তৃতীয়াঙ্ক — তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
প্রতিষ্ঠানপুরী—রাজান্তঃপুর-সংক্রান্ত উদ্যান।
(বকাসুর এবং শর্ম্মিষ্ঠার প্রবেশ।)
বক। ভদ্রে, এ কথা আমি তোমার মাতা দৈত্যরাজমহিষীকে কি প্রকারে বলবো? তিনি তোমা বিরহে শোকানলে যে কি পর্য্যন্ত পরিতাপিতা
হচ্যেন, তা বলা দুষ্কর। হে কল্যাণি, তোমা ব্যতিরেকে সে শোকানল নির্ব্বাণ হবার আর উপায়ান্তর নাই।
শর্ম্মি। মহাশয়, আমার অশ্রুজলে যদি সে অগ্নি নির্ব্বাণ হয়, তবে আমি তা অবশ্যই করবো; কিন্তু আমি দৈত্যপুরীতে আর এ জন্মে কিরে যাব না! (অধোবদনে রোদন।)
বক। ভদ্রে, গুরু মহর্ষিকে তোমার পিতা নানাবিধ পূজাবিধিতে পরিতুষ্ট করেছেন; রাজচক্রবর্ত্তী যযাতির পাটরাণী দেবযানী স্বীয় পিতৃআজ্ঞা কখনই উল্লঙ্ঘন বা অবহেলা করবেন না; যদ্যপি তুমি অনুমতি কর, আমি রাজসভায় উপস্থিত হয়ে নৃপতিকে এ সকল বৃত্তান্ত অবগত করাই। হে কল্যাণি, তোমা বিরহে দৈত্যপুরী এককালে অন্ধকার হয়েছে; আর পুরবাসীরাও রাজদম্পতির দুঃখে পরম দুঃখিত।
শর্ম্মি। মহাশয়, আপনি যদি এ কথা নৃপতিকে অবগত করতে উদ্যত হন, তবে আমি এই মুহূর্তেই এ স্থলে প্রাণত্যাগ করবো। (রোদন।)
বক। শুভে, তবে বল, আমার কি করা কর্তব্য?
শর্ম্মি। মহাশয়, আপনি দৈত্যদেশে পুনর্গমন করুন, এবং আমার জনক জননীকে সহস্র সহস্র প্রণাম জানিয়ে এই কথা বলবেন, তোমাদের হতভাগিনী দুহিতার এই প্রার্থনা, যে তোমরা তাকে জন্মের মত বিস্মৃত হও!
বক। রাজনন্দিনি, তোমার জনক জননীকে আমি এ কথা কেমন করে বলবো? তুমি তাঁদের একমাত্র কন্যা; তুমি তাঁদের মানস—সরোবরের একটি মাত্র পদ্মিনী; তুমিই কেবল তাঁদের হৃদয়াকাশে পূর্ণশশী।
শর্ম্মি। মহাশয়, দেখুন, এ পৃথিবীতে কত শত লোকের সন্তান সপ্ততি যৌবনকালেই মানবলীলা সম্বরণ করে; তা তারা কি চিরকাল শোকানলে পরিতপ্ত হয়? শোকালন কখন চিরস্থায়ী নয়।
বক। কল্যাণি, তবে কি তোমার এই ইচ্ছা, যে তুমি আপনার জন্মভূমি আর দর্শন করবে না? তোমার পিতা মাতাকে কি একেবারে বিস্তৃত হলে? আর আমাকে কি শেষে এই সংবাদ শয়ে যেতে হলো?
