চতুর্থাঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক জয়পুর-রাজগৃহ। (রাজা জগৎসিংহ এবং মন্ত্রী।) রাজা। বল কি, মন্ত্রি! এ সংবাদ তোমাকে কে দিলে? মন্ত্রী। মহারাজ, ধনদাস হয় অদ্য বৈকালে কি কল্য প্রাতে এসে উপস্থিত হবে। তার মুখে এ সকল কথা শুনলেই ত আপনি বিশ্বাস করবেন? রাজা। কি আপদ্। আমি কি আর তোমার কথায় অবিশ্বাস কচ‍্যি হে? আমি জিজ্ঞাসা কচ‍্যি কি, বলি এ কথা তুমি কার কাছে শুনলে? মন্ত্রী। মহারাজ, আমারই কোন চরের মুখে শুনেছি। সে অতি বিশ্বাসযোগ্য পাত্র। রাজা। বটে? তবে রাজা ভীমসিংহ আমাকে অবহেলা কর‍্যে মানসিংহকেই কন্যা প্রদান করবেন, মানস করেছেন? মন্ত্রী। আজ্ঞা, শুনেছি, যে রাজকুলপতি ভীমসিংহের আপনার প্রতি অত্যন্ত স্নেহ; তিনি কেবল দায়গ্রস্ত হয়ে আপনার বিরুদ্ধ কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়েছেন। মহারাজ, আমি ত পূর্ব্বেই এ সকল কথা রাজসম্মুখে নিবেদন করেছিলাম, কিন্তু আমার দৌর্ভাগ্যক্রমে আপনি সে সময়ে ধনদাসের পরামর্শ ই শুনলেন। রাজা। আঃ, সে গত বিষয়ের অনুশোচনে ফল কি? মন্ত্রী। আজ্ঞা তার সন্দেহ কি? তবে কি না, বিবেচনা করুন, ধনদাসই এই অনর্থের মূল! সেই কেবল স্বার্থ সাধনের জন্যে এ রাজ্যের সর্ব্বনাশটা কল্যে। রাজা। কেন? কেন? তার অপরাধ কি? মন্ত্রী। আজ্ঞা, আমি আর কি বলবো? ধনদাসের চরিত্র ত আপনি বিশেষরূপে জানেন না। রাজা। কেন? কি হয়েছে, বল না। মন্ত্রী। আজ্ঞা, এ সকল কথা রাজসম্মুখে কওয়া আমার কোন মতেই উচিত হয় না। কিন্তু— রাজা। কেন? ধনদাসের এতে অপরাধটা কি? মন্ত্রী। মহারাজ, রাজকুমারী কৃষ্ণার প্রতিমূর্ত্তি যে ও আপনাকে কেন এনে দেখায়, তা কি আপনি এখনও বুঝতে পাচ‍্যেন না? রাজা। কৈ, না! কি কারণ, বল দেখি শুনি। মন্ত্রী। এই বিবাহের উপলক্ষে একটা গোলযোগ বাধিয়ে আপনার উদর পূর্ণ করবে, এই কারণ, আর কারণ কি? মহারাজ, ওর মত স্বার্থপর মানুষ কি আর দুটি আছে? রাজা। বটে? তাই ও এ বিষয়ে এত উদ্যোগী হয়েছিল? আমি তখন বুঝতে পারি নাই। আচ্ছা, ও আগে ফিরে আসুক। তা এখন এ বিষয়ে কি কর্ত্তব্য, বল দেখি? মন্ত্রী। আজ্ঞা, আমার বিবেচনায় এ বিষয়ে নিরস্ত হওয়াই শ্রেয়ঃ। রাজা। (সারাষে) বল কি, মন্ত্রি? তুমি উন্মাদ হলে না কি? এমন অপমান কি কেউ কোথাও সহ্য কত‍্যে পারে?—কেন আমার কি অর্থ নাই?