তৃতীয়াঙ্ক — প্রথম গর্ভাঙ্ক
তৃতীয়াঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
উদয়পুর রাজনিকেতন-সম্মুখে।
(মরুদেশের দূত এবং [ পুরুষবেশে ] মদনিকার প্রবেশ।)
দূত। কি আশ্চর্য্য! তবে এ পত্রের কথাটা সত্য!
মদ। আজ্ঞা, হাঁ, সত্য বৈ কি? রাজকুমারী পত্র লিখে প্রথমে আমাকে দেন; তার পর আমি একজন বিশ্বাসী লোক দিয়ে আপনাদের দেশে পাঠাই।
দূত। যা হউক, আমাদের মহারাজের অতি সৌভাগ্য বলতে হবে, তা না হলে তোমাদের সুকুমারী কি তাঁর প্রতি এত অনুরক্ত হন!? আহা! বিধাতার কি অদ্ভুত লীলা! কেউ বা মহামণির লোভে অন্ধকারময় খনিতে প্রবেশ করে, আর কেউ বা তা পথে কুড়িয়ে পায়। এ সকল কপালগুণে ঘটে বৈ ত নয়! মহারাজ এ পত্র পাওয়া অবধি যেরূপ হয়ে উঠেছেন, তার আর তোমাকে কি বলবো?
তপ। দেখুন দূত মহাশয়, আপনি একটু সাবধান হয়ে চলবেন। এ পত্রের কথা এখানে প্রকাশ করবেন না, তা হলে রাজনন্দিনী লজ্জায় একেবারে প্রাণত্যাগ করবেন।
দূত। হাঁ! সে কি কথা আমি ত পাগল নই। এ কথাও কি প্রকাশ কত্যে আছে?
মদ। এই যে জয়পুরের দূত ধনদাস, ওকে, বোধ হয়, আপনি ভাল করে চেনেন না।
দূত। না, ওঁর সঙ্গে আমার বিশেষ আলাপ নাই।
মদ। মহাশয়, ওটা যে আপনাদের রাজার কত নিন্দা করে, তা শুনলে বোধ হয়, আপনি অগ্নির ন্যায় জ্বলে উঠবেন!
দূত। বটে?
মদ। আর তাতে রাজনন্দিনী যে কি পর্য্যস্ত ক্ষুণ্ণ, তা আর আপনাকে কি বলবো। মহাশয়, ওকে একবার কিছু শিক্ষা দিতে পারেন? তা হলে বড় ভাল হয়।
দূত। কেন? ওটা বলে কি!
মদ। মহাশয়, ওটা যা বলে, সে কথা আমাদের মুখে আনতে লজ্জা করে। ও লোকের কাছে বলে বেড়ায় কি যে মহারাজ মানসিংহ একটা ভ্রষ্টা স্ত্রীর দত্তক পুত্র মাত্র; আর তিনি মরুদেশের প্রকৃত অধিকারী নন।
দূত। অ্যাঁ—কি বল্লে? ওর এত বড় যোগ্যতা। কি বলবো? আমি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, নতুবা এই দণ্ডেই ওর মস্তকচ্ছেদ কত্যেম!
মদ। মহাশয়, এতে এত রাগলে কাজ চলবে না। যদি বাক্যবাণ দ্বারা দুরাচারকে কোন দণ্ড দিতে পারেন, ভালই; নচেৎ অন্য কোন অত্যাচার করাটা ভাল হয় না।
দূত। আচ্ছা, আমি এখন রাজমন্ত্রীর কাছে যাই। এর পর যা পরামর্শ হয়, করা যাবে। শৃগালের মুখে সিংহের নিন্দা। এ কি কখন সহ্য হয়।
[ প্রস্থান।
মদ। (স্বগত) বাঃ! কি গোলযোগই বাধিয়ে দিয়েছি! এখন জগদীশ্বর এই করুন, যেন এতে রাজনন্দিনী কৃষ্ণার কোন ব্যাঘাত না জন্মে। ভাল, এও ত বড় আশ্চর্য্য! আমি একজন বেশ্যার সহচরী, বনের পাখীর মতন কেবল স্বেচ্ছার অধীন; কখনই সংসার- পিঞ্জরে বন্ধ হই নাই। কিন্তু এ সুকুমারী রাজকুমারীর প্রকৃতি দেখে আমার মনটা এমন হলো কেন?—সত্য বটে!—লজ্জা আর সুশীলতাই স্ত্রীজাতির প্রধান অলঙ্কার। আহা! এ দুটি পদ্মা এ সরোবর থেকে যে আমি কি কুলগ্নে তুলে ফেলেছিলাম, তা কেবল এখন বুঝতে পাচ্যি। এই যে ধনদাস এ দিকে আসচে।
(ধনদাসের প্রবেশ।)
মহাশয়, ভাল আছেন ত?