শর্ম্মি। মহাশয়, আমার পিতা মাতা আমার মানসমন্দিরে চিরকাল পূজিত রয়েছেন। যেমন কোন ব্যক্তি, কোন পরম পরিত্র তীর্থ দর্শন করে এসে, তত্রস্থ দেবদেবীর অদর্শনে, তাঁদের প্রতিমূর্ত্তি আপনার মনোমন্দিরে সংস্থাপিত করে ভক্তিভাবে সর্ব্বদা ধ্যান করে, আমিও সেইরূপ আমার জনক জননীকে ভক্তি ও শ্রদ্ধার সহিত চিরকাল স্মরণ করবো; কিন্তু দৈত্যদেশে প্রত্যাগমন করতে আপনি আমাকে আর অনুরোধ করবেন না।
বক। বৎসে, তবে আমি বিদায় হই।
শর্ম্মি। (নিরুত্তরে রোদন।)
বক। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) ভদ্রে, এখনও বিবেচনা করে দেখ! রাজসভা অতিদূরবর্তিনী নয়; রাজচক্রবর্ত্তী যযাতিও পরম দয়ালু ও পরহিতৈষী; তোমার আদ্যোপান্ত সমুদায় বিবরণ শ্রবণমাত্রেই তিনি যে তোমাকে স্বদেশগমনে অনুমতি করবেন, তার কোন সংশয় নাই।
শর্ম্মি। (স্বগত) হা হৃদয়, তুমি জ্বালাবৃত্ত পক্ষীর ন্যায় যত মুক্ত হতে চেষ্টা কর, ততই আরো আবদ্ধ হও! (প্রকাশে) হে মহাভাগ! আপনি ও কথা আর আমাকে বলবেন না।
বক। তবে আর অধিক কি বলবো? শুভে, জগদীশ্বর তোমার কল্যাণ করুন! আমার আর এ স্থলে বিলম্ব করবার কোন প্রয়োজন নাই; আমি বিদায় হলেম।
[ প্রস্থান।
শর্ম্মি। (স্বগত) এ দুস্তর শোকসাগর হতে আমাকে আর কে উদ্ধার করবে? হা হতবিধাতঃ, তোমার মনে কি এই ছিল? তা তোমারই বা দোষ কি! (রোদন।) আমি আপন কর্ম্মদোষে এ ফল ভোগ কচ্চি। গুরুকন্যার সহিত বিবাদ করে প্রথমে রাজভোগচ্যুতা হয়ে দাসী হলেম; তা দাসী হয়েও ত বরং ভাল ছিলেম, গুরুর আশ্রমে ত কোন ক্লেশই ছিল না; কিন্তু এ আবার বিধির কি বিড়ম্বনা! হা অবোধ অন্তঃকরণ, তুই যে রাজা যযাতির প্রতি এত অনুরক্ত হলি, এতে তোর কি কোন ফল লাভ হবে? তা তোরই বা দোষ কি? এমন মূর্ত্তিমান্ কন্দর্পকে দেখে কে তার বশীভূত না হয়? দিনকর উদয়াচলে দর্শন দিলে কি কমলিনী নিমীলিত থাকতে পারে? (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) তা আমার এ রোগের মৃত্যু ভিন্ন আর ঔষধ নাই! আহা! গুরুকন্যা দেবযানী কি ভাগ্যবতী! (অধোবদনে বৃক্ষতলে উপবেশন।)
(রাজার প্রবেশ।)
রাজা। (স্বগত) আমি ত এ উদ্যানে বহুকালাবধি আসি নাই। শ্রুত আছি, যে এর চতুষ্পার্শ্বে মহিবীর সহচরীগণ না কি বাস করে। আহা! স্থানটি কি রমণীয়! সুমন্দ সমীরণ সঞ্চারে এখানকার লতামণ্ডপ কি সুশীতল হয়ে রয়েছে! চতুর্দ্দিকে প্রচণ্ড তপনতাপ যেন দেবকোপাগ্নির ন্যায় বসুমতীকে দগ্ধ করচে, কিন্তু এ প্রদেশের কি প্রশান্ত ভাব। বোধ হয়, যেন বিজনবিহারিণী শান্তিদেবী দুঃসহ প্রভাকর প্রভাবে একান্ত অধীর হয়ে, এখানেই স্নিগ্ধচিত্তে বিরাজ করছেন; এবং তাঁর অনুরোধে আর এই উত্থানস্থ বিহঙ্গমকুলের কুজনরূপ স্তুতিপাঠেই যেন সূর্যদেব আপনার প্রখরতর কিরণজাল এ স্থল হতে সম্বরণ করেছেন। আহা! কি মনোহর স্থান! কিঞ্চিৎকাল এখানে বিশ্রাম করে শ্রান্তি দূর করি। (শিলাতলে উপবেশন) দুষ্ট তস্করগণ ঘোরতর সংগ্রাম করেছিল; কিন্তু আমি অগ্নিঅস্ত্রে তাদের সকলকেই ভস্ম করেছি। (নেপথ্যে বীণাধ্বনি) আহাহা! কি মধুর ধ্বনি! বোধ হয়, সঙ্গীতবিদ্যায় নিপুণা মহিষীর কোন সহচরী সঙ্গিনীগণ সমভিব্যাহারে আমোদ প্রমোদে কালযাপন কচ্যে। কিঞ্চিৎ নিকটবর্তী হয়ে শ্রবণ করি দেখি (নিকটে গমন।)
নেপথ্যে গীত।
রাগিণী সোহিনী বাহার—তাল আড়া।
আমি ভাবি যার ভাবে, সে ত তা ভাবে না।
পরে প্রাণ দিয়ে পরে, হলো কি লাঞ্ছনা।
করিয়ে সুখেরি সাধ, এ কি বিষাদ ঘটনা।
বিষম বিবাদী বিধি, প্রেমনিধি মিলিলো না!
