জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯–১৯৫৪) · Jibanananda Das
রূপসী বাংলার কবি — রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা আধুনিক কবিতার প্রধান কণ্ঠস্বর। 'বনলতা সেন', 'রূপসী বাংলা', 'ঝরা পালক' তাঁর অমর সৃষ্টি। প্রকৃতি, ইতিহাস ও নিঃসঙ্গতার এক অনন্য চিত্রকল্প তাঁর কবিতায়।
একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে র’ব;—পশমের মতো লাল ফল ঝরিবে বিজন ঘাসে,—বাঁকা চাঁদ জেগে র’বে,—নদীটির জল বাঙালী মেয়ের মতো বিশালাক্ষী মন্দিরের ধূসর কপাটে আঘাত করিয়া যাবে ভয়ে ভয়ে—তারপর য...
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে! তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে; পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে; আবা...
সোনার খাঁচার বুকে রহিব না আমি আর শুকের মতন; কি গল্প শুনিতে চাও তোমরা আমার কাছে—কোন্ গান, বল, তাহ’লে এ-দেউলের খিলানের গল্প ছেড়ে চল, উড়ে চল,— যেখানে গভীর ভোরে নোনাফল পাকিয়াছে,—আছে আতাবন; পউষের ভিজে ভোরে, আজ হায় মন যে...
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে—এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়,—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়; হয়তো বা হাঁস হ’ব—কিশোরীর—ঘুঙুর র...
পৃথিবীর পথে আমি বহুদিন বাস ক’রে হৃদয়ের নরম কাতর অনেক নিভৃত কথা জানিয়াছি; পৃথিবীতে আমি বহুদিন কাটায়েছি; বনে বনে ডালপালা উড়িতেছে—যেন পরী জিন্ কথা কয়; ধূসর সন্ধ্যায় আমি ইহাদের শরীরের ’পর খইয়ের ধানের মতো দেখিয়াছি ঝরে...
যেখানে রুপালি জ্যোৎস্না ভিজিতেছে শরের ভিতর, যেখানে অনেক মশা বানায়েছে তাহাদের ঘর; যেখানে সোনালি মাছ খুঁটে-খুঁটে খায় সেই সব নীল মশা মৌন আকাঙ্ক্ষায়; নির্জন মাছের রঙে যেইখানে হ’য়ে আছে চুপ পৃথিবীর একপাশে একাকী নদীর গাঢ় র...
ভোর; আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল: চারিদিকের পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ। একটি তারা এখনও আকাশে রয়েছে: পাড়াগাঁর বাসরঘরে সব চেয়ে গোধূলি-মদির মেয়েটির মতো; কিংবা মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে-...
পৃথিবী রয়েছে ব্যস্ত কোনখানে সফলতা শক্তির ভিতর, কোনখানে আকাশের গায়ে রূঢ় মনুমেণ্ট উঠিতেছে জেগে, কোথায় মাস্তুল তুলে জাহাজের ভিড় সব লেগে আছে মেঘে, জানি নাকো;―আমি এই বাংলার পাড়াগাঁয়ে বাঁধিয়াছি ঘর: সন্ধ্যায় যে দাঁড়ক...
কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে, বলিল, তোমারে চাই: বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি— কুয়াশার পাখ্নায়— সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে-আলোক জোনাকির দেহ হতে— খুঁ...