দ্বিতীয়াঙ্ক — দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
উদয়পুর—রাজপথ।
(পুরুষবেশে মদনিকার প্রবেশ।)
মদ। (স্বগত) হা! হা! হা! তোমার নাম কি, ভাই? আমার নাম মদনমোহন। হা হা! হা!—না না;—এমন করে হাসলে হবে না। (আপনার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া) বড় চমৎকার বেশটা হয়েছে, যা হোক! কে বলে যে আমি বিলাসবতীর সখী মদনিকা? হা! হা! হা!—দূর হৌক!—মনে করি যে হাসবো না; আবার আপনা আপনিই হাসি পায়। স্বয়ং ধূর্ত্তচূড়ামণি; সে যখন আমাকে চিনতে পারে নাই, তখন আর ভয় কি!—বিলাসবতীর নিতান্ত ইচ্ছা যে এ বিবাহটা কোন মতে না হয়; তা হলে ধনদাসের মুখে এক প্রকার চূণকালি পড়ে। দেখা যাক্, কি হয়। আমি ত ভাঙা মঙ্গলচণ্ডী এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। আবার রাজা মানসিংহকে কৃষ্ণকুমারীর নামে জাল কর্যে এক পত্রও লিখেছি। হা! হা! হা! পত্রখানা যে কৌশল কর্যে লেখা হয়েছে, মানসিংহ তা পাবা মাত্রেই কৃষ্ণার জন্যে একবারে অস্থির হবে। রুক্মিণীদেবী, শিশুপালের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যে, যদুপতিকে যেরূপ মিনতি কর্যে পত্র লিখেছিলেন, আমরাও সেইরূপ কর্যে লিখে দিয়েছি। এখন দেখা যাক্, আমাদের এ শিশুপালের ভাগ্যে কি ঘটে? ঐ যে ধনদাস মন্ত্রীর সঙ্গে এ দিকে আসছে। আমি ঐ মন্ত্রীকে বিলাসবতীয় কথা যে কর্যে বলেছি, বোধ হয়, এর মন আমাদের রাজার উপর সম্পূর্ণ চটে গেছে। দেখি না, ওদের কি কথোপকথন হয়। (অন্তরালে অবস্থিতি।)
(সত্যদাস এবং ধনদাসের প্রবেশ।)
ধন। মন্ত্রীমহাশয়, যৌবনাবস্থায় লোকে কি না করে থাকে? আমাদের নরপতি যে কখন কখন ভগবান্ কন্দর্পের সেবক হন, সে কিছু বড় অসম্ভব নয়। মহারাজের অতি অল্প বয়েস। বিশেষতঃ, আপনিই বলুন দেখি, বড় বড় ঘরে কি কাণ্ড না হচ্যে?
সত্য। আজ্ঞা, তা সত্য বটে! কিন্তু আমি শুনেছি, যে জয়পুরের অধিপতি বিলাসবতী নামে একটা বারবিলাসিনীর এত দূর বাধ্য, যে—
ধন। হা! হা! বলেন কি মহাশয়? অলি কি কখন কোন ফুলের বাধ্য হয়ে থাকে?
সত্য। মহাশয়, আমি শুনেছি, যে এই বিলাসবতী বড় সমান্য পুষ্প নয়!
ধন। (স্বগত) তা বড় মিথ্যা নয়! নৈলে কি আমার মন টলে! (প্রকাশে) আজ্ঞা, আপনাকে এ কথা কে বল্যে? সে একটা সামান্য স্ত্রী, আজ আছে, কাল নাই।
সত্য। মহাশয়, রাজনন্দিনী কৃষ্ণা রাজকুলপতি ভীমসিংহের জীবন-স্বরূপ। তা তিনি যে এ সব কথা শুনলে, এ বিবাহে সম্মত হন, এমন ত আমার কোন মতেই বিশ্বাস হয় না।
ধন। কি সর্বনাশ! মহাশয়, এ কথা কি মহারাজের কর্ণগোচর করা উচিত!
সত্য। আজ্ঞা, তা ত নয়; কিন্তু জনরবের শত রসনা কে নিরস্ত করবে? এ বিবাহের কথা প্রচার হল্যে যে কত লোকে কত কথা কবে, তার কি আর সংখ্যা আছে।
ধন। মহাশয়, চন্দ্রে কলঙ্ক আছে বলে কি কেউ তাঁকে অবহেলা করে!
