত্তরে রোদন।) মদ। (সজল নয়নে) বালাই, মহারাজ, এমন কথা কি মুখে আনতে আছে! মদ। সখি, এ বড় সামান্য ব্যাপার ত নয়। পৃথিবীর ক্ষত্রিয়-কুল এ রণক্ষেত্রে একত্র হবে। সে যা হউক। এখন এসো, বিলাসবতি, আমাকে হাস্যমুখে বিদায় দাও এসে। মদ। এসো, সখি, মহারাজের সঙ্গে দ্বার পর্য‍্যন্ত যাই। আর কাঁদলে কি হবে, ভাই! এখন পরমেশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা কর, যে, মহারাজ যেন ভালয় ভালয় স্বরাজ্যে ফিরে এসেন। [ সকলের প্রস্থান।