প্রতিষ্ঠানপুরী—শর্মিষ্ঠার গৃহসম্মুখস্থ উষ্ঠান। শর্মিষ্ঠা ও দেবিকার প্রবেশ। দেবি। রাজনন্দিনি, আর বৃথা আক্ষেপ কল্যে কি হবে?—আমি একটা আশ্চর্য্য দেখছি, যে কালে সকলই পরিবর্ত্ত হয়, কিন্তু দেবযানীর স্বভাব চিরকাল সমান রৈল। এমন অসচ্চরিত্রা স্ত্রী কি আর দুটি আছে? শর্ম্মি। সখি, তুমি কেন দেবযানীকে নিন্দা কর? তার এ বিষয়ে অপরাধ কি? যদ্যপি আমি কোন মহামূল্য রত্নকে পরম যত্ন করি, আর যদি সে রত্নকে কেউ অপহরণ করে, তবে অপহর্তাকে কি আমি তিরস্কার করি না? দেবি। তা করবে না কেন? শর্ম্মি। তবে সখি, দেবযানীকে কি তোমার ভর্ৎসনা করা উচিত? পতিপরায়ণা স্ত্রীর পতি অপেক্ষা আর প্রিয়তম অমূল্য রত্ন কি আছে বল দেখি? (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) সখি, দেবযানী আমায় অপমান করেছে বলে যে আমি রোদন কচ্যি, তা তুমি ভেবো না। দেখ সখি, আমার কি দুরদৃষ্ট। কি ছিলেম, কি হলেম! আবার যে কি কপালে আছে, তাই বা কে বলতে পারে? এই সকল ভাবনায় আমি একেবারে জীবন্মৃত হয়ে রয়েছি! (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) প্রাণেশ্বরের সে চন্দ্রানন দর্শন না কল্যে আমি আর প্রাণধারণ কিরূপে করবো? সখি, যেমন মৃগী তৃষ্ণায় নিতান্ত পীড়িতা হয়ে, সুশীতল জলাভাবে ব্যাকুলা হয়, প্রাণনাথ বিরহে আমার প্রাণও সেইরূপ হয়েছে। (অধোবদনে রোদন)। দেবি। রাজনন্দিনি, তুমি এত ব্যাকুল হইও না; মহারাজ অতি ত্বরায় তোমার নিকটে আসবেন। শর্ম্মি। আর সখি! তুমিও যেমন, মিথ্যা প্রবোধ কি আর মন মানে? (রোদন।) দেবি। প্রিয়সখি, তোমার কি কিছু মাত্র ধৈর্য্য নাই? দেখ দেখি, কুমুদিনী দিবাভাগে তার প্রাণনাথ নিশানাথের বিরহ সহ্য করে; চক্রবাকীও তার প্রাণেশ্বর বিহনে একাকিনী সমস্ত যামিনী যাপন করে; তা তুমি কি আর, সখি, পতিবিচ্ছেদ ক্ষণমাত্র সহ্য করতে পার না! শর্ম্মি। প্রিয়সখি, তুমি কি জান না, যে আমার হৃদয়াকাশের পূর্ণ শশধর চিরকালের নিমিত্তে অস্তে গিয়েছেন। হায়! হায়! আমার বিরহরজনী কি আর প্রভাতা হবে? (রোদন।) দেবি। প্রিয়সখি, শান্ত হও, তোমার এরূপ দশা দেখে তোমার শিশু সম্ভানগুলিও নিতান্ত ব্যাকুল হয়েছে, আর তোমার জন্যে উচ্চৈঃস্বরে সর্ব্বদা রোদন কচ্যে। শর্ম্মি। হা বিধাতঃ, (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) আমার কপালে কি এই ছিল? সখি, তুমি বরঞ্চ গৃহে যাও, আমার শিশুগুলিকে সান্ত্বনা করগে, আমি এই নির্জ্জন কাননে আরও একটু থেকে যাব। দেবি। প্রিয়সখি, এ নির্জন স্থানে একাকিনী ভ্রমণ করায় প্রয়োজন কি? শর্ম্মি। সখি, তুমি কি জান না, যখন কুরঙ্গিণী বাণাঘাতে ব্যথিতা হয়, তখন কি সে আর অন্যান্য হরিণীগণের সহিত আমোদ প্রমোদে কালযাপন করে থাকে? বরঞ্চ নির্জ্জন বনে প্রবেশ করে একাকিনী ব্যাকুলচিত্তে ক্রন্দন করে, এবং সর্ব্বব্যাপী অন্তর্যামী ভগবান্ ব্যতিরেকে তার অশ্রুজল আর কেহই দেখতে পান না। সখি, প্রাণেশ্বরের বিরহবাণে আমারও হৃদয় সেইরূপ ব্যথিত হয়েছে, আমার কি আর বিষয়ান্তরে মন আছে? (নেপথ্যে) অয়ি দেবিকে, রাজনন্দিনী কোথায় গেলেন লা? এমন দুরন্ত ছেলেদের শান্ত করা কি আমাদের সাধ্য? শর্ম্মি। সখি, ঐ শুন, তুমি শীঘ্র যাও। দেবি। প্রিয়সখি, এ অবস্থায় তোমাকে একাকিনী রেখে, আমি কেমন করেই বা যাই; কিন্তু কি করি, না গেলেও ত নয়। [ প্রস্থান। শর্ম্মি। (স্বগত) হে প্রাণেশ্বর, তোমার বিরহে আমার এ দগ্ধ-হৃদয় যে কিরূপ চঞ্চল হয়েছে, তা আর কাকে বলবো। (দীর্ঘনিশ্বাস) হে প্রাণনাথ, তুমি কি এ অনাথাকে জন্মের মত পরিত্যাগ করলে? হে জীবিতনাথ, তোমাকে সকলে দয়াসিন্ধু বলে, কিন্তু এ হতভাগিনীর কপালগুণে কি তোমার সে নামে কলঙ্ক হলো? হে রাজন্, তুমি দরিদ্রকে অমূল্য রত্ন প্রদান করে, আবার তা অপহরণ করলে? অন্ধকার রাত্রে অতি পথশ্রান্ত পথিককে আলোক দর্শন করিয়ে, তাকে ঘোরতর গহন কাননে এনে, দীপ নির্ব্বাণ করলে! (বৃক্ষতলে উপস্থিত হইয়া) হা ভগবন্ অশোকবৃক্ষ, তুমি কত শত কান্ত বিহঙ্গমচয়কে আশ্রয় দাও, কত জন্তুগণ তপনতাপে তাপিত হয়ে তোমার আশ্রয় গ্রহণ করলে, সুশীতল ছায়াদ্বারা তাদের ক্লান্তি দূর কর; তুমি পরম পরোপকারী; অতএব তুমিই ধন্য! হে তরুবর, যেমন পিতা কন্যাকে বরপাত্রে প্রদান করে, তুমিও আমাকে প্রাণেশ্বরের হস্তে তদ্রূপ প্রদান করেছ, কেন না, তোমার এই সুস্নিগ্ধ ছায়ায় তিনি এ হতভাগিনীর পাণিগ্রহণ করেন। হে তাত, এক্ষণে এ অনাথা হতভাগিনীকে আশ্রয় দাও। (রোদন) আহা! এই বৃক্ষতলে প্রাণনাথের সহিত যে কত সুখভোগ করেছি, তা বলতে পারি না। (আকাশের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া) হায়! সে সকল দিন এখন কোথায় গেল! হে প্রভো নিশানাথ, হে নক্ষত্রমণ্ডল, হে মন্দ মলয়সমীরণ, তোমাদের সম্মুখে আমি পূর্ব্বে যে সকল সুখানুভব করেছি, তা কি আমার জন্মের মত শেষ হলো? (চিন্তা করিয়া) কি আশ্চর্য! গত সুখের কথা স্মরণ হলে দ্বিগুণ দুঃখবৃদ্ধি হয় বৈ নয়। গীত। ঝিঝোটী—তাল মধ্যমান। এই তো সে কুসুম-কানন গো, পাইয়েছিলেম যথা পুরুষরতন। সেই পূর্ণ শশধরে, সেইরূপ শোভা ধরে, সেই মত পিকবরে, স্বরে হরে মন। সেই এই ফুলবনে, মলয়ার সমীরণে, সুখোদয় যার সনে, কোথা সেই জন? প্রাণনাথে নাহি হেরি, নয়নে বরিষে বারি, এত দুঃখে আর নারি ধরিতে জীবন॥ আমরা এই স্থানে গানবাদ্যে যে কত সুখলাভ করেছি, তার পরিসীমা নাই, কিন্তু এক্ষণে সে সুখানুভব কোথায় গেল? আহা! কি চমৎকার ব্যাপার। সেই দেশ, সেই কাল, সেই আমি, কেবল প্রাণেশ্বর ব্যতিরেকে আমার সকলই অসুখ। বীণার তার ছিন্ন হলে তার যেমন দশা ঘটে, জীবিতেশ্বর বিহনে আমার অন্তঃকরণও অবিকল সেইরূপ হয়েছে। আর না হবেই বা কেন? জলধরের প্রসাদ অভাবে কি তরঙ্গিণী কলকলরবে প্রবাহিতা হয়? হে প্রাণনাথ, তুমি কি এ অনাথা অধীনীকে একেবারে বিস্মৃত হলে? যে যূথভ্রষ্টা কুরঙ্গিণী মহৎ গিরিবরের আশ্রয় পেয়ে কিঞ্চিৎ সুখী হয়েছিল, ভাগ্যক্রমে গিরিরাজ কি তাকে আশ্রয় দিতে একান্ত পরান্মুখ হলেন! (অধোবদনে উপবেশন।) রাজার একান্তে প্রবেশ। রাজা। (স্বগত) আহা! নিশাকরের নির্মল কিরণে এ উপবনের কি অপরূপ শোভা হয়েছে! যেমন কোন পরমসুন্দরী নবযৌবনা কামিনী বিমল দর্পণে আপনার অনুপম লাবণ্য দর্শন করে পুলকিত হয়, অন্ত্য সেইরূপ প্রকৃতিও ঐ স্বচ্ছ সরোবরসলিলে নিজ শোভা প্রতিবিম্বিত দেখে প্রফুল্লিত হয়েছে। নানাশব্দপূর্ণা ধরণী এ সময়ে যেন তপোমগ্না তপস্বিনীর ন্যায় মৌনব্রত অবলম্বন করেছেন। শত শত খদ্যোতিকাগণ উজ্জ্বল রত্নরাজীর ন্যায় দেদীপ্যমান হয়ে পল্লব হতে পল্লবান্তরে শোভিত হচ্যে। হে বিধাতঃ, তোমার এই বিপুল সৃষ্টিতে মনুষ্যজাতি ভিন্ন আর সকলেই সুখী! (চিন্তা করিয়া গমন।) মহিষীর অন্বেষণে নানা দিকে রথী আর অশ্বারূঢ়গণকে ত প্রেরণ করা গিয়াছে, কিন্তু এ পর্যন্ত তাঁর কোন সংবাদ পাওয়া যায় নাই! তা বৃথা ভেবেই বা আর কি ফল? বিধাতার মনে যা আছে, তাই হবে। কিন্তু আমি প্রাণেশ্বরী শর্ম্মিষ্ঠাকে এ মুখ আর কি প্রকারে দেখাবো? আহা! আমার নিমিত্তে প্রেয়সী যে কত অপমান সহ্য করেছেন, তা মনে হলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়। (পরিক্রমণ।) ঐ বৃক্ষতলে প্রাণেশ্বরীর পাণিগ্রহণ করেছিলেম! আহা, সে দিন কি শুভ দিনই হয়েছিল! শর্ম্মি। (গাত্রোত্থান করিয়া) দেবযানীর কোপে আমি বাল্যাবস্থাতেই রাজভোগে বঞ্চিতা হই, এক্ষণে সেই কারণে আবার কি প্রিয়তম প্রাণেশ্বরকেও হারালেম! হা বিধাতঃ, তুমি আমার সুখনাশার্থেই কি দেবযানীকে সৃষ্টি করেছো? (দীর্ঘনিশ্বাস।) রাজা। (শর্ম্মিষ্ঠাকে দেখিয়া সচকিতে) এ কি! এই যে আমার প্রাণাধিকা প্রিয়তমা শর্ম্মিষ্ঠা এখানে রয়েছেন। শর্ম্মি। (রাজাকে দেখিয়া ও রাজার