গুরুগৃহে করি শাস্ত্রপাঠ সমাপন, বন্দিয়া বণিকপুত্র গুরুর চরণ। ধীরে ধীরে, সবিনয়ে কহে মৃদুভাষে, “অনুমতি হয় যদি যাই নিজ বাসে; কিন্তু এক ভিক্ষা আছে, চরণের দাস সামান্য দক্ষিণা দিতে করে অভিলাষ।” গুরু হাসি’ কহে, “বৎস দক্ষিণা কি হবে? আমার অভাব কিছু নাহি এই ভবে।” শিষ্য বলে, “কান্তি তব কাঞ্চন-সন্নিভ, দু’গাছি সোণার বালা পরাইয়া দিব। সোণার শরীরে সোণা মানাইবে ভাল, রূপের ছটায় হবে তপোবন আলো।” গুরুদেব বলে, “বৎস, তাই যদি সাধ, দিয়ে যেয়ো, বাসনায় না সাধিব বাদ।” কিছুদিন পরে সেই বণিক-নন্দন, স্বর্ণবালা লয়ে, করে চরণ-বন্দন। স্বহস্তে গুরুর হাতে দিল পরাইয়া, হেরিল দেহের শোভা নয়ন ভরিয়া, শেষে কহে, “গুরুদেব দুগাছি বলয়, হারাইয়া ফেল যদি, এই মম ভয়।” গুরু কহে, “বৎস, আমি প্রতিজ্ঞা না করি, হারাইতে পারে, কেহ নিতে পারে হরি; তুমি তো সকলি জান, আমি উদাসীন, সর্ব্ববিধ ধনরত্নে বাসনা-বিহীন। তথাপি শিষ্যের দান গুরুর নিকটে, যথাযোগ্য যত্ন, আর আদরের বটে। সাধ্যমত যত্ন করি’ রাখিব বলয়, তথাপি জানিও, দৈব কারো বশে নয়।” আনন্দে বণিকপুত্র প্রণমিয়া পদে, ফিরি’ গেল নিজগৃহে, কাননের পথে। কিছুদিন পরে, পুনঃ গুরু-সন্দর্শন― অভিলাষে, বনে আসে বণিকনন্দন। চরণে প্রণমি’, দেখে দাঁড়াইয়া কাছে, এক হাতে বালা নাই, এক হাতে আছে। বিষাদে কহিল, “প্রভু, বালা কি করিলে?” গুরু কহে, “প’ড়ে গেছে সরসী-সলিলে। স্নান-হেতু নেমেছিনু সরোবর জলে, অকস্মাৎ বালা গাছি প’ড়ে গেল তলে।” বণিক নন্দন কহে জোড় করি’ কর, “সুন্দর বলয় সে যে, মূল্যও বিস্তর। কোন্ স্থানে পড়িয়াছে দেহ দেখাইয়া, খুঁজে দেখি একবার জেলে নামাইয়া।” অনুরোধে যান গুরু অনিচ্ছায় ধীরে, উভয়ে দাঁড়ান গিয়া সরোবর তীরে। শিষ্য কহে “কোন্ স্থানে পড়েছে বলয়?” অবশিষ্ট বালাগাছি গুরু খুলে লয়, “ওই স্থানে পড়িয়াছে” ধীরে গুরু ব’লে, সে গাছিও ছুঁড়ে ফেলে সরোবর জলে। দুগাছি বালাই গেল, ভাবে শিষ্য দুখে, দুগাছি বালাই গেল, গুরু ভাবে সুখে।