ধন। আরে মদন যে! তবে ভাল আছ ত? ভাই, তুমি সে অঙ্গুরীটি কোথায় রেখেছে।?
মদ। আজ্ঞা, আপনাকে বলতে লজ্জা করে। আর বোধ হয়, আপনি তা শুনলেও রাগ করবেন!
ধন। সে কি? কেন? রাগ করবো কেন?
মদ। আজ্ঞা, তবে শুনুন। এই নগরে মদনিকা বলে একটি বড় সুন্দরী মেয়ে মানুষ আছে, তাকে আমি বড় ভাল বাসি। সেই আমার কাছ থেকে অঙ্গুরীটি কেড়ে নিয়েছে।
ধন। কি সর্ব্বনাশ! তেমন অমূল্য রত্ন কি একটা বেশ্যাকে দিতে হয়? তোমার ত নিতান্ত শিশুবুদ্ধি হে। ছি! ছি! আর তুমি এত অল্প বয়েসে এমন সব লোকের সঙ্গে সহবাস কর?
মদ। দেখুন দেখি, এই আপনি বললেন, রাগ করবো না, তবে আবার রাগ করেন কেন?
ধন। (স্বগত) তাও বটে; আমিই বা রাগ করি কেন? (প্রকাশে) হা! হা! ওহে আমি তামাসা কছ্যিলেম। যা হউক, তুমি যে, দেখচি এক জন বিলক্ষণ রসিক পুরুষ হে। ভাল, তোমার এ মদনিকা কেথায় থাকে, বল দেখি, ভাই।
মদ। আজ্ঞা, তার বাড়ী গড়ের বাইরে।
ধন। (স্বগত) স্ত্রীলোকটার বাড়ীর সন্ধান পেলে অঙ্গুরীটা না হয় কিছু দিয়ে কিনে লওয়ার চেষ্টা পাওয়া যায়। আর যদি সহজে না দেয়, তারও উপায় করা যেতে পারে। (প্রকাশে) হাঁ! কোথায় বললে ভাই?
মদ। আজ্ঞা, এই গড়ের বাইরে।
ধন। ভাল, সে মেয়েমানুষটি দেখতে ভাল ত?
মদ। আজ্ঞা, বড় মন্দ নয়। মহাশয়, এ দিকে দেখছেন, রাজা মানসিংহের দূত মন্ত্রীর সঙ্গে এই দিকে আসচেন।
ধন। ভাল কথা মনে কল্যে, ভাই। তোমাকে আমি যে যে কথা অন্তঃপুরে বলতে বলেছিলেন, তা বলেছো ত?
মদ। আজ্ঞা, আপনার কাজে আমার কি কখনও অবহেলা আছে?
ধন। তোমার যে ভাই কত গুণ, তা আমি একমুখে কত বলবো?—তা বল দেখি, তোমার মদনিকা কোথায় থাকে?
মদ। তার জন্যে আপনি এত ব্যস্ত হচ্যেন কেন? এক দিন, না হয়, আপনার সঙ্গে তার দেখা করিয়ে দেবো, তা হলেই ত হবে। আমি এখন যাই, আর দাঁড়াব না। (স্বগত) দেখি, এ ঘটক ভায়ার ভাগ্যে আজ কি ঘটে।
[ প্রস্থান।
ধন। (স্বগত) অঙ্গুরীটির উদ্ধার না কল্যে আমার মন কোন মতেই স্থির হচ্যে না। সেটির মূল্য প্রায় দশ হাজার টাকা। তা সহজে কি ত্যাগ করা যায়। আহা! . মাহারাজকে যে কত প্রকারে ভুলিয়ে সেটি পেয়েছিলাম, তা মনে পড়লে চক্ষে জল এসে। তা বড় দায়ে না পড়লে আর সে আমার হাতছাড়া হতে পারতো না। দেখি, এই মদনিকার বাড়ীর সন্ধানটা পেলে একবার বুঝতে পারি। ধনদাসের চতুরতা কি নিতান্তই বিফল হবে?
