প্রতিষ্ঠানপুরী—রাজপুরীর নির্জন গৃহ। (রাজা যযাতি আসীন, নিকটে বিদূষক।) বিদূ। (চিন্তা করিয়া) মহারাজ! আপনি হিমাচলের ন্যায় নিস্তব্ধ আর গতিহীন হলেন না কি। রাজা। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) সখে মাধব্য, সুরপতি যদ্যপি বজ্রদ্বারা হিমাচলের পক্ষচ্ছেদ করেন, তবে সে সুতরাং গতিহীন হয়। বিদূ। মহারাজ! কোন্ রোগস্বরূপ ইন্দ্র আপনার এতাদৃশী দুরবস্থারকারণ, তা আপনি আমাকে স্পষ্ট করেই বলুন না। রাজা। কি হে সখে মাধব্য, তুমি কি ধন্বন্তরি? তোমাকে আমার রোগের কথা বলে কি উপকার হবে? বিদূ। (কৃতাঞ্জলিপুটে) হে রাজচক্রবর্ত্তিন, আপনি কি শ্রুত নন, যে মৃগরাজ কেশরী সময়বিশেষে অতি ক্ষুদ্র মূষিক দ্বারাও উপকৃত হতে পারেন। রাজা। (সহাস্য বদনে) ভাই হে, আমি যে বিপজ্জালে বেষ্টিত, তা তোমার ন্যায় মূষিকের দন্তে কখনই ছিন্ন হতে পারে না। বিদূ। মহারাজ! আপনি এখন হাস্য পরিহাস পরিত্যাগ করুন, এবং আপনার মনের কথাটি আমাকে স্পষ্ট করে বলুন; আপনি এ প্রকার অস্থির ও অন্যমনাঃ হলে রাজলক্ষ্মী কি আর এ রাজ্যে বাস করবেন? রাজা। না কল্যেনই বা। বিদূ। (কর্ণে হস্ত দিয়া) কি সর্বনাশ! আপনার কি এ কথা মুখে আনা উচিত? কি সর্ব্বনাশ! মহারাজ, আপনি কি রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের ন্যায় ইন্দ্রতুল্য সম্পত্তি পরিত্যাগ করে তপস্যাধর্ম্ম অবলম্বন করতে ইচ্ছা করেন? রাজা। রাজর্ষি বিশ্বামিত্র তপোবলে ব্রাহ্মণ্য প্রাপ্ত হন; সখে, আমার কি তেমন অদৃষ্ট? বিদূ। মহারাজ, আপনি ব্রাহ্মণ হতে চান না কি? রাজা। সখে! আমি যদি এই জগত্ত্রয়ের অধীশ্বর হতেম, আর ত্রিজগতের ধনদান দ্বারা এক অতিক্ষুদ্র ব্রাহ্মণও হতে পারতেম, তবে আর তা অপেক্ষা আমার সৌভাগ্য কি বল দেখি? বিদূ। উঃ! আজ যে আপনার গাঢ় ভক্তি দেখ্তে পাচ্চি! লোকে বলে, যে দৈত্যদেশে সকলেই পাপাচার, দেবতা ব্রাহ্মণকে কেউ শ্রদ্ধা করে না, কিন্তু আপনি যে ঐ দেশে কিঞ্চিৎকাল ভ্রমণ করে এত দ্বিজভক্ত হয়েছেন, এ ত সামান্য চমৎকারের বিষয় নয়! বয়স্য, আপনার কি মহর্ষি ভার্গবের সহিত গো-বিষয়ক কোন বিবাদ হয়েছে? বলুন দেখি, মহর্ষি শুক্রাচার্য্যের আশ্রমে কি কোন নন্দিনীনাম্নী কামধেনু আছে, না আপনি তাঁর দেবযানীনাম্নী নন্দিনীর কটাক্ষশরে পতিত হয়েছেন? বয়স্য! বলুন দেখি, শুক্রকন্যা দেবযানীকে আপনি দেখেছেন না কি? রাজা। (স্বগত) হা পরমেশ্বর! সে চন্দ্রানন কি আর এ জন্মে দর্শন করবো! আহা! ঋষিতনয়ার কি অপরূপ রূপলাবণ্য! (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) হা অন্তঃকরণ! তুমি কি সেই নির্জ্জন বন এবং সেই কূপতট হতে আর প্রত্যাগমন করবে না? হায়! হায়! সে স্তূপের অন্ধকার কি আর সে চন্দ্রের আভায় দূরীকৃত হবে? বিদূ। (স্বগত) হরিবোল হরি! সব প্রতুল হয়েছে! সেই