দ্বিতীয়াঙ্ক — প্রথম গর্ভাঙ্ক
দ্বিতীয়াঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
উদয়পুর—রাজগৃহ।
(অহল্যাদেবী এবং তপস্বিনীর প্রবেশ।)
অহ। ভগবতি, আমার দুঃখের কথা আর কেন জিজ্ঞাসা করেন! আমি যে বেঁচে আছি, সে কেবল ভগবান্ একলিঙ্গের প্রসাদে আর আপনাদের আশীর্ব্বাদে বৈ ত নয়! আহা! মহারাজের মুখখানি দেখলে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়! ভগবতি, আমরা কি পাপ করেছি, যে বিধাতা আমাদের প্রতি একেবারে এত বাম হলেন!
তপ। রাজমহিষি, আপনি এত উতলা হবেন না। সংসারের নিয়মই এই। কখন সুখ, কখন শোক, কখন হর্ষ, কখন বিষাদ আছেই ত! লোকে যাকে রাজভোগ বলে, সে যে কেবল সুখভোগ, তা নয়। দেখুন, যে সকল লোক সাগরপথে গমনাগমন করে, তারা কি সর্ব্বদাই শান্ত বায়ু সহযোগে যায়। কত মেঘ, কত ঝড়, কত বৃষ্টি, সময়বিশেষে যে তাদের গতি রোধ করে, তার কি সংখ্যা আছে?
অহ। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) ভগবতি, সেই প্রলয় ঝড় যে দেখেছে, সেই জানে, যে সে কি ভয়ঙ্কর পদার্থ! আপনি যদি আমাদের দুরবস্থার কথা শোনেন, তা হল্যে—
তপ। দেবি, আমি চির-উদাসিনী। এ ভবসাগরের কল্লোল আমার কর্ণকুহরে প্রায়ই প্রবেশ কত্যে পারে না! তবে যে—
অহ। (অতি কাতরভাবে) ভগবতি, মহারাজের বিরস বদন দেখলে আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না! আহা! সে সোনার শরীর একেবারে যেন কালি হয়ে গেছে! বিধাতার এ কি সামন্য বিড়ম্বনা!
তপ। মহিষি, সুবর্ণকান্তি অগ্নির উত্তাপে আরও উজ্জ্বল হয়! তা আপনাদের এ দুরবস্থা আপনাদের গৌরবের বৃদ্ধি বৈ কখন হ্রাস করবে না! দেখুন, স্বয়ং ধর্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির কি পর্য্যন্ত ক্লেশ না সহ্য করেছিলেন!
অহ। ভগবতি, আমার বিবেচনায় এ রাজভোগ করা অপেক্ষা যাবজ্জীবন বনবাস করা ভাল। রাজপদ যদি সুখদায়ক হতো, তা হলে কি আর ধর্ম্মরাজ রাজ্যত্যাগ করে মহাযাত্রায় প্রবৃত্ত হতেন।
তপ। হাঁ—তা সত্য বটে। ভাল, রাজমহিষি, আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি; বলি, আপনারা রাজকুমারীর বিবাহের বিষয়ে কি স্থির করেছেন, বলুন দেখি?
অহ। আর কি স্থির করবো? মহারাজের কি সে সব বিষয়ে মন আছে?। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) ভগবতি, আপনাকে আর কি বলবো, আমি এমন একটু সময় পাই না, যে মহারাজের কাছে এ কথাটিরও প্রসঙ্গ করি।
তপ। সে কি মহিষি? এ কর্ম্মে অবহেলা করা ত কোন মতেই উচিত হয় না। সুকুমারী রাজকুমারী কৃষ্ণার যৌবনকাল উপস্থিত; তা তার এ সময় বিবাহ না দিলে, আর কবে দেবেন?—ঐ না মহারাজ এই দিকে আসচেন?
