অন্নদার ভবানন্দভবনে যাত্রা। কে জানিবে তারা নাম মহিমা গো। ভীম ভজে নাম ভীমা গো আগমে নিগমে পুরাণ নিয়মে শিব দিতে নারে সীমা গো ধর্ম্ম অর্থ কাম মোক্ষ ধাম নাম শিবের সেই সে অণিমা গো নিলে তারা নাম তরে পরিণাম নাশে কলির কালিমা গো ভারত কাতর কহে নিরন্তর কি কর কৃপাবক্রিমা গো॥ অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাঙ্গিনীর তীরে। পার কর বলিয়া ডাকিলা পাটুনীরে॥ সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটুনী। ত্বরায় আনিল নৌকা বামাস্বর শুনি॥ ঈশ্বরীরে জিজ্ঞাসিল ঈশ্বরী পাটুনী। একা দেখি কুলবধূ কে বট আপনি॥ পরিচয় না দিলে করিতে নারি পার। ভয় করি কি জানি কে দিবে ফের ফার॥ ঈশ্বরীরে পরিচয় কহেন ঈশ্বরী। বুঝহ ঈশ্বরী আমি পরিচয় করি॥ বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি। জানহ স্বামির নাম নাহি ধরে নারী॥ গোত্রের প্রধান পিতা মুখবংশ জাত। পরমকুলীন স্বামী বন্দ্যবংশ খ্যাত॥ পিতামহ দিলা মোরে অন্নপূর্ণা নাম। অনেকের পতি তেঁই পতি মোর বাম॥ অতিবড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ। কোন গুণ নাহি তাঁর কপালে আগুন॥ কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠ ভরা বিষ। কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ ॥ গঙ্গা নামে সতী তার তরঙ্গ এমনি। জীবনস্বরূপা সে স্বামির শিরোমণি॥ ভূত নাচাইয়া পতি ফেরে ঘরে ঘরে। না মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন বরে॥ অভিমানে সমুদ্রেতে ঝাঁপ দিলা ভাই। যে মোরে আপনা ভাবে তারি ঘরে যাই॥ পাটুনী বলিছে আমি বুঝিনু সকল। যেখানে কুলীন জাতি সেখানে কন্দল॥ শীঘ্র আসি নায়ে চড় দিয়া কিবা বল। দেবী কন দিব আগে পারে লয়ে চল॥ যার নামে পার করে ভব পারাবার। ভাল ভাগ্য পাটুনী তাহারে করে পার॥ বসিলা নায়ের বাড়ে নামাইয়া পদ। কিবা শোভা নদীতে ফুটিল কোকনদ॥ পাটুনী বলিছে মা গো বৈস ভাল হয়ে। পায়ে ধরি কি জানি কুমীরে যাবে লয়ে॥ ভবানী কহেন তোর নায়ে ভরা জল। আলতা ধুইবে পদ কোথা থুব বল॥ পাটুনী বলিছে মা গো শুন নিবেদন। সেঁউতী উপরে রাখ ও রাঙ্গা চরণ॥ পাটুনীর বাক্যে মাতা হাসিয়া অন্তরে। রাখিলা দুখানি পদ সেঁউতী উপরে॥ বিধি বিষ্ণু ইন্দ্র চন্দ্র যে পদ ধেয়ায়। হৃদে ধরি ভূতনাথ ভূতলে লুঠায়॥ সে পদ রাখিলা দেবী সেঁউতী উপরে। তাঁর ইচ্ছা বিনা ইথে কি তপ সঞ্চরে॥ সেঁউতীতে পদ দেবী রাখিতে রাখিতে। সেঁউতী হইল সোণা দেখিতে দেখিতে॥ সোণার সেঁউতী দেখি পাটুনীর ভয়। এ ত মেয়ে মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয়॥ তীরে উত্তরিল তরি তারা উত্তরিলা। পূর্ব্বমুখে সুখে গজগমনে চলিলা॥ সেঁউতী লইয়া কক্ষে চলিল পাটুনী। পিছে দেখি তারে দেবী ফিরিলা আপনি॥ সভূয়ে পাটুনী কহে চক্ষে বহে জল। দিয়াছ যে পরিচয় সে বুঝিই ছল॥ হের দেখ সেঁউতীতে থুয়ে ছিলা পদ। কাঠের সেঁউতী মোর হৈল অষ্টাপদ॥ ইহাতে বুঝিনু তুমি দেবতা নিশ্চয়। দয়ায় দিয়াছ দেখা দেহ পরিচয়॥ তপ জপ জানি নাহি ধ্যান জ্ঞান আর। তবে যে দিয়াছ দেখা দয়া সে তোমার॥ যে দয়া করিল মোর এ ভাগ্য উদয়। সেই দয়া হৈতে মোরে দেহ পরিচয়॥ ছাড়াইতে নারি দেবী কহিলা হাসিয়া। কহিয়াছি সত্য কথা বুঝহ ভাবিয়া॥ আমি দেবী অন্নপূর্ণা প্রকাশ কাশীতে। চৈত্র মাসে মোর পূজা শুক্ল অটমীতে॥ কত দিন ছিনু হরিহোড়ের নিবাসে। ছাড়িলাম তার বাড়ী কন্দলের ত্রাসে॥ ভবানন্দ মজুন্দার নিবাসে রহিব। বর মাগ মনোনীত যাহা চাহ দিব॥ প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে যোড় হাতে। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে॥ তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান। দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান॥ বর পেয়ে পাটুনী ফিরিয়া ঘাটে যায়। পুনর্ব্বার ফিরি চাহে দেখিতে না পায়॥ সাত পাঁচ মনে করি প্রেমেতে পূরিল। ভবানন্দ মজুন্দারে আসিয়া কহিল॥ তার বাক্যে মজুন্দারে প্রত্যয় না হয়। সোণার সেঁউতী দেখি করিলা প্রত্যয়॥ আপন মন্দিরে গেলা প্রেমে ভয়ে কাঁপি। দেখেন মেঝায় এক মনোহর ঝাঁপি॥ গন্ধে আমোদিত ঘর নৃত্য বাদ্য গান। কে বাজায় নাচে গায় দেখিতে না পান॥ পুলকে পূরিল অঙ্গ ভাবিতে লাগিলা। হইল আকাশবাণী অন্নদা আইলা॥ এই ঝাঁপি যত্নে রাখ কভু না খুলিবে। তোর বংশে মোর দয়া প্রধানে থাকিবে॥ আকাশবাণীতে দয়া জানি অন্নদার। দণ্ডবত হৈল ভবানন্দ মজুন্দার॥ অন্নপূর্ণাপূজা কৈলা কত কব তার। নানামতে সুখ বাড়ে কহিতে অপার॥ করুণাকটাক্ষ চয় উত্তর উত্তর। সংক্ষেপে রচিত হৈল কহিতে বিস্তর॥ ইতঃপর কহে শুন রায় গুণাকর। প্রতাপআদিত্য মানসিংহের সমর॥ অন্নদামঙ্গল সমাপ্ত।