ঋষিব্যাটাই সকল অনর্থের মূল দেখতে পাচ্চি। যা হউক, এখন রোগ নির্ণয় হয়েছে; কিন্তু এ বিকারের মকরধ্বজ ব্যতীত আর ঔষধ কি আছে? (প্রকাশে) কেমন, মহারাজ, আপনি কি আজ্ঞা করেন? রাজা। সখে মাধব্য, তুমি কি বলছিলে? বিদূ। বল্‌বো আর কি? মহারাজ! আপনি প্রলাপ বক্‌ছেন তাই শুন্ছি। রাজা। কেন, ভাই, প্রলাপ কেন? তুমিই বল দেখি, বিধাতার এ কি অদ্ভুত লীলা! দেখ, যে মহামূল্য মাণিক্য রাজচক্রবর্ত্তীর মুকুটের উপযুক্ত, তমোময় গিরিগহ্‍বর কি তার প্রকৃত বাসস্থান? (দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) সুলোচনা মৃগী ভ্রমে নির্জ্জন কাননে; গজমুক্তা শোভে গুপ্ত শুক্তির সদনে; হীরকের ছটা বদ্ধ খনির ভিতর; সদা ঘনাচ্ছন্ন হয় পূর্ণ শশধর; পদ্মের মৃণাল থাকে সলিলে ডুবিয়া; হায়, বিধি, এ কুবিধি কিসের লাগিয়া? বিদূ। ও কি মহারাজ? যেরূপ ভাবোদয় দেখছি, আপনার স্কন্ধে দেবী সরস্বতী আবির্ভূতা হয়েছেন না কি? (উচ্চহাস্য।) রাজা। কি হে সখে, আমার প্রতি ভগবতী বাগ্দেবীর কৃপাদৃষ্টি হলে দোষ কি? বিদূ। (সহাস্য বদনে) এমন কিছু নয়; তবে তা হলে রাজলক্ষ্মীর নিকটে বিদায় হৌন, রাজদণ্ড পরিত্যাগ করে বীণা গ্রহণ করুন, আর রাজবৃত্তির পরিবর্ত্তে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করুন। রাজা। কেন? কেন? বিদূ। বয়স্য, আপনি কি জানেন না, লক্ষ্মী সরস্বতীর সপত্নী, অতএব ভূমণ্ডলে সপত্নী-প্রণয় কি সম্ভব? রাজা। সখে মাধব্য! তুমি কবিকুলকে হেয়জ্ঞান করো না, তারা প্রকৃতিরূপ বিশ্বব্যাপিনী জগন্মাতার বরপুত্ত্র। বিদূ। (সহাস্য বদনে) মহারাজ। এ কথা কবিভায়ারাই বলেন, আমার বিবেচনায়, তারা বরঞ্চ উদরস্বরূপ বিশ্বব্যাপী দেবের বরপুত্র। রাজা। (সহাস্য বদনে) সখে! তবে তুমিও ত এক জন মহাকবি, কেন না, সেই উদরদেবের তুমি এক জন প্রধান বরপুত্র। বিদূ। বয়স্য! আপনি যা বলেন। সে যা হউক, এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, ভার্গবদুহিতা দেবযানীর সহিত আপনার কি প্রকারে, আর কোন্ স্থানে সাক্ষাৎ হয়েছিল, বলুন দেখি? রাজা। (দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) সখে, তাঁর সহিত দৈবযোগে এক নির্জ্জন কাননে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। বিদূ। কি আশ্চর্য্য! তা মহারাজ, আপনি এমন অমূল্য রত্ন নির্জ্জন স্থানে পেয়ে কি কল্যেন? রাজা। আর কি করবো, ভাই। তাঁর পরিচয় পেয়ে আমি আস্তেব্যস্তে সেখান থেকে প্রস্থান কল্যেম। বিদূ। (সহাস্য বদনে) সে কি মহারাজ! বিকশিত কমল দেখে কি মধুকর কখন বিমুখ হয়? রাজা। সখে, সত্য বটে। কিন্তু দেবযানী ব্রাহ্মণকন্যা, অতএব যেমন কোন ব্যক্তি দূর হতে সর্পমণির কান্তি দেখে তৎপ্রতি ধাবমান হয়, পরে নিকটবর্ত্তী হয়ে সর্প দর্শনে বেগে পলায়ন করে, আমিও সে নবযৌবনা