দ্বিতীয়াঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক প্রতিষ্ঠানপুরী—রাজপথ। (দুই জন নাগরিকের প্রবেশ।) প্রথম। ভাল, মহাশয়, আপনার কি এ কথাটা বিশ্বাস হয়? দ্বিতীয়। বিশ্বাস না করেই বা করি কি?—ফলে মহারাজ যে উন্মাদপ্রায় হয়েছেন, তার আর সংশয় নাই। প্রথ। বলেন কি? আহা! মহাশয়, কি আক্ষেপের বিষয়! এত দিনের পর কি নিষ্কলঙ্ক চন্দ্রবংশের কলঙ্ক হলো? দ্বিতী। ভাই, সে বিষয়ে তোমার আক্ষেপ করা বৃথা। এমন মহাতেজাঃ যশস্বী বংশের কি কখন কলঙ্ক বা ক্ষয় হতে পারে? দেখ, যেমন দুষ্ট রাহু এই বংশনিদান নিশানাথকে কিঞ্চিৎকাল মলিন করে পরিশেষে পরাভূত হয়, সেইরূপ এ বিপদ্ও অতি ত্বরায় দূর হবে, সন্দেহ নাই। প্রথ। আহা! পরমেশ্বর কৃপা করে যেন তাই করেন! মহাশয়, আমরা চিরকাল এই বিপুলবংশীয় রাজাদিগের অধীন, অতএব এর ধ্বংস হলে আমরাও একবারে সমূলে বিনষ্ট হবো। দেখুন, বজ্রাঘাতে যদি কোন বিশাল আশ্রয়তরু জ্বলে যায়, তবে তার আশ্রিত লতাদির কি দূরবস্থা না ঘটে! দ্বিতী। হাঁ, তা যথার্থ বটে; কিন্তু ভাই, তুমি এ বিষয়ে নিতান্ত ব্যাকুল হইও না। প্রথ। মহাশয়, এ বিষয়ে ধৈর্য্য ধরা কোন মতেই সম্ভবে না; দেখুন, মহারাজ রাজকার্য্যে একবারও দৃষ্টিপাত করেন না; রাজধর্ম্মে তাঁর এককালে ঔদাস্য হয়েছে। মহাশয়, আপনি একজন বহুদর্শী এবং সুবিজ্ঞ মনুষ্য, অতএব বিবেচনা করুন দেখি, যদ্যপি দিনকর সতত মেঘাচ্ছন্ন থাকেন, তবে কি পৃথিবীতে কোন শস্যাদি জন্মে? আর দেখুন, বস্তুপি কোন পতিপরায়ণা রমণীর প্রিয়তম তার প্রতি হতশ্রদ্ধা করে, তবে কি সে স্ত্রীর পূর্ব্ববৎ রূপলাবণ্যাদি আর থাকে? রাজ-অবহেলার রাজলক্ষ্মী ও প্রতিদিন সেইরূপ শ্রীভ্রষ্টা হচ‍্যেন। দ্বিতী। ভাই হে, তুমি যা বল্‌লে, তা সকলই সত্য, কিন্তু তুমি এ বিষয়ে নিতান্ত বিষণ্ণ হয়ো না। বোধ করি, কোন মহিলার প্রতি মহারাজের অনুরাগ সঞ্চার হয়ে থাক্‌বে, তাই তাঁর চিত্ত সততই চঞ্চল। যা হউক, নরপতির এ চিত্তবিকার কিছু চিরস্থায়ী নয়, অতি শীঘ্রই তিনি সুস্থ হবেন। দেখ, সুরাপায়ী ব্যক্তি কিছু চিরকাল উন্মত্তভাবে থাকে না। আমাদের নরবর অধুনা আসক্তিরূপ সুরাপানে কিঞ্চিৎ উম্মত্ত হয়েছেন বটে, কিন্তু কিছু বিলম্বে যে তিনি স্বভাবস্থ হবেন, তার কোন সন্দেহ নাই। প্রথ। মহাশয়! সে