প্রতিষ্ঠানপুরী-রাজশুদ্ধান্ত। (রাজা যযাতি এবং রাজ্ঞী দেবযানী আসীন।) রাজ্ঞী। হে নাথ! আপনার মুখে যে সে কথাগুলি কত মিষ্ট লাগে, তা আমি একমুখে বলতে পারি না! কত বার ত আপনার মুখে সে কথা শুনেছি, তথাপি আবার তাই শুনতে বাসনা হয়! হে জীবিতেশ্বর! আপনি আমাকে সেই অন্ধকারময় কূপ হতে উদ্ধার করে আমার নিকটে বিদায় হয়ে, কোথায় গেলেন? রাজা। প্রিয়ে! যেমন কোন মনুষ্য কোন দেবকন্যাকে দৈবযোগে অকস্মাৎ দর্শন করে ভয়ে অতিবেগে পলায়ন করে, আমিও তদ্রূপ তোমার নিকট বিদায় হয়ে দ্রুতবেগে ঘোরতর মহারণ্যে প্রবেশ করলেম, কিন্তু আমার চিত্তচকোর তোমার এই পূর্ণচন্দ্রাননের পুনদর্শনে যে কিরূপ ব্যাকুল হলো, যিনি অন্তর্যামী ভগবান্, তিনিই তা বলতে পারেন। পরে আমি আতপতাপে তাপিত হয়ে বিশ্রামার্থে এক তরুতলে উপবেশন করলেম, এবং চতুর্দিগে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলেম, যেন সকলই অন্ধকারময় এবং শূন্যাকার! কিঞ্চিৎ পরে সে স্থান হতে গাত্রোত্থান করে গমনের উপক্রম কচ্চি, এমন সময়ে এক হরিণী আমার দৃষ্টিপথে পতিত হলো। স্বাভাবিক মৃগয়াসক্তি হেতু আমিও সেই হরিণীকে দর্শনমাত্রেই শরাসনে এক খরতর শরযোজনা করলেম; কিন্তু সন্ধানকালে কুরঙ্গিণী আমার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করাতে তার নয়নযুগল দেখে আমার তৎক্ষণাৎ তোমার এ কমলনয়ন স্মরণ হলো, এবং তৎকালে আমি এমন বলহীন আর বিমুগ্ধ হলেম, যে আমার হস্ত হতে শরাসন ভূতলে কখন যে পতিত হলো, তা আমি কিছুই জানতে পাল্যেম না। রাজ্ঞী। (রাজার হস্ত ধরিয়া এবং অনুরাগ সহকারে) হে প্রাণনাথ! আমার কি শুভাদৃষ্ট!—তার পর! রাজা। প্রেয়সি! যদি তোমার শুভাদৃষ্ট, তবে আমার কি? প্রিয়ে! তুমি আমার জন্ম সফল করেছো!—তার পর গমন করতে করতে এক কোকিলার মধুর ধ্বনি শ্রবণ করে আমার মনে হলো, যে তুমিই আমাকে কুহুরবে আহ্‍বান কচ্যো। রাজ্ঞী। হে প্রাণেশ্বর! তখন যদি সেই কোকিলার দেহে আমার প্রাণ প্রবিষ্ট হতে পারত, তবে সে কোকিলা কুহুরবে কেবল এই মাত্র বলতো, “হে রাজন্! আপনি সেই কূপতটে পুনর্গমন করুন, আপনার জন্যে শুক্রকন্যা দেবযানী ব্যাকুলচিত্তে পথ নিরীক্ষণ কচ্যে।” রাজা। প্রিয়ে! আমার অদৃষ্টে যে এত সুখ আছে, তা আমি স্বপ্নেও জানি না; যদি আমি তখন জানতে পাত্যেম, তবে কি আর এ নগরীতে একাকী প্রত্যাগমন করি? একবারে তোমাকে আমার হৃৎপদ্মাসনে উপবিষ্ট করিয়েই আনতেম! আমি যে কি শুভ লগ্নে দৈত্যদেশে যাত্রা করেছিলেম, তা কেবল এখনই জানতে পাচ্যি! (বিদূষকের প্রবেশ।) কি হে, দ্বিজবর। কি সংবাদ? বিদূ। মহারাজ! শ্রীমান্ নবকুমার রাজকুমারকে একবার দর্শন করে এলেম। রাজমহিষী চিরজীবিনী হউন। আহা! কুমারের কি অপরূপ রূপলাবণ্য! যেন দ্বিতীয় কুমার, কিম্বা তরুণ অরুণতুল্য শোভা! আর না হবেই বা কেন? “পিতা যস্য, পিতা যস্য”—আ হা হা! কবিতাটা বিস্মৃত হলেম যে? রাজা। (সহাস্য বদনে) ক্ষান্ত হও হে, ক্ষান্ত হও! তোমার