মধুসূদনের জীবিতকালে ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটকে’র তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তন্মধ্যে ১২৬৫ সালে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণের ও ১২৭৬ সালে প্রকাশিত তৃতীয় সংস্করণের পুস্তক আমরা দেখিয়াছি। এই দুইটি সংস্করণের যে যে স্থলে উল্লেখযোগ্য পাঠভেদ দৃষ্ট হইয়াছে, নিম্নে তাহার যথাযথ উল্লেখ করা হইল। প্রথম সংস্করণের পুস্তকের প্রারম্ভে এই অংশ ছিল:— প্রস্তাবনা। রাগিণী খাম্বাজ, তাল মধ্যমান। মরি হায়, কোথা সে সুখের সময়, যে সময় দেশময় নাট্যরস সবিশেষ ছিল রসময়! শুন গো ভারতভূমি, কত নিদ্রা যাবে তুমি.. আর নিদ্রা উচিত না হয়। উঠ ত‍্যজ ঘুম ঘোর, হইল, হইল ভোর, দিনকর প্রাচীতে উদয়। কোথায় বাল্মীকি, ব‍্যাস, কোথা তব কালিদাস, কোথা ভবভূতি মহোদয়। অলীক কুনাট্য রঙ্গে, মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে, নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়। সুধারস অনাদরে, বিষবারি পান করে, তাহে হয় তনু মনঃ ক্ষয়। মধু জাগ মা গো, বিভু স্থানে এই মাগ, সুরসে প্রবৃত্ত হউক তব তনয় নিচয়॥ ইতি। পৃ. পংক্তি প্রথম সংস্করণ তৃতীয় সংস্করণ ৫ ২৫ (প্রকাশে) কে হে তুমি? (প্রকাশে) কত্বং ১০ ৫-৬ আশ্রমস্থ পক্ষিসকল কূজনধ্বনি করতঃ চতুর্দ্দিক্ হত‍্যে আপন আপন কুলায়ে প্রত্যাগমন কর্চ‍্যে; কমলিনী স্বীয় আশ্রমে পক্ষিসকল কূজনধ্বনি কর‍্যে চারি দিক হত্যে আপন স্থাপন বাসায় ফিরে আসচে; কমলিনী আপনার ১৫ ১৭-১৮ এই দুই পংক্তির পরিবর্ত্তে প্রথম সংস্করণে এই অংশটি ছিল:— পূর্ণি। প্রিয়সখি! তোমার নবযৌবনরূপ কুসুমমুকুলে যে রাজা যযাতির প্রতি অনুরাগস্বরূপ কীট প্রবিষ্ট হয়েছে, তার সন্দেহ নাই, কিন্তু এক্ষণে এর যথোচিত প্রতিবিধান না কর্‌ল্যে, কালক্রমে যেমন পুষ্প অন্তরস্থ কীট পুষ্পভেদ কর‍্যে বহির্গত হয়, বোধ হয় কালান্তরে তোমারও তাদৃশী দুর্গতি ঘট্তে পারে; অতএব সখি, আমার বিবেচনার এ কথা মহর্ষির কর্ণগোচর করা আবশ্যক। ২১ ২-৩ এই জগদ্বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান নগরীতে রাজচক্রবর্ত্তী প্রবল প্রতাপশালী, বাহুবলেন্দ্র, রাজা এই প্রতিষ্ঠান নগরীতে রাজচক্রবর্তী রাজা ২২ ৮ ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ‍্য ২৬-২৭ এই দুই পংক্তির মধ্যে