অহ। ভগবতি, একবার মহারাজের মুখপানে চেয়ে দেখুন! হে বিধাতঃ, এ হিন্দুকুলসূর্য্যকে তুমি এ রাহুগ্রাস হত্যে কবে মুক্ত করবে? হায়, এ কি প্রাণে সয়! (রোদন।)
তপ। দেবি, শান্ত হউন! আপনার এ সময়ে এত চঞ্চলা হওয়া উচিত নয়। মহারাজ আপনাকে এ অবস্থায় দেখলে যে কত দূর ক্ষুণ্ণ হবেন, তা আপনিই বিবেচনা করুন!
অহ। ভগবতি, মহারাজের এ দশা দেখলে কি আর বাঁচতে ইচ্ছা হয়! হে বিধাতঃ, আমি কোন্ জন্মে কি পাপ কর্যেছিলাম, যে তুমি আমাকে এত যন্ত্রণা দিলে? (রোদন।)
তপ। (স্বগত) আহা! পতির দুঃখ দেখে পতিপরায়ণা স্ত্রী কি স্থির হত্যে পারে? (প্রকাশে) মহিষি, আপনি এখন একটু সরে দাঁড়ান, পরে কিঞ্চিৎ শান্ত হয়ে মহারাজের সহিত সাক্ষাৎ করবেন। (হস্ত ধরিয়া) আসুন, আমরা দুজনেই একবার সরে দাঁড়াই গে। (অন্তরালে অবস্থিতি।)
(ভৃত্যসহিত রাজ্য ভীমসিংহের প্রবেশ।)
রাজ। রাম প্রসাদ!—
ভৃত্য। মহারাজ।
রাজা। এই পত্র কখানা সত্যদাসকে দে আয়। আর দেখ্, তাঁকে বলিস্, যে এ সকলের উত্তর যেন আজিই পাঠিয়ে দেন।
ভৃত্য। যে আজ্ঞা, মহারাজ।
রাজা। উত্তরের মর্ম্ম যা যা হবে, তা আমি প্রতি পত্রের পৃষ্ঠে লিখে দিয়েছি।
ভৃত্য। যে আজ্ঞা, মহারাজ!
[ প্রস্থান।
রাজা। (স্বগত) হে বিধাতা, একেই কি লোকে রাজভোগ বলে।
তপ। (অগ্রসর হইয়া) মহারাজ, চিরজীবী হউন!
রাজা। (প্রণাম করিয়া) ভগবতি, বহুদিনের পর আপনার পাদপদ্ম দর্শন করে আমি যে কি পর্য্যন্ত সুখী হল্যেম, তার আর কি বলবো? রাজমহিষী কোথায়? তাঁকে যে এখানে দেখ্চি নে?
তপ। আজ্ঞা, তিনি এই ছিলেন, বোধ করি, আবার এখনি আসবেন।
রাজা। ভগবতি, আপনি এত দিন কোথায় ছিলেন?
তপ। আজ্ঞা—আমি তীর্থ-পর্য্যটনে যাত্রা করেছিলেন। মহারাজের সর্ব্বপ্রকারে মঙ্গল ত?
