রামদাস প্রতিদিন গিয়া পাঠশালে, পড়া হইতনা ব’লে, চড় খে’ত গালে। বিশেষতঃ ঠে’কে যে’ত কড়ায় গণ্ডায়, প্রমাদে পড়িত বড়, অঙ্কের ঘণ্টায়। নিত্য হারাইত তার অঙ্ক-কসা খাতা; অঙ্কের সময়, নিত্য ধরে তার মাথা। শিক্ষকেরে মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা ক’য়ে, ছুটী নিয়ে যেত রাম, প্রহারের ভয়ে। আজ তার পেট ব্যথা, কাল মাথা ধরা; ছুতো ধ’রে, কোন মতে চাই সরে পড়া। স্কুলে যে’তে, পথে যদি কভু বৃষ্টি হয়, ভিজাইয়া নিত গাত্র-বস্ত্র সমুদয়। ভিজে বস্ত্র দেখি’ দিত শিক্ষকেরা ছুটী; বাহিরে আসিয়া রাম হে’সে কুটি কুটি। কভু বা বলিত, “আজ মার বড় জ্বর, বলেছেন ছুটী নিয়া যাইতে সত্বর।” পিতার অসুখ ব’লে, কভু ছুটী নিত; বাড়ীতে না ফিরি, পথে খেলে বেড়াইত। কোন দিন, ‘ভাত খেয়ে আসি নাই’ বলে, ছুটী নিয়ে রামদাস বাড়ী যে’ত চ’লে। এইরূপে বে’ড়ে গেল ছুটী-নেয়া রোগ; কিন্তু কয়দিন রয় হেন শুভ-যোগ? একদিন রামদাস শুষ্ক, নত মুখ, শিক্ষকেরে কহে, “আজ বাবার অসুখ; হয়েছেন শয্যাগত ভয়ঙ্কর জ্বরে, যেতে হবে বৈদ্যবাটী ঔষধের তরে।” এমন সময় কোন গুরুতর কাজে, পিতা তার উপনীত পাঠশালা মাঝে। হেরি ক্রোধভরে কাঁপে গুরুমহাশয়, রামের গুণের কথা কহে সমুদয়। গুণ ধর পুত্রে, পিতা ডে’কে লন কাছে; রাম ভাবে, হায়, আজ অদৃষ্টে কি আছে! বেত্রগাছি দিয়া পিতা শিক্ষকের হাতে, বলেন, “মারুন ওরে’ আমার সাক্ষাতে।” পৃষ্ঠে বেত পড়ে, রাম কাঁদে ভেউ ভেউ; চিৎকার করিছে, ‘আহা’ বলে নাত কেউ। সমপাঠিগণ ‘মিথ্যাবাদী’ ব’লে হাসে, কাণ ধ’রে উঠায় বসায় রামদাসে। অবশেষে মাথায় গাধার টুপি দিয়া, পাঠশালে প্রতিঘরে আনে ঘুরাইয়া। আধমরা রামদাস লাজে অপমানে, বদন তুলিয়া নাহি চাহে কারো পানে। পিতা বলে কাছে এ’নে, কান ধ’রে নিজে, “বল, আর এজীবনে কহিবনা মিছে।” রামদাস ব’লে কেঁদে, “করহ মার্জ্জনা, এজীবনে আর কভু মিথ্যা কহিবনা।” সেই দিন হ’তে রাম পাঠে দিল মন; মিথ্যা কহিতনা আর ভ্রমেও কখন।