প্রথমাঙ্ক — দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
দৈত্য-দেশ—গুরু শুক্রাচার্য্যের আশ্রম।
(শর্ম্মিষ্ঠার সখী দেবিকার প্রবেশ।)
দেবি। (আকাশ প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া স্বগত) সূর্য্যদেব ত প্রায় অস্তগত হলেন। এই যে আশ্রমে পক্ষিসকল কুজনধ্বনি করে চারি দিক্ হতে আপন আপন বাসায় ফিরে আসচে; কমলিনী আপনার প্রিয়তম দিনকরকে গমনোম্মুখ দেখে বিষাদে মুদিতপ্রায়; চক্রবাক ও চক্রবাকবধু, আপনাদের বিরহ-সময় সন্নিহিত দেখে, বিষণ্ণভাবে উপবিষ্ট হয়ে, উভয়ে উভয়ের প্রতি একদৃষ্টে অবলোকন কচ্যে; মহর্ষিগণ স্বীয় স্বীয় হোমাগ্নিতে সায়ংকালীন আহুতি প্রদানের উদ্যোগে ব্যস্ত; দুগ্ধভারে ভারাক্রান্ত গাভীসকল বৎসাবলোকনে অতিশয় উৎসুক হয়ে বেগে গোষ্ঠে প্রবিষ্ট হচ্যে। (আকাশমণ্ডলের প্রতি পুনর্দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া) এই ত সন্ধ্যাকাল উপস্থিত, কিন্তু রাজকুমারী যে এখনও আসচেন না, কারণ কি? (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) আহা! প্রিয়সখীর কথা মনে উদয় হলে, একবারে হৃদয় বিদীর্ণ হয়! হা হতবিধাতঃ! রাজকুলে জন্মগ্রহণ করে শর্ম্মিষ্ঠাকে কি যথার্থই দাসী হতে হলো? আহা! প্রিয়সখীর সে পূর্ব্ব রূপলাবণ্য কোথায় গেল? তা এতাদৃশী দুরবস্থায় কি প্রকারেই বা সে অপরূপ রূপলাবণ্যের সম্ভব হয়? নির্ম্মল সলিলে যে পদ্ম বিকশিত হয়, পঙ্কিল জলে তাকে নিক্ষেপ করলে তার কি আর তাদৃশী শোভা থাকে? (অবলোকন করিয়া সহর্ষে) ঐ যে আমার প্রিয়সখী আসচেন!
(শর্ম্মিষ্ঠার প্রবেশ।)
(প্রকাশে) রাজকুমারি! তোমার এত বিলম্ব হলো কেন?
শর্ম্মি। সখি! বিধাতা এক্ষণে আমাকে পরাধীনা করেছেন, সুতরাং পরবশ জনের স্বেচ্ছানুসারে কর্ম্ম করা কি কখন সম্ভব হয়?
দেবি। প্রিয়সখি! তোমার দুঃখের কথা মনে হলে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়! হা কুসুমসুকুমারি! হা চারুশীলে! তোমার অদৃষ্টে যে এত ক্লেশ ছিল, এ আমি স্বপ্নেও জান্তেম না! (রোদন।)
শর্ম্মি। সখি! আর বৃথা ক্রন্দনে ফল কি?
দেবি। প্রিয়সখি! তোমার দুঃখে পাষাণও বিগলিত হয়!
শর্ম্মি। সখি! দুঃখের কথায় অন্তঃকরণ আর্দ্র হয় বটে, কিন্তু কৈ, আমার এমন দুঃখ কি?
দেবি। প্রিয়সখি! এর অপেক্ষা দুঃখ আর কি আছে? শশধর আকাশমণ্ডল হতে ভূতলে পতিত হয়েছেন! দেখ, রাজদুহিতা হয়ে দাসী হলে! হা দুর্দৈব! তোমার কি এ সামান্য বিড়ম্বনা!
