পুরন্দর ও বেচারাম
আহম্মদগঞ্জ এক প্রশস্ত বন্দর,
তথায় দোকান করে সাহা পুরন্দর।
কিছুমাত্র মূলধন ছিলনা তাহার;
কেবল সততা মাত্র সম্বল সাহার।
ছিল সে কর্ত্তব্য-নিষ্ঠ, সত্যপরায়ণ,
ধারে তারে টাকা দিত, যত মহাজন।
বাকি ক’রে ধান চা’ল কিনিয়া বেচিত,
চৈত্র মাসে সব টাকা শোধ ক’রে দিত।
কলিকাতা নগরীতে ব্যবসায়িগণ,
পুরন্দরে অবিশ্বাস করে না কখন।
সুখে ও সন্মানে দিন কাটে পুরন্দর,
ব্যবসায়ে লাভ তা’র হইত বিস্তর।
বেচারাম নামে ছিল গঞ্জের দালাল,
মিষ্ট মুখ, প্রাণে বিষ, সুন্দর মাকাল।
দালালী করিয়া দুষ্ট হয়েছিল ধনী;
ঘোর প্রবঞ্চক সেই শঠ শিরোমণি।
একদিন বেচারাম কহে পুরন্দরে,
“তোমার সমান মূর্খ নাহি এ বন্দরে।
তুমি চ’লে যে’তে চাও সততার বলে,
সত্য মিথ্যা না হ’লে কি কারবার চলে?
বিশেষতঃ তোমার নাহিক মূলধন,
ধার ক’রে চালাইবে সমস্ত জীবন?
মূলধন বিনা কভু হয়না উন্নতি;
কি করিবে, একবার হয় যদি ক্ষতি?
কি দিয়ে করিবে শোধ বাজারের ঋণ?
একথা কি ভাবিয়াছ ভ্রমে কোন দিন?
সুখে সুখী সবে, দুখে বলে নাক’ ‘আহা’:
আমার বচন শুন, পুরন্দর সাহা!
এই বার চৈত্রে সব হিসাব মিটায়ে,
বর্ত্তমান কারবার দেও হে উঠায়ে।
বৈশাখের মাঝে গিয়া কলিকাতাধাম,
বাকী ক’রে তুলো আন লক্ষ টাকা দাম।
তুলোর ব্যাপারী মাড়োয়ারি চাঁদমল;
তোমার উপরে তার বিশ্বাস অটল।
বাকীতে তোমারে তুলো দিবে সে নিশ্চয়:
এখানে গুদামে আনি করহ বিক্রয়।
আশী হাজারের তুলো বেচা হয়ে গেলে,
রাত্রিযোগে গুদামে আগুন দাও জ্বে’লে।
কুড়ি হাজারের তুলো যাইবে পুড়িয়।;
বেশ ক’রে ব’সে থাক, পাগল সাজিয়া।
যে যাহা জিজ্ঞাসা করে যখন তোমারে.
কেঁদে, হাত নে’ড়ে, শুধু ‘ভুঃ’ বলিবে তারে।
সম্বাদ পাইয়া, ব্যস্ত হ’য়ে মাড়োয়ারি,
কলিকাতা হইতে আসিবে তাড়াতাড়ি।
জিজ্ঞাসিবে, “কি হয়েছে? কেমনে হইল?
তুলোর গুদামে কবে, কে, আগুন দিল?”
এইরূপে চাঁদমল, যত প্রশ্ন করে,
হাত নে’ড়ে ‘ভুঃ’ বলিবে ক্রন্দনের স্বরে।
সকল প্রশ্নের ওই একই উত্তর;
পাগলের মত ভঙ্গী, পাগলের স্বর।
উন্মাদ হয়েছ দে’খে, হতাশ হইয়া,
মনোদুখে চাঁদমল যাইবে ফিরিয়া।
তার পর কর কিন্তু তৈল ব্যবহার,
রোগ শান্তি হবে, মাথা হবে পরিষ্কার।
আমি এসে দে’খে রাত্রিতে, গোপনে,
নির্জ্জনে বসিয়া যুক্তি করিব দুজনে।
তুলো বিক্রয়ের টাকা সে আশী হাজার,
আধেক লইও তুমি, আধেক আমার।
এইরূপে প্রচুর হইবে মূলধন,
স্বাধীন হইয়া দাও ব্যবসায়ে মন।
বান্ধবের হিত বাক্য ঠেল যদি পায়,
এ জনমে ঘুচিবেনা কভু ঋণ দায়।”
পাপ প্রলোভনে পড়ি’, সাধু পুরন্দর,
অতিশয় বিচলিত হইল অন্তর।
বহুচিন্তা করি’ শেষে কহে, “বেচারাম!
