উদয়পুর—একলিঙ্গের মন্দির-সম্মুখে। (ভৃত্যের প্রবেশ।) ভৃত্য। (স্বগত) উঃ কি অন্ধকার! আকাশে একটিও তারা দেখা যায় না। (চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিয়া) কি ভয়ানক স্থান। এখানে যে কত প্রেত, কত পিশাচ থাকে, তার কি সংখ্যা আছে। মহারাজ যে এমন সময়ে এ দেউলে কেন এলেন, তা ত কিছুই বুঝতে পাচ্যি না। (সচকিতে) ও বাবা! ও কি ও? তবে ভাল!—একটা পেঁচা। আমার প্রাণটা একবারে উড়ে গেছলো! শুনেছি, পেঁচাগুলো ভূতুড়ে পাধী। তা হতে পারে। ও মধুর স্বর ভূতের কানে বই আর কার কানে ভাল লাগবে। দূর! দূর! (পরিক্রমণ) কি আশ্চর্য‍্য! আজ ক দিন হলো, মহারাজ অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। আহার, নিজা রাজকর্ম্ম, সকলই একবারে পরিত্যাগ করেছেন, আর সর্ব্বদাই “হে বিধাতঃ, আমার কপালে কি এই ছিল। হা! বৎসে কৃষ্ণা, যে তোমার রক্ষক, তাকেই কি আবার গ্রহদোষে তোমার ভক্ষক হতে হলো।” কেবল এই সকল কথাই ওঁর মুখে শুনতে পাই। (নেপথ্যে পদশব্দ— সচকিতে) ও আবার কি? লম্বা যেন তালগাছ! ও বাবা! কি সর্ব্বনাশ! এ কি নন্দী না ভৃঙ্গী, না বীরভদ্র? বুঝি বীরভদ্রই হবে। তা না হলে এমন দীর্ঘ আকার আর কার আছে! উঃ! ও বাবা! এই দিকেই যে আসচে। (রক্ষকের প্রবেশ।) কে ও? ও! রঘুবরসিংহ! আঃ! বাঁচলেম। আমি, ভাই, তোমাকে বীরভদ্র ভেবে পলাতে উদ্যত হয়েছিলাম। তা তুমিও প্রায় বীরভদ্র বট। রক্ষ। চুপ কর হে। এত চেঁচিয়ে কথা কইও না। ভৃত্য। কেন? কেন? কি হয়েছে? রক্ষ। মহারাজ, বোধ হয়, অত্যন্ত সঙ্কটে পড়েছেন; বাঁচেন কি না, সন্দেহ। ভৃত্য। বল কি, রঘুবরসিংহ? রক্ষ। মহারাজ থেকে থেকে কেবল মূর্চ্ছা যাচ‍্যেন। ভগবান্ শম্ভুদাস আর তাঁর প্রধান প্রধান চেলারা অনেক ঔষধপত্র দিচ‍্যেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়ে উঠচে না। আহাঃ, মহারাজের দুঃখ দেখলে বুক ফেটে যায়। আর রাজকুমার বলেন্দ্রও, দেখচি, অত্যন্ত কাতর। দেখ, ভাই, বড় ঘরে ভেয়ে ভেয়ে এমন প্রণয় আমি কোথাও দেখি নাই। দুই জনে যেন এক প্রাণ। ভৃত্য। তার সন্দেহ কি? রক্ষ। তুমি ত, ভাই, সর্ব্বদাই মহারাজের কাছে থাক। তা মহারাজের এমন হবার কারণটা কিছু বুঝতে পার? ভৃত্য। কৈ, না! কেন? তুমিও ত, ভাই, রাজকুমারের ওখানে থাক। তা তুমি কি কিছু জান না? রক্ষ। কে জানে, ভাই, কিছুই ত বুঝতে পারি না। তবে