প্রথমাঙ্ক — প্রথম গর্ভাঙ্ক
প্রথমাঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
জয়পুর——রাজগৃহ।
(রাজা জয়সিংহ, পশ্চাতে পত্র হস্তে মন্ত্রীর প্রবেশ।)
রাজা। আঃ কি আপদ্! তোমরা কি আমাকে এক মুহূর্ত্তের জন্যেও বিশ্রাম কত্তে দেবে না? তুমিই যা হয় একটা বিবেচনা করগে না।
মন্ত্রী। মহারাজ, অনন্তদেব পৃথিবীর ভার সর্ব্বদা সহ্য করেন। তা আপনি এতে বিরক্ত হবেন না।
রাজা। হা! হা! মন্ত্রিবর, অনন্তদেবের সঙ্গে আমার তুলনাটা কি প্রকারে সঙ্গত হয়। তিনি হলেন দেবাংশ, আমি একজন ক্ষুদ্র মনুষ্য মাত্র। আহার, নিদ্রা, সময়বিশেষে আরাম—এ সকল না হলে আমার জীবন রক্ষা করা দুষ্কর। তা দেখ, আমার এখন কিঞ্চিৎ অলস ইচ্ছা হচ্যে। এ সকল পত্র না হয় সন্ধ্যার পর দেখা যাবে, তাতে হানি কি? যবনদল কিম্বা মহারাষ্ট্রের সৈন্য ত এই মুহূর্ত্তেই এ নগর আক্রমণ কত্যে আস্চে না—
(ধনদাসের প্রবেশ।)
আরে, ধনদাস? এস এস, তবে ভাল আছ ত?
ধন। আজ্ঞা, এ অধীন মহারাজের চিরদাস। আপনার শ্রীচরণপ্রসাদে এর কি অমঙ্গল আছে?
মন্ত্রী। (স্বগত) সব প্রতুল হলো—আর কি? একে মনসা, তায় আবার ধুনার গন্ধ! এ কর্ম্মনাশাটা থাকতে দেখছি কোন কর্ম্মই হবে না। দূর হোক্! এখন যাই। অনিচ্ছুক ব্যক্তির অনুসরণ করা পণ্ড পরিশ্রম।
[ প্রস্থান
রাজা। তবে সংবাদ কি, বল দেখি?
ধন। (সহাস্য বদনে) মহারাজ, এ নিকুঞ্জবনের প্রায় সকল ফুলেই আপনার এক একবার মধুপান করা হয়েছে, নূতনের মধ্যে কেবল ভেরেণ্ডা, ধুতুরা প্রভৃতি গোটা কতক কদর্য ফুল বাকি আছে। কৈ? জয়পুরের মধ্যে মহারাজের উপযুক্ত স্ত্রীলোক ত আর একটিও দেখতে পাওয়া যায় না।
রাজা। সে কি হে? সাগর বারিশূন্য হলো না কি?
ধন। আর, মহারাজ! এমন অগস্ত্য অবিশ্রান্ত শুষতে লাগলে, সাগরে কি আর বারি থাকে?
রাজা। তবে এখন এ মেঘবরের উপায় কি, বল দেখি?
ধন। আজ্ঞা, তার জন্যে আপনি চিন্তিত হবেন না। এ পৃথিবীতে একটা ত নয়, সাতটা সাগর আছে!
রাজা। ধনদাস, তোমার কথা শুনে আমার মনটা বড় চঞ্চল হয়ে উঠলো। তবে এখন উপায় কি, বল দেখি?