অনুপমা রূপবতী ঋষিতনয়ার পরিচয় পেয়ে সেইরূপ কল্যেম। বিদূ। মহারাজ, আপনি তা এক প্রকার উত্তমই করেছেন। রাজা। না ভাই, কেমন করে তার উত্তম করেছি? দেখ, আমি যে প্রাণভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন কল্যেম, এখন সেই প্রাণ আমার রক্ষা করা দুষ্কর হয়েছে। (গাত্রোত্থান করিয়া) সখে! এ যাতনা আমার আর সহ্য হয় না! আগ্নেয় গিরি কি হুতাশনকে চিরকাল অভ্যন্তরে রাখ্তে পারে? (দীর্ঘনিশ্বাস।) বিদূ। মহারাজ, আপনি এ বিষয়ে নিতান্তই হতাশ হবেন না। রাজা। সখে মাধব্য! মরুভূমে তৃষ্ণাতুর মৃগবর, মায়াবিনী মরীচিকাকে দূর থেকে দর্শন করে, বারিলোভে ধাবমান হলে, জীবন উদ্দেশে কেবল তার জীবনেরই সংশয় হয়। এ বিষয়ে আশা কল্যে আমারও সেই দশা ঘটতে পারে। ঋষিকন্যা দেবযানী আমার পক্ষে মরীচিকারূপ, যেহেতুক তাঁর ব্রাহ্মণকুলে জন্ম, সুতরাং তিনি ক্ষত্রিয়দুষ্প্রাপ্যা! হে পরমেশ্বর, আমি তোমার নিকট কি অপরাধ করেছি, যে তুমি এমন পরম রমণীয় বস্তুকে আমার প্রতি দুঃখকর কল্যে! কেবল আমাকে যাতনা দিবার জন্যেই কি এ পদ্ম আমার পক্ষে সকণ্টক মৃণালের উপর রেখেছ! বিদূ। মহারাজ, আপনি এত চঞ্চল হবেন না। বয়স্য! বুদ্ধি থাক্‌লে সকল কর্ম্মই কৌশলে সিদ্ধ হয়। দেখুন দেখি, আমি এমন সদুপায় করে দিচ্চি, যাতে এখনই আপনার মনের ব্যাকুলতা দূর হয়ে যাবে। রাজা। (সহাস্য বদনে) সখে, তবে আর বিলম্ব কেন? এস, তোমার এ উপায়ের দ্বার মুক্ত কর। বিদূ। যে আজ্ঞা, মহারাজ! আমি আগতপ্রায়। [ প্রস্থান। রাজা। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া স্বগত) আহা! কি কুলগ্নেই বা দৈত্যদেশে পদার্পণ করেছিলেম। (চিন্তা করিয়া) হে রসনে! তোমার কি এ কথা বলা উচিত? দেখ, তোমার কথায় আমার নয়নযুগল ব্যথিত হয়, কেন না, দৈত্যদেশগমনে তারা চরিতার্থ হয়েছে, যেহেতুক তারা সেখানে বিধাতার শিল্পনৈপুণ্যের সার পদার্থ দর্শন করেছে। (পরিক্রমণ) বাড়বানলে পরিতপ্ত হলে সাগর যেমন উৎকণ্ঠিত হন, আমিও কি অদ্য সেইরূপ হলেম? হে প্রভো অনঙ্গ, তুমি হরকোপানলে দগ্ধ হয়েছিলে বলে, কি প্রতিহিংসার নিমিত্তে মানবজাতিকে কামাগ্নিতে সেইরূপ দগ্ধ কর? (দীর্ঘনিশ্বাস।) কি আশ্চর্য্য! আমি কি মৃগয়া করতে গিয়ে স্বয়ং কামব্যাধের লক্ষ্য হয়ে এলাম! (উপবেশন।) তা আমার এমন চঞ্চল হওয়ায় কি লাভ? (সচকিতে) এ আবার কি? (এক জন নটীসহিত বিদূষকের পুনঃপ্রবেশ।) বিদূ। মহারাজ, এই দেখুন, ইনিই কাম-সরোবরের উপযুক্ত পদ্মিনী। নটী। মহারাজের জয় হউক! (প্রণাম।) রাজা। কল্যাণি, তুমি চিরকাল সধবা থাক। (বিদূষকের প্রতি) সখে এ সুন্দরী কে? বিদূ। মহারাজ, ইনি স্বয়ং উর্ব্বশী; ইন্দ্রপুরী অমরাবতীতে বসতি আর করে আপনার এই মহানগরীতেই অবস্থিতি করেন। রাজা। কি হে সখে মাধব্য, তুমি যে একেবারে রসিকচূড়ামণি