অনুমানে বোধ হয়, রাজকুমারী কৃষ্ণার বিবাহ বিষয়ই এ বিপদের মূল কারণ; দেখ, এ কয়েক দিন সেনানী মহাশয়ের আর মন্ত্রী মহাশয়ের মুখে সর্ব্বদা তাঁরই নাম শুনতে পাই। ভৃত্য। বটে? আমিও, ভাই, মহারাজের মুখে তাই শুনি। (বলেন্দ্রসিংহের প্রবেশ।) বলে। (স্বগত) কি সর্ব্বনাশ। এ কি আমার কর্ম্ম; হস্তী সুকুমার কুসুমকে দলন করে ফেলে বটে? তা সে পশু বৈ নয়। রূপ লাবণ্য গুণবিষয়ে তার চক্ষুঃ অন্ধ। কিন্তু মনুষ্য কি কখন পশুর কাজ কত্যে পারে? না, না, এ আমার কর্ম্ম নয়! আমার এখনি এ স্থান হতে প্রস্থান করাই কর্ত্তব্য। (প্রকাশে) রঘুবরসিংহ? রক্ষ। কি আজ্ঞা, বীরপতি! বলে। শীঘ্র আমার ঘোড়া আনতে বলো। রক্ষ। যে আজ্ঞা! (ভৃত্যের প্রতি) ওহে, বড় অন্ধকারটা হয়েছে; এসো না, ভাই, আমরা দুজনেই যাই। ভৃত্য। আচ্ছা চল। [ উভয়ের প্রস্থান। (মন্ত্রীর প্রবেশ।) মন্ত্রী। (হস্ত ধরিয়া) রাজকুমার, রক্ষা করুন, আর কি বলবো? আপনি এত বিরক্ত হলে সর্ব্বনাশ হয়! আসুন, মহারাজ আপনাকে আবার ডাকছেন। বলে। (হস্ত ছাড়াইয়া) তুমি বল কি, মন্ত্রি! আমি কি চণ্ডাল? না পাষণ্ড? এ কি আমার কর্ম্ম? এ কলঙ্কসাগরে মহারাজ আমাকে কেন মগ্ন কত‍্যে চান? অ্যাঁ? আমি কি বলে মনকে প্রবোধ দেবো, বল দেখি? কৃষ্ণা আমার প্রাণপুত্তলিকা। আমি কেমন করে নিরপরাধে তার প্রাণ বিনষ্ট করি?—ঐহিক সুখের জন্যে লোক পরকাল নষ্ট করে; কেন না, পরকালে যে কি ঘটবে, তার নিশ্চয় নাই। কিন্তু তুমি বল দেখি, পাপ কর্ম্মের প্রতিফল কি ইহ কালেও ভোগ কত‍্যে হয় না?—মন্ত্রি, তুমি এ ঘৃণাস্পদ কর্ম্ম কত‍্যে আমাকে আর অনুরোধ করো না। মন্ত্রী। (হস্ত ধরিয়া) রাজকুমার, আপনি মন্দিরের ফিরে আসুন। এ সব কথার যোগ্য স্থল এ নয়। [ উভয়ের প্রস্থান (চারি জন সন্ন্যাসীর প্রবেশ।) সকলে। (মন্দিরের সম্মুখে প্রণাম করিয়া) বোম্ ভোলানাথ! (সকলের উপবেশন এবং শিবস্তব গীতান্তে) বোম্‌ মহাদেব! প্রথম। গোঁসাই জি, আপনি যে বলছিলেন, অদ্য রাত্রে মহারাজের কোন বিপদ হবে, এর কারণ কি? আর আপনিই বা তা কি প্রকারে জানতে পারলেন? দ্বিতীয়। বাপু, তোমরা আমার চেলা। অতএব তোমাদের নিকট আমার কোন বিষয় গোপন রাখা অতি অকর্ত্তব্য। অদ্য সায়ংকালীন ধ্যানে দেখলেন, যেন দেবদেবের চক্ষে জলধারা পড়ছে! কিঞ্চিৎ পরে রাজভবনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করাতে