সত্য। আচ্ছা, না কিন্তু এত সেরূপ কলঙ্ক নয়। এ যে রাহুগ্রাস! এতে আপনাদিগের নরপতির শ্রীর সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা।
ধন। (স্বগত) এ ত বিষম বিভ্রাট। বিভ্রাটই বা কেন? বরঞ্চ আমারই উপকার। মহারাজ যদি এ সারিকাটিকে পিঞ্জর খুলে ছেড়ে দেন, তা হলে আর পায় কে? আমি ত ফাঁদ পেতেই বসে আছি।
সত্য। মহাশয় যে নিরুত্তর হলেন?
ধন। আজ্ঞা—না; ভাবছি কি বলি, এ তুচ্ছ বিষয়ে যদি আপনার এত দূর বিরাগ জন্মে থাকে, তবে না হয় আমি মহারাজকে এই সম্বন্ধে একখানি পত্র লিখি, যে তিনি পত্রপাঠমাত্রেই সে দুষ্টা স্ত্রীকে দেশান্তর করেন। তা হল্যে, বোধ করি, আর কোন আপত্তি থাক্বে না।
সত্য। আজ্ঞা, এর অপেক্ষা আর সুপরামর্শ কি আছে? রাজা জগৎসিংহ যদি এ কর্ম্ম করেন তা হল্যে ত আর এ বিবাহের পক্ষে কোন বাধাই নাই।
ধন। আজ্ঞা, এ না করবেন কেন? তাম্রের পরিবর্ত্তে স্বর্ণ কে না গ্রহণ করে।
সত্য। তবে আমি এখন বিদায় হই। আপনিও বাসায় যেয়ে বিশ্রাম করুন। মহারাজার সহিত পুনরায় সায়ংকালে সাক্ষাৎ হবে এখন।
[ প্রস্থান।
ধন। (স্বগত) আমাদের মহারাজের সুখ্যাতিটি দেখছি বিলক্ষণ দেদীপ্যমান। ভাল, এই যে জনরব, একে কি নীরব করবার কোন পন্থাই নাই? কেমন করোই বা থাক্বে? এর গতি মহানদের গতির তুল্য। প্রথমতঃ পর্ব্বত-নির্ঝর থেকে জল ঝরে একটি জলাশয়ের সৃষ্টি হয়; তা থেকে প্রবাহ বেরিয়ে ক্রমে ক্রমে বেগবান্ হয়; পরে আর আর স্রোতের সহকারে মহাকায় ধারণ করে। এ জনরবের ব্যাপারও সেইরূপ। (মদনিকাকে দূরে দর্শন করিয়া) আহাহা! এ সুন্দর বালকটি কে হে? এটিকে যেন চিনি চিনি বোধ হচ্যে।—একে কি আর কোথাও দেখেছি? (প্রকাশে) ওহে ভাই, তুমি একবার এই দিকে এসো ত।
মদ। (অগ্রসর হইয়া) আপনি কি আজ্ঞা কচ্যেন!
ধন। তোমার নাম কি, ভাই?
মদ। আজ্ঞা, আমার নাম মদনমোহন।
ধন। বাঃ, তোমার বাপ মা বুঝি তোমার রূপ দেখিই এ নামটি রেখেছিলেন? তুমি এখানে কি কর, ভাই?
মদ। আজ্ঞা, আমি রাজসংসারে থেকে লেখাপড়া শিখি।
ধন। হুঁ! মুক্তাফলের আশাতেই লোকে সমুদ্রে ডুব দেয়। রাজসংসার অর্থরত্নাকর। তা তুমি এমন স্থানে কি কেবল লেখাপড়াই কর? কেন? তোমাদের দেশে কি টোল নাই? সে যা হৌক, তুমি রাজনন্দিনী কৃষ্ণাকে দেখেছ?
মদ। আজ্ঞা, দেখবো না কেন? যারা চন্দ্রলোকে বাস করে, তাদের কি আর অমৃত দেখতে বাকি থাকে?
ধন। বাহবা, বেশ! আচ্ছা ভাই, বল দেখি, তোমাদের রাজকুমারী দেখতে কেমন?
মদ। আজ্ঞা, সে রূপ বর্ণনা করা আমার সাধ্য নয়; কিন্তু তিনি বিলাসবতীর কাছে নন।
ধন। অ্যাঁ—কার কাছে নন?
মদ। ও মহাশয়, আপনি কিছু কাণে খাট বটে?—বিলাসবতী! বিলাসবতী! শুনতে পেয়েছেন?