ধন। আজ্ঞা, উপায়ের কথা পরে নিবেদন করচি। আপনি অগ্রে এই চিত্রপটখানির প্রতি দৃষ্টিপাত করুন দেখি। এখানি একবার আপনাকে দেখাবার নিমিত্তেই আমি এখানে আনলেম।
রাজা। (চিত্রপট অবলোকন করিয়া) বাঃ, এ কার প্রতিমূর্ত্তি হে? এমন রূপ ত আমি কখন দেখি নাই।
ধন। মহারাজ, আপনি কেন? এমন রূপ, বোধ হয়, এ জগতে আর কেউ কখন দেখে নাই।
রাজা। তাই ত! আহা! কি চমৎকার রূপ! ওহে ধনদাস, এ কমলিনীটি কোন্ সরোবরে ফুটেছে, আমাকে বলতে পার? তা হলে আমি বায়ুগতিতে এখনই এর নিকটে যাই)।
ধন। মহারাজ, এ বিষয়ে এত ব্যস্ত হলে কি হবে? এ বড় সাধারণ ব্যাপার নয়। এ সুধা চন্দ্রলোকে থাকে। এর চারি দিকে রুদ্রচক্র অহর্নিশি ঘুরছে। একটি ক্ষুদ্র মাছিও এর নিকটে যেতে পারে না।
রাজা। কেন? বৃত্তান্তটা কি, বল দেখি শুনি?
ধন। আচ্ছা, মহারাজ—
রাজা। বলই না কেন? তায় দোষ কি?
ধন। মহারাজ, ইনি উদয়পুরের রাজদুহিতা—এঁর নাম কৃষ্ণকুমারী!
রাজা। (সসম্ভ্রমে) বটে? (পট অবলোকন করিয়া) ধনদাস, তুমি যে বলছিলে এ সুধা চন্দ্রলোকে থাকে, সে যথার্থ ই বটে। আহা! যে মহদ্বংশে শত রাজসিংহ জন্ম গ্রহণ করেছেন; যে বংশের যশঃসৌরভে এ ভারতভূমি চির পরিপূর্ণ; সে বংশে এরূপ অনুপমা কামিনীর সম্ভব না হলে আর কোথায় হবে? যে বিধাতা নন্দনকাননে পারিজাত পুষ্পের সৃজন করেছেন, তিনিই এই কুমারীকে উদয়পুরের রাজকুলের ললামরূপে সৃষ্টি করেছেন। আহা, দেখ, ধনদাস—
ধন। আজ্ঞা করুন।
রাজা। তুমি এ বংশনিদান বাপ্পা রায়ের যথার্থ নাম কি, তা জান ত?
ধন। আজ্ঞা― না।
রাজা। সে মহাপুরুষকে লোকে আদর করে বাপ্পা নাম দিয়াছিল; তাঁর যথার্থ নাম শৈলরাজ। আহা! তিনি যে শৈলরাজ, তা এ চিত্রপটখানি দেখলেই বিলক্ষণ জানা যায়!
ধন। কেমন করে, মহারাজ?
রাজা। মর্ মূর্খ! ভগবতী মন্দাকিনী শৈলরাজের গৃহে জন্ম গ্রহণ করেন কি না?
ধন। (স্বগত) মাছ ভায়া টোপটি ত গিলেছেন।—এখন এঁকে কোন ক্রমে ডাঙায় তুলতে পাল্যে হয়!
রাজা। দেখ, ধনদাস!
ধন। আজ্ঞা করুন, মহারাজ!
রাজা। তুমি এ চিত্রপটখানি আমাকে দাও—
ধন। মহারাজ, এ অধীন আপনার ক্রীত দাস; এর যা কিছু আছে, সে সকলই মহারাজের! তবে কি না—তবে কি না—
রাজা। তবে কি, বল?
ধন। আজ্ঞা, এ চিত্রপটখানি এ দাসের নয়; তা হলে মহারাজকে এক্ষণেই দিতেম। উদয়পুর থেকে আমার এক জন বান্ধব এ নগরে এসেছেন। তিনিই আমাকে এ চিত্রপটখানি বিক্রয় কত্যে দিয়েছেন।
রাজা। বেশ ত। তোমার বান্ধবকে এর উচিত মূল্য দিলেই ত হবে!
ধন। (স্বগত) আর যাবে কোথা? এইবার ফাঁদে ফেলেছি। (প্রকাশে) আজ্ঞা, তা হবে না কেন? তিনি বিক্রয় কত্যে এসেছেন; যথার্থ মূল্য পেলে না দেবেন কেন? তবে কি না, তিনি যে মূল্য প্রার্থনা করেন, সেটা কিছু অধিক বোধ হয়।
রাজা। ধনদাস, এ চিত্রপটখানি একটি অমূল্য রত্ন। ভাল, বল দেখি, তোমার বান্ধব কত চান?