বোধ হলো, যেন সে স্থল হতে একটা রক্তস্রোতঃ নির্গত হচ্যে। তৎপরে আকাশের প্রতি দৃষ্টিপাত করে দেখলেম, যেন প্রচণ্ড অগ্নিতে লক্ষ্মীদেবী দগ্ধ হচ্যেন, আর সকল দেবগণ হাহাকার কচ‍্যেন। এ সকলের পরেই এই ঘোরতর অন্ধকার আর মেঘগর্জ্জন আরম্ভ হলো। বাপু, এ সকল কুলক্ষণ। এতে যেন কোন বিশেষ বিপদ্ উপস্থিত হবে তার সন্দেহ নাই। প্রথম। তা আপনি কেন মহারাজকে এ বিষয় জ্ঞাত করান না। দ্বিতীয়। বাপু, বিধাতার যা নির্ব্বন্ধ তা অবশ্যই ঘটবে; অতএব মহারাজকে এ বিষয় জ্ঞাত করালে কেবল তাঁকে উদ্বিগ্ন করা হবে। আর কোন উপকার নাই। তৃতীয়। এই ত এক যুদ্ধ উপস্থিত, আর কি বিপদ ঘটতে পারে? দ্বিতীয়। তা কেবল ভগবান্ একলিঙ্গই জানেন। আমার অনুমান হয়, যার নিমিত্তে এই যুদ্ধ উপস্থিত, তার প্রতিই কোন অনিষ্ট ঘটতে পারে। যা হউক, সে কথায় আর প্রয়োজন নাই! এক্ষণে চল, আমরা এ স্থান হতে প্রস্থান করি। আকাশ যেরূপ মেঘাবৃত হয়েছে, বোধ হয়, অতি ত্বরায় একটা ভয়ানক ঝড়-বৃষ্টি হবে। সকলে। বোম্ কেদার! হর-হর-হর! বোম্‌-বোম্‌-বোম্‌! [ সকলের প্রস্থান। (বলে এবং মন্ত্রীর পুনঃ প্রবেশ।) মন্ত্রী। রাজকুমার, পিতৃসত্যপালনহেতু রঘুপতি রাজভোগ পরিত্যাগ করে বনবাসে গিয়েছিলেন। জ‍্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতৃতুল্য। তা মহারাজের আজ্ঞা অবহেলা করা আপনার কোন মতেই উচিত হয় না। বলে। আর ও সব কথায় আবশ্যক কি? আমি যখন মহারাজের পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছি, তখন কি আর তোমার মনে কোন সন্দেহ আছে? মন্ত্রী। আজ্ঞা, না, তা কেমন করে থাকবে! বলে। দেখ, মন্ত্রি, তুমি মহারাজকে সাবধানে রাজপুরে আন। হায়! হায়! আমার অদৃষ্টে এমন কেম ঘটলো? অবশ্য আমার পূর্ব্বজন্মে কোন পাপ ছিল; তা না হলে— (নেপথ্যে)। বীরবর, আপনার ঘোড়া প্রস্তুত। বলে। আচ্ছা। আমি চললেম, মন্ত্রি। [ প্রস্থান। মন্ত্রী। (স্বগত) রাজকুমার যে এ দুরূহ কর্ম্মে সম্মত হবেন, এমন ত কোন সম্ভাবনাই ছিল না। যাহা হউক, এখন বহু কষ্টে সম্মত হলেন। আহা! রাজকুমারী কৃষ্ণার মৃত্যু ভিন্ন তার কোন উপায় নাই। হায়, হায়। হে বিধাতঃ, এ কি তোমার সামান্য বিড়ম্বনা। (রাজার প্রবেশ।) রাজা। সত্যদাস, বলেন্দ্র কি গেছে? হায়, হায়! হে বিধাতঃ, আমার অদৃষ্টে কি তুমি এই লিখেছিলে। বাছা, আমি কি আর তোমার