প্রতিষ্ঠানপুরী, রাজসভা। রাজা যযাতি, রাজ্ঞী দেবধানী, বিদূষক, পূর্ণিকা, পরিচারিকা, সভাসদগণ ইত্যাদি। রাজা। অদ্য কি শুভ দিন! বহু দিনের পর যে ভগবান্ ঋষিপ্রবরের শ্রীচরণ দর্শন করবো, এতে আমার কি আনন্দ হচ্যে! রাজ্ঞী। হে প্রাণেশ্বর, ভগবান্ তাতকে আনয়ন কত্যে মন্ত্রী মহাশয় কি একাকী গিয়েছেন? রাজা। না, অন্যান্য সভাসদগণকেও তাঁর সঙ্গে পাঠান হয়েছে। (নেপথ্যে) বম্ ভোলানাথ! গীত। রাগিণী বেহাগ, তাল জলদ তেতালা। জয় উমেশ শঙ্কর, সর্বগুণাকর, ত্রিতাপ সংহর, মহেশ্বর। হলাহলাঙ্কিত, কণ্ঠ সুশোভিত, মৌলিবিরাজিত, সুধাকর॥ পিনাকবাদক, শৃঙ্গনিনাদক, ত্রিশূলধারক, ভয়ঙ্কর। বিরিঞ্চিবাঞ্ছিত, সুরেন্দ্রসেবিত, পদাজপুজিত, পরাৎপর॥ রাজা। (সচকিতে) ঐ যে মহর্ষি আগমন কচ‍্যেন। (সকলের গাত্রোত্থান।) (মহর্ষি শুক্রাচার্য্য, কপিল, মন্ত্রী, ইত্যাদির প্রবেশ।) শুক্র। হে মহীপতে, আপনাকে জগদীশ্বর চিরবিজয়ী এবং চিরজীবী করুন। (দেবযানীর প্রতি) বসে, তোমার কল্যাণ হৌক, আর চিরকাল সুখে থাক। রাজা। (প্রণাম করিয়া) ভগবন্, আপনকার পদার্পণে এ চন্দ্রবংশীয় রাজধানী এত দিনে পবিত্রা হলো, বসতে আজ্ঞা হৌক। (কপিলের প্রতি) প্রণাম মুনিবর, বসুন। (সকলের উপবেশন।) কপি। মহারাজের কল্যাণ হৌক! (দেবযানীর প্রতি) ভগিনি, তুমি চিরসুখিনী হও। শুক্র। হে নরাধিপ, আমার প্রিয়তমা দৈত্যরাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠা কোথায়? রাজা। (মন্ত্রীর প্রতি) আপনি শর্ম্মিষ্ঠা দেবীকে অতি ত্বরায় এখানে আনান। মন্ত্রী। মহারাজের আজ্ঞা শিরোধার্য্য। [ প্রস্থান। শুক্র। হে নরেশ্বর, আপনার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র পুরু যে এই বিপুল চন্দ্রবংশের প্রধান হবেন, এ জন্মেই বিধাতা আপনার উপর এ লীলা প্রকাশ করেন। যা হৌক, আপনি কোন প্রকারে হুঃখিত বা অসন্তুষ্ট হবেন না। বিধির নির্ব্বন্ধ কে খণ্ডন কত‍্যে পারে? (দেবযানীর প্রতি) বৎসে, তোমার সন্তানদ্বয় অপেক্ষা সপস্বীতনয় পুরুর সম্মান বৃদ্ধি হলো বলে, এ বিষয়ে তুমি ক্ষোভ করে। না; কেননা, জগৎপাতা যা করেন, তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করা মহাপাপ কর্ম্ম। বিশেষতঃ ভবিতব্যের অন্যথা কত‍্যে কে সক্ষম? (শর্ম্মিষ্ঠা এবং দেবিকার সহিত মন্ত্রীর পুনঃপ্রবেশ।) শর্ম্মি। আমি মহর্ষি ভার্গবের এইচরণে প্রণাম করি আর এই সভাস্থ গুরুলোকদিগকে বন্দনা করি। শুক্র। রাজনন্দিনি, বহু দিবসের পর তোমার চন্দ্রানন দর্শনে যে আমি: কি পর্য্যন্ত সুখী হলেম, তা প্রকাশ করা দুষ্কর। কল্যাণি, তোমার অতি শুভ ক্ষণে জন্ম! যেমন অদিতিপুত্ত্র স্বীয় কিরণজালে সমস্ত ভূমণ্ডলকে আলোকময় করেন, তোমার পুত্ত্র পুরুও আপন প্রতাপে সেইরূপ অখিল ধরাতল শাসন করবেন। তা বৎসে, অদ্যাবধি তুমি দাসত্ব-শৃঙ্খল হতে মুক্তা হলে, আর