মত ঔদরিক ব্রাহ্মণের খাদ্যদ্রব্যের নাম ব্যতীত কি আর কিছু মনে থাকে? রাজ্ঞী। (বিদূষকের প্রতি) মহাশয়! আমার যদুর নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে না কি? (রাজার প্রতি) নাথ, তবে আমি এখন বিদায় হই। রাজা। প্রিয়ে! তোমার যেমন ইচ্ছা হয়। [ রাজ্ঞীর প্রস্থান। বিদূ। মহারাজ! এই যে আপনাদের ক্ষত্রিয়জাতির যে কি স্বভাব, তা বলে উঠা ভার। এই দেখুন দেখি! আপনি দৈত্যদেশে মৃগয়া করতে গিয়ে কি না করলেন? ক্ষত্রিয়দুষ্প্রাপ্যা মহর্ষিকন্যাকেও আপনি লাভ করেছেন! আপনাকে ধন্যবাদ। আহা! আপনি দৈত্যদেশ হতে কি অপূর্ব্ব অনুপম রত্নই এনেছেন। ভাল মহারাজ। জিজ্ঞাসা করি, এমন রত্ন কি সেখানে আর আছে? রাজা। (সহাস্য মুখে) ভাই হে! বোধ হয়, দৈত্যদেশে এ প্রকার রত্ন অনেক আছে। বিদূ। মহারাজ, আমার ত তা বিশ্বাস হয় না। রাজা। তুমি কি মহিষীর সকল সহচরীগণকে দেখেছ? বিদূ। আজ্ঞা না। রাজা। আহা! সখে, তাঁর সহচরীদের মধ্যে একটি যে স্ত্রীলোক আছে, তার রূপলাবণ্যের কথা কি বলবো! বোধ হয়, যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মীদেবীই অবনীতে অবতীর্ণা হয়েছেন! সে যে মহিষীয় নিতান্ত সহচরী, কি সখী, তাও নয়। বিদূ। কি তবে মহারাজ! রাজা। তা ভাই, বলতে পারি না, মহিষীকেও জিজ্ঞাসা করতে শঙ্কা হয়! আর আমিও যে তাকে বিলক্ষণ স্পষ্টরূপে দেখেছি, তাও নয়। যেমন রাত্রিকালে আকাশমণ্ডল ঘনঘটা দ্বারা আচ্ছন্ন হলে নিশানাথ মূহূর্ত্তকাল দৃষ্ট হয়ে পুনরায় মেঘাবৃত হন, সেই সুন্দরী আমার দৃষ্টিপথে কয়েক বার সেইরূপে পতিতা হয়েছিল। বোধ হয়, রাজ্ঞীও বা তাকে আমার সম্মুখে আসতে নিষেধ করে থাকবেন। আহা! সখে, তার কি রূপমাধুর্য্য! তার পদ্মনয়ন দর্শন করলে পদ্মের উপর ঘৃণা জন্মে। আর তার মধুর অধরকে রতিসর্ব্বস্ব বললেও বলা যেতে পারে। (নেপথ্যে) দোহাই মহারাজের! আমি অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ। হায়! হায়! আমার সর্বনাশ হলো। রাজা। (সসম্ভ্রমে) এ কি। দেখ ত হে? কোন্ ব্যক্তি রাজদ্বারে এত উচ্চৈঃস্বরে হাহাকার কচ্যে? বিদূ। যে আজ্ঞা! আমি—(অর্দ্ধোক্তি।) (নেপথ্যে) দোহাই মহারাজের! হায়! হায় হায়! আমার সর্ব্বস্ব গেলো! রাজা। যাও না হে! বিলম্ব কচ্যো কেন? ব্যাপারটা কি? চিত্রপুত্তলিকার ন্যায় যে নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িলে রইলে? বিদূ। আজ্ঞা না, ভাবছি বলি, দেব-অমাত্য হয়ে আপনি দৈত্যগুরুর কণ্ঠা বিবাহ করেছেন, সেই ক্রোধে যদি কোন মায়াবী দৈত্যই বা এসে থাকে; তা হলে—(অর্দ্ধোক্তি।) রাজা। আঃ ক্ষুদ্রপ্রাণি! তুমি থাক, তবে আমি আপনিই যাই! বিদূ। আজ্ঞা না মহারাজ! আমার অদৃষ্টে যা থাকে তাই হবে; আপনার যাওয়া কখনই উচিত হয় না। [ প্রস্থান। রাজা। (গাত্রোত্থান করিয়া স্মিতমুখে স্বগত) ব্রাহ্মণজাতি বুদ্ধে বৃহস্পতি বটে, কিন্তু স্ত্রীলোকাপেক্ষাও ভীরু! (চিন্তা করিয়া) সে যা হৌক, সে