রাজার ছেলে ফিরেছি দেশে দেশে,  সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার। যেখানে যত মধুর মুখ আছে  বাকি ত কিছু রাখি নি দেখিবার। কেহ বা ডেকে কয়েছে দুটো কথা,  কেহ বা চেয়ে করেছে আঁখি নত, কাহারো হাসি ছুরির মত কাটে  কাহারো হাসি আঁখি জলেরি মত! গরবে কেহ গিয়েছে নিজ ঘর  কাঁদিয়া কেহ চেয়েছে ফিরে ফিরে। কেহ বা কারে কহে নি কোন কথা,  কেহ বা গান গেয়েছে ধীরে ধীরে।  এমনি করে ফিরেছি দেশে দেশে;  অনেক দূরে তেপান্তর-শেষে  ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,  তাহারি গলে এসেছি দিয়ে মালা! একদা রাতে নবীন যৌবনে  স্বপ্ন হতে উঠিনু চমকিয়া, বাহিরে এসে দাঁড়ানু একবার  ধরার পানে দেখিনু নিরখিয়া। শীর্ণ হ’য়ে এসেছে শুকতারা,  পূর্ব্ব তটে হ’তেছে নিশি ভোর। আকাশ কোণে বিকাশে জাগরণ,  ধরণীতলে ভাঙ্গে নি ঘুম-ঘোর। সমুখে পড়ে’ দীর্ঘ রাজপথ,  দু’ধারে তারি দাঁড়ায়ে তরুসার, নয়ন মেলি’ সুদূর পানে চেয়ে  আপন মনে ভাবি একবার,—  আমারি মত আজি এ নিশি শেষে  ধরার মাঝে নুতন কোন্ দেশে,  দুগ্ধফেনশয্যা করি’ আলা  স্বপ্ন দেখে ঘুমায়ে রাজবালা। অশ্ব চড়ি’ তখনি বাহিরিনু  কত যে দেশ-বিদেশ হনু পার! একদা এক ধূসর সন্ধ্যায়  ঘুমের দেশে লভিনু পুরদ্বার! সবাই সেথা অচল অচেতন,  কোথাও জেগে নাইক জনপ্রাণী, নদীর তীরে জলের কলতানে  ঘুমায়ে আছে বিপুল পুরীখানি। ফেলিতে পদ সাহস নাহি মানি,  নিমেষে পাছে সকল দেশ জাগে! প্রাসাদ মাঝে পশিনু সাবধানে  শঙ্কা মোর চলিল আগে আগে।  ঘুমায় রাজা, ঘুমায় রাণী-মাতা,  কুমার সাথে ঘুমায় রাজভ্রাতা;  একটি ঘরে রত্ন-দীপ জ্বালা,  ঘুমায়ে সেথা রয়েছে রাজবালা। কমলফুল-বিমল শেজখানি,  নিলীন তাহে কোমল তনুলতা। মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে  বাজিল বুকে সুখের মত ব্যথা! মেঘের মত গুচ্ছ কেশরাশি  শিথান ঢাকি পড়েছে ভারে ভারে। একটি বাহু বক্ষপরে পড়ি’  একটি বাহু লুটায় একধারে। আঁচলখানি পড়েছে খসি’ পাশে,  কাঁচলখানি পড়িবে বুঝি টুটি’, পত্রপুটে রয়েছে যেন ঢাকা  অনাঘ্রাত পূজার ফুল দুটি!  দেখিনু তারে উপমা নাহি জানি;  ঘুমের দেশে স্বপন একখানি;  পালঙ্কেতে মগন রাজবালা  আপন ভয় লাবণ্যে নিরালা! ব্যাকুল বুকে চাপি দুই বাহু,  না মানে বাধা হৃদয় কম্পন! ভূতলে বসি আনত করি’ শির  মুদিত আঁখি করি চুম্বন! পাতার ফাঁকে আঁখির তারা দুটি,  তাহারি পানে চাহিনু এক মনে, দ্বারের ফাঁকে দেখিতে চাহি যেন  কি আছে কোথা নিভৃত নিকেতনে! ভূর্জ্জপাতে কাজলমসী দিয়া  লিখিয়া দিনু আপন নাম ধাম। লিখিনু “অয়ি নিদ্রানিমগনা,  আমার প্রাণ তোমারে সঁপিলাম!”  যতন করি কনকসুতে গাঁথি  রতন হারে বাঁধিয়া দিনু পাঁতি।  ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,  তাহারি গলে পরায়ে দিনু মালা! ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯। — সোনার তরী (1894)