—সৈন্য নাই? না কি বল নাই! মন্ত্রী। আজ্ঞা, রাজলক্ষ্মীর প্রসাদে মহারাজের অভাব কিসের? রাজা। তবে আমাকে এতে ক্ষান্ত হতে বলচো কেন? মান অপেক্ষা কি ধন না জীবন প্রিয়তর? ছি! তুমি এমন কথা মুখেও আন! দেখ, প্রতি দুর্গপতিকে তুমি এখনই গিয়ে পত্র পাঠাও, যে তারা পত্রপাঠমাত্র সসৈন্যে এ নগরে এসে উপস্থিত হয়। আর দেখ— মন্ত্রী। আজ্ঞা করুন— রাজা। তুমি যে সে দিন ধনকুলসিংহের কথা বলছিলে, তিনি কে, আমাকে ভাল করে বল দেখি। মন্ত্রী। আজ্ঞা, তিনি মরুদেশের মৃত রাজা ভীমসিংহের পুত্র। কিন্তু তাঁর পিতার লোকান্তর প্রাপ্তির পর জন্ম হওয়ায়, কোন কোন লোক বলে যে তিনি বাস্তবিক ভীমসিংহের পুত্র নন। রাজা। বটে? মরুদেশের বর্ত্তমান রাজা মানসিংহ ত গোমানসিংহের পুত্র। গোমানসিংহ ধনকুলসিংহের পিতামহ, বীরসিংহের কনিষ্ঠ ছিলেন; তা ধনকুলসিংহই মরুদেশের প্রকৃত অধিকারী। মন্ত্রী। মহারাজ, এ কলিকালে কি আর ধর্মাধর্ম্মের বিচার আছে? যার শক্তি, তারই জয়। কুমার ধনকুল সিংহ কি আর রাজসিংহাসন পাবেন। রাজা। অবশ্য পাবেন! আমি তাঁকে মরুদেশের সিংহাসনে বসাবো। দেখ, মন্ত্রি, তুমি শীঘ্র গিয়ে পত্র লেখ। মানসিংহের এত বড় যোগ্যতা, যে সে আমার বিপক্ষতা করে। এখন দেখি, সে আপন রাজ্য কি করে রাখে। মন্ত্রী। মহারাজ,—— রাজা। (গাত্রোত্থান করিয়া) আর বৃথা বাক্যব্যয়ে প্রয়োজন কি? যাও— মন্ত্রী। মহারাজ, আমি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ। এই মহৎকুলের প্রসাদে মনুষ্যত্ব লাভ করেছি। আপনার স্বর্গীয় পিতা— রাজা। আঃ! কি উৎপাত! আমি কি আর তোমাকে চিনি না।; তুমি যে আমাকে আপন পরিচয় দিতে আরম্ভ কল্যে? মন্ত্রী। আজ্ঞা, তা নয়। তবে কি না আমার পরামর্শে এ বিষম কাণ্ডে সহসা প্রবৃত্ত হওয়া উচিত হয় না। রাজা। মন্ত্রি, মানবজীবন চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু অপষশঃ চিরস্থায়ী। আমি যদি এ অপমান সহ্য করি, তা হলে ভবিষ্যতে লোকে আমাকে কাপুরুষের দৃষ্টান্তস্থল করবে। বরঞ্চ ধনে প্রাণে মরবো, সেও ভাল, কিন্তু এ কথাটি যেন কেউ না বলে, যে অম্বর-অধিপতি মরুদেশের রাজার ভয়ে ভীত হয়েছিলেন। ছি! ছি! আমার সে অপযশঃ হতে সহস্রগুণে মরণ ভাল। তা তুমি যাও। মন্ত্রী। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) যে আজ্ঞা, মহারাজ! (স্বগত) বিধাতার নির্ব্বন্ধ কে খণ্ডন কত্যে পারে! হায়! হায়! দুষ্ট ধনদাসটাই এই অনর্থ ঘটালে! [ প্রস্থান। রাজা। (স্বগত) এই ত আর এক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আরম্ভ হলো! এত দিন রাজভোগে মত্ত ছিলাম, এখন একটু পরিশ্রমই করে দেখি। তরবার চিরকাল কোষে আবদ্ধ থাকলে মলিন ও কলঙ্কিত হয়। (চিন্তা করিয়া) যা হউক, ধনদাসকে এবার বিলক্ষণ দণ্ড দিতে হবে। আমি যত কুকর্ম্ম করেছি, সকলেতেই ঐ দুষ্ট আমার গুরু ওঃ! বেটার কি চমৎকার বুদ্ধি। তা দেখি, এবারও কি হয়! [ প্রস্থান।