শর্ম্মি। সখি! যদিও আমি দাসীত্ব-শৃঙ্খলে আবদ্ধা, তথাপি ত আমি রাজভোগে বঞ্চিতা হই নাই। এই দেখ! আমার মনে সেই সকল সুখই রয়েছে! এই অশোক-বেদিকা আমার মহার্হ সিংহাসন (বেদিকোপরি উপবেশন) এই তরুবর আমার ছত্রধর; ঐ সম্মুখস্থ সরোবরে বিকশিতা কুমুদিনীই আমার প্রিয়সখী! মধুকর ও মধুকরীগণ গুন্গুন্স্বরে আমারই গুণকীর্ত্তন কচ্যে; স্বয়ং সুগন্ধ মলয়মারুত আমার বীজনক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হয়েছে; চন্দ্রমণ্ডল নক্ষত্রগণ সহিত আমাকে আলোক প্রদান কচ্যেন। সখি! এ সকল কি সামান্য বৈভব? আমাকে এত সুখভোগ করতে দেখেও তোমার কি আমাকে সুখভোগিনী বলে বোধ হয় না?
দেরি। (সম্মিত বচনে) রাজনন্দিনি! এ কি পরিহাসের সময়?
শর্ম্মি। সখি! আমি ত তোমার সহিত পরিহাস কচ্যি না। দেখ, সুখ দুঃখ মনের ধর্ম্ম; অতএব বাহ্য সুখ অপেক্ষা আন্তরিক সুখই সুখ। আমি পূর্ব্বে যেরূপ ছিলাম, এখনও সেইরূপ; আমার ত কিঞ্চিন্মাত্রও চিত্তবিকার হয় নাই।
দেবি। সখি! তুমি যা বল, কিন্তু হতবিধাতার এ কি সামান্য বিড়ম্বনা? (রোদন।)
শর্ম্মি। হা ধিক্! সখি! তুমি বিধাতাকে বৃথা নিন্দা কর কেন? দেখ দেখি, যদি আমি কোন ব্যক্তিকে দেবভোগ তুল্য উপাদেয় মিষ্টান্ন ভোজন করতে দি, আর সে যদি তা বিষ সহকারে ভোজন করে চিররোগী হয়, তবে কি আমি সে ব্যক্তির রোগের কারণ বলে গণ্য হতে পারি?
দেবি। সখি, তাও কি কখন হয়?
শর্ম্মি। তবে তুমি বিধাতাকে আমার জন্যে দোষ দেও কেন? বিধাতার এ বিষয়ে দোষ কি? গুরুকন্যা দেবযানীর সহিত আমার বিবাদ বিসম্বাদ না হলে ত আমাকে এ দুর্গতি ভোগ করতে হতো না! দেখ, পিতা আমার দৈত্যরাজ; তিনি প্রতাপে আদিত্য, আর ঐশ্বর্য্যে ধনপতি; তাঁর বিক্রমে দেবগণও সশঙ্কিত; আমি তাঁর প্রিয়তমা কন্যা। আমি আপন দোষেই এ দুর্দ্দশায় পতিত হয়েছি,—আমি আপনি মিষ্টান্নের সহিত বিষ মিশ্রিত করে ভক্ষণ করেছি, তায় অন্যের দোষ কি?
দেবি। প্রিয়সখি! তোমার কথা শুনলে অন্তরাত্মা শীতল হয়! তোমার এতাদৃশী বাক্পটুতা, বোধ হয়, যেন স্বয়ং বাগ্দেবীই অবনীতে অবতীর্ণা হয়েছেন। হা বিধাতঃ! তুমি কি নিষ্ঠুরতা প্রকাশ করবার আর স্থান পাও নাই! এমত সরলা বালাকেও কি এত যন্ত্রণা দেওয়া উচিত? (রোদন।)
শর্ম্মি। সখি! আর বৃথা রোদন করো না! অরণ্যে রোদনে কি ফল?
দেবি। ভাল, প্রিয়সখি! একটা কথা জিজ্ঞাসা করি,—বলি, দাসী হয়েই কি চিরকাল জীবন যাপন করবে?
