পূর্ণিমার সন্ধ্যাকালে চাঁদ উঠে পূবে, পশ্চিমের আকাশেতে সূর্য্য যায় ডুবে। উঁকি মেরে চাঁদ কয় সূর্য্য পানে চেয়ে, “ওগো সূয্যি মামা! কোথা চলিয়াছ ধেয়ে? এতক্ষণ জীবগণে পোড়াইয়া ধীরে, শরীরের জ্বালা বুঝি নিভাইতে নীরে, সাগরে ডুবিছ? ভাল, উঠিও না আর, আমি আসিতেছি, তাপ জুড়াতে ধরার। আমার শীতল জ্যোৎস্না পেয়ে জীবগণ, হ’য়ে থাকে অবিরল আনন্দে মগন। অবোধ সরল শিশু মা’র কোলে থেকে, ‘আর চাঁদ, আয় চাঁদ,’ বলে মোরে ডেকে। সহস্র চকোর উড়ে মোর দেখা পেয়ে, কি আনন্দ পায় তারা মোর সুধা খেয়ে। ‘সুধাকর’ নাম মোর, করি সুধাদান; ‘তপন’ তোমার নাম, দগ্ধ কর প্রাণ। ‘শশধর’ নাম মোর কেমন সুন্দর; ‘মার্ত্তণ্ড’ তোমার নাম অতি ভয়ঙ্কর! তোমারে দেখিলে কেহ, চক্ষু হয় অন্ধ; আমার শীতল মূর্ত্তি, দর্শনে আনন্দ। তোমার কিরণ স্পর্শে অবিরত ঘর্ম্ম, পিপাসায় প্রাণ যায়, দগ্ধ হয় চর্ম্ম। তোমারে দেখিয়া সবে গৃহেতে লুকায়, ভাবে, কতক্ষণে এটা অস্ত যাবে, হায়! যাইতেছ ডু’বে যদি, যাও নমস্কার;― একেবারে যাও মামা, জ্বালাওনা আর।” সূর্য্য কহে ধীরে ধীরে রাঙ্গামুখে হেসে, “এমন পণ্ডিত আর আছে কোন্ দেশে? আমি আছি, তাই বাঁচে জীবের জীবন, হাতে হাতে প্রাণ দেয় আমার কিরণ। পৌষমাসে যৎসামান্য দক্ষিণেতে সরি, শীতে মৃতপ্রায় জীব,— কম্প থরথরি। আমার কিরণ পেয়ে বাঁচে যত তরু, নতুবা এ ধরা হ’ত অনুর্ব্বর মরু। ফল, ফুল, লতা, গুল্ম, শস্য অগণন, করি অঙ্কুরিত, করি বর্দ্ধন, পালন। তাই খেয়ে, তাই পেয়ে, জীবের বড়াই, আমিই মেঘের জল ধরায় ছড়াই। গিরি-শিরে অবিরত গলাই তুষার, তাই প্রাণিগণ পায় শীত জলধার! আমি না উদিলে, আর নাহি চলে বায়ু, মুহূর্ত্তে জীবের শেষ হ’য়ে যায় আয়ু। আরে মূর্খ! কোন্ মুখে মোরে ‘মামা’ কহ? নাহি জান, আমি যে তোমার পিতামহ? সে দিনের শিশু তুমি বয়স বা কত, এরি মধ্যে ধরিয়াছ গুরুনিন্দা ব্রত? নাম নিয়ে কেন কর এত কথা ব্যয়? নামের গৌরব বাড়ে গুণ যদি রয়। শান্ত ছেলেটীকে যদি ‘দুষ্ট’ ব’লে ডাকি, ডাকিতে ডাকিতে ছেলে মন্দ হয় নাকি? পণ্ডিতের নাম যদি রাখি ‘বোকারাম’, মূর্খ হ’য়ে যায় নাকি? পায় না প্রণাম? বালকের নাম যদি রাখি ‘বৃদ্ধ রায়’, শৈশবেই চুল তার সাদা হ’য়ে যায়? অন্ধপুত্রে যদি ডাকি ‘পদ্মনেত্র’ ব’লে, দৃষ্টি শক্তি পায় সে কি সুধু তারি ফলে? গায়ের কলঙ্ক বুঝি দেখিতে না চাও? তাই নিষ্কলঙ্কে নিন্দা ক’রে সুখ পাও? তুমি না থাকিলে চাঁদ কি বিশেষ ক্ষতি? আমা ভিন্ন এ ধরার কি হইত গতি? যে আলোর তুমি এত কর অহঙ্কার, সে আলো তো মোর কাছে করিয়াছ ধার। যা’র ধনে ধনী তুমি, তারি নিন্দা কর? উদিত হ’য়োনা, শিশু, জলে ডু’বে মর।”