তৃতীয়াঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক প্রতিষ্ঠানপুরী—রাজনিকেতনসম্মুখে। (মন্ত্রীর প্রবেশ।) মন্ত্রী। (স্বগত) মহারাজ যে মুনির আশ্রম হতে স্বদেশে প্রত্যাগমন করেছেন, এ পরম সৌভাগ্য আর আহ্‍লাদের বিষয়। যেমন রজনী অবসন্না হলে, সূর্য্যদেবের পুনঃ প্রকাশে জগন্মাতা বসুন্ধরা প্রফুল্লচিত্তা হন, রাজবিরহে কাতরা রাজধানীও নৃপাগমনে অদ্য সেইরূপ হয়েছে। (নেপথ্যে মঙ্গলবাদ্য) পুরবাসীরা অদ্য অপার আনন্দার্ণবে মগ্ন হয়েছে। অদ্য যেন কোন দেবোৎসবই হচ্যে! আর না হবেই বা কেন? নহুষপুত্ত্র যযাতি এই বিশাল চন্দ্রবংশের চূড়ামণি; আর ঋষিবরদুহিতা দেবযানীও রূপগুণে অনুপমা; অতএব এঁদের সমাগমে নিরানন্দের বিষয় কি? আহা! রাজমহিষী যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মীস্বরূপা! এমন দয়াশীলা, পরোপকারিণী, পতিপরায়ণা স্ত্রী, বোধ হয়, ভূমণ্ডলে আর নাই; আর আমাদের মহারাজ বেদবিদ্যাবলে নিরুপম! অতএব উভয়েই উত্তরের অনুরূপ পাত্র বটেন। তা এইরূপ হওয়াই ত উচিত; নচেৎ অমৃত কি কখন চণ্ডালের ভক্ষ্য হয়ে থাকে? লোচনানন্দ সুধাকর ব্যতিরেকে রোহিণীর কি প্রকৃত শোভা? রাজহংসী বিকশিত কমলকাননেই গমন করে থাকে। মহারাজ প্রায় সার্দ্ধৈক বৎসর রাণীর সহিত নানা দেশ ভ্রমণ ও নানা তীর্থ দর্শন করে এত দিনে স্বরাজধানীতে পুনরাগমন কল্যেন!—যদু নামে নৃপবরের যে একটি নবকুমার জন্মেছেন, তিনিও সর্ব্বসুলক্ষণধারী। আহা! যেন সুচারু সমীবৃক্ষের অভ্যন্তরস্থ অগ্নিকণা পৃথিবীকে উজ্জ্বল করবার জন্যে বহির্গত হয়েছে। এক্ষণে আমাদের প্রার্থনা এই, যে কৃপাময় পরমেশ্বর পিতার ন্যায় পুত্রকেও যেন চন্দ্রবংশশেখর করেন! আঃ, মহারাজ রাজকর্ম্মে নিযুক্ত হয়ে আমার মস্তক হতে যেন বসুন্ধরার ভার গ্রহণ করেছেন, কিন্তু আমার পরিশ্রমের সীমা নাই। যাই, রাজভবনের উৎসব প্রকরণ সমাধা করিগে। [ প্রস্থান। (মিষ্টান্ন হস্তে বিদূষকের প্রবেশ।) বিদূ। (স্বগত) পরদ্রব্য অপহরণ করা যেন পাপকর্ম্মই হলো, তার কোন সন্দেহ নাই; কিন্তু, চোরের ধন চুরি করলে যে পাপ হয়, এ কথা ত কোন শাস্ত্রেই নাই; এই উত্তম সুখাদ্য মিষ্টান্নগুলি ভাণ্ডারী বেটা রাজভোগ হতে চুরি করে এক নির্জ্জন স্থানে গোপন করে রেখেছিল; আমি চোরের উপর বাটপাড়ি করেছি! উঃ, আমার কি বুদ্ধি! আমি কি পাপকর্ম্ম করেছি? যদি পাপকর্ম্মই করে থাকি, তবে যা হৌক, এতে উচিত প্রায়শ্চিত্ত কল্যেই ত খণ্ডন হতে পারে। একজন দরিদ্র সদ্বংশজাত ব্রাহ্মণকে আহ্বান করে, তাঁকে কিঞ্চিৎ মিষ্টান্ন দিলেই ত আমার পাপ ধ্বংস হবে! আহা! ব্রাহ্মণভোজন পরম ধর্ম্ম। (আপনার প্রতি লক্ষ্য করিয়া) হে দ্বিজবর! এ স্থলে আগমনপূর্ব্বক কিঞ্চিৎ মিষ্টান্ন গ্রহণ করুন। এই যে এলেম। হে দাতঃ, কি মিষ্টান্ন দেবে, দাও দেখি? তবে বসতে আজ্ঞা হউক। (স্বয়ং উপবেশন) এই আহার করুন (স্বয়ং ভোজন)। ওহে ভক্তবৎসল! তুমি আমাকে অত্যন্ত পরিতুষ্ট করলে। (স্বয়ং গাত্রোত্থান করিয়া) তুমি কি বর প্রার্থনা কর? হে দ্বিজবর। যদি এই মিষ্টান্ন চুরির বিষয়ে আমার কোন পাপ হয়ে থাকে, তবে যেন সে পাপ দূর হয়। তথাস্তু! এই ত নিষ্পাপী হলেম! ওহে, ব্রাহ্মণকুলে জন্ম কি সামান্য পুণ্যের কর্ম্ম! (উচ্চস্বরে হাস্য) যা হউক, প্রায় দেড় বৎসর রাজার সহিত নানা দেশ পর্য্যটন আর নানা তীর্থ দর্শন করেছি, কিন্তু মা যমুনা! তোমার মতন পবিত্রা নদী আর দুটি নাই! তোমার ভগিনী জাহ্নবীর পাদপদ্মে সহস্র প্রণাম, কিন্তু মা, তোমার শ্রীচরণাম্বুজে সহস্র সহস্র প্রণিপাত! তোমার নির্ম্মল সলিলে স্নান করিলে কি ক্ষুধার উদ্রেকই হয়। যাই, এখন আর বিলম্বে প্রয়োজন নাই। রাণী বললেন, যে একবার তুমি গিয়ে দেখে এসো দেখি, আমার যদু কি কচ্যে? তা দেখতে গিয়ে আমার আবার মধ্যে থেকে কিছু মিষ্টান্নও লাভ হয়ে গেল। বেগারের পুণ্যে কাশী দর্শন! মন্দই কি? আপনার উদরতৃপ্তি হলো; এখন রাণীর মনঃ তৃপ্তি করিগে। [ প্রস্থান।