ভাব লাভ আশা করে, মিছে পরেরি ভাবনা!
খেদে আছি ম্রিয়মাণ বুঝি প্রাণ রহিল না।
রাজা। আহা! কি মনোহর সঙ্গীত! মহিষী যে এমন এক জন সুগায়িকা স্বদেশ হতে সঙ্গে এনেছেন, তা আমি ও স্বপ্নেও জানতেম না। (চিন্তা করিয়া) এ কি? আমার দক্ষিণ বাহু স্পন্দন হতে লাগলো কেন? এ স্থলে মাদৃশ জনের কি ফল লাভ হতে পারে? বলাও যায় না, ভবিতব্যের দ্বার সর্ব্বত্রেই মুক্ত রয়েছে। দেখি, বিধাতার মনে কি আছে।
শর্ম্মি। (গাত্রোত্থান করিয়া স্বগত) হা হতভাগিনি! তুমি স্বেচ্ছাক্রমে প্রণয়পরবশ হয়ে আবার স্বাধীন হতে চাও? তুমি কি জান না, যে পিঞ্জরবদ্ধ পক্ষীর চঞ্চল হওয়া বৃথা? হা পিতা মাতা! হা বন্ধুবান্ধব! হা জন্মভূমি! আমি কি তবে তোমাদের আর এ জন্মে দর্শন পাব না। (রোদন।)
রাজা। (অগ্রসর হইয়া স্বগত) আহা! মধুরস্বরা পল্লবাবৃতা কোকিলা কি নীরব হলো! (শর্ম্মিষ্ঠাকে অবলোকন করিয়া) এ পরমসুন্দরী নবযৌবনা কামিনীটি কে? ইনি কি কোন দেবকন্যা বনবিহারঅভিলাষে স্বর্গ হতে এ উদ্যানে অবতীর্ণা হয়েছেন? নতুবা পৃথিবীতে এতাদৃশ অপরূপ রূপের কি প্রকারে সম্ভব হয়? তা ক্ষণৈক অদৃশ্যভাবে দেখিই না কেন, ইনি একাকিনী এখানে কি কচ্যেন? (বৃক্ষান্তরালে অবস্থিতি।)
শর্ম্মি। (মুক্তকণ্ঠে) বিধাতা স্ত্রীজাতিকে পরাধীন করে সৃষ্টি করেছেন। দেখ, ঐ যে সুবর্ণবর্ণ লতাটি স্বেচ্ছানুসারে ঐ অশোকবৃক্ষকে বরণ করে আলিঙ্গন কচ্যে, যদ্যপি কেউ ওকে অন্য কোন উদ্যান হতে এনে এ স্থলে রোপণ করে থাকে, তথাপি কি ও জন্মভূমিদর্শনার্থে আপন প্রিয়তম তরুবরকে পরিত্যাগ কতো পারে? কিম্বা যদি কেউ ওকে এখান হতে স্ববলে লয়ে যায়, তবে কি ও আর প্রিয়বিরহে জীবন ধারণ করে? হে রাজন্, আমিও সেইমত তোমার জন্যে পিতামাতা, বন্ধুবান্ধব, জন্মভূমি সকলই পরিত্যাগ করেছি। যেমন কোন পরমভক্ত কোন দেবের সুপ্রসন্নতার অভিলাষে পৃথিবীস্থ সমুদায় সুখভোগ পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বন করে, আমিও সেইরূপ যযাতিমূর্ত্তি সার করে অন্য সকল সুখে জলাঞ্জলি দিয়েছি! (রোদন।)
রাজা। (স্বগত) এ কি আশ্চর্য্য! এ যে সেই দৈত্যরাজদুহিতা শর্ম্মিষ্ঠা! কিন্তু এ যে আমার প্রতি অনুরক্তা হয়েছে, তা ত আমি স্বপ্নেও জানি না। (চিন্তা করিয়া সপুলকে) বোধ হয়, এই জন্যেই বুঝি আমার দক্ষিণ বাহু স্পন্দন হতেছিল। আহা! অদ্য আমার কি সুপ্রভাত! এমন রমণীরত্ব ভাগ্যক্রমে প্রাপ্ত হলে যে কত যত্নে তাকে হৃদয়ে রাখি, তা বলা অসাধ্য! (অগ্রসর হইয়া শর্ম্মিষ্ঠার প্রতি) হে সুন্দরি, রুদ্রের কোপানলে মন্মথ পুনরায় দগ্ধ হয়েছেন না কি, যে তুমি স্বর্গ পরিত্যাগ করে একাকিনী এ উদ্যানে বিলাপ কচ্যো?