(সত্যদাসের সহিত দূতের পুনঃ প্রবেশ।)
সত্য। এই যে ধনদাস মহাশয় এখানে রয়েছেন। তা চলুন, একবার রাজসভাতে যাওয়া যাউক।
দূত। মহাশয়, ইনিই রাজা জগৎসিংহের দূত না?
সত্য। আজ্ঞা, হাঁ!
দূত। (ধনদাসের প্রতি) মহাশয়, আমরা যখন উভয়েই একটি অমূল্য রত্নের আশায় এ দেশে এসেছি, তখন আমরা উভয়ে উভয়ের বিপক্ষ বটি, কিন্তু তা বলে আমাদের পরস্পরে কি কোন অসদ্ব্যবহার করা উচিত?
ধন। আজ্ঞা, তাও কি হয়?
দূত। তবে একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করি;—বলি, আপনি যে নিরন্তর মরুদেশের রাজ্যেশ্বরের নিন্দা করেন, সেটা কি আপনার উপযুক্ত কর্ম্ম?
ধন। বলেন কি মহাশয়? এ কথা আপনাকে কে বললে?
দূত। মহাশয়, বাতাস না হলে বৃক্ষপল্লব কখনই লড়ে না।
ধন। মহাশয়ের আমার সঙ্গে নিতান্ত বিবাদ করবার ইচ্ছা বটে?
ধন। আপনার সঙ্গে আমার বিবাদ করায় কি ফল। কিন্তু আপনি যে এ দুষ্কর্ম্মের সমুচিত ফল পাবেন, তার সন্দেহ নাই। আপনাদের নরপতি বেশ্যাদাস; নৃত্য, গীত, প্রেমালাপ—এই সকল বিদ্যাতেই পরম নিপুণ; তা তিনি কি রাজেন্দ্রকেশরী মানসিংহের সমতুল্য ব্যক্তি? না সুকুমারী রাজকুমারী কৃষ্ণার উপযুক্ত পাত্র?
ধন। (সত্যদাসের প্রতি) মহাশয়, শুনলেন ত? (কর্ণে হস্ত দিয়া দূতের প্রতি) ঠাকুর, কি বলবো, তুমি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, তা না হল্যে তোমাকে আমি আজ অমনি ছাড়তেম না!
দূত। কেন? তুমি কি কত্যে? ওঃ। বড় শঙ্কা যে?
সত্য। মহাশয়রা ক্ষান্ত হউন। আপনাদের এ বৃথা বাগ্দ্বন্দ্বে প্রয়োজন কি? বিশেষতঃ, এ স্থলে কি আপনাদের এরূপ অসৌজন্য প্রকাশ করা উচিত?
ধন। আজ্ঞা, হাঁ, তা সত্য বটে। কিন্তু আপনি বিবেচনা করুন, আমার বিষয়ে অপরাধ কি? উনিই ত বিবাদ কচ্যেন।
(বলেন্দ্র সিংহের প্রবেশ।)
বলে। এ কি এ, মহাশয়! আপনাদের মধ্যে ঘোর দ্বন্দ্ব উপস্থিত যে! আপনারা কি লক্ষ্য ভেদ হতে না হতেই যুদ্ধ আরম্ভ কল্যেন?
দূত। আজ্ঞা, না। যুদ্ধ আরম্ভ হবে কেন? তবে কি না, এই জয়পুরের দূত মহাশয়কে আমি দুই একটা হিতোপদেশ দিছ্যিলেম।
বলে। কি হিতোপদেশ দিলেন, বলুন দেখি? আপনার ত এই ইচ্ছা, যে উনি এ বিবাহের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে স্বদেশে প্রস্থান করেন। হা! হা! হা!