রাজা। এই যেমন দেখছেন। ভগবান্ একলিঙ্গের প্রসাদে আর আপনাদের আশীর্ব্বাদে রাজলক্ষ্মী এখনও এ রাজগৃহে আছেন, কিন্তু এর পর থাকবেন কি না, তা বলা দুষ্কর।
তপ। মহারাজ, এমন কথা কি বলতে আছে? মন্দাকিনী কি কখন শৈলরাজগৃহ পরিত্যাগ করেন। কমলা এ রাজভবনে ত্রেতাযুগ অবধি অবস্থিতি কচ্যেন। শরৎকালের শশীর ন্যায় বিপদ্মেঘ হত্যে পুনঃ পুনঃ মুক্তা হয়্যে পৃথিবীকে আপন শোভায় শোভিত করেছেন। এ বিপুল রাজকুল কি কখন শ্রীঘ্রই হতে পারে? আপনি এমন কথা মনেও করবেন না।
(অহল্যাদেবীর পুনঃ প্রবেশ।)
আসুন, মহিষী আসুন।
অহ। (রাজার হস্ত ধরিয়া) নাথ, এত দিনের পর যে একবার অন্তঃপুরে পদার্পণ কল্যে, এও এ দাসীর পরম সৌভাগ্য।
রাজা। দেবি, আমি যে তোমার কাছে কত অপরাধী আছি, তা মনে কল্যে অত্যন্ত লজ্জা হয়। কিন্তু কি করি? আমি কোন প্রকারেই ইচ্ছাকৃত দোষে দোষী নই। তা এসো, প্রিয়ে বসো। (তপস্বিনীর প্রতি) ভগবতি, আপনি আসন পরিগ্রহ করুন। (সকলের উপবেশন।)
(ভৃত্যের পুনঃ প্রবেশ।)
ভৃত্য। ধর্ম্মাবভার, মন্ত্রীমহাশয় এই পত্রখানি রাজসম্মুখে পাঠিয়ে দিলেন।
রাজা। কৈ? দেখি। (পত্র পাঠ করিয়া) আঃ, এত দিনের পর, বোধ হয়, এ রাজ্য কিছু কালের জন্যে নিরাপদ হলো।
[ ভৃত্যের প্রস্থান।
অহ। নাথ, এ কি প্রকারে হলো?
রাজা। মহারাষ্ট্রের অধিপতির সঙ্গে একপ্রকার সন্ধি হবার উপক্রম হয়েছে। তিনি এই পত্রে অঙ্গীকার করেছেন, যে ত্রিশ লক্ষ মুদ্রা পেলে স্বদেশে ফিরে যাবেন। দেবি, এ সংবাদে রাজা দুর্য্যোধনের মতন আমার হর্ষবিষাদ হলো। শত্রুবল স্বরূপ প্লাবন যে এ রাজভূমি ত্যাগ কল্যে, এ হর্ষের বিষয় বটে; কিন্তু যে হেতুতে ত্যাগ কলো, সে কথাটি মনে হল্যে আমার আর এক দণ্ডের জন্যেও প্রাণধারণ কত্যে ইচ্ছা করে না। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) হায়! হায়! আমি ভুবনবিখ্যাত শৈলরাজের বংশধর, আমাকে এক জন দুষ্ট, লোভী গোপালের ভয়ে অর্থ দিয়া রাজ্যরক্ষা কত্যে হলো? ধিক্ আমাকে! এ অপেক্ষা আমার আর কি গুরুতর অপমান হতে পারে?
তপ। মহারাজ, আপনি ত সকলই অবগত আছেন! দ্বাপরে চন্দ্রবংশপতি যুধিষ্ঠির বিরাট রাজার সভাসদপদে নিযুক্ত হয়ে কালযাপন করেন। এই সূর্য্যবংশচূড়ামণি নলও সারথিপদ গ্রহণ করেছিলেন। তা এ সকল বিধাতার লীলা বৈ নয়।
রাজা। আজ্ঞা, হাঁ, তার সন্দেহ কি?
অহ। মহারাষ্ট্রের অধিপতি যে সসৈন্যে স্বদেশে গেলেন, এ কেবল ভগবান্ একলিঙ্গের অনুগ্রহে।
রাজা। (সহাস্য বদনে) দেবি, তুমি কি ভেবেছ, যে ও নরাধম আমাদের একেবারে পরিত্যাগ করে গেল? বিড়াল একবার যেখানে দুধের গন্ধ পায়, সে স্থান কি আর ছাড়তে চায়? ধনের অভাব হল্যেই ও যে আবার আসবে, তাঁর সন্দেহ নাই।
তপ। মহারাজ, যিনি ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমানের কর্ত্তা, তিনিই আপনাকে ভবিষ্যতে রক্ষা করবেন; আপনি সে বিষয়ে উৎকণ্ঠিত হবেন না।
অহ। নাথ, এ জঞ্জাল ত এক প্রকার মিটে গেল। এখন তোমার কৃষ্ণার বিবাহের বিষয়ে মনোযোগ কর।
রাজা। তার জন্যে এত ব্যস্ত হবার আবশ্যক কি?