শর্ম্মি। (রাজাকে অবলোকন করিয়া লজ্জিত হইয়া স্বগত) কি আশ্চর্য্য! মহারাজ যে একাকী এ উদ্যানে এসেছেন?
রাজা। হে মৃগাক্ষি, তুমি যদি মন্মথমনোহারিণী রতি না হও, তবে তুমি কে এ উদ্যান অপরূপ রূপলাবণ্যে উজ্জ্বল কচ্যো?
শর্ম্মি। (স্বগত) আহা! প্রাণনাথ কি মিষ্টভাষী!—হা অন্তঃকরণ! তুমি এত চঞ্চল হলে কেন?
রাজা। ভজে, আমি কি অপরাধ করেছি, যে তুমি মধুরভাবে আমার কর্ণকুহরের সুখপ্রদানে একবারে বিরত হলে?
শর্ম্মি। (কৃতাঞ্জলিপুটে) হে নরেশ্বর, আমি রাজমহিষীর এক জন পরিচারিকা মাত্র; তা দাসীকে আপনার এ প্রকারে সম্বোধন করা উচিত হয় না।
রাজা। না, না, সুন্দরি, তুমি সাক্ষাৎ রাজলক্ষ্মী! যা হৌক, যদ্যপি তুমি মহিষীর সহচরী হও, তবে তোমাতে আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। অতএব হে ভদ্রে, তুমি আমাকে বরণ কর।
শর্ম্মি। হে নরবর, আপনি এ দাসীকে এমত আজ্ঞা করবেন না।
রাজা। সুন্দরি, আমাদের ক্ষত্রিয়কুলে গান্ধর্ব্ব বিবাহ প্রচলিত আছে, আর তুমি রূপে ও গুণে সর্ব্বপ্রকারেই আমার অনুরূপ পাত্রী, অতএব হে কল্যাণি, তুমি নিঃশঙ্কচিত্তে আমার পাণি গ্রহণ কর।
শর্ম্মি। (স্বগত) হা হৃদয়, তোমার মনোরথ এত দিনের পর কি সফল হবে? (প্রকাশে) হে নরনাথ, আপনি এ দাসীকে ক্ষমা করুন! আমার প্রতি এ বাক্য বিড়ম্বনামাত্র।
রাজা। প্রিয়ে, আমি সূর্য্যদেব ও দিন্মণ্ডলকে সাক্ষী করে এই তোমার পাণিগ্রহণ করলেম, (হস্তধারণ।) তুমি অদ্যাবধি আমার রাজমহিষীপদে অভিষিক্তা হলে।
শর্ম্মি। (সসম্ভ্রমে) হে নরেশ্বর, আপনি এ কি করেন? শশধর কি কুমুদিনী ব্যতীত অন্য কুসুমে কখন স্পৃহা করেন?