দুঃখান্তেই নাকি সুখানুভব অধিকতর হয়, সেই নিমিত্তেই বুঝি বিধাতা তোমার প্রতি কিঞ্চিৎকাল বিমুখ হয়েছিলেন, তার মর্ম্ম অদ্য সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ হলো। (রাজার প্রতি) হে রাজন্, যেমন আমি আপনাকে পূর্ব্বে একটি কন্যারত্ন সম্প্রদান করেছিলেম, অধুনা এঁকেও আপনার হস্তে অর্পণ কল্যেম, আপনি এ কন্যারত্বের প্রতিও সমান যত্নবান হবেন! এখন এঁকেও গ্রহণ করে আপনার এক পার্শ্বে বসান। রাজা। ভগবান্ মহর্ষির আজ্ঞা শিরোধার্য্য। (দেবযানীর প্রতি) কেমন প্রিয়ে, তুমি কি বল? রাজ্ঞী। (সহাস্য মুখে) নাথ, এত দিনে কি আমার অনুমতির সাপেক্ষা হলো? শুক্র। বংসে, তুমিও তোমার সপত্নী অথচ আবাল্যের প্রিয়াধী শর্মিষ্ঠাকে যথোচিত সম্মান কর;—আর আপনার সহোদরার ন্যায় এঁর প্রতি পূর্ব্বমত স্নেহ মমতা করবে। রাজ্ঞী। (গাত্রোত্থানপূর্বক শর্ম্মিষ্ঠার কর গ্রহণ করিয়া) প্রিয়সখি, আমার সকল দোষ মার্জনা কর। শর্ম্মি। প্রিয়সখি, তোমার দোষ কি? এ সকল বিধাতার লীলা বৈ ত নয়! রাজ্ঞী। সে যা হৌক, সখি, অদ্যাবধি আমাদের পূর্ব্বপ্রণয় সঞ্জীবিত হলো। এখন এসো, দুই জনেই পতিসেবায় কিছু দিন সুখে যাপন করি। (রাজার প্রতি) মহারাজ, এক বিশাল রসাল তরুবর, মালতী আর মাধবী উত্তর লতিকার আশ্রয়স্থল হলো। রাজা। (প্রফুল্ল মুখে উভয়কে উভয় পার্শ্বে বসাইয়া) অন্ত এক বৃত্তে যুগল পারিজাত প্রস্ফুটিত। (আকাশে কোমল বাদ্য।) শুক্র। (আকাশমার্গে দৃষ্টিপাত করিয়া) এই যে, ইন্দ্রের অপ্সরীরা, এই মাঙ্গলিক ব্যাপারে দেবতাদের অনুকূলতা প্রকাশ করণার্থে উপস্থিত হয়েছেন। (আকাশে পুষ্পবৃষ্টি।) বিদূ। মহারাজ, এতক্ষণ ত আকাশের আমোদ হলো, এখন কিছু মর্ত্ত্যের আমোদ হলে ভাল হয় না? নর্ত্তকীরা এসেছে, অনুমতি হয় ত এখানে আনয়ন করি। রাজা। (হাস্যমুখে) ক্ষতি কি? বিদূ। মহারাজ, ঐ দেখুন, নটীরা নৃত্য কত্যে কত্যে সভার আসচে। (জনান্তিকে রাজার প্রতি) বয়স্য, দেখুন! মলয় মারুতের স্পর্শসুখানুভবে সরসী হিল্লোলিতা হলে যেমন মালিনী নৃত্য করে, এরাও সেইরূপ মনোহররূপে নেচে নেচে আসচে! রাজা। (সহাস্যবদনে জনান্তিকে) সখে, বরঞ্চ বল, যে যেমন মন্দ প্রবাহে কমলিনী ভাসে, এরাও পক্ষ স্বরতরঙ্গে তদ্রূপ প্লবমানা হয়ে এ দিকে আসচে। (চেটীদিগের প্রবেশ।) চেটী। (প্রণাম করিয়া) রাজদম্পতী চিরবিজয়িনী হউন। (নৃত‍্য।) রাজা। আহা! কি মনোহর নৃত্য! সখে মাধব্য, এদের যথোচিত পুরস্কার প্রদানে অনুমতি কর। শুক্র। এই ত আমার মনস্কামনা পূর্ণ হলো! হে রাজন্, এখন আশীর্ব্বাদ করি, যে তোমরা সকলে দীর্ঘজীবী হয়ে এইরূপ পরমসুখে কালযাপন কর, এবং শর্ম্মিষ্ঠার কীর্ত্তিপতাকা ধরাতলে চিরকাল উড্‌ডীয়মানা থাকুক। রাজা। ভগবন্, সিদ্ধবাক্য অমোঘ; আমি ঐহিক সুখের চরম লাভ অদ্যই করলেম। (যবনিকা পতন) ইতি শর্ম্মিষ্ঠা নাটক সমাপ্ত।