পঞ্চমাঙ্ক — প্রথম গর্ভাঙ্ক
পঞ্চমাঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
উদগপুর—রাজগৃহ।
(রাজা ভীমসিংহ এবং মন্ত্রীর প্রবেশ।)
রাজা। কি সর্ব্বনাশ! তার পর?
মন্ত্রী। আজ্ঞা, রাজা মানসিংহ অসি স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করেছেন, যে হয় তিনি সুকুমারী রাজকুমারী কৃষ্ণাকে বিবাহ করবেন, নয় উদয়পুরকে ভস্মসাৎ করে মহারাজের রাজ্য ছারখার করবেন। রাজা জগৎসিংহেরও এইরূপ পণ।
রাজা। (ক্ষোভ ও বিরক্তির সহিত) বটে! এ কলিকালে লোকে একেই কি বীরত্ব বলে থাকে? (ললাটে কর প্রহার করিয়া) হায়! হায়! মৃতদেহে কে না খড়্গ প্রহার কত্যে পারে! আমার যদি এমন অবস্থা না হতো, তা হলে কি আর এঁরা এত দর্প কত্যে পারতেন? দেখ, আমার ধনাগার অর্থশূন্য; সৈন্য বীরশূন্য, সুতরাং আমি অভিমন্যুর মতন এ সপ্ত রথীর মধ্যে যেন নিরস্ত্র হয়ে রয়েছি; তা আমার সর্ব্বনাশ করা কিছু বিচিত্র কথা নয়।—হে বিধাতঃ, এ অপমান আমাকে আর কত দিন সহ্য কত্যে হবে? শমন আমাকে কত দিনে গ্রাস করবেন?
মন্ত্রী। মহারাজ, আপনি এত চঞ্চল হলে—
রাজা। (সরোষে) বল কি, সত্যদাস? এ সকল কথা শুনে স্থির হয়ে থাকা যায়। মরুদেশের অধিপতি কে, যে তিনি আমাকে শাসান? আর রাজা জগৎসিংহও যে এখন আত্মবিস্মৃত হলেন, এত বড় আশ্চর্য্য! (পরিক্রমণ।)
মন্ত্রী। (স্বগত) হায়! হায়! এ কি রাগের সময়! আমাদের এখন যে অবস্থা, তাতে কি এ প্রবল বৈরীদলকে কটূক্তিতে বিরক্ত করা উচিত? (দীর্ঘনিশ্বাস) হা বিধাতঃ, কুমারী কৃষ্ণাকে লয়ে যে এত বিভ্রাট ঘটবে, এ স্বপ্নেরও অগোচর।
রাজা। (উপবেশন করিয়া) সত্যদাস, বসো।
মন্ত্রী। যে আজ্ঞা, মহারাজ, (উপবেশন।)
রাজা। এখন এতে কি কর্ত্তব্য, তা বল দেখি? আমি ত কোন দিকেই এ বিপদ্-সাগরের কূল দেখতে পাচ্চি না। (দীর্ঘনিশ্বাস) মন্ত্রি, এ রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট হওয়া অবধি আমি কত যে সুখভোগ করেছি, তা ত তুমি বিলক্ষণ জান। তা বিধাতা কি অপরাধ দেখে আমার প্রতি এত প্রতিকূল হলেন, বল দেখি। এমন যে মণিময় রাজকিরীট, এও আমার শিরে যেন অগ্নিময় হলো! হায়! শমন কি আমাকে বিস্তৃত হলেন! এ কৃষ্ণা আমার গৃহে কেন জন্মেছিল? হায়!
মন্ত্রী। নরনাথ, এ সূর্য্যবংশীয় রাজারা পূর্ব্বকালে আপন কুল মান রক্ষার্থে যা যা কীর্তি করে গেছেন, তা কি আপনার কিছুই মনে হয়?
রাজা। সত্যদাস, তুমি ও সকল কথা আমাকে এখন মার কেন স্মরণ করিয়ে দাও? আলোক থেকে অন্ধকারে এসে পড়লে, সে অন্ধকার যেন দ্বিগুণ বোধ হয়; ও সব পূর্ব্বকথা মনে হলে কি আমার আর এক দণ্ডও বাঁচতে ইচ্ছা করে—
মন্ত্রী। মহারাজ——
রাজা। হায়, এ শৈলরাজের বংশে আমার মতন কাপুরুষ আর কে কবে জন্মগ্রহণ করেছে? ব্যাধের জয়ে শৃগাল গহ্বরে প্রবেশ করে; কিন্তু সিংহের কি সে রীতি?