শর্ম্মি। সখি! কারাবদ্ধ ব্যক্তি কি কখন স্বেচ্ছানুসারে বিমুক্ত হতে পারে? তবে তার বৃথা ব্যাকুল হওয়ায় লাভ কি? আমি যেরূপ বিপদে বেষ্টিত, এ হতে করুণাময় পরমেশ্বর ভিন্ন আর কে আমাকে উদ্ধার করতে সক্ষম! তা, সখি, আমার জন্যে তোমার রোদন করা বৃথা।
দেবি। রাজনন্দিনি, শান্তিদেবী কি তোমার হৃদয়পদ্মে বসতি কচ্যেন, যে তুমি এককালীন চিত্তবিকারশূন্যা হয়েছ? কি আশ্চর্য্য! প্রিয়সখি! তোমার কথা শুন্লে, বোধ হয়, যে তুমি যেন কোন বৃদ্ধা তপস্বিনী শান্তরসাস্পদ আশ্রমপদে যাবজ্জীবন দিনপাত করেছ। আহা! এও কি সামান্য দুঃখের বিষয়! হা হতবিধে! দুর্লভ পারিজাত পুষ্পকে কি নির্জ্জন অরণ্যে নিক্ষেপ করা উচিত! অমূল্য রত্ন কি সমুদ্রতলে গোপন রাখ্বার নিমিত্তেই সৃজন করেছ! (দীর্ঘনিশ্বাস।)
শর্ম্মি। প্রিয়সখি! চল, আমরা এখন কুটীরে যাই। ঐ দেখ, চন্দ্রনায়িকা কুমুদিনীর ন্যায় দেবযানী পূর্ণিকার সহিত প্রফুল্ল বদনে এই দিকে আস্চেন। তুমি আমাকে সর্ব্বদা “কমলিনী, কমলিনী” বল; তা যদ্যপি আমি কমলিনীই হই, তবে এ সময়ে আমার এ স্থলে বিকশিত হওয়া কি উচিত? দেখ দেখি, আমার প্রিয়সখা অনেকক্ষণ হলো অস্তগত হয়েছেন, তাঁর বিরহে আমাকে নিমীলিত হতে হয়। চল, আমরা যাই।
দেবি। রাজকুমারি! ঐ অহঙ্কারিণী ব্রাহ্মণকন্যাকে কি কুমুদিনী বলা যায়? আমার বিবেচনায়, তুমি শশধর আর ও দুষ্ট রাহু। আমি যদি সুদর্শনচক্র পাই তা হলে ঐ দুষ্টা স্ত্রীকে এই মুহূর্তেই দুই খণ্ড করি।
শর্ম্মি। হা ধিক্! সখি, তুমি কি উন্মত্তা হলে! ঐ ব্রাহ্মণকন্যার পিতৃপ্রসাদেই আমাদের পিতৃকুল সেই সুদর্শনচক্র হতে নিস্তার পায়। তা সখি, চল এখন আমরা যাই।
[ উভয়ের প্রস্থান।
(দেবযানী এবং পূর্ণিকার প্রবেশ।)
দেব। (আকাশ প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া) প্রিয়সখি! বসুমতী যেন অদ্য রাত্রে স্বয়ম্বরা হয়েছেন; ঐ দেখ, আকাশমণ্ডলে ইন্দু এবং গ্রহনক্ষত্রগণ প্রভৃতির কি এক অপূর্ব্ব এবং রমণীয় শোভা হয়েছে! আহা! রোহিণীপতির কি অনুপম মনোরম প্রভা। বোধ হয়, ত্রিভুবনমোহিনী জলধিদুহিতা কমলার স্বয়ম্বরকালে, পুরুষোত্তম দেবসমাজে যাদৃশ শোভমান হয়েছিলেন, সুধাকরও অদ্য নক্ষত্রমধ্যে তদ্রূপ অপরূপ ও অনির্বচনীয় শোভা ধারণ করেছেন! (চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিয়া) প্রিয়সখি! এই দেখ, এ আশ্রমপদেরও কি এক অপরূপ সৌন্দর্য্য! স্থানে স্থানে নানাবিধ কুসুমজাল বিকশিত হয়ে যেন স্বয়ম্বরা বসুন্ধরার অলঙ্কারস্বরূপ হয়ে রয়েছে। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ।)