ধন। অ্যাঁ—বিলাসবতী কে?
মদ। হা! হা! বিলাসবতী কে, তা কি আপনি জানেন না? হা! হা! হা!
ধন। (স্বগত) কি সর্ব্বনাশ! তার নাম এ ছোঁড়া আবার কোথ্থেকে শুনলে? (প্রকাশে) আমি তাকে কেমন কর্যে জানবো?
মদ। আঃ, আমার কাছে আর মিছে ছলনা করেন কেন? আপনি মন্ত্রিবরকে যা যা বলছিলেন, আমি তা সব শুনেছি।
ধন। (স্বগত) এ কথার আর অধিক আন্দোলন কিছু নয়। (প্রকাশে) হ্যা দেখ ভাই, আমার দিব্য, তুমি যা শুনেছ, শুনেছ, কিন্তু অন্যের কাছে এ কথার আর প্রসঙ্গ করো না।
মদ। কেন? তাতে হানি কি?
ধন। না ভাই, তোমাকে না হয় আমি কিছু মেটাই খেতে দিচ্যি, এ সব রাজারাজড়ার কথায় তোমার থেকে কাজ কি?
মদ। (সরোষে) তুমি ত ভারি পাগল হে! আমাকে কি কচি ছেলে পেয়েছো, যে মিঠাই দেখিয়ে ভোলাবে?
ধন। তবে বল, ভাই, তুমি কি পেলে সন্তুষ্ট হও?
মদ। আচ্ছা, তোমার হাতে ঐ যে অঙ্গুরীটি আছে, এটি আমাকে দেও, তা হলে আমি আর কাকেও কিছু বলবো না।
ধন। ছি ভাই, তুমি আমাকে পাগল বলছিলে; আবার তুমিও পাগল হলে না কি? এ নিয়ে তুমি কি করবে! এ কি কাকেও দেয়?
মদ। আচ্ছা, তবে আমি এই রাজমহিষীর কাছে যাই। (গমনোদ্যত।)
ধন। ওহে ভাই, আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও, রাগ ভরেই চল্যে যে? একটা কথাই শুনে যাও। (স্বগত) এ কথা প্রচার হল্যে সব বিফল হবে। এখন করি কি? এ অমূল্য অঙ্গুরীটিই বা দি কেমন কর্যে!—কি করা যায়? দিতে হলো!—হায়! হায়! এ অঙ্গুরীটি যে কত যত্নে মহারাজের কাছ থেকে পেয়েছিলেম,—আর ভাবলেই বা কি হবে?
মদ। ও মহাশয়, আপনি কাঁদছেন না কি? হা! হা! হা!
মদ। (স্বগত) কি আশ্চর্য্য! একটা শিশু আমাকে ঠকালে হে? ছি। ছি। আর কি করি? দি। ভাল, এ কর্ম্মটা সফল কত্যে পাল্যে, রাজার নিকট বিলক্ষণ কিঞ্চিৎ পাবার সম্ভাবনা আছে। (প্রকাশে) এই নাও, ভাই। দেখো, ভাই, এ কথা যেন প্রকাশ না হয়।
মদ। (অঙ্গুরী লইয়া) যে আজ্ঞা—তবে আমি চল্যেম। (অন্তরালে অবস্থিতি।)
মদ। (স্বগত) দূর ছোঁড়া হতভাগা! আজ যে কি কুলগ্নে তোর মুখ দেখেছিলেম, তা বলতে পারি নে। আর কি হবে, যাই এখন বাসায় যাই।
[ প্রস্থান।
মদ। (অগ্রসর হইয়া স্বগত) হা! হা! ধনদাসের দুঃখ দেখলে কেবল হাসি পায়। হা! হা! বেটা যেমনি ধূর্ত্ত, তেমনি প্রতিফল হয়েছে!—এখনই হয়েছে কি? একে সমুচিত শাস্তি দিতে হবে, তা নৈলে আমার নামই নয়। তো এখন কেন যাই না! একবার নারীবেশ ধরে রাজকুমারী কৃষ্ণার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি গে। ভাল, আমার পরিচয়টা কি দেব? (চিন্তা করিয়া) হাঁ! তাই ভাল! মরুদেশের রাজা মানসিংহের দূতী! হা! হা! হা!
[ প্রস্থান।
More from কৃষ্ণকুমারী নাটক
Comments (0)
Log in to join the conversation.