ধন। (স্বগত) অমূল্য রত্ন বটে? তবে আর ভয় কি? (প্রকাশে) মহারাজ, তিনি বিশ সহস্র মুদ্রা চান। এর কমে কোন মতেই বিক্রয় কত্যে স্বীকার করেন না। অনেক লোকে তাঁকে ষোল সহস্র মুদ্রা পর্য্যন্ত দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাতে তিনি—
রাজা। ভাল, তবে তিনি যা চান তাই দেওয়া যাবে। আমি কোষাধ্যক্ষকে এক পত্র দি; তুমি তার কাছ থেকে এ মুদ্রা লয়ে তোমার বন্ধুকে দিও। কৈ? এখানে যে লিখবার কোন উপকরণ নাই।
ধন। মহারাজ, আজ্ঞা করেন ত আমি এখনই সব এনে প্রস্তুত করে দি।
রাজা। তবে আন।
ধন। যে আজ্ঞা, আমি এলেম বলে।
[ প্রস্থান।
রাজা। (স্বগত) মহারাজ ভীমসিংহের যে এমন একটি সুন্দরী কন্যা আছে তা ত আমি স্বপ্নেও জানতেন না। হে রাজলক্ষ্ণি, তুমি কোন্ ঋষিবরের অভিশাপে এ জলধিতলে এসে বাস কচ্যো?
(মসীভাজন প্রভৃতি লইয়া ধনদাসের পুনঃপ্রবেশ।)
ধন। মহারাজ, এই এনেছি। (রাজার উপবেশন এবং লিপিকরণ—স্বগত) মন্ত্রণার প্রথমেই ত ফল লাভ হলো। এখন দেখা যাক, শেষটা কিরূপ দাঁড়ায়। কৌশলের ত্রুটি হবে না। তার পর আর কিছু না হয়, জানলেম যে চোরের রাত্রবাসই লাভ। আর মন্দই বা কি? কোন ব্যয় নাই অথচ বিলক্ষণ লাভ হলো!
রাজা। এই নাও। (পত্রদান।)
ধন। মহারাজ, আপনি স্বয়ং দাতা কর্ণ!
রাজা। তুমি আমাকে যে অমূল্য রত্ন প্রদান কল্লে, এতে তোমার কাছে আমি চিরবাধিত থাকলেন।
ধন। মহারাজ, আমি আপনার দাস মাত্র! দেখুন মহারাজ, আপনি যদি এ দাসের কথা শোনেন, তা হলে আপনার অনায়াসে এ স্ত্রীরত্নটি লাভ হয়।
রাজা। (উঠিয়া) বল কি, ধনদাস? আমার কি এমন অদৃষ্ট হবে?
ধন। মহারাজ, আপনি উদয়পুরের রাজকুমারীর সঙ্গে পরিণয় ইচ্ছা প্রকাশ করবামাত্রেই, আপনার সে আশা ফলবতী হবে, সন্দেহ নাই। আপনার পূর্ব্বপুরুষেরা ঐ বংশে অনেক বার বিবাহ করেছেন; আর আপনি কুলে, মানে, রূপে, গুণে সর্ব্বপ্রকারেই কুমারী কৃষ্ণার উপযুক্ত পাত্র। যেমন পঞ্চালদেশের ঈশ্বর দ্রুপদ তাঁর কৃষ্ণাকে পৌরবকুলতিলক পার্থকে দিতে ব্যগ্র ছিলেন, আপনার নাম শুনলে মহারাজ ভীমসেনও সেইরূপ হবেন।
রাজা। হাঁ—উদয়পুরের রাজসংসারে আমার পূর্ব্বপুরুষেরা বিবাহ করেন বটে; কিন্তু মহারাজ ভীমসেন নিতান্ত অভিমানী, যদি তিনি এ বিষয়ে অসম্মত হন, তবে ত আমার আর মান থাকবে না।
ধন। মহারাজ, আপনি সূর্য্যবংশচূড়ামণি! মহোদয় ব্যক্তিরা আপনাদের গুণবিষয়ে প্রায়ই আত্মবিস্মৃত। এই জন্যে আপনি আপন মাহাত্ম্য জানেন না। জনক রাজা কি দাশরথিকে অবহেলা করেছিলেন?
