আমাকে তুমি দেখিয়েছিলে একদিন: মস্ত বড়ো ময়দান— দেবদারু পামের নিবিড় মাথা— মাইলের পর মাইল; দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হ’য়ে হারিয়ে যায়; জোয়ারের মতো ফিরে আসে আবার; জানালায়-জানালায় অনেকক্ষণ ধ’রে কথা বলে: পৃথিবীকে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয়। তারপর দূরে অনেক দূরে খররৌদ্রে পা ছড়িয়ে বর্ষীয়সী রূপসীর মতো ধান ভানে— গান গায়— গান গায় এই দুপুরের বাতাস। এক-একটা দুপুরে এক-একটা পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত হ’য়ে যায় যেন। বিকেলে নরম মুহূর্ত; নদীর জলের ভিতর শম্বর, নীলগাই, হরিণের ছায়ার আসা-যাওয়া; একটা ধবল চিতল-হরিণীর ছায়া আতার ধূসর ক্ষীরে-গড়া মূর্তির মতো নদীর জলে সমস্ত বিকেলবেলা ধ’রে স্থির। মাঝে-মাঝে অনেক দূর থেকে শ্মশানের চন্দনকাঠের চিতার গন্ধ, আগুনের— ঘিয়ের ঘ্রাণ; বিকেলে অসম্ভব বিষণ্ণতা। ঝাউ হরিতকী শাল, নিভন্ত সূর্যে পিয়াশাল পিয়াল আমলকী দেবদারু— বাতাসের বুকে স্পৃহা, উৎসাহ, জীবনের ফেনা; শাদা শাদাছিট কালো পায়রার ওড়াউড়ি জ্যোৎস্নায়— ছায়ায়, রাত্রি; নক্ষত্র ও নক্ষত্রের অতীত নিস্তব্ধতা। মরণের পরপারে বড়ো অন্ধকার এই সব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো। — শ্রেষ্ঠ কবিতা (1954)