চতুর্থাঙ্ক — প্রথম গর্ভাঙ্ক
চতুর্থাঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
প্রতিষ্ঠানপুরী—রাজগৃহ।
রাজা ও বিদূষকের প্রবেশ।
বিদূ। বয়স্য। আপনি অদ্য এত বিরসবদন হয়েছেন কেন?
রাজা। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) আর ভাই! সর্ব্বনাশ হয়েছে! হা বিধাতঃ, এ দুস্তর বিপদর্ণব হতে কিসে নিস্তার পাব!
বিদূ। সে কি মহারাজ? ব্যাপারটা কি, বলুন দেখি?
রাজা। আর ভাই বলবো কি? যেমন কোন পোতবণিক্ ঘোরতর অন্ধকারময় বিভাবরীতে ভয়ানক সমুদ্রমধ্যে পথ হারালে, ব্যাকুলচিত্তে কোন দিঙ্নির্ণায়ক নক্ষত্রের প্রতি সহায় বিবেচনায় মুহুর্মুহুঃ দৃষ্টিপাত করে, আমি সেইরূপ এই অপার বিপদ্-সাগরে পতিত হয়ে পরমকারুণিক পরমেশ্বরকে একমাত্র ভরসাজ্ঞানে সর্ব্বদা মানসে ধ্যান কর্চি। হে জগৎপিতঃ, এ বিপদে আমাকে রক্ষা করুন।
বিদূ। (স্বগত) এ ত কোন সামান্য ব্যাপার নয়! ত্রিভুবনবিখ্যাত, রাজচক্রবর্ত্তী যযাতি যে এতাদৃশ ত্রাসিত হয়েছেন, কারণটাই কি? (প্রকাশে) মহারাজ! ব্যাপারটা কি, বলুন দেখি?
রাজা। কি আর বলবো ভাই! এবার সর্ব্বনাশ উপস্থিত; এত দিনের পর রাণী আমার প্রেয়সী শর্ম্মিষ্ঠার বিষয় সকলই অবগত হয়েছেন।
বিদূ। বলেন কি মহারাজ? তা এ যে অনিষ্ট ঘটনা, তার কোন সন্দেহ নাই; ভাল, রাজমহিষী কি প্রকারে এ সকল বিষয় জানতে পাল্যেন?
রাজা। সখে, সে কথা কেন জিজ্ঞাসা কর? বিধাতা বিমুখ হলে, লোকের আর দুঃখের পরিসীমা থাকে না। মহিষী অদ্য সায়ংকালে অনেক যত্নপূর্ব্বক তাঁর পরিচারিকাদের উদ্যানে ভ্রমণ করতে আমাকে আহ্বান করেছিলেন; আমিও তাতে অস্বীকার হতে পাল্যেম না। সুতরাং আমরা উভরে তথায় ভ্রমণ করতে করতে প্রেয়সী শর্ম্মিষ্ঠার গৃহের নিকটবর্ত্তী হলেম। ভাই হে, তৎকালে আমার অন্তঃকরণ যে কি প্রকার উদ্বিগ্ন হলো, তা বলা দুষ্কর।
বিদূ। বয়স্য! তার পর?
রাজা। আমাকে দেখে প্রিয়তমা প্রেয়সী শর্ম্মিষ্ঠার তিনটি পুত্র তাদের বাল্যক্রীড়া পরিত্যাগ করে প্রফুল্লবদনে উর্দ্ধশ্বাসে আমার নিকটে এলো এবং রাজমহিষীকে আমার সহিত দেখে চিত্রার্পিতের স্থায় স্তব্ধ হয়ে দণ্ডায়মান রইলো।
বিদূ। কি দুর্ব্বিপাক! তার পর?
রাজা। রাজ্ঞী তাদের স্তব্ধ দেখে মৃদুস্বরে বললেন, হে বৎসগণ, তোমরা কিছুমাত্র শঙ্কা করো না। এই কথা শুনে সর্বকনিষ্ঠ পুরু সক্রোধে স্বীয় কোমল বাহু আস্ফালন করে বল্লে, আমরা কাকেও শঙ্কা করি না, তুমি কে? তুমি যে আমাদের পিতার হাত ধরেছ? তুমি ত আমাদের জননী নও,—তিনি হলে আমাদের কত আদর কত্যেন।
বিদূ। কি সর্বনাশ! বয়স্য, তার পর কি হলো?
রাজা। সে কথার আর বলবো কি? তৎকালে আমার মস্তক কুলালচক্রের ন্যায় একবারে ঘূর্ণায়মান হতে লাগলো, আর মনে মনে চিন্তা কল্যেম, যদি এ সময়ে জগন্মাতা বসুন্ধরা দ্বিধা হন, তা হলে আমি তৎক্ষণাৎ তাতে প্রবেশ করি! (দীর্ঘনিশ্বাস।)
বিদূ। বয়স্য! আপনি যে একেবারে নিস্তব্ধ হলেন!
