প্রথমাঙ্ক — দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
জয়পুর—বিলাসবতীয় গৃহ
(বিলাসতী।)
বিলা। (স্বগত) কি আশ্চর্য্য! মহারাজ যে আজ এত বিলম্ব কচ্যেন, এর কারণ কি? (দীর্ঘনিশ্বাস) ভাল—আমি এ লম্পট জগৎসিংহের প্রতি এত অনুরাগিণী হলেম কেন? এ নবযৌবনের ছলনায় যাকে চিরদাস করবো, মনে করেছিলাম, পোড়া মদনের কৌশলে আমিই আবার তার দাসী হলেম যে! আমি কি পাখীর মতন আহারের অন্বেষণে জালে পড়লেম? তা না হলে রাজাকে না দেখে আমার মনঃ এত চঞ্চল হয় কেন? (দীর্ঘনিশ্বাস)
রাজার আসবার ত সময় হয়েছে; আমাকে আজ কেমন দেখাচ্যে কে জানে! (দর্পণের নিকট অবস্থিতি।)
(মদনিকার প্রবেশ।)
(প্রকাশে) ওলো মদনিকে, একবার দেখ্ত ভাই, আমার মুখখানা আজ আরসিতে কেমন দেখাচ্যে?
মদ। আহা, ভাই, যেন একটি কনকপদ্ম বিমল সরোবরে ফুটে রয়েছে। তা ও সব মরুক্ গে যাক! এখন আমি যে কথা বলতে এলেন, তা আগে মন দিয়ে শোন।
বিলা। কি, ভাই? মহারাজ বুঝি আসচেন?
মদ। আর মহারাজ! মহারাজ কি আর তোমার আছেন যে আসবেন?
বিলা। কেন? কেন? সে কি কথা? কি হয়েছে, শুনি—
মদ। আর শুনবে কি? ঐ যে ধনদাস দেখচো, ওকে ত তুমি ভাল করে চেন না। ও পোড়ারমুখোর মতন বিশ্বাসঘাতক মানুষ কি আর দুটি আছে?
বিলা। কেন! সে কি করেছে?
মদ। কি আর করবে? তুমি যত দিন তার উপকার করেছিলে, তত দিন সে তোমায় ছিল। এখন সে অন্য পথ ভাবছে।
বিলা। বলিস্ কি লো? আমি ত তোর কথা কিছুই বুঝতে পাল্যেম না।
মদ। বুঝবে আর কি? তুমি উদয়পুরের রাজা ভীমসিংহের নাম শুনেছ?
বিলা। শুনবো না কেন? তিনি ইন্দুকুলের চূড়ামণি। তাঁর নাম কে না শুনেছে?
মদ। তোমার প্রিয় বন্ধু ধনদাস সেই রাজার মেয়ে কৃষ্ণার সঙ্গে মহারাজের বিবাহ দেবার চেষ্টা পাচ্যে।
বিলা। এ কথা তোকে কে বললে?
মদ। কেন? এ নগরে তুমি ছাড়া বোধ হয়, এ কথা সকলেই জানে! ধনদাস যে স্বয়ং কাল সকালে পত্র কত্যে উদয়পুরে যাত্রা করবে। ও কি ও! তুমি যে কাঁদতে বসলে? ছি ছি! এ কথা শুনে কি কাঁদতে হয়। মহারাজ ত আর তোমার স্বামী নন্, যে তোমার, সতীনের ভয় হলো?
বিলা। যা, তুই এখন যা—(রোদন)।
মদ। ও মা! এ কি? তোমার চক্ষের জল যে আর থাকে না! কি আপদ্। আমি যদি ভাই, এমন জানতেম, তা হলে কি আর এ কথা তোমাকে শোনাই!—ঐ যে ধনদাস এ দিকে আসচে। দেখ, ভাই, তুমি যদি এ বিষয় নিবারণ কত্যে চাও, তবে তার উপায় চেষ্টা কর। কেবল চক্ষের জল ফেললে কি হবে? তোমার চক্ষের জল দেখে কি মহারাজ ভুলবেন, না ধনদাস ডরাবে?