হয়ে উঠলে! বিদূ। (কৃতাঞ্জলিপুটে) বয়স্য। না হয়ে করি কি? দেখুন, মলয় গিরির নিকটস্থ অতি সামান্য সামান্য তরুও চন্দন হয়ে যায়; তা এ দরিদ্র ব্রাক্ষণ আপনারই অনুচর; এ যে রসিক হবে, তার আশ্চর্য্য কি? রাজা। সে যা হোক, এ সুন্দরীকে এখানে আনা হয়েছে কেন, বল দেখি? বিদূ। বয়স্য! আপনি সেই ঋষিকন্যাকে দেখে ভেবেছেন যে তার তুল্য রূপবতী বুঝি আর নাই, তা এখন একবার এঁর দিকে চেয়ে দেখুন দেখি? রাজা। (জনান্তিকে) সখে, অমৃতাভিলাষী ব্যক্তির কি কখনও মধুতে তৃপ্তি জন্মে? বিদূ। (জনান্তিকে) তা বটে, মহারাজ! কিন্তু চন্দ্রে অমৃত আছে বলে কি কেউ মধুপান ত্যাগ করে? বয়স্য! আপনি একবার এঁর একটি গান শুনুন। (নটীর প্রতি) অয়ি মৃগাক্ষি, তুমি একটি গান করে মহারাজের চিত্তবিনোদ কর। নটী। আমি মহারাজের আজ্ঞাবর্ত্তিনী। (উপবেশন।) গীত। (রাগিণী বাহার—তাল জলদ তেতালা) উদয় হইল সখি,সরস বসন্ত। মোদিত দশ দিশ পুষ্পগণে,— আর বহিছে সমীর সুশান্ত পিককুল কূজিত,ভূঙ্গ বিগুঞ্জিত, রঞ্জিত কুঞ্জ নিতান্ত। যত বিরহিণীগণ,মন্মথ তাড়ন, তাপিত তনু বিনে কান্ত॥ রাজা। আহা! কি মধুর স্বর! সুন্দরি! তোমার সঙ্গীত শ্রবণে যে আমার অন্তঃকরণ কি পর্য্যন্ত পরিতৃপ্ত হলো, তা বলতে পারি না! (নেপথ্যে সরোষে) রে দুরাচার, পাষণ্ড দ্বারপাল! তুই কি মাদৃশ ব্যক্তিকে দ্বাররুদ্ধ কত‍্যে ইচ্ছা করিস? রাজা। এ কি? বহির্দ্বারে দাম্ভিকের ন্যায় অতি প্রগল্‌ভতার সহিত কে এক জন কথা কচ্যে হে? বিদূ। বোধ করি, কোন তপস্বী হবে, তা না হলে আর এমন সুস্বর কার আছে! (দৌবারিকের প্রবেশ।) দৌবা। মহারাজের জয় হউক! মহারাজ, মহর্ষি শুক্রাচার্য্য কোন বিশেষ কার্য্যোপলক্ষে আপনার নিকট স্বশিষ‍্য মুনিবর কপিলকে প্রেরণ করেছেন; অনুমতি হলে মহারাজের সহিত সাক্ষাৎ করেন। রাজা। (গাত্রোখান করিয়া সসম্ভ্রমে) সে কি! মুনিবর কোথায়? আমাকে শীঘ্র তাঁর নিকটে লয়ে চল। [ রাজা এবং দৌবারিকের প্রস্থান। নটী। (বিদূষকের প্রতি) মহাশয়, মহারাজ এত চঞ্চল হলেন কেন? বিদূ। হে চারুহাসিনি, তোমার মত মধুমালতী বিকশিতা দেখলে, কার মন-অলি না অধীর হয়? নটী। বাঃ, ঠাকুরের কি সূক্ষ্মবুদ্ধি গা! অলি কি বিকশিতা মধুমালতীর আঘ্রাণে পলায়ন করে? চল, দেখিগে মহারাজ কোথা গেলেন। বিদূ। হে সুন্দরি, তুমি অয়স্কান্ত মণি, আমি লৌহ! তুমি যেখানে যাবে, আমিও সেইখানে আছি। (হস্তধারণ) আহা, তোমার অধরে ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণ অমৃতভাণ্ড গোপন করে রেখেছেন! হে মনোমোহিনি, তুমি একটি চুম্ব দিয়ে আমাকে অমর কর। নটী। (স্বগত) এ মা, বামুন বেটা ত কম ষাঁড় নয়। (প্রকাশে) দূর হতভাগা! [ বেগে পলায়ন! বিদূ। এঃ! এ দুশ্চারিণীর রাজার উপরেই লোভ! কেবল অর্থই চিনেছে, রসিকতা দেখে না! যাই, দেখিগে, বেটী কোথায় গেল। [ প্রস্থান।