পূর্ণি। তবে দেখ দেখি, প্রিয়সখি! নিশানাথের এতাদৃশ মনোহারিণী প্রভায় তোমার চিত্তচকোরের কি নিরানন্দ হওয়া উচিত? দেখ, শর্ম্মিষ্ঠা তোমাকে যে সময় কূপমধ্যে নিক্ষেপ করেছিল, তদবধি তোমার তিলার্ধের নিমিত্তেও মনঃস্থির নাই, সততই তুমি অন্যমনস্ক আর মলিন বদনে দিনযামিনী যাপন কর। সখি, এ নিগূঢ় তত্ত্ব তুমি আমাকে অকপটে বল, আমি ত তোমার আর পর নই। বিবেচনা করলে সখীদের দেহমাত্রই ভিন্ন, কিন্তু মনের ভাব কখনও ভিন্ন নয়।
দেব। প্রিয়সখি! আমার অন্তঃকরণ যে একান্ত বিচলিত ও অধীর হয়েছে, তা সত্য বটে; কিন্তু তুমি যদি আমার চিত্তচঞ্চলতার কারণ শুন্তে উৎসুক হয়ে থাক, তবে বলি, শ্রবণ কর।
পূর্ণি। প্রিয়সখি! সে কথা শুন্তে যে আমার কি পর্যন্ত লালসা, তা মুখে ব্যক্ত করা দুঃসাধ্য।
দেব। শর্মিষ্ঠা আমাকে কূপে নিক্ষেপ করলে পর, আমি অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত অজ্ঞানাবস্থায় পতিতা ছিলেম, পরে কিঞ্চিৎ চেতন পেয়ে দেখ্লেম, যে চতুর্দ্দিক্ কেবল অন্ধকারময়। অনন্তর আমি ভয়ে উচ্চৈঃস্বরে রোদন করতে আরম্ভ করলেম। দৈবযোগে এক মহাত্মা সেই স্থান দিয়া গমন কর্তেছিলেন, হঠাৎ কূপমধ্যে হাহাকার আর্ত্তনাদ শুনে নিকটস্থ হয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে? আর কি জন্যই বা কূপের ভিতর রোপন কচ্যো?” প্রিয়সখি! তৎকালে তাঁর এরূপ মধুর বাক্য শুনে, আমার বোধ হলো, যেন বিধাতা আমাকে উদ্ধার করবার জন্য স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন। তিনি কে, আমি কিছুই নির্ণয় করতে পারলেম না, কেবল ক্রন্দন করতে২ মুক্তকণ্ঠে এইমাত্র বল্লেম, “মহাশয়! আপনি দেবই হউন, বা মানবই হউন, আমাকে এই বিপজ্জাল হতে শীঘ্র বিমুক্ত করুন।” এই কথা শুনিবা মাত্র, সেই দয়ালু মহাশয় তৎক্ষণাৎ কূপমধ্যে অবতীর্ণ হয়ে আমাকে হস্তধারণপূর্ব্বক উত্তোলন করলেন। আমি উপরিস্থা হয়ে তাঁর অলৌকিক রূপলাবণ্য দর্শনে একেবারে বিমোহিতা হলেম। সখি! বল্লে প্রত্যয় করবে না, বোধ হয়, তেমন রূপ এ ভূমণ্ডলে নাই। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ।)
পূর্ণি। কি আশ্চর্য্য। তার পর, তার পর!