প্রথম সংস্করণে এই অংশটি ছিল:— ভূবনমোহনী যিনি সাধনের ধন, বিরাগেতে ত‍্যজ্য তিনি করি ত্রিভূবন, অতল জলধি তলে কম আসনে, বিরাজেন কমলা কমল উপবনে সেইরূপ তপোধন ভার্গব আশ্রম, উজ্জ্বল করয়ে ধনী রূপে নিরুপম! কে ডরায়, সিন্ধু, তোর করিতে মথন, পায় যদি সেই এই রমণীরতন! ২৫ ২১-২৬ এই কয় পংক্তির স্থলে প্রথম সংস্করণের পুস্তকে নিম্নোদ্ধৃত অংশ ছিল:— রাজা। কল্যাণি, তুমি চিরকাল সধবা থাক। বিদূ। (সহাস্য বদনে) মহারাজ, আপনার আশীর্ব্বাদ কখনই ব্যর্থ হবার নয়; ইনি রক্তবীজ কুলের কুলবধূ, সুতরাং এঁর চিরসধবা থাকা কোন মতেই অসম্ভব নয়। রাজা। সে কিহে সখে? এ সুন্দরী কে? বিদু। আজ্ঞা, ইনি বারবিলাসিনী, সুতরাং পুরুষকুল নিষ্কুল না হল্যে, এর বৈধব্য দশা কোন ক্রমেই ঘটতে পার্‌ব‍্যে না। রাজা। ছি! ছি! ঐ দেখ, তোমার কথায় সুন্দরী লজ্জায় অধোবদনা হয়েছেন। বিদু। (নটির প্রতি) অয়ি নিতম্বিনি, তুমি আমার প্রতি ক্রুদ্ধা হল্যে না কি? দেখ, যদি তোমার নবযৌবন সুরভি কুসুমের মধুলোভে আমার চিত্ত মধুকর উম্মত্ত হয়ে থাকে, তবে সে কি আমার দোষ? তুমি কি জান না, তোমার প্রতি আমার কতদূর অনুরাগ? দেখ, পুরুষোত্তম যেমন ব্রাহ্মণের পদচিহ্ন বক্ষঃস্থলে রাখেন, তোমাকে পেল্যে আমিও তদপেক্ষা অধিক প্রবন্ধে হৃৎপদ্মে রাখবো। ২৬ এই পৃষ্ঠায় মুদ্রিত গীতটি প্রথম সংস্করণে এইরূপ ছিল:— গীত। রাগিণী বসন্ত, তাল রূপক। হায়, কুহু, কুহু, কুহু, কোকিলের নাদ। বসন্ত এলো সহ অনঙ্গ উন্মাদ! হায়, যৌবনমুকুল তব, শুনি ওই কুহু রব, বিকশিলে ঘটিবে প্রমাদ! হায়, জ্ঞানহীন মধুকর, ভ্রমে দেশ দেশান্তর, কে ভুঞ্জিবে মদন প্রসাদ? হায়, তুমি রতী সমা অতি নিরুপমা,— এ বয়েসে হরিষে বিষাদ? ৩৮ ২৭-২৮ কে তার বশীভূত না হয়? কে তার বশীভূত না হয়? দিনকর উদয়াচলে দর্শন দিলে কি কমলিনী নিমীলিত থাক্‌তে পারে? ৩৯ প্রথম সংস্করণের গানটি এইরূপ ছিল:— গীত। রাগিণী আড়ানা, ভাল মধ্যমান। হে, থাক সাবধানে, ওহে কৃশোদরি, এল তব অরি, রণসজ্জা ধরি! আরোহণ মীনধ্বজে, ধূসরিত পুষ্পরজে, প্রফুল্লিত সলিলজে, উপবেশন করি! তুরঙ্গ ভ্রমরগণ, ধাইতেছে অনুক্ষণ, সারথি মলয় পবন, চালাইছে ত্বরাত্বরি! পিকগণ ঝঙ্কারিছে, রণধ্বনি হুঙ্কারিছে, ফুলধনু টঙ্কারিছে, বিরহি জ্ঞান হরি! খরতর শরে যবে, বিদরিবে তনু, তবে কেমনে সুস্থির রবে, ভবিয়া দেখ সুন্দরি! ৪২ ১৩-১৪ এই দুই পংক্তির মধ্যে