পুরাকালে ছিল এক রাজার নন্দন, মহিষীর একমাত্র আনন্দবর্দ্ধন। অতি আদরের ছেলে, শিশুকাল হ’তে, অঙ্গঢে’লে দিয়েছিল বিলাসের স্রোতে। কখন ছিলনা কোন সুখের অভাব, যেমন ঐশ্বর্য্য তার, তেমনি প্রতাপ। একদা প্রত্যূষে, পরি মৃগয়ার সাজ, সৈন্য লয়ে মৃগয়ায় যান যুবরাজ। গহনে মৃগের পিছু ছুটি অনিবার, পথ হারাইল সাঁজে রাজার কুমার। পরিশ্রান্ত অতিশয়, তৃষ্ণায় কাতর, অন্ধকার হ’য়ে আসে ক্রমে গাঢ়তর। বিষণ্ণ বিহ্বল চিত্ত, নৃপের নন্দন, দ্রুতপদে করে এক তরু আরোহণ। অনিদ্রায় অনাহারে পোহাইল রাতি, প্রভাতে বনের পাখী গাহিল প্রভাতী। অবরোহি’ তরু হ’তে, পথ-অম্বেষণে, ভ্রমিতে লাগিল বনে চঞ্চল চরণে। হেনকালে দেখা এক ঋষিপুত্র সাথে, সে যায় তুলিতে ফুল, ফুলসাজি হাতে। রাজপুত্র কহে ডাকি “কে? কোথায় যাও? প্রাণ যায়, একবিন্দু জল মোরে দাও। ঋষিপুত্র যত্নে লয়ে যায় যুবরাজে, সুপবিত্র শান্তিময় তপোবন মাঝে জল দিয়া যুবরাজে আদরে বসায়, জিজ্ঞাসে “কি নাম ধর, বসতি কোথায়?” রাজপুত্র নাহি দেয় কথার উত্তর, ঋষিদের দশা দেখ ব্যথিত অন্তর। অবশেষে কহে, ঋষিপুত্রেরে সম্ভাষি,― “আজ্ঞা পেলে, দুটী কথা তোমারে জিজ্ঞাসি কি হেতু কঠোর শাস্তি হয়েছে তোমার? আলে। ভাল নয়? ভাল বনের আঁধার? গাছের পাতায় ঢাকা একখানি কুঁড়ে, ঝড়ে উ’ড়ে যেতে পারে, যেতে পারে পুড়ে। সুখের নাহিক চিহ্ন, আছ কোন সুখে? পায়স মিষ্টান্ন বুঝি নাহি যায় মুখে? কটু তিক্ত ফল খেয়ে ক্ষুধা হয় দূর? ওটা কি? হায়রে দশা! কুশের মাদুর? ওই শয্যা? পরিধান করেছ বাকল? বস্ত্র নাহি জুটে? কিম্বা হয়েছ পাগল? শত-ছিদ্র এ কুটীর; ঘোর বরষায় — পড়েনা বৃষ্টির ধারা? শুয়ে থাকা যায়? প্রজ্জ্বলিত অগ্নিমাত্র শীতের সম্বল? অন্য থাক্, একখানা জোটে না কম্বল? এত ক্লেশ ক’রে যার কর আরাধনা, তার কাছে কিছুই কি চাহিতে পারনা? আরও ভেবে দেখ, যদি মরণের পরে পরকাল নাহি থাকে? পণ্ডশ্রম ক’রে মিথ্যা আশা বুকে লয়ে, সাধিতেছ কত ভয়ানক ক্লেশকর, সুকঠোর ব্রত; না খেলে মধুর খাদ্য রসনা তোষণ, না পেলে বিলাসদ্রব্য বসন ভূষণ। গীত, বাদ্য, রসালাপ লেখেনি ললাটে, মানুষের জীবন কি এই ভাবে কাটে? পরকাল না থাকিলে দুঃখ মাত্র সার, নিষ্ফল জীবনে তব, সহস্র ধিক্কার। টুক দেখেছে পরকাল? আছে কি বিশ্বাস? ঘোর অন্ধকার সব, ফুরালে নিশ্বাস।” ধীরভাবে ঋষিপুত্র শ্লেষবাক্য শুনে বলে শেষে, “রাজা তুমি কহ কোন্ গুণে? যৌবনেই যার হেন বুদ্ধি-বিপর্য্যয়, সুশাসন তার ভাগ্যে নাহিক নিশ্চয়। যে সব বিলাসদ্রব্য কভু নাহি চাই, তাহার অপ্রাপ্তি হেতু দুঃখ কিছু নাই। মানবের সুখ দুঃখ জনমে অন্তরে, সেই দুঃখী, সদা যে অভাব বোধ করে। বসন, ভূষণ কিম্বা খাদ্য সুরসাল, যে না চাহে, তার বল কিসের জঞ্জাল? আমি যদি সুখী হই বনফল খেয়ে, কি ফল, এ কানে মিষ্টান্নের গুণ গেয়ে? পরকাল আছে কিনা দেখে নাই কেহ, যদি বল সে বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ; নাই যদি থাকে, তা’তে মোর দুঃখ নাই, যদি থাকে, তোমার কি গতি হবে ভাই? প্রজার বুকের রক্ত করিয়া শোষণ, শত শত দরিদ্রেরে করায়ে রোদন, শত মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, শত অবিচারে, যে অর্থ তুলিছ তুমি রাজ ধনাগারে, তাই দিয়া কিনিয়াছ এ ক্ষণিক সুখ, বৃথা অহঙ্কারে ফু’লে উঠিয়াছে বুক। যে দিয়াছে এই সুখ, বিলাস, সম্পদ, ভ্রমে চিন্তা নাহি কর তাঁহার শ্রীপদ। পরকাল যদি থাকে তবে কোথা যাবে? সমস্ত পাপের শাস্তি একে একে পাবে। তাই বলি, নৃপসুত, তুমিই নির্ব্বোধ, কোথায় তোমার শান্তি, কোথায় প্রবোধ? পাপে ডু’বে যেই নিজে সুখী মনে করে, ক্ষণিক বিলাসে ম’জে না ডাকে ঈশ্বরে, তারে কভু বুদ্ধিমান্ বলা নাহি যায়, ভাব গিয়া, কি প্রভেদ তোমায় আমায়।”