নিকটবর্ত্তিনী হইয়া এবং হস্ত গ্রহণ করিয়া) প্রাণনাথ, আমি কি নিদ্রিত হয়ে স্বপ্ন দেখতেছিলেম, না কোন দৈবমায়ায় বিমুগ্ধা ছিলেম? নাথ, আমি যে আপনার চন্দ্রবদন আর এ জন্মে দর্শন করবো, এমন কোন প্রত্যাশা ছিল না। রাজা। কান্তে, তোমার নিকটে আমার আসতে অতি লজ্জা বোধ হয়। শর্ম্মি। সে কি নাথ? রাজা। প্রিয়ে, আমার নিমিত্ত তুমি কি না সহ্য করেছো? শর্ম্মি। জীবিতনাথ, দুঃখ ব্যতিরেকে কি সুখ হয়? কঠোর তপস্যা না কল্যে ত কখন স্বর্গলাভ হয় না! রাজা। আবার দেখ, মহিষী ক্রোধান্বিত হয়ে— শর্ম্মি। (অভিমান সহকারে রাজার হস্ত পরিত্যাগ করিয়া) মহারাজ, তবে আপনি অতিত্বরায় এ স্থান হতে গমন করুন; কি জানি, এখানে মহিষীর আগমনেরও সম্ভাবনা আছে! রাজা। (শর্মিষ্ঠার হস্ত গ্রহণ করিয়া) প্রিয়ে, তুমিও কি আমার প্রতি প্রতিকূল হলে? আর না হবেই বা কেন? বিধি বাম হলে সকলেই অনাদর করে। শর্ম্মি। প্রাণেশ্বর, আপনি এমন কথা মুখে আনবেন না। বিধাতা আপনার প্রতি কেন বিমুখ হবেন? আপনার আদিত্যতুল্য প্রতাপ, কুবেরতুল্য সম্পত্তি, কন্দপতুল্য রূপলাবণ্য—আর তায় আপনার মহিষীও দ্বিতীয় লক্ষ্মীস্বরূপা। রাজা। প্রিয়ে, রাজমহিষীর কথা আর উল্লেখ করো না, তিনি প্রতিষ্ঠানপুরী পরিত্যাগ করে কোন্ দেশে যে প্রস্থান করেছেন, এ পর্য‍্যন্ত তার কোন উদ্দেশই পাওয়া যায় নাই। শর্ম্মি। সে আবার কি, মহারাজ? রাজা। প্রিয়ে, বোধ হয়, তিনি রোষাবেশে পিত্রালয়ে গমন করে থাকবেন। শর্ম্মি। এ কি সর্বনাশের কথা! আপনি এই মুহূর্তেই রথারোহণে দৈত্যদেশে গমন করুন, আপনি কি জানেন না, যে গুরু শুক্রাচার্য্য মহাতেজস্বী ব্রাহ্মণ! তাঁর এত দূর ক্ষমতা আছে, যে তিনি কোপানলে এই ত্রিভুবনকেও ভস্ম করতে পারেন। রাজা। প্রিয়ে, আমি সকলই জানি, কিন্তু তোমাকে একাকিনী রেখে আমি দৈত্যদেশে ত কোন মতেই গমন কত‍্যে পারি না। ফণী কি শিরোমণি কোথাও রেখে দেশান্তরে যায়? শর্ম্মি। প্রাণনাথ, আপনি এ দাসীর নিমিত্তে অধিক চিন্তা করবেন না; আমি বালকগুলিনকে লয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে উদর পোষণ করবো। আপনি কি গুরুকোপে এ বিপুল চন্দ্রবংশের সর্ব্বনাশ কত্যে উদ্ভূত হয়েছেন? রাজা। প্রাণেশ্বরি, তোমাপেক্ষা চন্দ্রবংশ কি আমার প্রিয়তর হলো? তুমি আমার—(স্তব্ধ।) শর্ম্মি। এ কি! প্রাণবল্লভ যে অকস্মাৎ নিস্তব্ধ হলেন! কেন, কেন, কি হলো? রাজা। প্রিয়ে, যেমন রণভূমিতে বক্ষঃস্থলে শেলাঘাত হলে পৃথিবী একবারে অন্ধকারময় বোধ হয়, আমার সেইরূপ—(ভূতলে অচেতন হইয়া পতন।) শর্ম্মি। (ক্রোড়ে