সকল ভাগ্য অপেক্ষা করে। আহা! নরপতি যে এরূপ অবস্থায় কালযাপন করবেন, এ আমাদের স্বপ্নেরও অগোচর! দ্বিতী। (সহাস্য বদনে) ভাই, তোমার নিতান্ত শিশুবুদ্ধি। দেখ, এই বিপুলা পৃথিবী কামস্বরূপ কিরাতের মৃগয়াস্থান; তিনি ধনুর্ব্বাণ গ্রহণপূর্ব্বক মৃগমিথুনরূপ নরনারী লক্ষ্যভেদে অনবরতই পর্য‍্যটন কচ‍্যেন; অতএব এই ভূমণ্ডলে কোন্ ব্যক্তি এমত জিতেন্দ্রিয় আছে, যে তাঁর শরপথ অতিক্রম করতে পারে? দৈত্য-দেশের রমণীগণ অত্যন্ত মায়াবিনী, আর তারা নানাবিধ মোহন গুণে নিপুণ; সুতরাং, নরপতি যৎকালে মৃগয়ার উপলক্ষে সে দেশে প্রবেশ করেছিলেন, বোধ করি, সে সময়ে কোন সুরূপা কামিনী তাঁর দৃষ্টিপথে পড়ে কটাক্ষবাণে তাঁর চিত্ত চঞ্চল করেছে। যা হউক, যদিও মহারাজ কোন বনকুসুমের আঘ্রাণে একান্ত লোভাসক্ত হয়ে থাকেন, তথাপি স্বীয় উদ্যানের সুরভি পুষ্পের মাধুর্য্যে যে ক্রমশঃ তাঁর সে লোভসম্বরণ হবে, তার কোন সংশয় নাই। তুমি কি জান না ভাই, যে ব্রহ্ম-অস্ত্র ব্রহ্ম-অস্ত্রেই নিরস্ত হয়, আর বিষই বিষের পরমৌষধ! প্রথ। আজ্ঞা হাঁ, তা যথার্থ। ফলতঃ, এক্ষণে মহারাজ সুস্থ হলেই আমাদের পরম লাভ। দেখুন, এই চন্দ্রবংশীয় রাজগণ দেবসখা; আমি শুনেছি, যে লোকেরা ঔষধ আর মন্ত্রবলে প্রাণিসমূহের প্রাণনাশ কত্যে পারে, অতএব পরমেশ্বর এই করুন, যেন কোন দুর্দ্দান্ত দানব দেবমিত্র বলে মহারাজকে সেইরূপ না করে থাকে। দ্বিতী। ভাই, ঔষধ কি মন্ত্রবলে যে লোককে বিমোহিত করা, এ আমার কখনই বিশ্বাস হয় না, কিন্তু স্ত্রীলোকেরা যে পুরুষজাতিকে কটাক্ষস্বরূপ ঔষধে আর মধুরভাষারূপ মন্ত্রে মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়, এ কথা অবশ্যই বিশ্বাস্য বটে। (দৃষ্টিপাত করিয়া) এ ব্যক্তিটে কে হে? (কপিলের দূরে প্রবেশ।) প্রথ। বোধ হয়, কোন তপস্বী, দুরাচার রাক্ষসেরা যজ্ঞভূমে উৎপাত করাতে বুঝি মহারাজের শরণাপন্ন হতে আসচেন। দ্বিতী। কি কোন মহর্ষির শিষ্যই বা হবেন। কপিল। (স্বগত) মহর্ষি গুরু শুক্রাচার্য্যের আদেশানুসারে এই ত মহারাজ যযাতির রাজধানীতে অদ্য উপস্থিত হলেম। আঃ, কত দুস্তর নদ, নদী, ও কান্তার অরণ্য প্রভৃতি যে অতিক্রম করেছি, তার আর পরিসীমা নাই। অধুনা মহর্ষিও স্বপরিবার সঙ্গে গোদাবরী-ভীরে ভগবান্ পর্ব্বতমুনির