সে দিন বরষা ঝরঝর ঝরে   কহিল কবির স্ত্রী— “রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়, রচিতেছে বসি’ পুঁথি বড় বড়, মাথার উপরে বাড়ি পড়-পড়   তার খোঁজ রাখ কি! গাঁথিছ ছন্দ দীর্ঘ হ্রস্ব, মাথা ও মুণ্ড, ছাই ও ভস্ম, মিলিবে কি তাহে হস্তী অশ্ব,   না মিলে শস্যকণা! অন্ন জোটে না, কথা জোটে মেলা, নিশিদিন ধরে’ এ কি ছেলেখেলা, ভারতীরে ছাড়ি ধর এই বেলা   লক্ষ্মীর উপাসনা! ওগো ফেলে দাও পুঁথি ও লেখনী, যা করিতে হয় করহ এখনি, এত শিখিয়াছ এটুকু শেখনি   কিসে কড়ি আসে দুটো!” দেখি সে মূরতি সর্ব্বনাশিয়া কবির পরাণ উঠিল ত্রাসিয়া, পরিহাস ছলে ঈষৎ হাসিয়া   কহে জুড়ি করপুট,— “ভয় নাহি করি ও মুখ-নাড়ারে, লক্ষ্মী সদয় লক্ষ্মীছাড়ারে, ঘরেতে আছেন নাইক ভাঁড়ারে   এ কথা শুনিবে কেবা! আমার কপালে বিপরীত ফল, চপলা লক্ষ্মী মোরে অচপল, ভারতী না থাকে থির এক পল   এত করি তাঁর সেবা! তাই ত কপাটে লাগাইয়া খিল স্বর্গে মর্ত্তে খুঁজিতেছি মিল, আনমনা যদি হই এক তিল   অমনি সর্ব্বনাশ!” মনে মনে হাসি মুখ করি ভার কহে কবিজায়া “পারিনেক আর ঘর সংসার গেল ছারেখার   সব তা’তে পরিহাস!” এতেক বলিয়া বাঁকায়ে মুখানি শিঞ্জিত করি কাঁকন দুখানি চঞ্চল করে অঞ্চল টানি’   রোষ দুলে যায় চলি। হেরি সে ভুবন-গরব-দমন অভিমান-বেগে অধীর গমন, উচাটন কবি কহিল “অমন   যেয়ো না হৃদয় দলি’! ধরা নাহি দিলে ধরিব দু’পায় কি করিতে হবে বল সে উপায়, ঘর ভরি’ দিব সোনায় রূপায়   বুদ্ধি যোগাও তুমি! একটুকু ফাঁকা যেখানে যা পাই তোমারি মুরতি সেখানে চাপাই, বুদ্ধির চাষ কোনখানে নাই,   সমস্ত মরুভূমি!” “হয়েছে, হয়েছে, এত ভাল নয়" হাসিয়া কষিয়া গৃহিণী ভনয় “যেমন বিনয় তেমনি প্রণয়   আমার কপাল গুণে! কথার কখনো ঘটেনি অভাব, যখনি বলেছি পেয়েছি জবাব, একবার ওগো বাক্য-নবাব   চল দেখি কথা শুনে! শুভ দিন ক্ষণ দেখ পাঁজি খুলি’, সঙ্গে করিয়া লহ পুঁথি গুলি, ক্ষণিকের তরে আলস্য ভুলি’,   চল রাজসভা মাঝে! আমাদের রাজা গুণীর পালক মানুষ হইয়া গেল কত লোক, ঘরে তুমি জমা করিলে শোলোক   লাগিবে কিসের কাজে!” কবির মাথায় ভাঙ্গি পড়ে বাজ, ভাবিল “বিপদ দেখিতেছি আজ, কখনো জানিনে রাজা মহারাজ   কপালে কি জানি আছে!” মুখে হেসে বলে “এই বই নয়! আমি বলি আরো কি করিতে হয়। প্রাণ দিতে পারি, শুধু জাগে ভয়   বিধবা হইবে পাছে! যেতে যদি হয় দেরিতে কি কাজ! ত্বরা করে’ তবে নিয়ে এস সাজ! হেম কুণ্ডল, মণিময় তাজ,   