সে চন্দ্রানন দেখতে পাব না? হায়, হায়। ছিঃ, আমি কি পাষণ্ড! নরাধম—— মন্ত্রী। মহারাজ, এখন চলুন, রাজপুরে চলুন। রাজা। সত্যদাস, আমি ও মশানে আর কেমন করে প্রবেশ করবো? মন্ত্রী। ধর্ম্মাবতার,—— রাজা। সত্যদাস, তুমি আমাকে কেন আর ধর্ম্মাবতার বল? আমি চণ্ডাল অপেক্ষাও অধম। আমি স্বয়ং কলি অবতার। মন্ত্রী। মহারাজ, এ সকল বিধাতার ইচ্ছা বৈ ত নয়! (ঝড় ও আকাশে মেঘগর্জ্জন।) রাজা। (আকাশের প্রতি কিঞ্চিৎ দৃষ্টিপাত করিয়া) রজনী দেবী বুঝি এ পামরের গর্হিত কর্ম্ম দেখে, এই প্রচণ্ড কোপ ধারণ করেছেন; আর চন্দ্র ও নক্ষত্র প্রভৃতি মণিময় আভরণ পরিত্যাগ করে, চামুণ্ডা-রূপে গর্জ্জন কচ‍্যেন। উঃ! কি ভয়ানক ব্যাপার! কি কালস্বরূপ অন্ধকার! হে তমঃ, তুমি কি আমাকে গ্রাস কতো উদ্যত হয়েছো? উঃ! মেঘবাহন অন্ধকারকে পুনঃ পুনঃ ঐ দীপ্তিমান্ কশাঘাত করে যেন দ্বিগুণ ক্রোধান্বিত কচ‍্যেন। বজ্রের কি ভয়ঙ্কর শব্দ! এ কি প্রলয়কাল! তা আমার মস্তকে কেন বজ্রাঘাত হউক না? (ঊর্দ্ধ্বে অবলোকন করিয়া) হে কাল, আমাকে গ্রাস কর। হে বজ্র! এ পাপাত্মাকে বিনষ্ট কর। হে নিশাদেবি! এ পাষণ্ডকে পৃথিবীতে আর কেন রাখ! বিনাশ কর।—কৈ? এখনও বজ্রাঘাত হলো না?—কৈ? বিলম্ব কেন। (হতজ্ঞানে আপন মস্তকে হস্ত দিয়া) এই নেও!—এই নেও! (কিঞ্চিৎ নীরব) কৈ? বজ্র ভয়ে পলায়ন কল্যেন নাকি? (বিকট হাস্য।) মন্ত্রী। (স্বগত) এ কি বিপদ্ উপস্থিত! মহারাজ যে ক্ষিপ্তপ্রায় হলেন। (প্রকাশে) মহারাজ, আপনি ও কি করেন? আসুন, এক্ষণে রাজপুরে যাই। রাজা। (না শুনিয়া) পরমেশ্বর কি কল্যে?—মৃত্যু হবে না? কেন হবে না? কেন?—কেন?—অ্যাঁ! কি হবে? তবে কি হবে?—আমার কি হবে? (রোদন।) মন্ত্রী। (স্বগত) এ কি সর্ব্বনাশ! এখন কি করি? এঁকে লয়ে যাবার উপায় কি? রাজা। এ কি? ও মা কৃষ্ণা! কেন, মা?—এস, এস, একবার তোমার মস্তক চুম্বন করি। তোমার কি হয়েছে, মা?—আহা!—আমি যে তোমার দুঃখী পিতা, মা। যাকে তুমি এত ভাল বাসতে।—(রোদন) ও কি ভাই বলেন্দ্র? ও কি?—ও কি?—কি কর?—কি কর? এমন কর্ম্ম—ওঃ—(মূর্চ্ছাপ্রাপ্তি।) মন্ত্রী। (স্বগত) এ কি? এ কি? সর্ব্বনাশ।—কি হবে? এখানে যে কেউ নাই। (উচ্চৈঃস্বরে) কে আছিস্ রে! (ভৃত্য ও রক্ষকের প্রবেশ।) ভৃত্য। এ কি?—কি সর্ব্বনাশ। মন্ত্রী। ধর, ধর, মহারাজকে শীঘ্র রাজপুরে লয়ে চল। [ রাজাকে লইয়া প্রস্থান।