(বলেন্দ্রসিংহের প্রবেশ।)
এসো, ভাই, বসো। তুমি এ সকল সংবাদ শুনেছ ত?
বলে। (উপবেশন করিয়া) আজ্ঞা, হ্যাঁ, মন্ত্রীর নিকট সকলই অবগত হয়েছি। আর আমিও যে কয়েক জন দূত পাঠিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে তিন জন ফিরে এসেছে। যবনপতি আমীর আর মহারাষ্ট্রপতি মাধবজী, উভয়েই রাজা মানসিংহের পক্ষ হয়েছেন।
রাজা। সে কি? আমীর না ধনকুলসিংহের দলে ছিলেন?
বলে। আজ্ঞা, ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি প্রবঞ্চনায় ধনকুলসিংহের প্রাণ নাশ করে, এখন আবার রাজা মানসিংহের সহায় হয়েছেন।
রাজা। আঁ! বল কি? আহাহা! আমি দেখছি, বিশ্বাসঘাতকতা এ যবনকুলের কুলব্রত!
মন্ত্রী। আজ্ঞা, তার আর সন্দেহ নাই; ভারতবর্ষে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যাচ্যে।
রাজা। জয়পুর থেকে, ভাই, কি সংবাদ এসেছে, বল দেখি শুনি।
বলে। আজ্ঞা, রাজা জগৎসিংহও প্রাণপণে যুদ্ধের আয়োজন কচ্যেন। আর অনেক অনেক রাজবীরও তাঁর সহায় হয়েছেন।
মন্ত্রী। হায়! হায়! এ সমরের কথা শুনলে যে ক দিক্ থেকে কত লোক গর্জ্জে উঠবে, তার সংখ্যা নাই। ঝড় আরম্ভ হলে সাগরের তরঙ্গসমূহ কখনই শান্তভাবে থাকে না।
রাজা। না, তা ত থাকেই না। তবে এখন এতে কি কর্ত্তব্য? তুমি কি বল, বলেন্দ্র?
বলে। আজ্ঞা, আর কি বলবো! মহারাজের কিম্বা স্বদেশের হিতসাধনে, যদি আমার প্রাণ পর্যন্ত দিতে হয়, তাতেও আমি প্রস্তুত আছি। তবে কি না, এ বিপদ্ হতে নিষ্কৃতি পাওয়া মনুষ্যের অসাধ্য। যা হোক, যে পর্য্যন্ত আমার কায় প্রাণে বিচ্ছেদ না হয়, আমি যত্নে কখনই বিরত হবো না। এখন দেবতারা—
রাজা। ভাই, এখন কি আর সে কাল আছে, যে দেবতারা মানবজাতির দুঃখে দুঃখী হবেন। দুরন্ত কলির প্রতাপে অমরকুলও অন্তর্হিত হয়েছেন। তবে এখনও যে চন্দ্র সূর্য্যের উদয় হয়ে থাকে, সে কেবল বিধাতার অলঙ্ঘনীয় বিধি বলে।
বলে। যদি আপনি আজ্ঞা করেন, তা হলে, না হয় একবার দেখি, বিধাতা আমাদের অদৃষ্টে কি লিখেছেন।
রাজা। (দীর্ঘনিশ্বাস) তা, ভাই, আর দেখতে হবে কেন? বুঝেই দেখ না, যদি কোন ব্যক্তি ‘বিধাতা আমার কপালে কি লিখেছেন, দেখি,’ এই বলে কোন উচ্চ পর্ব্বত থেকে লাফ দেয়; কিম্বা জ্বলন্ত অনলে প্রবেশ করে, বিধাতা যে তার কপালে কি লিখেছেন, তা তৎক্ষণাৎ প্রকাশ পায়।
বলে। আজ্ঞা, তা যথার্থ বটে। তবু,———
মন্ত্রী। (বলেন্দ্রের প্রতি) আপনি একবার এই পত্রখানি পড়ে দেখুন দেখি। (পত্রপ্রদান।)
রাজা। ও কি পত্র, মন্ত্রি?