রাজা। (চিন্তা করিয়া) আচ্ছা—তুমি একবার মন্ত্রিবরবে ডাক দেখি।
ধন। যে আজ্ঞা, মহারাজ।
[ প্রস্থান।
রাজা। (স্বগত) দেখি, মন্ত্রীর কি মত হয়। এ বিষয়ে সহসা হস্তক্ষেপ করাটা উচিত নয়। আহা, যদি ভীমসিংহ এতে সম্মত হন, তবে আমার জন্ম সফল হবে। (উপবেশন।)
(মন্ত্রীর সহিত ধনদাসের পুনঃপ্রবেশ।)
মন্ত্রী। দেব, অনুমতি হয় ত, এ-পত্র কখানি রাজসম্মুখে পাঠ করি।
রাজা। (সহাস্য বদনে) না, না! ও সব সন্ধ্যার পরে দেখা যাবে। এখন বসো। তোমার সঙ্গে আমার অন্য কোন কথা আছে।
মন্ত্রী। (বসিয়া) আজ্ঞা করুন।
রাজা। দেখ, মন্ত্রিবর, মহারাজ ভীমসিংহের কি কোন সন্তান সন্ততি আছে?
মন্ত্রী। আজ্ঞা, হাঁ আছে।
রাজা। কয় পুত্ত্র, কয় কন্যা, তা তুমি জান?
মন্ত্রী। আজ্ঞা না, এ আশীর্ব্বাদক কেবল রাজকুমারী কৃষ্ণার নাম শ্রুত আছে।
ধন। মহাশয়, রাজকুমারী কৃষ্ণা নাকি পরম সুন্দরী!
মন্ত্রী। লোকে বলে যে যাজ্ঞসেনী স্বয়ং পুনরায় ভূমণ্ডলে অবতীর্ণা হয়েছেন!
ধন। তবে, মহাশয়, আপনি আমাদের মহারাজের সঙ্গে এ রাজকুমারীর বিবাহের চেষ্টা পান না কেন? মহারাজও ত স্বয়ং নরনারায়ণ অবতার!
মন্ত্রী। তার সন্দেহ কি? তবে কি না এতে যৎকিঞ্চিৎ বাধা আছে।
রাজা। কি বাধা?
মন্ত্রী। আজ্ঞা, মহারাজ, মরুদেশের মৃত অধিপতি বীরসিংহের সঙ্গে এই রাজকুমারীর পরিণয়ের কথা উপস্থিত হয়েছিল; পরে তিনি অকালে লোকান্তর প্রাপ্ত হওয়াতে সে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় নাই। আমি পরম্পরায় শুনেছি যে, সে দেশের বর্ত্তমান নরপতি মানসিংহ নাকি এই কন্যার পাণিগ্রহণ কত্যে ইচ্ছা করেন।
রাজা। বটে? বামন হয়ে চাঁদে হাত! এই মানসিংহ একটা উপপত্নীর দত্তক পুত্ত্র, এ কথা সর্ব্বত্র রাষ্ট্র। তা এ আবার কৃষ্ণকুমারীকে বিবাহ কত্যে চায়? কি আশ্চর্য্য! দুরাত্মা রাবণ কি বৈদেহীর উপযুক্ত পাত্র? দেখ, মন্ত্রি, তুমি এই দণ্ডেই উদয়পুরে লোক পাঠাও। আমি এ রাজকন্যাকে বরণ করবো। (উঠিয়া) মানসিংহ যদি এতে কোন অত্যাচার করে, তবে আমি তাকে সমুচিত প্রতিফল না দিয়া ক্ষান্ত পাব না!