দেব। তার পর তিনি আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করে এই কথা জিজ্ঞাস! করলেন, “হে ললনে! তুমি দেবী কি মানবী? কার অভিশাপে তোমার এ দুর্দশা ঘটেছিল? সবিশেষ শ্রবণে অতিশয় কৌতূহল জন্মেছে, বিবরণ করলে আমি যৎপরোনাস্তি পরিতৃপ্ত হই।” তাঁর এ কথা শুনে আমি সবিনয়ে বল্লেম, “হে মহাভাগ! আমি দেবকন্যা নই—আমার ঋষিকুলে জন্ম—আমি ভগবান্ মহর্ষি ভার্গবের দুহিতা, আমার নাম দেবযানী।” প্রিয়সখি! আমার এই উত্তর শুনেই সেই মহাত্মা কিঞ্চিৎ অন্তরে দণ্ডায়মান হয়ে বল্লেন, “ভদ্রে! আপনি ভগবান্ ভার্গবের দুহিতা? আমি ঋষিবরকে বিলক্ষণ জানি; তিনি এক জন ত্রিভুবনপূজ্য পরম দয়ালু ব্যক্তি; আপনি তাঁকে আমার শত সহস্র প্রণাম জানাবেন আমার নাম যযাতি—আমার চন্দ্রবংশে জন্ম। হে ঋষিতনয়ে। এক্ষণে অনুমতি করুন, আমি বিদায় হই।” এই কথা বলে তিনি সহসা প্রস্থান করলেন। প্রিয়সখি, যেমন কোন দেবতা, কোন পরম ভক্তের প্রতি সদয় হয়ে, তার অভিলষিত বর প্রদানপূর্ব্বক অন্তর্হিত হলে, সেই ভক্ত জন মুহূর্ত্তকাল আনন্দরসে পুলকিত ও মুজিতনয়ন হয়ে, আপন ইষ্টদেবকে সম্মুখে আবির্ভূত দেখে, এবং বোধ করে, যেন তিনি বারম্বার মধুরভাবে তার শ্রুতিসুখ প্রদান কর্চেন, আমিও সেই মহোদয়ের গমনানন্তর ক্ষণকাল তদ্রূপ সুখসাগরে নিমগ্না ছিলেম। আহা! সখি। সেই মোহনমূর্ত্তি অদ্যাপি আমার হৃৎপদ্মে জাগরূক রয়েছে। প্রিয়সখি! সে চন্দ্রানন কি আমি আর এজন্মে দর্শন করবো? (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ।) সেই অমৃতবর্ষিণী মধুর ভাষা কি আর কখন আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে? প্রিয়সখি! শর্ম্মিষ্ঠা যখন আমাকে কূপে নিক্ষিপ্ত করেছিল, তখন আমার মৃত্যু হলে আর কোন যন্ত্রণাই ভোগ করতে হতো না। (রোদন।)
পূর্ণি। প্রিয়সখি! তুমি কেন এ সমুদায় বৃত্তান্ত ভগবান্ মহর্ষিকে অবগত করাও না?
দেব। (সত্রাসে) কি সর্ব্বনাশ! সখি, তাও কি হয়? এ কথা ভগবান্ মহর্ষি জনককে কি প্রকারে জ্ঞাত করান যায়? রাজচক্রবর্ত্তী যযাতি ক্ষত্রিয়—আমি হলেম ব্রাহ্মণকন্যা।
পূর্ণি। সখি, আমার বিবেচনায় এ কথা মহর্ষির কর্ণগোচর করা আবশ্যক।
দেব। (সত্রাসে) কি সর্ব্বনাশ! সখি, তুমি কি উন্মত্তা হয়েছ? এ কথা মহর্ষি জনকের কর্ণগোচর করা অপেক্ষা মৃত্যুও শ্রেয়ঃ।
পুর্ণি। প্রিয়সখি! ঐ দেখ, ভগবান্ মহর্ষির নাম গ্রহণ মাত্রেই তিনি এ দিকে আস্চেন। এও একটা সৌভাগ্য বা কার্য্যসিদ্ধির লক্ষণ।
দেব। (সত্রাসে) প্রিয়সখি! তুমি এ কথা ভগবান্ পিতার নিকট কোন প্রকারেই ব্যক্ত করো না। হে সখি! তুমি আমার এই অনুরোধটি রক্ষা কর।
পূর্ণি। সখি! যেমন অন্ধ ব্যক্তির সুপথে গমন করা দুঃসাধ্য, জ্ঞানহীন জনের পক্ষে সদসৎ বিবেচনা তদ্রূপ সুকঠিন।
দেব। (সত্রাসে) প্রিয়সখি, তুমি কি একেবারে আমার প্রাণনাশ করতে উদ্যত হয়েছ। কি সর্ব্বনাশ! তোমার কি প্রজ্বলিত হুতাশনে আমাকে আহুতি প্রদানের ইচ্ছা হয়েছে? ভগবান্ পিতা স্বভাবতঃ উগ্রস্বভাব; এতাদৃশ বাক্য তাঁর কর্ণগোচর হলে, আর কি নিস্তার আছে?