রাজা। (সহাস্য বদনে) আর কুমুদিনীরও চন্দ্রস্পর্শে অপ্রফুল্ল থাকা ত উচিত নয়! আহা! প্রেয়সি, অদ্য আমার কি শুভ দিন! আমি যে দিবস তোমাকে গোদাবরী নদীতটে পর্ব্বত মুনির আশ্রমে দর্শন করেছিলেম, সেই দিন অবধি তোমার এই অপূর্ব্ব মোহিনী মূর্ত্তি আমার হৃদয়মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে! তা দেবতা সুপ্রসন্ন হয়ে এত দিনে আমার অভীষ্ট সিদ্ধ কল্যেন।
(দেবিকার প্রবেশ।)
দেবি। (স্বগত) আহা! বকাসুর মহাশয়ের খেদোক্তি স্মরণ হলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়! (চিন্তা করিয়া) দেবযানীর পরিণয়কালাবধিই প্রিয়সখীর মনে জন্মভূমির প্রতি এইরূপ বৈরাগ্য উপস্থিত হয়েছে। কি আশ্চর্য! এমন সরলা বালার অন্তঃকরণ কি গুরুকন্যার সৌভাগ্যে হিংসায় পরিণত হলো! (রাজাকে অবলোকন করিয়া সসম্ভ্রমে) এ কি! মহারাজ যযাতি যে প্রিয়সখীর সহিত কথোপকথন কচ্যেন! আহা! দুই জনের একত্রে কি মনোহর শোভাই হয়েছে। যেন কমলিনীনায়ক অবনীতে অবতীর্ণ হয়ে প্রিয়তমা কমলিনীকে মধুরভাষে পরিতুষ্ট কচ্যেন!
শর্মি। আমার ভাগ্যে যে এত সুখ হবে, তা আমার কখনই মনে ছিল না; হে নরেশ্বর, যেমন কোন যুথভ্রষ্টা কুরঙ্গিণী প্রাণভয়ে ভীতা হয়ে কোন বিশাল পর্ব্বতান্তরালে আশ্রয় লয়, এ অনাথা দাসীও অধ্যাবধি সেইরূপ আপনার শরণাপন্না হলো! মহারাজ, আমি এত দিন চিরদুঃখিনী ছিলাম! (রোদন।)
রাজা। (শর্মিষ্ঠার অশ্রু উন্মোচন করিতে করিতে) কেন কেন প্রিয়ে! বিধাতা ত তোমার নয়নযুগল কখন অশ্রুপূর্ণ হবার নিমিত্তে করেন নাই?
রাজা। (দেবিকাকে অবলোকন করিয়া সসম্ভ্রমে) প্রিয়ে, দেখ দেখি, এ স্ত্রীলোকটি কে?
শর্মি। মহারাজ, ইনি আমার প্রিয়সখী, এঁর নাম দেবিকা।
দেবি। মহারাজের জয় হউক।
রাজা। (দেবিকার প্রতি) সুন্দরি, তোমার কল্যাণে আমি সর্ব্বত্রেই বিজয়ী! এই দেখ, আমি বিনা সমুদ্রমন্থনে অন্য এই কমলকাননে কমলাস্বরূপ তোমার সবীরত্ন প্রাপ্ত হলেম।
দেবি। (করযোড়ে) নরনাথ, এ রত্ন রাজমুকুটেরই যোগ্যাভরণ বটে, আমাদেরও অদ্য নয়ন সফল হলো।
শর্ম্মি। (দেবিকার প্রতি) তবে সখি, সংবাদ কি বল দেখি?
দেবি। রাজনন্দিনি, বকাসুর মহাশয় তোমার নিকট বিদায় হয়েও পুনর্ব্বার একবার সাক্ষাৎ কত্যে নিতান্ত ইচ্ছুক; তিনি পূর্ব্বদিকের বৃক্ষবাটিকাতে অপেক্ষা কচ্যেন, তোমার যেমন অনুমতি হয়।
রাজা। কোন্ বকাসুর?