অহ। সে কি, নাথ? এত বড় মেয়ে হলো, আরো কি তাকে আইবড় রাখা যায়? (নেপথ্যে দূরে বংশীধ্বনি।)
রাজা। এ কি? আহা! এ বংশীধ্বনি কে কচ্যে?
অহ। (অবলোকন করিয়া) ঐ যে তোমার কৃষ্ণা তার সখীদের সঙ্গে উদ্যানে বিহার কচ্যে!
তপ। আহা, মহারাজ, দেখুন, যেন বনদেবী আপন সহচরীগণ লয়ে বনে ভ্রমণ কচ্যেন!
অহ। নাথ, তোমার কি এই ইচ্ছা যে কোন পাষণ্ড যবন এসে এই কমলটিকে এ রাজসরোবর থেকে তুলে নে যায়?
রাজা। সে কি, প্রিয়ে?
অহ। মহারাজ, দিল্লীর অধিপতি, কিম্বা অন্য কোন যবনরাজ, জনরবস্বরূপ বায়ুসহযোগে এ পদ্মের সৌরভ পেলে কি আর রক্ষা থাকবে? কেন, তোমার পূর্বপুরুষ ভীমসেনের প্রণয়িনী পদ্মিনীদেবীর কথা তুমি কি বিস্তৃত হল্যে? (নেপথ্যে দূরে বংশীধ্বনি।)
রাজা। আহা! কি মধুর ধ্বনি!
(নেপথ্যে গীত।)
[ ধানী মুলতানী—কাওয়ালী ]
শুনিয়ে মোহন, মুরলী গান।
করি অনুমান, গেল বুঝি কুলমান।
প্রাণ কেমন করে, সুমধুর স্বরে,
ধৈরয মন না ধরে;
সাধ সতত হয় শ্যাম দরশনে,
লাজ ভয় হলো অবসান।
নারি, সহচরি, রহিতে ভবনে,
ত্রিভঙ্গ শ্যাম বিহনে,
চিত যে বঞ্চিত তুরিত মিলনে,
না দেখি তাহার সুবিধান॥
তপ। আ, মরি, মরি! কি সুধাবর্ষণ! মহারাজ, আমরা তপোবনে কখন কখন এইরূপ সুস্বর আকাশমার্গে শুনে থাকি! তাতে করে আমার জ্ঞান ছিল, যে সুরসুন্দরী ভিন্ন এ স্বর অন্যের হয় না।
রাজা। আহা, তাই ত! ভাল, মহিষি, কৃষ্ণার এখন বয়েস কত হলো।
অহ। সে কি, মহারাজ? তুমি কি জান না? কৃষ্ণা যে এই পোনেরতে পা দিয়েছে!
তপ। মহারাজ, এ কলিকালে স্বয়ম্বরের প্রথাটা একেবারেই উঠে গেছে; নতুবা আপনার এ কৃষ্ণার পাণিগ্রহণ লোভে এত দিন সহস্র সহস্র রাজা এসে উপস্থিত হতেন।
রাজা। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) ভগবতি, এ ভারতভূমির কি আর সে শ্রী আছে! এ দেশের পূর্ব্বকালীন বৃত্তান্ত সকল স্মরণ হল্যে, আমরা যে মনুষ্য, কোন মতেই ত এ বিশ্বাস হয় না! জগদীশ্বর যে আমাদের প্রতি কেন এত প্রতিকূল হলেন, তা বলতে পারি নে। হায়! হায়! যেমন কোন লবণাম্বুতরঙ্গ কোন সুমিষ্টবারি নদীতে প্রবেশ কর্যে তার সুস্বাদ নষ্ট করে, এ দুষ্ট যবনদলও সেইরূপ এ দেশের সর্ব্বনাশ করেছে। ভগবতি, আমরা কি আর এ আপদ্ হত্যে কখন অব্যাহতি পাবো?