বিলা। আয়, ভাই, তবে আমরা একটু সরে দাঁড়াই। ঐ ধনদাস আসচে। দেখি না, ও এখানে এসে কি করে? (অন্তরালে অবস্থিতি)।
(ধনদাসের প্রবেশ।)
ধন। (স্বগত) হা! হা! মন্ত্রীভায়া আমার সঙ্গে অধিক সৈন্য পাঠাতে নিতান্ত অসম্মত ছিলেন; কিন্তু এমনি কৌশলটি করলেম যে ভায়ার আমার মতেই শেষ মত দিতে হলো। হা! হা! রাজাই হউন, আর মন্ত্রীই হউন, ধনদাসের ফাঁসে সকলকেই পড়তে হয়! শর্ম্মা আপন কর্ম্মটি ভোলেন না। এই ত আপাততঃ সৈন্যদলের ব্যয়ের জন্যে যে টাকাটা পাওয়া যাবে, সেটা হাত কত্যে হবে; আর পথের মধ্যে যেখানে যা পাব, তাও ছাড়া হবে না। এত লোক যার সঙ্গে, তার আর ভয় কি? (চিন্তা করিয়া) বিলাসবতীর উপর মহারাজের যে অনুরাগটি ছিল, তার ত দিন দিন হ্রাস হয়ে আসছে। এখন আর কেন? এর দ্বারায় ত আমার আর কোন উপকার হতে পারে না। তবে কি না—স্ত্রীলোকটা পরমসুন্দরী। ভাল—তা একবার দেখাই যাক না কেন? (প্রকাশে) কৈ হে? বিলাসবতী কোথায়? কৈ, কেউ যে উত্তর দেয় না?
(বিলাসবতীর পুনঃপ্রবেশ।)
বিলা। কি হে, ধনদাস? তবে কি ভাবছিলে, বল দেখি শুনি?
ধন। আর কি ভাববো, ভাই! তোমার অপরূপ রূপের কথাই ভাবছিলেম!
বিলা। আমার অপরূপ রূপের কথা? এ কথা তোমাকে কে শিখিয়ে দিলে, বল দেখি?
ধন। আর কে শিখিয়ে দেবে, ভাই? আমার এই চক্ষু দুটিই শিখিয়ে দিয়েছে।
বিলা। বেশ! বেশ! ওহে ধনদাস, তুমি যে একজন পরম রসিক পুরুষ হয়ে পড়লে হে?
ধন। আর ভাই, না হয়ে করি কি? দেখ, গৌরীর চরণ স্পর্শে একটা পাষাণ মহারত্নের শোভা পেয়েছিল, তা এ ধনদাস ত তোমারই দাস!
বিলা। ভাল ধনদাস, তুমি নাকি মহারাজের কাছে একখানা চিত্রপট বিশ হাজার টাকায় বিক্রী করেছ?
ধন। অ্যাঁ—তা—না! এ—এ কথা তোমাকে কে বললে?
বিলা। যে বলুক না কেন? এ কথাটা সত্য ত?
ধন। না, না। এমন কথা তোমাকে কে বললে! তুমিও যেমন ভাই! আজকাল বিশ হাজার টাকা কে কাকে দিয়ে থাকে?
বিলা। এ আবার কি? তুমি ভাই, এ অঙ্গুরীটি কোথায় পেলে?
ধন। (স্বগত) আঃ, এ মাগী ত ভারি জ্বালাতে আরম্ভ কল্যে হে? (প্রকাশে) এ অঙ্গুরীটি মহারাজ আমাকে রাখতে দিয়েছেন।
বিলা। বটে? তাই ত বলি! ভাল, ধনদাস, মরুভূমি আকাশের জল পেলে যেমন যত্নে রাখে, বোধ হয়, তুমিও মহারাজের কোন বস্তু পেলে তেমনি যত্নে রাখ না?
ধন। কে জানে, ভাই? তুমি এ কি বল, আমি কিছুই বুঝতে পারি না।
বিলা। না—তা পারবে কেন? তোমার মতন সরল লোক ত আর দুটি নাই। আমি বলছিলেম কি, যে মরুভূমি যেমন জল পাবামাত্রেই তাকে একবারে শুষে নেয়, তুমিও রাজার কোন দ্রব্যাদি পেলে ত তাই কর? সে যাক মেনে; এখন আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। তুমি নাকি উদয়পুরের রাজকন্যার সঙ্গে মহারাজের বিবাহ দেবার চেষ্টা পাচ্যো?
ধন। (স্বগত) কি সর্ব্বনাশ! এ বাঘিনী আবার এ সব কথা কেমন করে শুনলে?
বিলা। কি গো ঘটক মহাশয়, আপনি যে চুপ করে রইলেন?
ধন। তোমাকে এ সব মিছে কথা কে বললে বল ত?