শর্ম্মি। বকাসুর মহাশয় একজন প্রধান দৈত্য, তিনি আমার সহিত সাক্ষাৎকারণেই আপনার এ নগরীতে আগমন করেছেন।
রাজা। (সসম্ভ্রমে) সে কি? আমি দৈত্যবর বকাসুর মহাশয়ের নাম বিশেষরূপে শ্রুত আছি, তিনি একজন মহাবীর পুরুষ। তাঁর যথোচিত সমাদর না কল্যে আমার এ রাজধানীর কলঙ্ক হবে; প্রিয়ে, চল, আমরা সকলে অগ্রসর হয়ে তাঁর সহিত সাক্ষাৎ করিগে।
[ সকলের প্রস্থান।
(বিদূষকের প্রবেশ।)
বিদূ। (স্বগত) এই ত মহিষীর পরিচারিকাদের উদ্যান; তা কৈ, মহারাজ কোথায়? রক্ষক বেটা মিথ্যা কথা বললে না কি? কি আপদ্! প্রিয় বয়স্য অস্ত্রধারী ব্যক্তির নাম শুনলেই একেবারে নেচে উঠেন! ছি! ক্ষত্রজাতির কি দুঃস্বভাব! এঁদের কবিভায়ারা যে নরব্যাঘ্র বলেন, সে কিছু অযথার্থ নয়। দেখ দেখি, এমন সময় কি মনুষ্য গৃহের বাহির হতে পারে? আমি দরিদ্র ব্রাহ্মণ, আমার কিছু সুখের শরীর নয়; তবুও আমার যে এ রৌদ্রে কত ক্লেশ বোধ হচ্যে, তা বলা দুষ্কর! এই দেখ, আমি যেন হিমাচলশিথর হয়েছি, আমার গা থেকে যে কত শত নদ ও নদী নিঃসৃত হয়ে ভূতলে পড়ছে, তার সীমা নাই! (মস্তকে হস্ত দিয়া) উঃ! আমি গঙ্গাধর হলেম না কি? তা না হলে আমার মস্তকপ্রদেশে মন্দাকিনী যে এসে অবস্থিতি কচ্যেন, এর কারণ কি? যা হৌক, মহারাজ গেলেন কোথায়? তিনি যে একাকী দস্যুদলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বেরিয়েছেন, এ কথা শুনে পুরবাসীরা সকলেই অত্যন্ত ব্যাকুল হয়েছে, আর সৈন্যাধ্যক্ষেরা পদাতিকদল লয়ে তাঁর অন্বেষণে নানা দিকে ভ্রমণ কচ্যে। কি উৎপাত! ডাঙ্গায় বসে যে মাছ বড়শীতে অনায়াসে গাঁথা যায়, তার জন্যে কি জলে ঝাঁপ দেওয়া উচিত? (চিন্তা করিয়া) হাঁ, এও কিছু অসম্ভব নয়। দেখ, এই উত্থানের চতুষ্পার্শ্বে রাণীর পরিচারিকারা বসতি করে। তারা সকলেই দৈত্যকন্যা। শুনেছি, তারা না কি পুরুষকে ভেড়া করে রাখে। কে জানে, যদি তাদের মধ্যে কেউ আমাদের কন্দর্পস্বরূপ মহারাজের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে মায়াবলে সেইরূপই করে থাকে, তবেই ত ঘোর প্রমাণ! (চিন্তা করিয়া) হাঁ, হাঁ, তাও বটে, আমারও ত এমন জায়গায় দেখা দেওয়া উচিত কর্ম্ম নয়। যদিও আমি মহারাজের মতন স্বয়ং মূর্ত্তিমান্ মন্মথ নই, তবু আমি যে নিতান্ত কদাকার, তাও বলা যায় না। কে জানে, যদি আমাকেও দেখে আবার কোন মাগী ক্ষেপে ওঠে, তা হলেই তো আমি গেলেম! তা ভেড়া হওয়া ত কখনই হবে না! আমি দুঃখী ব্রাহ্মণের ছেলে, আমার কি তা চলে? ও সব বরঞ্চ রাজাদের পোষায়; আমরা পেট ভরে খাব, আর আশীর্ব্বাদ করবো; এই ত জানি, তা সাত জন্ম বরং নারীর মুখ না দেখবো, তবু ত ভেড়া হতে স্বীকার হবো না—বাপ! (নেপথ্যাভিমুখে অবলোকন করিয়া সচকিতে) ও কি? ঐ না—এক মাগী আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে? ও বাবা, কি সর্বনাশ! (বস্ত্রের দ্বারা মুখাবরণ) মাগী আমার মুখটা না দেখতে পেলেই বাঁচি। হে প্রভু অনঙ্গ! তোমার পায়ে পড়ি, তুমি আমাকে এ বিপদ্ হতে রক্ষা কর! তা আর কি? এখন দেখচি, পালাতে পাল্যেই রক্ষা।
[ বেগে পলায়ন।
ইতি তৃতীয়াঙ্ক।
More from শর্মিষ্ঠা নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.