মন্ত্রী। মহারাজ, এ পত্রখানি আমি গত রাত্রে পাই। কিন্তু এ যে কে কোথ্থেকে লিখেছে, আর কে দিয়ে গেছে, তার আমি কোন সন্ধানই পাচ্চি না।
বলে। কি সর্ব্বনাশ! রাম, রাম, রাম, রাম!——এমন কথা কি মুখে আনতে আছে!
রাজা। কেন, ভাই, বৃত্তান্তটা কি, বল দেখি, শুনি?
বলে। আজ্ঞা, এ কথা আমি মুখে উচ্চারণ কত্যে পারি না, যদি আপনার ইচ্ছা হয়, পড়ে দেখুন। এ কথা আপনার কর্ণগোচর করা আমার সাধ্য নয়। (রাজাকে পত্র-প্রদান।)
মন্ত্রী। কথাটা অত্যন্ত ভয়ানক বটে, কিন্তু——
বলে। রাম! রাম! আর ও কথার প্রয়োজন কি? রাম, রাম! এও কি কথা! ছি, ছি, ছি!
মন্ত্রী। (জনান্তিকে) তা—বলি—বলি—এ উপায় ভিন্ন আর যদি অ কোন উপায় থাকে, তা বরং আপনি বিবেচনা করে দেখুন—
বলে। আমি বিলক্ষণ বিবেচনা করেছি। মহাশয়, এ কি মনুষ্যের কর্ম্ম?
মন্ত্রী। আজ্ঞা, কুল মান রক্ষা করা মানবজাতির প্রধান কর্ম্ম। বিশেষতঃ ক্ষত্রকুলের যে কি রীতি, তা ত আপনি জানেন।
রাজা। (ক্ষণৈক নিস্তব্ধ থাকিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগপূর্ব্বক) মন্ত্রি,———
মন্ত্রী। মহারাজ!
রাজা। এ পত্রখানি তোমাকে কে লিখেছে হে?
মন্ত্রী। মহারাজ, তা আমি বলতে পারি না।
রাজা। দেখ, মন্ত্রি, এ চিকিৎসক অতি কটূ ঔষধের ব্যবস্থা দেয় বটে, কিন্তু এ দেখছি, রোগ নিরাকরণ কত্যে সুনিপুণ। (দীর্ঘনিশ্বাস এবং নীরবে অবস্থান।)
মন্ত্রী। আজ্ঞা, হাঁ। আর বোধ হয়, এ রোগের এই ভিন্ন আর কোন ঔষধ নাই।
রাজা। বলেন্দ্র,——
বলে। আজ্ঞা——
রাজা। (দীর্ঘনিশ্বাস) ভাই, কি হবে?.
বলে। আজ্ঞা, এ পত্রখানি আমাকে দেন, আমি ছিঁড়ে ফেলি। এ যে শত্রুর লিপি, তার কোন সন্দেহ নাই। কি সর্ব্বনাশ!
রাজা। তুমি কি বল, সত্যদাস?
মন্ত্রী। মহারাজ, বিপদকাল উপস্থিত হলে, লোকে রক্ষা হেতু আপন বক্ষঃ বিদীর্ণ করেও দেবপুজায় রক্তদান করে থাকে।
রাজা। সত্যদাস, তা যথার্থ বটে। কিন্তু বক্ষঃ বিদীর্ণ করে রক্ত দেওয়াতে আজ এ কর্ম্মেতে অনেক পৃথক্।
মন্ত্রী। আচ্ছা তা বটে। সে যাতনা অপেক্ষা এ যাতনা অধিকতর, কিন্তু বিবেচনা করে দেখুন, এ সময়ে সর্ব্বনাশ হবার সম্ভাবনা; তা সর্ব্বনাশ অপেক্ষা—
রাজা। সত্যদাস, এ কথাটা মনে হলে সর্ব্বশরীর লোমাঞ্চিত হয়, আর চতুর্দ্দিক্ যেন অন্ধকার দেখি। আঃ, কি হলো! হা পরমেশ্বর!—না, না, না,—এও কি হয়?—
মন্ত্রী। মহারাজ, মনে করে দেখুন। কত শত রাজসতী এই বংশের মানরক্ষার্থে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে দেহ ত্যাগ করেছেন; বিশেষতঃ যিনি নরপতি, তিনি প্রজাগণের পিতাস্বরূপ, তা এক জনের মায়ায় কি শত সহস্র জনকে ধনে প্রাণে নষ্ট করা উচিত?
