প্রথম সর্গ — দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা
দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা।
[শকুন্তলা বিশ্বামিত্রের ঔরসে ও মেনকানাম্নী অপ্সরার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়া, জনক জননী কর্ত্তৃক শৈশবাবস্থায় পরিত্যক্ত হওয়াতে, কণ্বমুনি তাঁহাকে প্রতিপালন করেন। একদা মুনিবরের অনুপস্থিতিতে রাজা দুষ্মন্ত মৃগয়া প্রসঙ্গে তাঁহার আশ্রমে প্রবেশ করিলে, শকুন্তলা রাজ-অতিথির যথাবিধি অতিথিসৎকার সম্পন্ন করিয়াছিলেন। রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার অসাধারণ রূপলাবণ্যে বিমোহিত হইয়া, এবং তিনি যে ক্ষত্রকুলোদ্ভবা, এই কথা শুনিয়া, তাঁহার প্রতি প্রেমাসক্ত হন। পরে রাজা তাঁহাকে গুপ্তভাবে গান্ধর্ব্ব বিধানে পরিণয় করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন। রাজা দুষ্মন্ত, স্বরাজ্যে গমনান্তর শকুন্তলার কোন তত্ত্ববিধান না করাতে, শকুন্তলা রাজ সমীপে এই নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি প্রেরণ করিয়াছিলেন।]
বন-নিবাসিনী দাসী নহে রাজপদে,
রাজেন্দ্র! যদিও তুমি ভুলিয়াছ তারে,
ভুলিতে তোমারে কভু পারে কি অভাগী?
হায়, আশামদে মত্ত আমি পাগলিনী!
হেরি যদি ধূলারাশি, হে নাথ, আকাশে;৫
পবন-স্বনন যদি শুনি দূর বনে;
অমনি চমকি ভাবি,—মদকল করী,
বিবিধ রতন অঙ্গে, পশিছে আশ্রমে,
পদাতিক, বাজীরাজী, সুরথ, সারথি,
কিঙ্কর, কিঙ্করী সহ! আশার ছলনে,১০
প্রিয়ম্বদা, অনসূয়া, ডাকি সখীদ্বয়ে;
কহি—‘হ্যাদে দেখ্, সই, এত দিনে আজি
স্মরিলা লো প্রাণেশ্বর এ তাঁর দাসীরে!
ওই দেখ্, ধূলারাশি উঠিছে গগনে!
ওই শোন্ কোলাহল! পুরবাসী যত১৫
আসিছে লইতে মোরে নাথের আদেশে।”
নীরবে ধরিয়া গলা কাঁদে প্রিয়ম্বদা;
কাদে অনুসূয়া সই বিলাপি বিষাদে!
দ্রুতগতি ধাই আমি সে নিকুঞ্জ-বনে,
যথায় হে মহীনাথ, পূজিনু প্রথমে২০
পদযুগ; চারি দিকে চাহি ব্যগ্রভাবে
দেখি প্রফুল্লিত ফুল, মুকুলিত লতা;
শুনি কোকিলের গীত, অলির গুঞ্জর,
স্রোতোনাদ, মরমরে পাতাকুল নাচি;
কুহরে কপোত, সুখে বৃক্ষশাখে বসি,২৫
প্রেমালাপে কপোতীর মুখে মুখ দিয়া।
সুখি গঞ্জি ফুলপুঞ্জে;—‘রে নিকুঞ্জশোভা,
কি সাথে হাসিস্ তোরা? কেন সমীরণে
বিতরিস্ আজি হেথা পরিমল-সুধা?’
কহি পিকে,—‘কেন তুমি, পিককুল-পতি,৩০
এ স্বরলহরী আজি বরিষ এ বনে?
কে করে আনন্দধ্বনি নিরানন্দ কালে?
মদনের দাস মধু; মধুর অধীনে
তুমি; সে মদন মোহে যাঁর রূপ গুণে,
কি সুখে গাও হে তুমি তাঁহার বিরহে?”৩৫
অলির গুঞ্জর শুনি ভাবি—মৃদু স্বরে
কাঁদিছেন বনদেবী দুঃখিনীর দুঃখে!
শুনি স্রোতোনাদ ভাবি—গম্ভীর নিনাদে
নিন্দিছেন বনদেব তোমায়, নৃমণি,—
কাঁপি ভয়ে—পাছে তিনি শাপ দেন রোষে।৪০
কহি পত্রে,—শোন্ পত্র;—সরস দেখিলে
তোরে, সমীরণ আসি নাচে তোরে লয়ে
প্রেমামোদে; কিন্তু যবে শুখাইস্ কালে
তুই, ঘৃণা করি তোরে তাড়ায় সে দূরে;—
তেমতি দাসীরে কি রে ত্যজিলা নৃপতি?৪৫
মুদি পোড়া আঁখি বসি রসালের তলে;
ভ্রান্তিমদে মাতি ভাবি পাইব সত্বরে
পাদপদ্ম! কাঁপে হিয়া দুরুদুক করি
শুনি যদি পদশব্দ! উল্লাসে উম্মীলি
নয়ন, বিষাদে কাঁদি হেরি কুরঙ্গীরে!৫০
গালি দিয়া দূর তারে করি করাঘাতে!