কেয়ুর, কনক হার! বলে’ দাও মোর সারথীরে ডেকে ঘোড়া বেছে নেয় ভাল ভাল দেখে’ কিঙ্করগণ সাথে যাবে কে কে   আয়োজন কর তার!” ব্রাহ্মণী কহে “মুখাগ্রে যার বাধে না কিছুই, কি চাহে সে আর, মুখ ছুটাইলে রথাশ্বে আর   না দেখি আবশ্যক! নানা বেশভুষা হীরা রূপা সোন এনেছি পাড়ার করি’ উপাসনা, সাজ করে লও পূরায়ে বাসনা,   রসনা ক্ষান্ত হোক্‌।” এতেক বলিয়া ত্বরিত চরণ আনে বেশ বাস নানান্‌ ধরণ, কবি ভাবে মুখ করি বিবরণ   আজিকে গতিক মন্দ! গৃহিণী স্বয়ং নিকটে বসিয়া তুলিল তাহারে মাজিয়া ঘষিয়া, আপনার হাতে যতনে কসিয়া   পরাইল কটিবন্ধ! উষ্ণীষ আনি মাথায় চড়ায়, কণ্ঠী আনিয়া কণ্ঠে জড়ায়, অঙ্গদ দুটি বাহুতে পরায়,   কুণ্ডল দেয় কানে। অঙ্গে যতই চাপায় রতন, কবি বসি থাকে ছবির মতন, প্রেয়সীর নিজ হাতের যতন   সেও আজি হার মানে! এই মতে দুই প্রহর ধরিয়া বেশভূষা সব সমাধা করিয়া, গৃহিণী নিরখে ঈষৎ সরিয়া   বাঁকায়ে মধুর গ্রীবা! হেরিয়া কবির গম্ভীর মুখ হৃদয়ে উপজে মহা কৌতুক, হাসি’ উঠি’ কহে ধরিয়া চিবুক   আ মরি সেজেছ কিবা! ধরিল সমুখে আরশি আনিয়া, কহিল বচন অমিয় ছানিয়া, “পুরনারীদের পরাণ হানিয়া   ফিরিয়া আসিবে আজি, তখন দাসীরে ভুলোনা গরবে, এই উপকার মনে রেখো তবে, মোরেও এমনি পরাইতে হবে   রতন ভূষণ রাজি!” কোলের উপরে বসি, বাহু পাশে বাঁধিয়া কবিরে সোহাগে সহাসে কপোল রাখিয়া কপোলর পাশে   কানে কানে কথা কয়। দেখিতে দেখিতে কবির অধরে হাসি রাশি আর কিছুতে না ধরে, মুগ্ধ হৃদয় গলিয়া আদরে   ফাটিয়া বাহির হয়। কহে উচ্ছ্বসি, “কিছু না মানিব, এমনি মধুর শ্লোক বাখানিব, রাজভাণ্ডার টানিয়া আনিব   ও রাঙা চরণতলে!” বলিতে বলিতে বুক উঠে ফুলি’ উষ্ণীবপরা মস্তক তুলি’ পথে বাহিরায় ‘গৃহদ্বার খুলি   দ্রুত রাজগৃহে চলে! কবির রমণী কুতূহলে ভাসে, তাড়াতাড়ি উঠি’ বাতায়ন পাশে উঁকি মারি’ চায়, মনে মনে হাসে,   কালো চোখে আলো নাচে! কহে মনে মনে বিপুল পুলকে, “রাজপথ দিয়ে চলে এত লোকে এমনটি আর পড়িল না চোখে   আমার যেমন আছে!” এদিকে কবির উৎসাহ ক্রমে নিমেষে নিমেষে আসিতেছে কমে’ যখন পশিল নৃপ-আশ্রমে   মরিতে পাইলে বাঁচে! রাজসভাসদ সৈন্য পাহারা গৃহিণীর মত নহে ত তাহারা সারি সারি দাড়ি করে দিশাহারা,   হেথা কি আসিতে আছে! হেসে ভালবেসে দুটো কথা হয় রাজসভাগৃহ হেন ঠাঁই নয়, মন্ত্রী হইতে দ্বারী মহাশয়   সবে গভীর মুখ! মানুষে কেন যে মানুষের প্রতি ধরি’ আছে হেন যমের মুরতি, তাই ভাবি কবি না