চিরদিন তরে, ভাই, হারাব সুনাম।
তিলার্দ্ধ বিশ্বাস আর কেহ না করিবে;”
বেচারাম কহে, “লোকে কেমনে ধরিবে?
সব তুলো পুড়ে নাই, বুঝিবে কেমনে?
অথচ বিস্তর লাভ হইবে গোপনে।”
উত্তরিল পুরন্দর চিন্তি’ বহুক্ষণ;
“আজ বড় অস্থির হয়েছে মোর মন।
কাল তুমি এস, দিব ইহার উত্তর,”
“বেশ্” ব’লে বেচারাম উঠিল সত্বর।
পুরন্দর সারারাত্রি কাটে অনিদ্রায়;
কি করিলে ভাল হয়, বু’ঝে উঠা দায়।
পাপ-অর্থলোভ, আর বিবেক প্রখর,
মনোমধ্যে আরম্ভিল বিষম সমর।
পরিশেষে পুরন্দর দৃঢ় করে মন,
পরদিন বেচারাম দিল দরশন।
পুরন্দর কহে, “ভাই, পারিবনা আমি;
টাকা হ’তে যশ মোর ঢের বেশী দামী।”
প্রবঞ্চক পুনঃ পুনঃ ফেলে পাপ- জাল;
এইরূপে কে’টে গেল দুই মাস কাল।
দুর্জ্জনের প্রলোভন অতি ভয়ঙ্কর!
বিলম্বে পড়িল জালে সাধু পুরন্দর।
প্রস্তাব করিবা মাত্র, চাঁদমল তারে,
লক্ষ টাকা মূল্য লিখি,’ তুলে দিল ধারে।
বিধি মতে পালিল শঠের উপদেশ;
না রহিল দ্বিধা, কিম্বা অনুতাপ লেশ।
অবশেষে পাগল সাজিল পুরন্দর,
সকল প্রশ্নের এক ‘ভুঃ’ মাত্র উত্তর।
অগ্নি নির্ব্বাণের ছলে শূন্যে দেয় ফুঁ;
যে যাহা জিজ্ঞাসা করে, সুধু কয় ‘ভুঃ’।
কহিতে লাগিল সবে, “হায় কর্ম্মফল!
এমন সজ্জন সাধু, হইল পাগল!”
চাঁদমল পায় যবে দারুণ সংবাদ,
হইল তাহার শিরে অশনি-সম্পাত।
আহাম্মদগঞ্জে আসি’ নামে তাড়াতাড়ি;
পুরন্দর বাসে উপনীত মাড়োয়ারি।
বলে, “ভাই পুরন্দর, কেমনে কি হ’ল?
সব তুলো পু’ড়ে গেছে? শীঘ্র খুলে বল।”
অর্দ্ধক্রন্দনের স্বরে, পাগলের মত,
পুরন্দর, হাতমুখ নে’ড়ে অবিরত,
সুধু বলে, ‘ভুঃ’, সব কথার উত্তর;
ফিরে গেল চাঁদমল শিরে হানি কর।
একদিন রাত্রিযোগে বেচারাম এসে,
“চল্লিশ হাজার মোর দাও,” বলে হে’সে।
আর কোন ভয় নাই, হয়ে গেছ ধনী,
আমার টাকাটি ভাই দাও মোরে গণি।”
হে’সে পুরন্দর হ’ল পাগলের মত,
শঠের সম্মুখে হাত নাড়ে অবিরত;
বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া, সুধু ‘ভু’ ‘ভু’ করে;
দালাল ব্যাকুল হয়ে ধরে পুরন্দরে।
বলে “ভাই, সে কি কথা? আমাকেও ‘ভুঃ’?
হেসে পুরন্দর সাহা শুধু কয় ‘হুঁ’!
More from সদ্ভাব কুসুম
More in Poetry
Poetry
Palanquin Bearers
Lightly, O lightly we bear her along, She sways like a flower in the wind of our song; She skims like a bird on the foam of a stream; She floats like a laugh from the lips of a dream. Gaily, O gaily we glide and we sing,...
Poetry
Where the Mind is Without Fear (Gitanjali 35)
Where the mind is without fear and the head is held high; Where knowledge is free; Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls; Where words come out from the depth of truth; Where tirel...
Poetry
Thou Hast Made Me Endless (Gitanjali 1)
Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life. This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed...
Comments (0)
Log in to join the conversation.