বিলা। মিছে কথা বৈ কি? আমি তোমার ধূর্ত্তপনা এত দিনে বিলক্ষণ করে টের পেয়েছি; তুমি আমার সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার করেছ, আর আমাকে যে সব কথা বলেছ, সে সব মহারাজ শুনলে, তোমাকে উদয়পুরে ঘটকালি কত্যে না পাঠিয়ে, একেবারে যমপুরে পাঠাতেন! তা তুমি জান?
ধন। তা এখন তুমি বলবেই ত? তোমার দোষ কি, ভাই? এ কালের ধর্ম্ম! এ কলিকাল কি না? এ কালে যার উপকার কর, সে আবার অপকার করে! মনে করে দেখ দেখি, ভাই, তুমি কি ছিলে, আর কি হয়েছ! এখন যে তুমি এই রাজ-ইন্দ্রাণীর মুখভোগ কচ্যো, সেটি কার প্রসাদে? তা এখন আমার নামে চুকলি না কাটলে চলবে কেন? তুমি যদি আমার অপবাদ না করবে, ত আর কে করবে? তুমিও ত একজন কলিকালের মেয়ে কি না।
বিলা। হাঁ—আমি কলিকালের মেয়ে বটি; কিন্তু তুমি যে স্বয়ং কলি অবতার। তুমি আমাকে পূর্ব্বের কথা স্মরণ করয়ে দিতে চাও, কিন্তু সে সব কথা তুমি আপনি একবার মনে করে দেখ দেখি। তুমিই না অর্থের লোভে আমার ধর্ম্ম নষ্ট করালে? আমি যদিও দুঃখী লোকের মেয়ে, তবুও ধর্ম্মপথে ছিলেম। এখন, ধনদাস, তুমিই বল দেখি, কোন্ দুষ্ট বেদে এ পাখীটিকে ফাঁদ পেতে ধরে এনে এ সোনার পিঞ্জরে রেখেছে? (রোদন।)
ধন। (স্বগত) এ মেয়েমানুষটিকে আর কিছু বলা ভাল হয় না; এ যে সব কথা জানে, তা মহারাজ শুনলে আর নিস্তার থাকবে না। (প্রকাশে) আামি ত ভাই তোমার হিত বৈ অহিত কখন করি নাই। তা তুমি আমার উপর এ বৃথা রাগ কর কেন?
বিলা। এ বিবাহের কথা তবে কে তুললে?
ধন। তা আমি কেমন করে জানবো?
বিলা। কেমন করে জানবে। তুমি হচ্যো এর ঘটক, তুমি জানবে না ত আর কে জানবে?
ধন। হা! হা! তোমাদের মেয়েমানুষের এমনি বুদ্ধিই বটে! আরে আমি যে ঘটক হয়েছি, সে কেবল তোমার উপকারের জন্যে বৈ ত নয়! কি ভেবেছ, যে আমি গেলে আর এ বিবাহ হবে! সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাক! তার পর তখন টের পাবে, ধনদাস তোমার কেমন বন্ধু।
নেপথ্যে। ওগো, ধনদাস মহাশয় এ বাড়ীতে আছেন? মহারাজ তাঁকে. একবার ডাকচেন।
ধন। ঐ শোন! আমি ভাই, এখন বিদায় হই। তুমি এ বিষয়ে কোন মতেই ভাবিত হইও না। যদিও মহারাজ এ বিবাহ করেন, তবু আমি বেঁচে থাকতে তোমার কোন চিন্তা নাই। তোমার যে এই নবযৌবন আর রূপ, এ ধনপতির ভাণ্ডার! (স্বগত) এখন রূপ নিয়ে ধুয়ে খাও; আমি ত এই তোমার মাথা খেতে চললেম!
[ প্রস্থান।
বিলা। (দীর্ঘনিশ্বাস ও স্বগত) এখন কি যে অদৃষ্টে আছে কিছুই বলা যায় না। কৈ? মহারাজ ত আজ আর এলেন না।
(মদনিকার পুনঃপ্রবেশ।)
মদ। কেমন, ভাই? আমি যা বলেছিলেম, তা সত্য কি না। তবে এখন এর উপায় কি? এ বিবাহ হলে, তুমি চিরকালের জন্যে গেলে।
বিলা। আর উপায় কি?
মদ। উপায় আছে বৈ কি? ভাবনা কি? ধনদাস ভাবে যে এর মতন সুচতুর মানুষ আর দুটি নাই; কিন্তু এইবার দেখা যাবে ও কত বৃদ্ধি ধরে। এসো, তুমি আমার সঙ্গে এসো। ও দুষ্টকে ঠকান বড় কথা নয়।
বিলা। তবে চল।
[ উভয়ের প্রস্থান।
ইতি প্রথমাঙ্ক।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.