পায় ফুরতি   দমি যায় তার বুক! বসি মহারাজ মহেন্দ্র রায় মহোচ্চ গিরি শিখরের প্রায়, জন-অরণ্য হেরিছে হেলায়   অচল অটল ছবি। কৃপা নির্ঝর পড়িছে ঝরিয়া শত শত দেশ সরস করিয়া, সে মহা মহিমা নয়ন ভরিয়া   চাহিয়া দেখিল কবি। বিচার সমাধা হল যবে, শেষে ইঙ্গিত পেয়ে মন্ত্রী-আদেশে যোড় করপুটে দাঁড়াইল এসে   দেশের প্রধান চর! অতি সাধুমত আকার প্রকার, এক তিল নাহি মুখের বিকার, ব্যবসা যে তাঁর মানুষ-শীকার   নাহি জানে কোন নর! ব্রত নানামত সতত পালয়ে, এক কানা কড়ি মূল্য না লয়ে ধর্ম্মোপদেশ আলয়ে আলয়ে   বিতরিছে যাকে তাকে! চেরা কটাক্ষ চকে ঠিকরে, কি ঘটিছে কার, কে কোথা কি করে, পাতায় পাতায় শিকড়ে শিকড়ে   সন্ধান তার রাখে! নামাবলী গায়ে বৈষ্ণব রূপে যখন সে আসি প্রণমিল ভূপে, মন্ত্রী বাজারে অতি চুপে চুপে   কি করিল নিবেদন! অমনি আদেশ হইল রাজার “দেহ এঁরে টাকা পঞ্চ হাজার” “সাধু, সাধু” কহে সভার মাঝার   যত সভাসদ জন! পুলক প্রকাশে সবার গাত্রে, “এ যে দান ইহা যোগ্যপাতে, দেশের আবাল বনিতা মাত্রে   ইথে না মানিবে দ্বেষ!” সাধু নুয়ে পড়ে নম্রতা ভরে, দেখি সভাজন আহা আহা করে, মন্ত্রীর শুধু জাগিল অধরে   ঈষৎ হাস্য লেশ! আসে গুটি গুটি বৈয়াকরণ ধূলিভরা দুটি লইয়া চরণ, চিহ্ণিত করি রাজাস্তরণ   পবিত্র পদ-পঙ্কে! ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘর্ম্ম, বলি অঙ্কিত-শিথিল চর্ম্ম, প্রখর মূর্ত্তি অগ্নিশর্ম্ম,   ছাত্র মরে আতঙ্কে! কোন দিকে কোন লক্ষ্য না করে’ পড়ি’ গেল শ্লোক বিকট হাঁ করে’ মটর কড়াই মিশায়ে কাঁকরে   চিবাইল যেন দাঁতে! কেহ তার নাহি বুঝে আগু পিছু, সবে বসি থাকে মাথা করি নীচু, রাজা বলে “এঁরে দক্ষিণা কিছু   দাও দক্ষিণ হাতে।” তার পরে এল গণৎকার, গণনায় রাজা চমৎকার, টাকা ঝন্‌ ঝন্‌ ঝনৎকার   বাজায়ে সে গেল চলি’! আসে এক বুড়া গণ্য মান্য করপুটে লয়ে দুর্ব্বাধান্য, রাজা তাঁর প্রতি অতি বদান্য   ভরিয়া দিলেন থলি! আসে নট ভাট রাজপুরোহিত, কেহ একা কেহ শিষ্য সহিত, কারো বা মাথায় পাগ্‌ড়ি লোহিত,   কারো বা হরিৎবর্ণ। আসে দ্বিজগণ পরমারাধ্য, কন্যার দায়, পিতার শ্রাদ্ধ, যার যথামত পায় বরাদ্দ,   রাজা আজি দাতাকর্ণ। যে যাহার সবে যায় স্বভবনে, কবি কি করিবে ভাবে মনে মনে, রাজা দেখে তারে সভাগৃহকোণে   বিপন্ন মুখছবি! কহে ভূপ “হোথা বসিয়া কে ওই, এস ত মন্ত্রী সন্ধান লই” কবি কহি উঠে “আমি কেহ নই   আমি শুধু এক কবি!” রাজা কহে “বটে! এস এস তবে, আজিকে কাব্য আলোচনা হবে।” বসাইলা কাছে মহা গৌরবে   ধরি তার কর দুটি! মন্ত্রী ভাবিল—যাই এই বেলা, এখন ত শুরু হবে ছেলেখেলা!