ধারণ করিয়া) হা প্রাণনাথ! হা দয়িত! হা প্রাণেশ্বর! হা রাজচক্রবর্ত্তিন! তুমি এ হতভাগিনীকে কি যথার্থই পরিত্যাগ করলে? (উচ্চৈঃস্বরে রোদন) হায়! হায়! বিধাতঃ, তোমার মনে কি এই ছিল! হা রাজকুলতিলক! (দেবিকার পুনঃপ্রবেশ।) দেবি। প্রিয়সখি, তুমি কি নিমিত্তে—(রাজাকে অবলোকনকরিয়া) হায়! হায়! হায়! এ কি সর্ব্বনাশ। এ পূর্ণ শশধর ধুলায় লুণ্ঠিত কেন? হায়! হায়! এ কি সর্ব্বনাশ! রাজা। (কিঞ্চিৎ সচেতন হইয়া এবং মৃদুস্বরে) প্রেয়সি শর্ম্মিষ্ঠে! আমাকে জন্মের মত বিদায় দাও, আমার শরীর অবসন্ন হলো, আর আমার প্রাণ কেমন কচ্যে; অদ্যাবধি আমার জীবন-আশা শেষ হলো। শর্ম্মি। (সজলনয়নে) হা প্রাণেশ্বর, এ অনাথাকে সঙ্গে কর! আমি মাতা, পিতা, বন্ধু বান্ধব সকলই পরিত্যাগ করে কেবল আপনারই শ্রীচরণে শরণ লয়েছি! এ নিতান্ত অনুগত অধীনীকে পরিত্যাগ করা আপনার কখনই উচিত নয়। দেবি। প্রিয়সখি, এ সময়ে এত চঞ্চল হলে হবে না! চল, আমরা মহারাজকে এখান থেকে লয়ে যাই। শর্ম্মি। সখি, যাতে ভাল হয় কর, আমি জ্ঞানশূন্য হয়েছি। [ উভয়ে রাজাকে লইয়া প্রস্থান। (বিদূষকের প্রবেশ।) বিদূ। (কর্ণপাত করিয়া স্বগত) এ কি? রাজান্তঃপুরে যে সহসা এত ক্রন্দনধ্বনি আর হাহাকার শব্দ উঠলো, এর কারণ কি? প্রিয় বয়স্যেরও অনেকক্ষণ হলো, দর্শন পাই নাই, ব্যাপারটা কি? দ্বারপালের নিকট শুনলেম, যে মহিষী পূর্ণিকার সহিত আপন মন্দিরে প্রবেশ করেছেন, তা তাঁর নিমিত্তে ত আর কোন চিন্তা নাই—তবে এ কি? (একজন পরিচারিকার প্রবেশ।) পরি। হায়! হায়! কি সর্ব্বনাশ! হা রে পোড়া বিধি! তোর মনে কি এই ছিল! হায়! হায়! কি হলো? বিদূ। (ব্যগ্রভাবে) কেন কেন? ব্যাপারটা কি? পরি। তুমি কি শুন নি না কি? হায়! হায়! কি সর্ব্বনাশ! আমরা কোথায় যাব? আমাদের কি হবে? (রোদন করিতে করিতে বেগে প্রস্থান।) বিদূ। (স্বগত) দূর মাগী লক্ষ্মীছাড়া? তুই ত কেঁদেই গেলি, এতে আমি কি বুঝলেম? (চিন্তা করিয়া) রাজপুরে যে কোন বিপদ্ উপস্থিত হয়েছে, তার আর সংশয় নাই, কিন্তু— (মন্ত্রীর প্রবেশ।) মহাশয়, ব্যাপারটা কি? মন্ত্রী। (সজলনয়নে) আর কি বলবো? এ কালসর্প—(অর্দ্ধোক্তি।) বিদূ। সে কি? মহারাজকে কি সর্পে দংশন করেছে না কি? মন্ত্রী। সর্পই বটে! মহারাজকে যে কালসর্পে দংশন করেছে, স্বয়ং ধন্বন্তরি ও তার বিষ হতে রক্ষা করতে পারেন না; আর ধন্বন্তরিই বা স্বয়ং নীলকণ্ঠ সে বিষ স্বকণ্ঠে ধারণ কত্যে ভীত হন? (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ।) বিদূ। মহাশয়, আমি