ডাকি উচ্চে অলিরাজে; কহি,—‘ফুলসখে
শিলীমুখ, আমি তুমি আক্রম গুঞ্জরি
এ পোড়া অধর পুনঃ! রক্ষিতে দাসীরে
সহসা দিবেন দেখা পুরু-কুল-নিধি!’৫৫
কিন্তু বৃথা ডাকি, কান্ত। কি লোভে ধাইবে
আর মধুলোভী অলি এ মুখ নিরখি,—
শুখাইলে ফুল, কবে কে আদরে তারে?
কাঁদিয়া প্রবেশি, প্রভু, সে লতামণ্ডপে,
যথায়—ভাবিয়া দেখ, পড়ে যদি মনে,৬০
নরেন্দ্র; যথায় বসি, প্রেমকুতূহলে,
লিখিল কমলদলে গীতিকা অভাগী;—
যথায় সহসা তুমি প্রবেশি, জুড়ালে
বিষম বিরহজ্বালা! পদ্মপর্ণ নিয়া
কত যে কি লিখি নিত্য কব তা কেমনে?৬৫
কভু প্রভঞ্জনে কহি কৃতাঞ্জলি-পুটে;—
‘উড়ায়ে লেখন মোর, বায়ুকুলরাজা,
ফেল রাজ-পদ-তলে যথা রাজালয়ে
বিরাজেন রাজাসনে রাজকুলমণি!’
সম্বোধি কুরঙ্গে কভু কহি শূন্যমনে;—৭০
‘মনোরথ গতি তোরে দিয়াছেন বিধি,
কুরঙ্গ! লেখন লয়ে, যা চলি সত্বরে
যথায় জীবিতনাথ! হায়, মরি আমি
বিরহে! শৈশবে তোরে পালিমু যতনে;
বাঁচা রে এ পোড়া প্রাণ আজি রূপা করি!’৭৫
আর যে কি কই কারে, কি কাজ কহিয়া,
নরেশ্বর? ভাবি দেখ, পড়ে যদি মনে,
অনসূয়া প্রিয়ম্বদা সখীদ্বয় বিনা,
নাহি জন জানে, হায়, এ বিজন বনে
অভাগীর দুঃখ-কথা! এ দুজন যদি৮০
আসে কাছে, মুছি আঁখি অমনি; কেনন।
বিবশা দেখিলে মোরে রোষে ঋষিবালা,
নিন্দে তোষা, হে নরেন্দ্র, মন্দ কথা কয়ে!—
বজ্রসম অপবাদ বাজে পোড়া বুকে!
ফাটি অন্তরিত রাগে—বাক্য নাহি ফোটে!৮৫
আর আর স্থল যত,—কাঁদিয়া কাঁদিয়া
আমি সে সকল স্থলে! যে তরুর মূলে
গান্ধর্ব্ববিবাহচ্ছলে ছলিলে দাসীরে,
যে নিকুঞ্জে ফুলশয্যা সাজাইয়া সাধে
সেবিল চরণ দাসী কানন-বাসরে,—৯০
কি ভাব উদয়ে মনে, দেখ মনে ভাবি,
ধীমান্, যখন পশি সে নিকুঞ্জ-ধামে!—
হে বিধাতঃ, এই কি রে ছিল তোর মনে?
এই কি রে ফলে ফল প্রেমতরু-শাখে?
এই রূপে ভ্রমি নিত্য আমি অনাথিনী,৯৫
প্রাণনাথ! ভাগ্যে বৃদ্ধা গৌতমী তাপসী
পিতৃম্বসা,—মনঃ তাঁর রত তপজপে;
তা না হলে, সর্ব্বনাশ অবশ্য হইত
এত দিনে! নাহি সাধ বাঁধিতে কবরী
ফুলরত্নে আর, দেব! মলিন বাকলে১০০
আবরি মলিন দেহ; নাহি অম্বে রুচি;
না জানি কি কহি কারে, হায়, শূন্যমনে!
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, পড়ি ভূমিতলে,
হারাই সতত জ্ঞান; চেতন পাইয়া
মিলি যবে আঁখি, দেখি তোমায় সম্মুখে!১০৫
অমনি পসারি বাহু ধাই ধরিবারে
পদযুগ; না পাইয়া কাঁদি হাহারবে!
কে কবে, কি পাপে সহি হেন বিড়ম্বনা!
কি পাপে পীড়েন বিধি, সুধিব তা কারে?