- কহে “মহারাজ, কাজ আছে মেলা,   আদেশ পাইলে উঠি!” রাজা শুধু মৃদু নাড়িলা হস্ত, নৃপ ইঙ্গিতে মহা তটস্থ বাহির হইয়া গেল সমস্ত   সভাস্থ দলবল!- পাত্র মিত্র অমাত্য আছি, অর্থী প্রার্থী বাদী প্রতিবাদী, উচ্চ তুচ্ছ বিবিধ উপাধি   বন্যার যেন জল! চলি গেল যবে সভ্যসুজন, মুখোমুখী করি বসিলা দুজন, রাজা বলে “এবে কাব্যকূজন   আরম্ভ কয় কবি!” কবি তবে দুই কর যুড়ি বুকে বাণীবন্দনা করে নতমুখে, “প্রকাশো জননী নয়ন সমুখে   প্রসন্ন মুখচ্ছবি! বিমল মানস-সরসবাসিনী শুক্লবসনা শুভ্রহাসিনী, বীণাগঞ্জিত মঞ্জুভাষিণী   কমলকুঞ্জাসনা! তোমারে হৃদয়ে করিয়া আসীন সুখে গৃহকোণে ধনমানহীন ক্ষ্যাপার মতন আছি চিরদিন   উদাসীন আনমনা! চারিদিকে সবে বাঁটিয়া দুনিয়া আপন অংশ নিতেছে গুণিয়া, আমি তব স্নেহ বচন শুনিয়া   পেয়েছি স্বরগ সুধা! সেই মোর ভাল-সেই বহু মানি, তবু মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে প্রাণী, সুরের খাদ্যে জান ত মা বাণী   নরের মিটে না ক্ষুধা! যা হবার হবে, সে কথা ভাবি না, মাগো, একবার ঝঙ্কারো বীণা, ধরহ রাগিণী বিশ্ব-প্লাবিনা   অমৃত উৎস ধারা! যে রাগিণী শুনি নিশি দিনমান বিপুল হর্ষে দ্রব ভগবান মলিন মর্ত্ত্যমাঝে বহমান   নিয়ত আত্মহারা! যে রাগিণী সদা গগন ছাপিয়া হোমশিখা সম উঠিছে কাঁপিয়া, অনাদি অসীমে পড়িছে ঝাঁপিয়া   বিশ্বতন্ত্রী হতে। যে রাগিণী চির জন্ম ধরিয়া চিত্তকুহরে উঠে কুহরিয়া অশ্রু হাসিতে জীবন ভরিয়া   ছুটে সহস্র স্রোতে! কে আছে কোথায়? কে আসে, কে যায়, নিমেষে প্রকাশে, নিমেষে মিলায়, বালুকা লইয়া কালের বেলায়   ছায়া আলোকের খেলা! জগতের যত রাজা মহারাজ কাল ছিল যারা কোথা তারা আজ, সকালে ফুটিছে সুখ দুখ লাজ,   টুটিছে সন্ধ্যাবেলা! শুধু তার মাঝে ধ্বনিতেছে সুর বিপুল বৃহৎ গভীর মধুর, চিরদিন তাহে আছে ভরপুর,   মগন গগনতল। যে জন শুনেছে সে অনাদিধ্বনি ভাসায়ে দিয়েছে হৃদয়তরণী, জানে না আপনা জানে না ধরণী,   সংসার কোলাহল! সে জন পাগল, পরাণ বিকল, ভবকুল হতে ছিঁড়িয়া শিকল কেমনে এসেছে ছাড়িয়া সকল   ঠেকেছে চরণে তব! তোমার অমল কমলগন্ধ হৃদয়ে ঢালিছে মহা আনন্দ, অপুর্ব্ব গীত, অলোক ছন্দ   শুনিছে নিত নব! বাজুক্‌ সে বীণা, মজুক্‌ ধরণী, বারেকের তরে ভুলাও জননী কে বড় কে ছোট কে দীন কে ধনী   কেবা আগে