রাজা। হাঁ, তা বটে। কিন্তু তা বলে আমি কি এই অদ্ভুত নিষ্ঠুর ব্যাপারে সম্মত হতে পারি? আর রাজমহিষী এ কথা শুনলেই বা কি বলবেন। আমাদের পুরুষকুলে জন্ম; সুতরাং আমরা অনেক সহ্য কত্যে পারি। কিন্তু———
মন্ত্রী। আজ্ঞা, তিনি এ কথা কেমন করে টের পাবেন?
রাজা। সত্যদাস, এ কথা কি গোপনে থাকবে?
মন্ত্রী। আজ্ঞা, তা না থাকতে পারে। তবে কি না, এটা একবার চুকে গেলে আর ততো ভাবনা নাই। কারণ, যে বিধাতা হতে শোকের সৃষ্টি হয়েছে, তিনিই আবার সেই শোককে অল্পজীবী করেছেন। অতএব শোক কিছু চিরস্থায়ী নয়।
রাজা। (চিন্তা করিয়া) আমার মৃত্যুই শ্রেয়ঃ।—না,—তাতেই বা কি হবে? কেবল আত্মহত্যার পাপ গ্রহণ করা। বিশেষতঃ, আপন রাজ্যের ও পরিবারের সমূহ বিপদ্ জেনে মরাও কাপুরুষতা। না, না,—কৃষ্ণা থাকতে এ বিবাদ যে মেটে, এমন ত কোন মতেই বোধ হয় না। আর এ বিবাদ ভঞ্জন না হলেও সর্ব্বনাশ। উঃ—না,—না, (গাত্রোত্থান) তা বলে কি আমি এ কর্ম্মে সন্মত হতে পারি? সত্যদাস, এমন কর্ম্ম চণ্ডালেও কত্যে পারে না। আর চণ্ডাল ত মনুষ্য, এমন কর্ম্ম পশু পক্ষীরাও কত্যে বিমুখ হয়! দেখ, যে সকল পঞ্চরা মাংসাশী, তারাও আবার আপন শাবকগণকে প্রাণপণ যত্নে প্রতিপালন করে।
মন্ত্রী। আজ্ঞা, মহারাজ, এ তর্কবিতর্কের বিষয় নয়। আপনি কি বলেন, বীরবর?
বলে। আমি এতে আর কি বলবো?
রাজা। বলেন্দ্র, আমি কি ভাই, ইচ্ছা করে আমার স্নেহ পুত্তলিকা কৃষ্ণার প্রাণনাশ কত্যে সম্মত হতে পারি? যে এ পত্র লিখেছে, বোধ হয়, অপত্যস্নেহ যে কার নাম সে তা কখনই জানে না। ভাই, এ কথাটা মনে হলে প্রাণ যে কেমন করে উঠে, তার আর কি বলবো? উঃ—(বক্ষঃস্থলে হস্তপ্রদান) হে বিধাতঃ, আমার অদৃষ্টে কি এই লিখেছিলে?আহা! এমন সরলা বালা।—আমার প্রাণপ্রতিমা নিরপরাধে—আহা! ও মা কৃষ্ণা—আঃ—(মূর্চ্ছাপ্রাপ্তি।)
মন্ত্রী। কি সর্ব্বনাশ! কি সর্ব্বনাশ।
বলে। হায়, এ কি হলো?—কি হবে? এখানে কে আছে রে?
(ভৃত্যের প্রবেশ।)
ভৃত্য। কি সর্ব্বনাশ! এ কি?—মহারাজ!—এ কি?
মন্ত্রী। বীরবর, এ দেখছি, বিষম বিপদ উপস্থিত। তা আসুন, আমরা মহারাজকে এখানে থেকে নিয়ে যাই। রামপ্রসাদ, তুই শীব্র গিয়ে রাজবৈতাকে ডেকে আনগে যা।
ভৃত্য। যে আজ্ঞা।
[প্রস্থান।
মন্ত্রী। আপনি মহারাজকে ধরুন।
[ রাজাকে লইয়া উভয়ের প্রস্থান।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.