মন্ত্রী। ধর্ম্মাবতার, এ কি ঘেরাও বিবাদের সময়? দেখুন, দেশবৈব্বিদল চতুর্দ্দিকে দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছে।
রাজা। আঃ, দেশবৈরিদল! তুমি যে দেশবৈরিদলের কথা ভেবে একবারে বাতুল হলে!এক যে দিল্লীর সম্রাট, তিনি ত এখন বিষহীন ফণী। আর যদি মহারাষ্ট্রের রাজার কথা বল, সেটা ত নিতান্ত লোভী।
যৎকিঞ্চিৎ অর্থ, পেলেই ত তার সন্তোষ। তা যাও। তুমি এখন যথাবিধি দূত প্রেরণ করগে। মানসিংহের কি সাধ্য যে, সে আমার সঙ্গে বিবাদ করে?
ধন। (জনান্তিকে) মহারাজ, এ দাসকে পাঠালে ভাল হয় না?
রাজা। (জনান্তিকে) সে ত ভালই হয়। তুমি একজন সদ্বংশজাত ক্ষত্রিয়, তোমার যাওয়ায় হানি কি? (প্রকাশে) দেখ, মন্ত্রি, ভূমি ধনদাসকে উদয়পুরে পাঠায়ে দাও।
মন্ত্রী। যে আজ্ঞা, মহারাজ। (ধনদাসের প্রতি) মহাশয়, আপনি তবে আমার সঙ্গে আসুন। এ বিষয়ে যা কর্ত্তব্য সেটা স্থির করা যাকগে।
রাজা। যাও, ধনদাস, যাও।
ধন। যে আজ্ঞা, মহারাজ।
[ মন্ত্রী এবং ধনদাসের প্রস্থান।
রাজা। (পরিক্রমণ করিয়া স্বগত) আহা, এমন মহার্হ রত্ন কি আমার ভাগ্যে আছে? তা দেখি, বিধাতা কি করেন। ধনদাস অত্যন্ত সুচতুর মানুষ; ও যদি সুচারুরূপে এ কর্ম্মটা নির্ব্বাহ কত্যে না পারে, তবে আর কে পারবে!
(ধনদাসের পুনঃপ্রবেশ।)
ধন। মহারাজ,—
রাজা। কি হে, তুমি যে আবার ফিরে এলে?
ধন। আজ্ঞা, মন্ত্রী মহাশয়ের সঙ্গে আমার একটা কথার ঐক্য হচ্যে না। তারই জন্যে আবার রাজসম্মুখে এলেন।
রাজা। কি কথা?
ধন। আজ্ঞা, এ দাসের বিবেচনায় কতকগুলি সৈন্য সঙ্গে নিলে ভাল হয়। কিন্তু মন্ত্রী এতে এই আপত্তি করেন যে, তা কত্যে গেলে অনেক অর্থের ব্যয় হবে।
রাজা। হা! হা! হা! বৃদ্ধ হলে লোকের এমনি বুদ্ধিই ঘটে! তবে মন্ত্রীর কি ইচ্ছা যে তুমি একলা যাও।
ধন। আজ্ঞা, এক প্রকার তাই বটে।
রাজা। কি লজ্জার কথা! একে ত মহারাজ ভীমসেন অত্যন্ত অভিমানী, তাতে এ বিষয়ে যদি কোন ত্রুটি হয়, তা হলেই বিপরীত ঘটে উঠবে।
ধন। আজ্ঞা, তার সন্দেহ কি? এ দাসও তাই বলছিল।
রাজা। আচ্ছা—তুমি মন্ত্রীকে এই কথা বলগে, তিনি তোমার সঙ্গে এক শত অশ্ব, পাঁচটা হস্তী, আর এক সহস্র পদাতিক প্রেরণ করেন। এ বিষয়ে কৃপণতা কল্যে কায হবে না।
ধন। মহারাজ, আপনি প্রতাপে ইন্দ্র, ধনে কুবের, আর বুদ্ধে স্বয়ং বৃহস্পতি অবতার। বিবেচনা করে দেখুন, যখন সুরপতি বাসব সাগর মন্থন কর্যে অমৃতলাভের বাসনা করেছিলেন, তখন কি তিনি সে বৃহৎ ব্যাপারে একলা প্রবৃত্ত হয়েছিলেন?
