পরম বৈষ্ণব এক কৃষ্ণদাস নামে, বসতি করিত নবকৃষ্ণপুর গ্রামে। প্রতিদিন ন্যূন-কল্পে একটি অতিথি, ভোজন করা’ত, তার ছিল চির রীতি। অভুক্ত রহিত নিজে অতিথি না পে’লে, নিজে খে’ত, অতিথি আহার ক’রে গেলে। এই ব্যবহার তার ছিল আজীবন, ভ্রমেও হবেনা কভু নিয়ম-লঙ্ঘন। বিধাতার ইচ্ছা কিবা বলা নাহি যায়, একদিন কৃষ্ণদাস অতিথি না পায়। যা’রে পথে দেখে, তা’রে কহে কর জোড়ে, “একবার মম বাসে এস দয়া ক’রে, দরিদ্রের দু’টী অন্ন মুখে দিয়ে যাও, অনাহারে আছি আমি, জীবন বাঁচাও।” এরূপে সমস্ত দিন যাচি’ প্রতিজনে, সন্ধ্যায়, একাকী গৃহে ফিরে, ক্ষুণ্ণ মনে। কেহ বলে, ‘কাজ আছে, বড় তাড়াতাড়ী,’ কেহ বলে, ‘নাহি খাই বৈষ্ণবের বাড়ী,’ কেহ বলে, ‘এখনি এলাম ভাত খেয়ে,’ কেহ নিরুত্তর, ব্যস্ত চলিয়াছে ধেয়ে। সম্মুখে প্রস্তুত অন্ন, ভাবে কৃষ্ণদাস, ‘প্রভু আজ দিয়াছেন মোরে উপবাস।’ রাত্রি দ্বিপ্রহরে যবে নীরব অবনী, দুয়ারে শুনিল স্পষ্ট করাঘাত-ধ্বনি। ব্যস্ত হ’য়ে কৃষ্ণদাস খুলে দেয় দ্বার, ক্ষুধার্ত্ত অতিথি এক মাগিছে আহার। ভাবে, ‘প্রভু এতক্ষণে ক’রেছেন কৃপা, জুড়া’য়ে গিয়াছে অন্ন, খাওয়াইব কিবা!’ সমাদরে অতিথিরে বসায়ে আসনে, অন্ন আনি দিল তারে পরম যতনে। সম্মুখে যেমন অন্ন রাখে কৃষ্ণদাস, অতিথি বদনে দেয় বড় বড় গ্রাস। ইষ্টদেবে নিবেদন করিল না দে’খে, কৃষ্ণদাস একেবারে অগ্নিশর্ম্মা রে’গে। বলে “তুই কোথা হ’তে আইলি? আ-মর! দেখি নাই তোর মত পাষণ্ড পামর। তোর মত ধর্ম্মহীন, পাতকী, পাগল, খাওয়াইলে, কিছুমাত্র নাহি হবে ফল। যার করুণায় এই ক্ষুধার সময় পাইলি আহার, তারে মনে নাহি হয়? ওঠ তুই, তোর আর খেয়ে কাজ নাই, অভুক্ত রহিব আমি, অতিথি না চাই।” এত কহি, এক চড় মারে তার গালে, উঠিল অতিথি, ভাত পড়ে র’ল থালে। অভিমানে চ’লে গেল, ফিরিল না আর, কৃষ্ণদাস ক্রোধ ভরে রুদ্ধ করে দ্বার। এমন সময়ে, এক দেব-দূত এসে, দাঁড়াল সম্মুখে, সাধু-উদাসীন-বেশে। দূত কহে, “কৃষ্ণদাস, কি করিলে হায়! ক্ষুধার্ত্তের অন্ন নাকি কেড়ে নে’য়া যায়? পাঠাইল প্রভু মোরে তোমার সকাশে, ব’লে দিল, ‘সাবধান কর কৃষ্ণদাসে; পূর্ব্বকৃত সুবিমল পুণ্য করি’ নাশ, গভীর পাপের পঙ্কে ডুবে কৃষ্ণদাস।’ যে প্রভুর অন্ন, পাপী করিছে ভোজন, কোন দিন করে নাই তাঁরে নিবেদন। তথাপি দয়াল তার আহার যোগান, দয়া ক’রে চিরকাল ক্ষমা ক’রে যান। কেন বিপরীত বুদ্ধি হইল তোমার? এ অন্নে তোমার, বল, কোন্ অধিকার? তুমি প্রতিনিধি মাত্র দয়াল প্রভুর, তুমি তাড়াইলে কেন ক্ষুধা-তৃষ্ণাতুর? দয়ালের অন্ন এ যে তোমার তো নয়; তাঁর চিরকাল সহে, তোমার না সয়? চিরকাল ক্ষমা তিনি করিছেন এ’রে; তুমি দিলে তাড়াইয়া, গালে চড় মে’রে? তবু তুমি ভৃত্যমাত্র, মালিক তো নহ; একদিন মাত্র, তাই তোমার দুঃসহ? শীঘ্র যাও, ক্ষুধিতেরে আন ফিরাইয়া, আহার করাও তারে আদর করাইয়া, অসীম দয়াল প্রভু, ক্ষমার নিবাস; হেরি,’ ক্ষমা শিক্ষা কর, ভ্রান্ত কৃষ্ণদাস!” লজ্জা পেয়ে, অনুতাপে, কৃষ্ণদাস ধায়; অতিথি ফিরায়ে এ’নে আহার করায়।