স্ত্রীলোকটি যে কে, তা আমি ভেবে চিন্তে কিছুই স্থির কত্যে পাচ্ছি না। আমরা যখন গোদাবরীতীরস্থ পর্ব্বত মুনির আশ্রমে কিঞ্চিৎকাল বিহার করি, তখন এক দিন আমি একলা নদীতটে ভ্রমণ কত্যে২ এক পুষ্পোদ্যানে প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে সেই পরম রমণীয়া নবযৌবনা কামিনীকে দেখলেম, আপনার করতলে কপোল বিন্যাস করে অশোকবৃক্ষতলে বসে রয়েছে, বোধ হলো, যে সে চিন্তার্ণবে মগ্না রয়েছে; আর তার চারি দিকে নানা কুসুম বিস্তৃত ছিল, তাতে এমনি অনুমান হতে লাগলো যেন দেবতাগণ সেই নবযৌবনা অঙ্গনার সৌন্দর্য্যগুণে পরিতুষ্ট হয়ে তার উপর পুষ্পবৃষ্টি করেছেন, কিম্বা স্বয়ং বসন্তরাজ বিকশিত পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে রতিভ্রমে তাকে পূজা করেছেন! পরে আমার পদশব্দ শুনে সেই বামা আমার দিকে নয়নপাত করে, যেমন কোন ব্যাধকে দেখে কুরঙ্গিণী পবনবেগে পলায়ন করে, তেমনি ব্যস্তসমস্তে অন্তর্হিতা হলো। পরম্পরায় শুনেছি, যে ঐ সুন্দরী দৈত্যরাজকন্যা শর্মিষ্ঠা, কিন্তু তার পর আর কোন পরিচয় পাই নাই। সবিশেষ অবগত হওয়াও আবশ্যক, কিন্তু—(অর্দ্ধোক্তি।) (বিদূষকের এক জন ব্রাহ্মণ সহিত পুনঃপ্রবেশ।) ব্রাহ্মণ। দোহাই মহারাজের! আমি অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ! আমার সর্ব্বনাশ হলো। রাজা। কেন, কেন? বৃত্তান্তটা কি বলুন দেখি? ব্রাহ্ম। (কৃতাঞ্জলিপুটে) ধর্ম্মাবতার! কয়েক জন দুর্দ্দান্ত তস্কর আমার গৃহে প্রবেশ করে যথাসর্ব্বস্ব অপহরণ কচ্যে! হায়! হায়! কি সর্ব্বনাশ! হে নরেশ্বর, আপনি আমাকে রক্ষা করুন। রাজা। (সরোষে) সে কি? এ রাজ্যে এমন নির্ভয় পাষণ্ড লোক কে আছে, যে ব্রাহ্মণের ধন অপহরণ করে? মহাশয়, আপনি ক্রন্দন সম্বরণ করুন, আমি স্বহস্তে এই মুহূর্ত্তেই সেই দুরাচার দস্যুদলের যথোচিত দণ্ড বিধান করবো। (বিদূষকের প্রতি) সখে মাধব্য, তুমি ত্বরায় আমার ধনুর্ব্বাণ ও অসিচর্ম্ম আন দেখি। বিদু। মহারাজ, আপনার স্বয়ং যাবার প্রয়োজন কি? রাজা। (সক্রোধে) তুমি কি আমার আজ্ঞা অবহেলা কর? বিদু। (সত্রাসে) সে কি, মহারাজ? আমার এমন কি সাধ্য যে আপনার আজ্ঞা উল্লঙ্ঘন করি। [ বেগে প্রস্থান। রাজা। মহাশয়, কত জন তস্কর আপনার গৃহাক্রমণ করেছে? ব্রাহ্ম। হে মহীপতে, তা নিশ্চয় বলতে পারি না! হায়! হায়! আমার সর্ব্বস্ব গেলো। রাজা। ঠাকুর, আপনি ধৈর্য্য অবলম্বন করুন; আর বৃথা আক্ষেপ করবেন না। (বিদূষকের অস্ত্রশস্ত্র লইয়া পুনঃপ্রবেশ।) এই আমি অস্ত্র গ্রহণ কল্যেম। (অস্ত্র গ্রহণ) এখন চলুন যাই। [ রাজা ও ব্রাহ্মণের প্রস্থান। বিদু। (স্বগত) যেমন আহুতি দিলে অগ্নি জ্বলে উঠে, তেমনি শত্রুনামে আমাদের মহারাজেরও কোপাগ্নি জ্বলে উঠলো। চোর বেটাদের আজ যে মরণদশা ধরেছে, তার কোন সন্দেহ নাই। মরবার জন্যেই পিঁপড়ের পাখা ওঠে! এখন এখানে থেকে আর কি করবো? যাই, নগরপালের নিকট এ সংবাদ পাঠিয়ে দিগে। [ প্রস্থান।