রাজা। দেখ, ধনদাস,—
ধন। আজ্ঞা করুন—
রাজা। যেমন নলরাজা রাজহংসকে দময়ন্তীর নিকটে দূত করে পাঠিয়েছিলেন, আমিও তোমাকে তেমনি পাঠাচ্ছি। দেখ, ধনদাস, আমার কর্ম্ম যেন নিষ্ফল না হয়।
ধন। মহারাজ, আপনার কর্ম্ম সাধন কত্যে যদি প্রাণ যায়, তাতেও এ দাস প্রস্তুত; কিন্তু রাজচরণে একটি নিবেদন আছে।
রাজা। কি?
ধন। মহারাজ, নলরাজা যে হংসকে দূত করে পাঠিয়ে লেন, তার সোনার পাখা ছিল; এ দাসের কি আছে, মহারাজ?
রাজা। (সহাস্য বদনে) এই নাও। তুমি এই অঙ্গুরীটি গ্রহণ কর।
ধন। মহারাজ, আপনি স্বয়ং দাতা কর্ণ!
রাজা। তবে আর বিলম্ব কেন? তুমি মন্ত্রীর নিকট গিয়ে, অদ্যই যাতে যাত্রা করা হয়, এমন উদ্যোগ করগে। যাও, আর বিলম্ব করো না। আমি এখন বিলাসকাননে গমন করি।
ধন। (স্বগত) এখন তোমার যেখানে ইচ্ছা, গমন কর। আমার যা কর্ম্ম তা হয়েছে। (পরিক্রমণ) ধনদাস বড় সামান্য পাত্র নন্। কোথায় উদয়পুরের একজন বণিকের চিত্রপট কৌশলক্রমে প্রায় বিনা মূল্যেই হস্তগত করা হলো; আবার তাই রাজাকে বিক্রয় করে বিলক্ষণ অর্থ সংগ্রহ করলেম! এ কি সামান্য বুদ্ধির কর্ম্ম! হা! হা! হা! বিশ সহস্র মুদ্রা! হা! হা! হা! মধ্যে থেকে আবার এই অঙ্গুরীটিও লাভ হয়ে গেল! (অবলোকন করিয়া) আহা! কি চমৎকার মণিখানি! আমার প্রপিতামহও এমন বহুমূল্য মণি কখন দেখেন নাই! যা হোক, ধন্য ধনদাস। কি কৌশলই শিখেছিলে! জ্যোতির্বেত্তারা বলে থাকেন যে গ্রহদল রবিদেবের সেবা কর্যে তাঁর প্রসাদেই তেজঃ লাভ করেন; আমরাও রাজ-অনুচর; তা আমরা রাজপূজায় অর্থলাভ না করি, তবে আর কিসে করব? তা এই ত চাই! আরে, এ কালে কি নিতান্ত সরল হলে কাজ চলে! কখন বা লোকের মিথ্যা গুণ গাইতে হয়; কখন বা আহেতু দোষারোপ কত্যে হয়; কারো বা দুটো অসত্য কথায় মনঃ রাখতে হয় আর কারু কারু মধ্যে বা বিবাদ বাধিয়ে দিতে হয়; এই ত সংসারের নিয়ম। অর্থাৎ, যেমন কর্যে হৌক, আপনার কার্য্য উদ্ধার করা চাই! তা না করে, যে আপনার মনের কথা ব্যক্ত করে ফেলে, সেটা কি মানুষ? হুঃ! তার মন তো বেশ্যার দ্বার বল্যেই হয়! কোন আবরণ নাই। যার ইচ্ছা সেই প্রবেশ কত্যে পারে! এরূপ লোকের ত ইহকালে অন্ন মেলা ভার আর পরকালে—পরকাল কি? পরকালে বাপ নির্ব্বংশ—আর কি! হা! হা! যাই, অগ্রে ত টাকাগুলো হাত করিগে; পরে একবার মন্ত্রীর কাছে যেতে হবে। আঃ, সেটা আবার এক বিষম কণ্টক! ভাল, দেখা যাক, মন্ত্রীভায়ার কত বুদ্ধি।
[ প্রস্থান।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.