রাজা। আর ভাই! করি কি বল। রাজমহিষী তৎকালে আমাকে আর প্রিয়তমা শর্ম্মিষ্ঠাকে যে কত অপমান, কত ভর্ৎসনা করলেন, তার আর সীমা নাই। অধিক কি বলবো, যদ্যপি তেমন কটুবাক্য স্বয়ং বাগ্দেবীর মুখ হতে বহির্গত হতো, তা হলে আমি তাও সহ্য করতেম না, কিন্তু কি করি? রাজমহিষী ঋষিকন্যা, বিশেষতঃ প্রিয়া শর্ম্মিষ্ঠার সহিত তাঁর চিরবাদ। (দীর্ঘনিশ্বাস।)
বিদূ। বয়স্য! সে যথার্থ বটে; কিন্তু আপনি এ বিষয়ে অধিক চিন্তাকুল হবেন না। রাজমহিষীর কোপাগ্নি শীঘ্রই নির্ব্বাণ হবে। দেখুন, আকাশ-মণ্ডল কিছু চিরকাল মেঘাচ্ছন্ন থাকে না, প্রবল ঝটিকা কিছু চিরকাল বয় না।
রাজা। সখে, তুমি মহিষীর প্রকৃতি প্রকৃতরূপে অবগত নও। তিনি অত্যন্ত অভিমানিনী।
বিদূ। বয়স্য! যে স্ত্রী পতিপ্রাণা, সে কি কখন আপনার প্রিয়তমকে কাতর দেখতে পারে?
রাজা। সখে, তুমি কি বিবেচনা কর, যে আমি রাজমহিষীর নিমিত্তেই এতাদৃশ ত্রাসিত হয়েছি? মৃগীর ভয়ে কি মৃগরাজ ভীত হয়। যে কোমল বাহু পুষ্প-শরাসনে গুণযোজনায় ক্লান্ত হয়, এতাদৃশ বাহুকে কি কেউ ভয় করে?
বিদূ। তবে আপনার এতাদৃশ চিন্তাকুল হবার কারণ কি?
রাজা। সখে, যদ্যপি রাণী এ সকল বৃত্তান্ত তাঁর পিতা মহর্ষি শুক্রাচার্য্যকে অবগত করান, তবে সেই মহাতেজাঃ তপস্বীর কোপাগ্নি হতে আমাকে কে উদ্ধার করবে? যে হুতাশন প্রজ্বলিত হলে স্বয়ং ব্রহ্মাও কম্পায়মান হন, সে হুতাশন হতে আমি দুর্ব্বল মানব কি প্রকারে পরিত্রাণ পাবো? (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) হায়! হায়! শর্মিষ্ঠার পাণিগ্রহণ করে আমি কি কুকর্ম্মই করেছি! (চিন্তা করিয়া) হা রে পাষণ্ড নির্ব্বোধ অন্তঃকরণ! তুই সে নিরুপমা নারীকে কেমন করে নিন্দা করিস, যার সহিত তুই মর্ত্যে স্বর্গভোগ করেছিস? হা নিষ্ঠুর! তুই যে এ পাপের যথোচিত দণ্ড পাবি, তার আর কোন সন্দেহ নাই! আহা, প্রেয়সি! যে ব্যক্তি তোমার নিমিত্তে প্রাণপর্য্যন্ত পরিত্যাগ করতে উদ্যত, সেই কি তোমার দুঃখের মূল হলো! হা চারুহাসিনি! আমার অদৃষ্টে কি এই ছিল! হা প্রিয়ে! হা আমার হৃৎসরোবরের পদ্মিনি!
বিদূ। বয়স্য! এ বৃথা খেদোক্তি করেন কেন? চলুন, আমরা উভয়ে মহিষীর মন্দিরে যাই, তিনি অত্যন্ত দয়াশীলা, আর পতিপরায়ণা, তিনি আপনাকে এতাদৃশ কাতর দেখলে অবশ্যই ক্রোধ সম্বরণ করবেন।
রাজা। সখে, তুমি কি বিবেচনা কচ্যো, যে মহিষী এ পর্য্যনত এ নগরীতে আছেন?
বিদূ। (সসম্ভ্রমে) সে কি মহারাজ? তবে রাজমহিষী কোথায়?
রাজা। ভাই, তিনি সখী পূর্ণিকাকে সঙ্গে লয়ে যে কোথায় গিয়েছেন, তা কেউ বলতে পারে না।
বিদূ। (ত্রস্ত হইয়া) মহারাজ! এ কি সর্ব্বনাশের কথা। যদ্যপি রাজ্ঞী ক্রোধাবেশে দৈত্যদেশেই প্রবেশ করেন, তবেই ত সকল গেল! আপনি এ বিষয়ের কি উপায় করেছেন? রাজা। আর কি করবো? আমি জ্ঞানপুক্ত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি, ভাই!
বিদূ। কি সর্ব্বনাশ! মহারাজ, আর কি বিলম্ব করা উচিত! চলুন, চলুন, অতি খরার পবনবেগশালী অশ্বারূঢ়গণকে মহিবীর অন্বেষণে পাঠান যাকগে। কি সর্ব্বনাশ! কি সর্ব্বনাশ!
[ উভয়ের প্রস্থান।
More from শর্মিষ্ঠা নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.