অহ। হা অদৃষ্ট! এখন কি আর সে কাল আছে? স্বয়ম্বরসমারোহ দূরে থাকুক, এখন যে রাজকুলে সুন্দরী কন্যা জন্মে, সে কুলের মান রক্ষা করা ভার।
তপ। তা সত্য বটে। প্রভো, তোমারই ইচ্ছা। মহারাজ, ভারতভূমির এ অবস্থা কিছু চিরকাল থাকবে না। যে পুরুষোত্তম সাগরময়া বসুধাকে বরাহরূপ ধরে উদ্ধার করেছিলেন, তিনি কি এ পুণ্যভূমিকে চিরবিস্মৃত হয়ে থাকবেন? অদ্যাবধি চন্দ্রসূর্য্যের উদয় হচ্যে, এখনও এক পাদ ধর্ম্ম আছে।
রাজা। আর ভাগ্যে যা আছে, তাই হবে। দেবি, তুমি কৃষ্ণাকে একবার এখানে ডাক ত। আহা! অনেক দিন হলো, মেয়েটিকে ভাল করে দেখি নাই।
অহ। এই যে ডেকে আনি।
তপ। মহিষি, আপনার যাবার আবশ্যক কি? আমিই যাচ্যি।
অহ। (উঠিয়া) বলেন কি, ভগবতি? আপনি যাবেন কেন?
রাজা। (অবলোকন করিয়া) আর কাকেও যেতে হবে না। ঐ দেখ, কৃষ্ণা আপনিই এই দিকে আসচে।
তপ। আহা! মহারাজ, আপনার কি সৌভাগ্য! মহিষি, আপনাকেও আমি শত ধন্যবাদ দি, যে আপনি এ দুর্ল্লভ রত্নটিকে লাভ করেছেন! আহা! আপনি কি স্বয়ং উমাকে গর্ভে ধরেছেন! আপনারা যে পূর্ব্বজন্মে কত পুণ্য করেছিলেন, তার সংখ্যা নাই।
অহ। (উপবেশন করিয়া সজলনয়নে) ভগবতি, এখন এই আশীর্ব্বাদ করুন, যেন মেয়েটি স্বচ্ছন্দে থাকে। তর রূপলাবণ্য, সচ্চরিত্র, আর বিদ্যাবুদ্ধি দেখে, আমার মনে যে কত ভাব উদয় হয়, তা বলতে পারি নে।
(কৃষ্ণকুমারীর প্রবেশ।)
এসো, মা এসো। মা, তুমি কি ভগবতী কপালকুণ্ডলাকে চিনতে পাচ্যো না?
কৃষ্ণা। ভগবতীর শ্রীচরণ অনেক দিন দর্শন করি নাই, তাইতে, মা, ওঁকে প্রথমে চিনতে পারি নাই। (প্রণাম করিয়া) ভগবতি, আপনি এ দাসীর দোষ মার্জ্জনা করুন।
তপ। বৎসে, তুমি চিরসুখিনী হও! (রাণীয় প্রতি) মহিষি, যখন আমি তীর্থযাত্রায় যাই, তখন আপনার এ কনকপদ্মটি মুকুল মাত্র ছিল।
রাজা। বসো, মা, বসো। তুমি ও উদ্যানে কি করছিলে, মা?
কৃষ্ণা। (বসিয়া) আজ্ঞা, আমি ফুলগাছে জল দিয়ে, শিক্ষক মহাশয় যে নূতন তানটি আজ শিখ্য়ে দিয়েছেন, তাই অভ্যাস করছিলাম। পিতঃ, আপনি অনেক দিন আমার উদ্যানে পদার্পণ করেন নাই, তা আজ একবার চলুন! আহা! সেখানে যে কত প্রকার ফুল ফুটেছে, আপনি দেখে কত আনন্দিত হবেন এখন।
অহ। ওটি কি ফুল, মা?