কেবা পিছে, কার জয় হল, কার পরাজয়, কাহার বৃদ্ধি, কার হল ক্ষয়, কেবা ভাল, আর কেবা ভাল নয়,   কে উপরে কেবা নীচে! গাঁথা হয়ে যাক্ এক গীত রবে, ছোট জগতের ছোট বড় সবে, মুখে পড়ে’ রবে পদপল্লবে   যেন মালা একখানি! তুমি মানসের মাঝখানে আসি দাঁড়াও মধুর মুরতি বিকাশি’, কুন্দবরণ সুন্দর হাসি   বীণা হাতে বীণাপাণি! ভাসিয়া চলিবে রবি শশি তারা, সারি সারি যত মানবের ধারা অনাদিকালের পান্থ যাহারা   তব সঙ্গীত স্রোতে! দেখিতে পাইব ব্যামে মহাকাল ছন্দে ছন্দে বাজাইছে তাল, দশ দিক্‌বধু খুলি কেশজাল   নাচে দশ দিক্‌ হতে!” এতেক বলিয়া ক্ষণপরে কবি করুণ কথায় প্রকাশিল ছবি পুণ্যকাহিনী রঘুকুলরবি   রাঘবের ইতিহাস। অসহ দুঃখ সহি নিরবধি কেমন জনম গিয়েছে দগধি’, জীবনের শেষ দিবস অবধি   অসীম নিরাশ্বাস! কহিল, বারেক ভাবি’ দেখ মনে সেই একদিন কেটেছে কেমনে যেদিন মলিন বাকল বসনে   চলিলা বনের পথে, ভাই লক্ষ্মণ বয়স নবীন, স্নান ছায়াসম বিষাদ-বিলীন, নববধূ সীতা আভরণহীন   উঠিলা বিদায় রথে। রাজপুরী মাঝে উঠে হাহাকার, প্রজা কাঁদিতেছে পথে সারেসার, এমন বজ্র কখনো কি আর   পড়েছে এমন ঘরে? অভিষেক হবে, উৎসবে তার আনন্দময় ছিল চারিধার, মঙ্গলদীপ নিবিয়া আঁধার   শুধু নিমেষের ঝড়ে। আর এক দিন ভেবে দেখ মনে যে দিন শ্রীরাম লয়ে লক্ষ্মণে ফিরিয়া নিভৃত কুটীর ভবনে   দেখিলা জানকী নাহি,— জানকী জানকী আর্ত্ত রোদনে ডাকিয়া ফিরিলা কাননে কাননে, মহা অরণ্য আঁধার আননে   রহিল নীরবে চাহি। তার পরে দেখ শেষ কোথা এর,— ভেবে দেখ কথা সেই দিবসের; এত বিষাদের এত বিরহের   এত সাধনের ধন,— সেই সীতাদেবী রাজসভামাঝে বিদায় বিনয়ে নমি’ রঘুরাজে, বিধা ধরাতলে অভিমানে লাজে   হইলা অদর্শন। সে সকল দিন সেও চলে যায়, সে অসহ শোক, চিহ্ন কোথায়, যায় নি ত এঁকে ধরণীর গায়ে   অসীম দগ্ধ রেখা! দ্বিধা ধরাভূমি জুড়েছে আবার, দণ্ডক বনে ফুটে ফুলভার, সরযূর কূলে তুলে তৃণসার   প্রফুল্ল শ্যাম-লেখা। শুধু সে দিনের একখানি সুর চির দিন ধরে বহু বহু দূর . কাঁদিয়া হৃদয় করিছে বিধুর   মধুর করুণ তানে; সে মহাপ্রাণের মাঝখানটিতে যে মহা রাগিণী আছিল ধ্বনিতে আজিও সে গীত মহা সঙ্গীতে   বাজে মানবের কানে! তার পরে কবি কহিল সে কথা, কুরু পাণ্ডব সমর-বারতা;— গৃহবিবাদের ঘোর মত্ততা   ব্যাপিল সর্ব্ব দেশ, দুইটি যমজ তরু পাশাপাশি, ঘর্ষণে জলে হুতাশন রাশি, মহা দাবানল ফেলে শেষে গ্রাসি   অরণ্য-পরিবেশ! এক গিরি হতে দুই স্রোত পারা দুইটি