দয়া করি কভু যদি বিরামদায়িনী১১০
নিদ্রা, সুকোমল কোলে, দেন স্থান মোরে,
কত যে স্বপনে দেখি, কব তা কেমনে?
স্বর্ণ-রত্ন-সংঘটিত দেখি অট্টালিকা;
দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত দুয়ারে দুয়ারী
দ্বিরদ, সুবর্ণাসন দেখি স্থানে স্থানে;১১৫
ফুলশয্যা; বিদ্যাধরী-গঞ্জিনী কিঙ্করী;
কেহ গায়, কেহ নাচে; যোগায় আনিয়া
বিবিধ ভূষণ কেহ; কেহ উপাদেয়
রাজভোগ! দেখি মুক্তা মণি রাশি রাশি,
অলকা সদনে যেন! শুনি বীণা-ধ্বনি;১২০
গন্ধামোদে মাতে মনঃ, নন্দন কাননে—
(শুনেছি এ কথা, নাথ, তাত কণ্বমুখে)
নন্দন কাননান্তরে বসন্তে যেমনি!
তোমায়, নৃমণি, দেখি স্বর্ণ সিংহাসনে!
শিরোপরি রাজছত্র; রাজদণ্ড হাতে,১২৫
মণ্ডিত অমূল-রত্নে; সসাগরা ধরা,
রাজকর করে, নত রাজীব-চরণে!
কত যে জাগিয়া কাঁদি কব তা কাহারে?
জানে দাসী, হে নরেন্দ্র, দেবেন্দ্র-সদৃশ
ঐশ্বর্য্য, মহিমা তব; অতুল জগতে১৩০
কুল মান ধনে তুমি, রাজকুলপতি!
কিন্তু নাহি লোভে দাসী বিভব! সেবিবে
দাসীভাবে পা দুখানি—এই লোভ মনে,—
এই চির-আশা, নাথ, এ পোড়া হৃদয়ে!
বন-নিবাসিনী আমি, বাকল-বসনা,১৩৫
ফলমূলাহারী নিত্য, নিত্য কুশাসনে
শয়ন; কি কাজ, প্রভু, রাজসুখ-ভোগে?
আকাশে করেন কেলি লয়ে কলাঘরে
রোহিণী, কুমুদী তাঁরে পূজে মর্ত্ততলে!
কিঙ্করী করিয়া মোরে রাখ রাজপদে!১৪০
চির-অভাগিনী আমি! জনক জননী
ত্যজিলা শৈশবে মোরে, না জানি, কি পাপে?
পরান্নে বাঁচিল প্রাণ—পরের পালনে!
এ নব যৌবনে এবে ত্যজিলা কি তুমি,
প্রাণপতি? কোন্ দোষে, কহ, কান্ত, শুনি,১৪৫
দাসী শকুন্তলা দোষী ও চরণ-যুগে?
এ মনে যে সুখ-পাখী ছিল বাসা বাঁধি,
কেন ব্যাধবেশে আসি বধিলে তাহারে,
নরাধিপ? শুনিয়াছি রথীশ্রেষ্ঠ তুমি,
বিখ্যাত ভারতক্ষেত্রে ভীম বাহুবলে;১৫০
কি যশঃ লভিলা, কহ, যশস্বি, বিনাশি—
অবলা কুলের বালা আমি—সুখ মম!
আসিবেন তাত কণ্ব ফিরি যবে বনে;
কি কব তাঁহারে, নাথ, কহ, তা দাসীরে?
নিন্দে অনসূয়া যবে মন্দ কথা কয়ে,১৫৫
অপবাদে প্রিয়ম্বদা তোমায়,— কি বল্যে
বুঝাবে এ দোঁহে দাসী, কহ তা দাসীরে?
কহ, কি বলিয়া, দেব, হায়, বুঝাইব
এ পোড়া পরাণ আমি—এ মিনতি পদে!
বনচর চর, নাথ! না জানি কি রূপে১৬০
প্রবেশিবে রাজপুরে, রাজ সভাতলে?
কিন্তু মজ্জমান জন, শুনিয়াছি ধরে
তৃণে, আর কিছু যদি না পায় সম্মুখে!
জীবনের আশা, হায়, কে ত্যজে সহজে!
ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে শকুন্তলাপত্রিকা নাম
প্রথম সর্গ।
More from বীরাঙ্গনা কাব্য
More in Poetry
Poetry
Palanquin Bearers
Lightly, O lightly we bear her along, She sways like a flower in the wind of our song; She skims like a bird on the foam of a stream; She floats like a laugh from the lips of a dream. Gaily, O gaily we glide and we sing,...
Poetry
Where the Mind is Without Fear (Gitanjali 35)
Where the mind is without fear and the head is held high; Where knowledge is free; Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls; Where words come out from the depth of truth; Where tirel...
Poetry
Thou Hast Made Me Endless (Gitanjali 1)
Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life. This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed...
Comments (0)
Log in to join the conversation.