অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার। হে বন্ধু, হে দেশবন্ধু, স্বদেশ আত্মার বাণী-মূর্ত্তি তুমি। তোমা লাগি’ নহে মান, নহে ধন, নহে সুখ; কোনো ক্ষুদ্র দান চাহ নাই কোনো ক্ষুদ্র কৃপা; ভিক্ষা লাগি’ বাড়াওনি আতুর অঞ্জলি। আছ জাগি’ পরিপূর্ণতার তরে সর্ব্ববাধাহীন,— যার লাগি’ নর-দেব চির রাত্রি দিন তপোমগ্ন; যার লাগি’ কবি বজ্ররবে গেয়েছেন মহাগীত, মহাবীর সবে গিয়াছেন সঙ্কট-যাত্রায়; যার কাছে আরাম লজ্জিত শির নত করিয়াছে; মৃত্যু ভুলিয়াছে ভয়;—সেই বিধাতার শ্রেষ্ঠ দান আপনার পূর্ণ অধিকার— চেয়েছো দেশের হ’য়ে অকুণ্ঠ আশায়, সত্যের গৌরব-দৃপ্ত প্রদীপ্ত ভাষায় অখণ্ড বিশ্বাসে। তোমার প্রার্থনা আজি বিধাতা কি শুনেছেন? তাই উঠে বাজি’ জয় শঙ্খ তাঁ’র? তোমার দক্ষিণ করে তাই কি দিলেন আজি কঠোর আদরে দুঃখের দারুণ দীপ, আলোক যাহার জ্বলিয়াছে, বিদ্ধ করি’ দেশের আঁধার ধ্রুব তারকার মতো? জয়, তব জয়। কে আজি ফেলিবে অশ্রু, কে করিবে ভয়, সত্যেরে করিবে খর্ব্ব কোন্ কাপুরুষ নিজেরে করিতে রক্ষা? কোন্ অমানুষ তোমার বেদনা হ’তে না পাইবে বল? মোছ্‌রে, দুর্ব্বল চক্ষু, মোছ্ অশ্রুজল। দেবতার দীপ হস্তে যে আসিল ভবে সেই রুদ্র দূতে, বলো, কোন্ রাজা কবে পারে শাস্তি দিতে? বন্ধন শৃঙ্খল তা’র চরণ বন্দনা করি’ করে নমস্কার— কারাগার করে অভ্যর্থনা। রুষ্ট রাহু বিধাতার সূর্য্যপানে বাড়াইয়া বাহু আপনি বিলুপ্ত হয় মুহূর্ত্তেক পরে ছায়ার মতন। শাস্তি? শাস্তি তা’রি তরে যে পারে না শাস্তি ভয়ে হইতে বাহির লঙ্ঘিয়া নিজের গড়া মিথ্যার প্রাচীর, কপট বেষ্টন; যে নপুংস কোনোদিন চাহিয়া ধর্ম্মের পানে নির্ভীক স্বাধীন অন্যায়েরে বলেনি অন্যায়; আপনার মনুষ্যত্ব, বিধিদত্ত নিত্য অধিকার যে নির্লজ্জ ভয়ে লোভে করে অস্বীকার সভামাঝে; দুর্গতির করে অহঙ্কার; দেশের দুর্দ্দশা ল’য়ে যার ব্যবসায়, অন্ন যার অকল্যাণ মাতৃরক্ত প্রায়; সেই ভীরু নতশির, চিরশাস্তি তা’রে রাজকারা বাহিরেতে নিত্য কারাগারে। বন্ধন পীড়ন দুঃখ অসম্মান মাঝে হেরিয়া তোমার মূর্ত্তি, কর্ণে মোর বাজে আত্মার বন্ধনহীন আনন্দের গান, মহাতীর্থ যাত্রীর সঙ্গীত, চিরপ্রাণ আশার উল্লাস, গম্ভীর নির্ভয় বাণী উদার মৃত্যুর। ভারতের বীণা-পাণি হে কবি, তোমার মুখে রাখি’ দৃষ্টি তাঁর তারে তারে দিয়াছেন বিপুল ঝঙ্কার,— নাহি তাহে দুঃখ তান, নাহি ক্ষুদ্র লাজ, নাহি দৈন্য, নাহি ত্রাস। তাই শুনি আজ কোথা হ’তে ঝঞ্ঝাসাথে সিন্ধুর গর্জ্জন, অন্ধবেগে নির্ঝরের উন্মত্ত নর্ত্তন পাষাণ পিঞ্জর টুটি’,—বজ্র গর্জ্জরব ভেরি মন্দ্রে মেঘপুঞ্জ জাগায় ভৈরব এ উদাত্ত সঙ্গীতের তরঙ্গ মাঝার অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার। তা’র পরে তাঁরে নমি যিনি ক্রীড়াচ্ছলে গড়েন নূতন সৃষ্টি প্রলয় অনলে, মৃত্যু হ’তে দেন প্রাণ, বিপদের বুকে সম্পদেরে করেন লালন, হাসিমুখে ভক্তেরে পাঠায়ে দেন কণ্টক কান্তারে রিক্তহস্তে শত্রুমাঝে রাত্রি অন্ধকারে। যিনি নানা কণ্ঠে কন্ নানা ইতিহাসে, সকল মহৎ কর্মে পরম প্রয়াসে, সকল চরমলাভে “দুঃখ কিছু নয়, ক্ষত মিথ্যা, ক্ষতি মিথ্যা, মিথ্যা সর্ব্ব ভয়; কোথা মিথ্যা রাজা কোথা রাজদণ্ড তা’র; কোথা মৃত্যু, অন্যায়ের কোথা অত্যাচার। ওরে ভীরু, ওরে মূঢ়, তোলো তোলো শির, আমি আছি, তুমি আছ, সত্য আছে স্থির।” (৭ ভাদ্র ১৩১৪) — পূরবী (1925)