শীর্ণ বিদ্বেষধারা সরীসৃপগতি মিলিল তাহারা   নিষ্ঠুর অভিমানে- দেখিতে দেখিতে হল উপনীত ভারতের যত ক্ষত্র শোণিত, ত্রাসিত ধরণী করিল ধ্বনিত   প্রলয়-বন্যা-গানে! দেখিতে দেখিতে ডুবে গেল কূল, আত্ম ও পর হয়ে গেল ভুল, গৃহবন্ধন করি নির্ম্মূল   ছুটিল রক্তধারা, ফেনায়ে উঠিল মরণাম্বুধি, বিশ্ব রহিল নিশ্বাস রুধি’, কাঁপিল গগন শত আঁখি মুদি’   নিবায়ে সূর্য্য তারা! সমর-বন্যা যবে অবসান সোনার ভারত বিপুল শ্মশান, রাজগৃহ যত ভূতল-শয়ান   পড়ে আছে ঠাঁই ঠাঁই,— ভীষণা শান্তি রক্ত নয়নে বসিয়া শোণিত-পঙ্কশয়নে, ধরা পানে চাহি আনত বয়নে   মুখেতে বচন নাই। বহু দিন পরে ঘুচিয়াছে খেদ, মরণে মিটেছে সব বিচ্ছেদ, সমাধা যজ্ঞ মহা নরমেধ   বিদ্বেষ-হুতাশনে! সকল কামনা করিয়া পূর্ণ, সকল দম্ভ করিয়া চূর্ণ, পাঁচ ভাই গিয়া বসিলা শূন্য   স্বর্ণ-সিংহাসনে! স্তব্ধ প্রাসাদ বিষাদ-আঁধার, শ্মশান হইতে আসে হাহাকার, রাজপুর-বধূ যত অনাথার   মর্ম্ম-বিদার রব! “জয় জয় জয় পাণ্ডুতনয়” সারি সারি দ্বারী দাঁড়াইয়া কয়, পরিহাস বলে’ আজি মনে হয়,   মিছে মনে হয় সব! কালি যে ভারত সারা দিন ধরি’ অট্ট গরজে অম্বর ভরি’ রাজার রক্তে খেলেছিল হোরি   ছাড়ি কুলভয় লাজে পরদিনে চিতাভস্ম মাখিয়া সন্ন্যাসী বেশে অঙ্গ ঢাকিয়া বসি একাকিনী শোকার্ত্ত হিয়া   শূন্য শ্মশান মাঝে; কুরু পাণ্ডব মুছে গেছে সব, সে রণরঙ্গ হয়েছে নীরব, সে চিত-বহ্ণি অতি ভৈরব   ভস্মও নাহি তার; যে ভূমি লইয়া এত হানাহানি সে আজি কাহার তাহাও না জানি, কোথা ছিল রাজা, কোথা রাজধানী   চিহ্ণ নাহিক আর! তবু কোথা হতে আসিছে সে স্বর,— যেন সে অমর সমর সাগর গ্রহণ করেছে নব কলেবর   একটি বিরাট গানে; বিজয়ের শেষে সে মহা প্রয়াণ সফল আশার বিষাদ মহান, উদাস শান্তি করিতেছে দান   চির-মানবের প্রাণে! হায়, এ ধরায় কত অনন্ত বরষে বরষে শীত বসন্ত সুখে দুখে ভরি দিক্‌ দিগন্ত   হাসিয়া গিয়াছে ভাসি; এমনি বরষা আজিকার মত কত দিন কত হয়ে গেছে গত, নব মেঘভারে গগন আনত   ফেলেছে অশ্রুরাশি! যুগে যুগে লোক গিয়েছে এসেছে, দুখীরা কেঁদেছে, সুখীরা হেসেছে, প্রেমিক যে জন ভাল সে বেসেছে   আজি আমাদেরি মত; তারা গেছে শুধু তাহাদের গান দু হাতে ছড়ায়ে করে গেছে দান, দেশে দেশে, তার নাহি পরিমাণ,   ভেসে ভেসে যায় কত! শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়ানে; সমস্ত প্রাণে কেন যে কে জানে   ভরে আসে আঁখি জল, বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা, বহু