পূর্ণি। প্রিয়সখি! আমি তোমার অপকারিণী নাই। তা তুমি এ স্থান হতে প্রস্থান কর; ঐ দেখ, ভগবান্ মহর্ষি এই দিকেই আগমন কচ্যেন।
দেব। (সত্রাসে) প্রিয়সখি! এক্ষণে আমার জীবন মরণে তোমারই সম্পূর্ণ প্রতুতা; কিন্তু আমি জীবনাশায় জলাঞ্জলি দিয়ে তোমার নিকট হতে বিদায় হলেম।
পূর্ণি। প্রিয়সখি! এতে চিন্তা কি? আমি কৌশলক্রমে মহর্ষির নিকট এ সকল বৃত্তান্ত নিবেদন করবো, তার ভয় কি?
দেব। প্রিয়সখি! তোমার বা ইচ্ছা তাই কর। হয় ত জন্মের মত এই সাক্ষাৎ হলো।
[ বিষণ্ণভাবে দেবযানীর প্রস্থান।
(মহর্ষি শুক্রাচার্য্যের প্রবেশ।)
পূর্ণি। তাত! প্রিয়সখী দেবযানীর মনোগত কথা অদ্য জ্ঞাত হয়েছি, অনুমতি হলে নিবেদন করি।
শুক্র। (নিকটবর্ত্তী হইয়া) বৎসে পূর্ণিকে! কি সংবাদ?
পূর্ণি। ভগবন্! সকলই সুসংবাদ, আপনি যা অনুভব করেছিলেন, তাই যথার্থ।
শুক্র। (সহাস্য বদনে) বৎসে! সমাধিনির্ণীত বিষয় কি মিথ্যা হওয়া সম্ভব? তবে দুহিতার মনোগত ব্যক্তির নাম কি?
পূর্ণি। ভগবন্! তাঁর নাম যযাতি।
শুক্র। (সহাস্য বদনে) শ্রীনিবাসের বক্ষঃস্থলকে অলঙ্কৃত করবার নিমিত্তেই কৌস্তুভ মণির সৃজন। হে বৎসে! এই রাজর্ষি যযাতি চন্দ্রবংশাবতংস। যদ্যপিও তিনি ক্ষত্রকুলজাত, তত্রাচ বেদবিদ্যাবলে তিনিই আমার কন্যারত্নের অনুরূপ পাত্র। অতএব হে বৎসে পূর্ণিকে। তুমি তোমার প্রিয়সখী দেবযানীকে আশ্বাস প্রদান কর। আমি অনতিবিলম্বেই সুবিজ্ঞতম প্রধান শিষ্য কপিলকে রাজর্ষি-সান্নিধ্যে প্রেরণ করবো। সুচতুর কপিল একবারে রাজর্ষি চন্দ্রবংশ চূড়ামণি যযাতিকে সমভিব্যাহারে আনয়ন করবেন। তদনন্তর আমি তোমার প্রিয়সখীর অভীষ্ট সিদ্ধি করবো। তার চিন্তা কি?
পূর্ণি। ভগবন্! যথা আজ্ঞা, আমি তবে এখন বিদায় হই।
শুক্র। বৎসে! কল্যাণমস্তু তে।
[ পূর্ণিকার প্রস্থান।
শুক্র। (স্বগত) আমার চিরকাল এই বাসনা, যে আমি অনুরূপ পাত্রে কন্যা সম্প্রদান করি; কিন্তু ইদানীং বিধি আনুকূল্য প্রকাশপূর্ব্বক মদীয় মনস্কামনা পরিপূর্ণ করলেন। এক্ষণে কন্যাদায়ে নিশ্চিত্ত হলেম। সুপাত্রে প্রদত্তা কন্যা পিতামাতার অনুশোচনীয়া হয় না।
[ প্রস্থান।
ইতি প্রথমাঙ্ক।
More from শর্মিষ্ঠা নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.