ধন। হা! হা! হা! আজ্ঞা, এক প্রকার তাই বটে।
দূত। আজ্ঞা, হাঁ! আমার বিবেচনায় ওঁর তাই করা উচিত হচ্যে! মহাশয়, মান বড় পদার্থ। অতএব এমন যে মান, এর রক্ষার বিষয়ে অবহেলা করা অতি অকর্ত্তব্য।
বলে। হা! হা! দূর মহাশয়, আপনি যে দেখছি, স্বয়ং চাণক্য অবতার! ভাল মহাশয়, আমি শুনেছি, যে আপনাদের মরুদেশে ভগবতী পৃথিবী নাকি বন্ধ্যা নারীর স্বভাব ধরেন? তা বলুন দেখি, আপনাদের রাজকর্ম্ম কিরূপে চলে?
দূত। বীরবর, বন্ধ্যা স্ত্রী লয়ে কি কেউ সংসার করে না?
বলে। হা। হা! বেশ। (ধনদাসের প্রতি) ও গো মহাশয়, আপনাদের অম্বরদেশের বর্ণনটা একবার করুন দেখি শুনি!
ধন। আজ্ঞা, আমার কি সাধ্য, যে তার বর্ণন করি? যদি পঞ্চানন হন, তথাপি অম্বরের সুখসম্পত্তির সুচারুরূপে বর্ণন হয় না।—মহাশয়, আমাদের অম্বর সাক্ষাৎ অম্বরপ্রদেশই বটে! সেখানে অঙ্গনাকুল তারাকুলতুল্য সুন্দর, আর মেঘে যেমন সৌদামিনী আর বারিবিন্দু, রাজভাণ্ডারে তেমনি হীরক ও মুক্তা প্রভৃতি, তাতে আবার আমাদের মহারাজ ত স্বয়ং শশধর—
ধন। হাঁ, শশধরের ন্যায় কলঙ্কী বটেন!
বলে। হা! হা! কি বল, ধনদাস?
ধন। আজ্ঞা, ও কথায় আর কি বলবো? পেচক সূর্য্যের আলো ত কখনই সহ্য কত্যে পারে না! আর যদিও ক্ষুধার পীড়নে রাত্রিকালে কোটরের বাহির হয়, তবু সে চন্দ্রের প্রতি কখন প্রকাশিত নয়নে দৃষ্টিপাত করতে পারে না। তেজোময় বস্তুমাত্রই তার চক্ষের বিষ!
বলে। হা! হা! হা! কেমন, দূতবর! এইবার? (নেপথ্যে যন্ত্রধ্বনি) ও আবার কি? (নেপথ্যে বাদ্য।)
সত্য। এই যে মহারাজ রাজসভায় আসছেন। চলুন, আমরা এখন যাই।
(রক্ষকের প্রবেশ!)
রক্ষক। (যোড়করে) বীরবর, গণেশগঙ্গাধর শাস্ত্রী নামে একজন দূত মহারাষ্ট্রপতির শিবির থেকে সিংহদ্বারে এসে উপস্থিত হয়েছেন। আপনার কি আজ্ঞা হয়?
বলে। দূত? মহারাষ্ট্রপতির শিবির থেকে? আচ্ছা, তাঁকে রাজসভায় নে যাও; আমি যাচ্ছি। চলুন তবে আমরা সকলেই একবার রাজসভায় যাই।
[ সকলের প্রস্থান।
(মদনিকার পুনঃ প্রবেশ।)
মদ। (স্বগত) এখন ত আমার কার্যসিদ্ধি হয়েছে; আর এ নগরে বিলম্ব করবার প্রয়োজন কি? আমার কৌশলক্রমে রাজনন্দিনী রাজা মানসিংহের উপর এমন অনুরাগিণী হয়েছেন, যে তিনি রাজা জগৎসিংহের নাম শুনলে একবারে যেন জ্বলে উঠেন; আর আমার পত্র পেয়ে মানসিংহও দূত পাঠিয়েছেন। তবে আর এখানে থেকে কি হবে?—যাব বটে, কিন্তু রাজনন্দিনীকে ছেড়ে যেতে প্রাণটা যেন কেমন করে। আহা! এমন সুশীলা মেয়ে কি আর দুটি আছে। হে পরমেশ্বর, এই যে আমি বনে আগুন লাগিয়ে চললেম, এ যেন দাবানলের রূপ ধরে এ সুলোচনা কুরঙ্গিণীকে দগ্ধ না করে। প্রভু, তুমিই একে কৃপা করে রক্ষা করো। যাই, আমাকে আবার ধনদাসের আগে জয়পুরে পঁহুছিতে হবে।
[ প্রস্থান।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.