আশ্রমে আমার প্রত্যাগমন আশায় বাস করছেন। মহারাজ যযাতি সে আশ্রমে গমন কল্যে, তপোধন তাঁকে স্বীয় কন্যা সম্প্রদান করবেন। মহারাজকে আহ্বান করতেই আমার এ নগরীতে আগমন হয়েছে। আহা! নরাধিপের কি অতুল ঐশ্বর্য্য। স্থানে স্থানে কত শত প্রহরিগণ গজবাজি আরোহণপূর্ব্বক করতলে করাল করবাল ধারণ করে রক্ষাকার্য্যে নিযুক্ত আছে; কোন স্থলে বা মন্দুরায় অশ্বগণ অতি প্রচণ্ড হেষারব কচ‍্যে; কোথাও বা মদমত্ত করিরাজের ভীষণ বৃংহিতনিনাদ শ্রুতিগোচর হচ্যে; কোন স্থানে বা বিবিধ সমারোহে বিচিত্র উৎসবক্রিয়া সম্পাদনে জনগণ অনুরক্ত রয়েছে; স্থানে স্থানে ক্রয় বিক্রয়ের বিপণি নানাবিধ সুখাদ্য ও সুদৃশ্য দ্রব্যজাতে পরিপূর্ণ। নানা স্থানে সুরম্য অট্টালিকাসন্দর্শনে যে নয়নযুগল কি পর্য‍্যন্ত পরিতৃপ্ত হচ্যে, তা মুখে ব্যক্ত করা দুঃসাধ্য। আমরা অরণ্যচারী মনুষ্য, এরূপ জনসমাকুল প্রদেশে প্রবেশ করার আমাদের মনোবৃত্তির যে কত দূর পরিবর্ত্ত হয়, তা অনুমান করা যায় না। কি আশ্চর্য্য! প্রাসাদসমূহের এতাদৃশ রমণীয়ত্ব ও সৌসাদৃশ্য, কোন্‌টি যে রাজভবন, তার নির্ণয় করা সুকঠিন। যাহা হউক, অদ্য পথপরিশ্রমে একান্ত পরিশ্রান্ত হয়েছি, কোন একটা নির্জন স্থান গেলে সেখানে কিঞ্চিৎকাল বিশ্রাম করি, পরে মহারাজের সহিত সাক্ষাৎ করবো। (নাগরিকদ্বয়কে অবলোকন করিয়া) এই ত দুই জন অতি ভদ্রসন্তানের মত দেখ্ছি; এদের নিকট জিজ্ঞাসা কর্‌লে, বোধ করি, বিশ্রামস্থানের অনুসন্ধান পেতে পার্‌বো। (প্রকাশে) ও হে পৌরজনগণ, তোমাদের এ নগরীতে অতিথিশালা কোথায়? প্রথ। মহাশয়, আপনি কে? এ নগরে কার অণ্বেষণ করেন? কপিল। আমি দৈত্যকুলগুরু মহর্ষি শুক্রাচার্য্যের শিষ্য। এই প্রতিষ্ঠাননগরীতে রাজচক্রবর্তী রাজা যযাতির নিকটে কোন বিশেষ কর্ম্মের উপলক্ষে এসেছি। প্রথ। ভগবন্, তবে আপনার অতিথিশালায় যাবার প্রয়োজন কি? ঐ রাজনিকেতন। আপনি ওখানে পদার্পণ করবামাত্রেই যথোচিত সমাদৃত ও পূজিত হবেন, এবং মহারাজের সহিতও সাক্ষাৎ হতে পারবে। কপিল। তবে আমি সেই স্থানেই গমন করি। [ প্রস্থান। প্রথ। এ আবার কি মহাশয়? দৈত্যগুরু যে মহারাজের নিকট দূত পাঠিয়েছেন? চলুন, রাজভবনের দিকে যাওয়া যাক। দেখিগে, ব্যাপারটাই বা কি। দ্বিতী। চল না, হানি কি? [ উভয়ের প্রস্থান।