কৃষ্ণা। মা, এটি গোলাব; আমার ঐ উদ্যান থেকে তোমার জন্যে তুলে এনেছি। (মাতার হতে অর্পণ।)
রাজা। পুর্ব্বকালে এ পূষ্প এ দেশে ছিল না। যে সর্পের সহকারে আমরা এ মণিটি পেয়েছি, তার গরলে এ ভারতভূমি প্রতিদিন দগ্ধ হচ্যে।
(দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) এ কুসুমরত্ন দুষ্ট যবনেরাই এ দেশে আনে। (দূরে দুন্দুভিধ্বনি।)
সকলে। (চকিতে) এ কি?
রাজা। রামপ্রসাদ!
নেপথ্যে। মহারাজ?
(ভৃত্যের পুনঃ প্রবেশ।)
রাজা। দেখ্ত, এ দুন্দুভিধ্বনি হচ্যে কেন?
ভৃত্য। যে আজ্ঞা, মহারাজ!
[ প্রস্থান।
রাজা। এ আবার কি বিপদ্ উপস্থিত হলো, দেখ? মহারাষ্ট্রপতি সন্ধি অবহেলা করে, আবার যুদ্ধে প্রবৃত্ত হল্যেন না কি? (উঠিয়া) আঃ, এ ভারত-ভূমিতে এখন এইরূপ মঙ্গলধ্বনিই, লোকের কর্ণকুহরে সচরাচর প্রবেশ করে। আমি শুনেছি যে কোন কোন সাগরে ঝড় অনবরতই বইতে থাকে; তা এ দেশেরও কি সেই দশা ঘটলো! হায়! হায়!—
(ভৃত্যের পুনঃ প্রবেশ।)
কি সমাচার!
ভৃত্য। আজ্ঞা, মহারাজ, সকলই মঙ্গল। জয়পুরের অধিপতি রাজা জগৎসিংহ রায় রাজসম্মুখে কোন বিশেষ কার্য্যের নিমিত্তে দূত প্রেরণ করেছেন।
রাজা। বটে? আঃ রক্ষা হৌক! আমি ভাবছিলাম, বলি বুঝি আবার কি বিপদ্ উপস্থিত হলো।—জয়পুরের অধিপতি আমার পরম আত্মীয়। জগদীশ্বর করুন, যেন তিনি কোন বিপদ্গ্রস্ত হয়ে আমার নিকটে দূত না পাঠিয়ে থাকেন। (তপস্বিনীর প্রতি) ভগবতি, আমাকে এখন বিদায় দিন। (রাণীর অতি) প্রেয়সি, আমাকে পুনরায় রজসভায় যেতে হলো।
অহ। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) জীবিতেশ্বর, এ অধীনীর এমন কি সৌভাগ্য, যে ক্ষণকালও নাথের সহবাসসুখ লাভ করে!
রাজা। দেবি, এ বিষয়ে তোমার আক্ষেপ করা বৃথা। লোকে যাকে নরপতি বলে, বিশেষ বিবেচনা করে দেখলে, সে নরদাস বৈ নয়। অতএব যার এত লোকের সন্তোষণ কতো হয়, সে কি তিলার্দ্ধের নিমিত্তেও বিশ্রাম কত্যে পারে!
[ ভৃত্যের সহিত প্রস্থান।
অহ। ভগবতি, চলুন, তবে আমরাও যাই। (কৃষ্ণার প্রতি) এসো, মা—আমরা তোমার পুষ্পোদ্যানে একবার বেড়িয়ে আসিগে।
কৃষ্ণা। যাবে, মা? চল না।—দেখ, মা, আজ পিতা একবার আমার উদ্যানটি দেখলেন না?
[ সকলের প্রস্থান।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.