ত কিছুই বুঝতে পাল্যেম না। মন্ত্রী। আর বুঝবে কি? শুরু শুক্রাচার্য্য মহারাজকে অভিসম্পাত করেছেন। বিদূ। কি সর্ব্বনাশ! তা মহর্ষি ভার্গব এখানকার বৃত্তান্ত এত ত্বরার কি প্রকারে জানতে পালোন? মন্ত্রী। (দীর্ঘনিশ্বাস) এ সকল দৈবঘটনা। তিনি এত দিনের পর অদ্য সায়ংকালে এ নগরীতে স্বয়ং এসে উপস্থিত হয়েছেন। বিদূ। তবে ত দৈবঘটনাই ঘটে! তা এখন আপনি কি স্থির কচ‍্যেন, বলুন দেখি? মন্ত্রী। আমি ত প্রায় জ্ঞানশূন্য হয়েছি, তা দেখি, রাজপুরোহিত কি পরামর্শ দেন। বিদূ। চলুন, তবে আমিও আপনার সঙ্গে যাই। হায়! হায়! হায়! কি সর্ব্বনাশ! আর আমার জীবন থাকায় ফল কি? মহারাজ, আপনিও যেখানে, আমিও আপনার সঙ্গে; তা আমি আর প্রাণধারণ করবো না। [ উভয়ের প্রস্থান। (রাষ্ট্রী দেবযানী এবং পুর্ণিকার প্রবেশ।) পূর্ণি। রাজমহিষি, আর বৃথা আক্ষেপ করেন কেন? যে কর্ম্ম হয়েছে, তার আর উপায় কি? রাজ্ঞী। হায়! হায়! সখি, আমার মতন চণ্ডালিনী কি আর আছে? আমি আমার হৃদয়-নিধি সাধ করে হারালেম, আমার জীবনসর্ব্বস্বধন হেলায় নষ্ট কল্যেম। পতিভক্তি হতেও কি আমার ক্রোধ বড় হলো? হায়! হায়! আমি স্বেচ্ছাক্রমে আপনার মন্মথকে ভস্ম কল্যেম! হে জগন্মাতঃ বসুন্ধরে! তুমি আমার মতন পাপীয়সী স্ত্রীর ভার যে এখনও সহ্য কচ্যো? হে প্রভো নিশানাথ! তোমার সুশীতল কিরণ যে এখনও আমাকে অগ্নি হয়ে দগ্ধ করছে না সখি, শমনও কি আমাকে বিস্মৃত হলেন? হায়! হায়! হা আমার কন্দর্প! আমি কি যথার্থই তোমাকে ভস্ম কলোম? (রোদন।) পূর্ণি। রাজমহিষি, রতিপতি ভস্ম হলে, রতি দেবী যা করেছিলেন, আপনিও তাই করুন। যে মহেশ্বর, কোপানলে আপনার কন্দর্পকে দগ্ধ করেছেন, আপনি তাঁরই শ্রীচরণে শরণাপন্ন হন। রাজ্ঞী। সখি, আমি এ পোড়া মুখ আর ভগবান্ মহর্ষি জনককে কি বলে দেখাবো? হা প্রাণনাথ, হা রাজকুলতিলক! হা নরশ্রেষ্ঠ! হায়! হায়! হায়! আমি এ কি কল্যেম! (রোদন।) পূর্ণি। দেখি, চলুন, আমরা পুনরায় মহর্ষির নিকটে যাই। তা হলেই এর একটা উপায় হবে। রাজ্ঞী। সখি, আমার এ পাপ হৃদয় কি সামান্য কঠিন! এ যে এখনও বিদীর্ণ হলো না! হায়! হায়! প্রাণনাথ আমাকে বল্যেন “প্রেয়সি, তুমি আমাকে বিদায় দাও, আমি বনবাসী হয়ে তপস্যায় এ জরাগ্রস্ত দেহভার পরিত্যাগ করি।” আহা! নাথের এ কথা শুনে আমার দেহে এখনও প্রাণ রৈলো! (রোদন।) পূর্ণি। মহিষি, চলুন, আমরা ভগবান্ ভাতের নিকট যাই। তিনিই কেবল এ রোগের ঔষধ দিতে পারবেন। এখানে বৃথা আক্ষেপ কল্যে কি হবে? [ রাজ্ঞীর হস্ত ধারণ করিয়া প্রস্থান। ইতি চতুর্থাঙ্ক।