আমের মুকুল ঝরিয়া আজিকে মিশিছে নিমের ফুলে, ম্লান হাসিটুকু কাঁপিছে অধরে অশ্রু আঁখির কুলে! প্রাণ করে হায় হায়, বরষের পথ সঙ্গে যে ছিল সে আজ চলিয়া যায়। কত না তারার খণ্ড-জোছনা কত স্নেহ, কত প্রীতি, কত ভ্রূণ আঁখি চেয়ে আছে কত তিক্ত-মধুর স্মৃতি; কত আশা কত ভয় কতই গরব, কত সে কুণ্ঠা,—ফুল-কণ্টকময়।  বকুল ঝরিয়া যায় গো মরিয়া পিছনে কিছু না রাখি’, সারা যামিনীর সাথী যে প্রদীপ স্তিমিত তাহার আঁখি; বুক ভরে হাহাকারে, লুতার লালায় লিপ্ত কুঁড়িটি পাপ্‌ড়ি মেলিতে নারে। কিশোর আশার কিশলয় ভেঙে স্মৃতি আজ বাঁধে নীড়, দুর্ব্বল মনে সংশয় আর দুর্ভাবনার ভিড়; ব্যসন কলহ, ক্লেশ ব্যথিছে আজিকে সারা বরষের বিষ-ভরা বিদ্বেষ। অঞ্জলি করি’ সুন্দরী ঊষা যে সোনা গেছিল ঢালি’ নিশীথের কালো নিকষে কষিতে সকলি কি হ’ল কালি? জগতের আনাগোনা সে কি হ’ল শেষে অশ্রুজলের মত আগাগোড়া লোণা? অতসী-অশোক গাঁথিতে কি হায় গেঁথেছি অপরাজিতা? প্রাণের স্ফটিক পাত্রে ঢেলেছি মিঠার সঙ্গে তিতা? বিশ্ব কি বিস্বাদ? একি ভুল নয়?—এই বিষময় মোহময় অবসাদ? ঝরা ফুল পাতা মাটি হ’য়ে যায় জাগে তায় অঙ্কুর, মৃত্যু প্রবল করে উজ্জ্বল জীবনের ক্ষীণ সুর। ওরে নাই নাই শোক, ত্যজিছে আবার অনস্ত তার বরষের নির্ম্মোক। ঘণ্টা পড়েছে নাট্যশালায় নূতন পর্দ্দা উঠে! নব নব নীড় উঠিছে গড়িয়া শামুকের দেহ-পুট! পুরাতন অবসান, তারার কিরণ-সঙ্গমে ফিরে আজিকে পুণ্য স্নান! নব-জীবনের বিদ্যুৎ—সে যে বেদনার বুকে খেলে, শিকড় কাটিতে ডর নাহি যার সফলতা তারি মেলে! মরণ মরণ নয়, জীবন-শিখার গোপন আধারে ক্ষয়হীন সঞ্চয়। নিমফুল আর আমের মুকুল চুমে আজ ধূলিকণা, তিক্ত আভাসে বক্ষে ধরিছে মধুর সম্ভাবনা; পুরাণো চলিয়া যায়, অশ্রু-সজল মৌন পরাণ নূতনের পথ চায়।