দিবসের সুখে দুখে আঁকা, লক্ষ যুগের সঙ্গীতে মাখা   সুন্দর ধরাতল! এ ধরার মাঝে তুলিয়া নিনাদ চাহি নে করিতে বাদ প্রতিবাদ, যে ক’ দিন আছি মানসের সাধ   মিটাব আপন মনে; যার যাহা আছে তার থাক্‌ তাই, কারো অধিকারে যেতে নাহি চাই, শান্তিতে যদি থাকিবারে পাই   একটি নিভৃত কোণে! শুধু বাঁশিখানি হাতে দাও তুলি বাজাই বসিয়া প্রাণমন খুলি’, পুষ্পের মত সঙ্গীতগুলি   ফুটাই আকাশ ভালে। অন্তর হতে আহরি বচন আনন্দলোক করি বিরচন, গীতরসধারা করি সিঞ্চন   সংসার-ধূলিজালে! অতি দুর্গম সৃষ্টি-শিখরে অসীম কালের মহা কন্দরে সতত বিশ্ব নির্ঝর ঝরে   ঝর্ঝর সঙ্গীতে, স্বর-তরঙ্গ যত গ্রহ তারা ছুটিছে শূন্যে উদ্দেশহারা,— সেথা হতে টানি লব গীতধারা   ছোট এই বাঁশরীতে। ধরণীর শ্যাম করপুটখানি ভরি’ দিব আমি সেই গীত আনি, বাতাসে মিশায়ে দিব এক বাণী   মধুর অর্থভরা। নবীন আষাঢ়ে রচি’ নব মায়া এঁকে দিয়ে যাব ঘনতর ছায়া, করে’ দিয়ে যাব বসন্তকারী   বাসন্তীবাস পরা। ধরণীর তলে, গগনের গায়, সাগরের জলে, অরণ্য ছায় আরেকটুখানি নবীন আভায়   রঙীন্ করিয়া দিব। সংসার মাঝে দুয়েকটি সুর রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর, দুয়েকটি কাঁটা করি দিব দূর   তার পরে ছুটি নিব! সুখহাসি আরো হবে উজ্জ্বল, সুন্দর হবে নয়নের জল, স্নেহ-সুধামাখা বাসগৃহতল   আরো আপনার হবে! প্রেয়সী নারী নয়নে অধরে আরেকটু মধু দিয়ে যাব ভরে’, আরেকটু স্নেহ শিশুমুখ পরে   শিশিরের মত র’বে! না পারে বুঝাতে আপনি না বুঝে মানুষ ফিরিছে কথা খুঁজে খুঁজে, কোকিল যেমন পঞ্চমে কূজে   মাগিছে তেমনি সুর; কিছু ঘুচাইব সেই ব্যাকুলতা, কিছু মিটাইব প্রকাশের ব্যথা, বিদায়ের আগে দু চারিটা কথা   রেখে যাব সুমধুর! খাক হৃদাসনে জননী ভারতী, তোমারি চরণে প্রাণের আরতি, চাহিনা চাহিতে আর কারো প্রতি,   রাখি না কাহারো আশা! কত সুখ ছিল হয়ে গেছে দুখ, কত বান্ধব হয়েছে বিমুখ, ম্লান হয়ে গেছে কত উৎসুক   উন্মুখ ভালবাসা! শুধু ও চরণ হৃদয়ে বিরাজে, শুধু ওই বীণা চিরদিন বাজে, স্নেহসুরে ডাকে অন্তর মাঝে   —আয় রে বৎস আয়,— ফেলে রেখে আয় হাসি ক্রন্দন, ছিঁড়ে আয় যত মিছে বন্ধন, হেথা ছায়া আছে চির নন্দন   চির বসন্ত বায়!- সেই ভালো মাগো, যাক্ যাহা যায়, জন্মের মত বরিনু তোমায়, কমল গন্ধ কোমল দু’পায়   বার বার নমো নমঃ!- এত বলি কবি থামাইল গান, বসিয়া রহিল মুগ্ধ নয়ান, বাজিতে লাগিল হৃদয় পরাণ   বীণা ঝঙ্কার সম! পুলকিত রাজা, আঁখি ছলছল, আসন ছাড়িয়া নামিলা ভূতল, দু বাহু বাড়ায়ে পরাণ উতল   কবিরে লইলা বুকে’ কহিলা, ধন্য, কবিগো, ধন্য, আনন্দে মন সমাচ্ছন্ন তোমায় কি আমি কহিব অন্য,   চিরদিন থাক সুখে! ভাবিয়া না পাই কি দিব তোমারে, করি পরিতোষ কোন্ উপহারে, যাহা কিছু আছে রাজভাণ্ডারে   সব দিতে পারি আনি!- প্রেমোচ্ছ্বসিত আনন্দ জলে ভরি দুনয়ন কবি তাঁরে বলে,— কণ্ঠ হইতে দেহ মোর গলে   ওই ফুলমালা খানি!- মালা বাঁধি কেশে কবি যায় পথে, কেহ শিবিকায়, কেহ ধায় রথে, নানাদিকে লোক যায় নানা মতে   কাজের অন্বেষণে; কবি নিজ মনে ফিরিছে লুব্ধ, যেন সে তাহার নয়ন মুগ্ধ কল্পধেনুর অমৃত দুগ্ধ   দোহন করিছে মনে! কবির রমণী বাঁধি কেশপাশ, সন্ধ্যার মত পরি’ রাঙা বাস, বসি’ একাকিনী বাতায়ন পাশ,   সুখ হাস মুখে ফুটে। কপোতের দল চারিদিকে ঘিরে নাচিয়া ডাকিয়া বেড়াইছে ফিরে, যবের কণিকা তুলিয়া সে ধীরে   দিতেছে চঞ্চুপুটে! অঙ্গুলি তার চলিছে যেমন কত কি যে কথা ভাবিতেছে মন, হেন কালে পথে ফেলিয়া নয়ন   সহসা কবিরে হেরি’ বাহু খানি নাড়ি’ মৃদু ঝিনি ঝিনি বাজাইয়া দিল কর-কিঙ্কিণী, হাসিজালখানি অতুলহাসিনী   ফেলিলা কবিরে ঘেরি’। কবির চিত্ত উঠে উল্লাসি’ অতি সত্বর সম্মুখে আসি’ কহে কৌতুকে মৃদু মৃদু হাসি’   —দেখ কি এনেছি বালা! নানা লোকে নানা পেয়েছে রতন, আমি আনিয়াছি করিয়া যতন তোমার কণ্ঠে দেবার মতন   রাজকণ্ঠের মালা!- এত বলি মালা শির হতে খুলি’ প্রিয়ার গলায় দিতে গেল তুলি’, কবি নারী নোষে কর দিল ঠেলি’   ফিরায়ে রহিল মুখ! মিছে ছল করি’ মুখে করে রাগ, মনে মনে তার জাগিছে সোহাগ, গরবে ভরিয়া উঠে অনুরাগ,   হৃদয়ে উথলে সুখ। কবি ভাবে, বিধি অপ্রসন্ন, বিপদ আজিকে হেরি আসন্ন, বসি থাকে মুখ করি বিষণ্ন,   শূন্য নয়ন মেলি!- কবির ললনা আধ খানি বেঁকে, চোরা কটাক্ষে চাহে থেকে থেকে, পতির মুখের ভাবখানা দেখে’   মুখের বসন ফেলি’ উচ্চ কণ্ঠে উঠিল হাসিয়া, তুচ্ছ ছলনা গেল সে ভাসিয়া, চকিতে সরিয়া নিকটে আসিয়া   পড়িল তাহার বুকে,— সেথায় লুকায়ে হাসিয়া কাঁদিয়া, কবির কণ্ঠ বাহুতে বাঁধিয়া, শতবার করি আপনি সাধিয়া   চুম্বিল তার মুখে! বিস্মিত কবি বিহ্বল প্রায়;— আনন্দে কথা খুঁজিয়া না পায়;— মালা খানি লয়ে আপন গলায়   আদরে পরিলা সতী। ভক্তি আবেগে কবি ভাবে মনে চেয়ে সেই প্রেমপূর্ণ বদনে- বাঁধা প’ল এক মাল্য বাঁধনে   লক্ষ্মী সরস্বতী। ১৩ শ্রাবণ, ১৩০০। — সোনার তরী (1894)