প্রথম সংস্করণে ছিল:— শর্ম্মি। নাথ, এম্‌নি স্নেহ যেন চিরকাল থাকে, এই আমার প্রার্থনা। ৪২ ১৪-২৮ প্রথম সংস্করণে এই কয়েক পংক্তি ৪৬ পৃষ্ঠার ১৪ পংক্তির ঠিক পূর্ব্বে দেওয়া আছে। কেবল “হে নরেশ্বর,” কথাটির পরিবর্ত্তে প্রথম সংস্করণে “নাথ,” আছে। ৪৭ ২৫ সে কি? বয়স্য! সে কি মহারাজ? ৫০ ১৮ সধবা হয়ে—(অর্দ্ধোক্তি)। সধবা হয়ে মুখেও আনা উচিত—(অর্দ্ধোক্তি)। ২৫-২৬ এতাদৃশী অবস্থায় একাকিনী রেখ্যে যমুনায় কি প্রকারে এ অবস্থায় এক্‌লা...কেমন করে ২৮-২৯ এইক্ষণে ধূলায় লুণ্ঠিতা হচ‍্যেন, অথচ একটি লোক নাই যে নিকটে এখন ধূলার গড়াগড়ি যাচোন, তবুও এমন একটি লোক নাই, যে তাঁর নিকটে ৫৫ ১ হাঁ, তা যথার্থ বটে? তা করবে না কেন? ৫৭ প্রথম সংস্করণে গানটি এইরূপ ছিল:— গীত। রাগিণী সোহিনী, ভাল মধ্যমান। হায়, এই কি সেই সুখ ফুল বন, যে বনে সার্থক মম জীবন যৌবন? এই সরোবর ফুলে, এই অশোকের মূলে, প্রিয় প্রাণপতি সহ সতত মিলন! সেই তরু লতাচর, কিছু ভাবান্তর নয়, মন ভাগ্য ভাবান্তর, হলো কি কারণ? নহে বহুদিন গত, সোহাগ করিল কত, যে সব স্বপন মত, জ্ঞান হয় এখন! বসি এই শিলা তলে, মম মান রক্ষা হলে, সুচারু করকমলে ধরিল চরণ! এখন সাধনা করি, স্মরি দিবা বিভাবরী, আর কি সে চন্দ্র মোরে দিবে দরশন! ৫৯ ২২ বালকদিগের সহিত ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন কর‍্যে বালকগুলিনকে লয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে ৬২ ৩ চারা উপায় ৬৭ প্রথম সংস্করণে গানটি এইরূপ ছিল:— গীত। রাগিণী বেহাগ, তাল জলদ্ তেতালা। জয়, উমেশ শঙ্কর, শম্ভু দিগম্বর, শশাঙ্ক শেখর, জটাধর। রজত বিনিন্দিত, পন্নগ শোভিত, বিভূতি ভূষিত, কলেবর॥ ত্রিলোক তারক, ত্রিলোক পালক, মোক্ষ বিধায়ক, মহেশ্বর। বিরিঞ্চি বন্দিত, সুরেশ সেবিত, পদার পূজিত, পরাৎপর॥ ৭০ এই পৃষ্ঠার ১৯ পংক্তির ঠিক আগেই নিম্নলিখিত গানটি প্রথম সংস্করণে আছে:— গীত। রাগ ভৈরব, তাল একতালা। মাত হে, আনন্দ রসে পঙ্কজিনি ধনি। রাহুগ্রাসে মুক্ত শেষে তব দিনমণি॥ নিরখিয়ে পুনঃ প্রভাত করে। ধরণী হাসিছে রঙ্গ ভরে। বিছল গাইছে মধুরস্বরে। ললিত লহরী গণি। ৭০ ২০ আহা! কি মধুর সঙ্গীত! আহা! কি মনোহর নৃত্য! ৭০ ২৮-২৯ এই দুই পংক্তির মধ্যে প্রথম সংস্করণে এই অংশটি আছে:— ইতি পঞ্চমাঙ্ক। উপসংহার। রাগিণী বসন্ত, তাল ধীমা তেতালা। শুন হে সভাজন! আমি অভাজন, দীন ক্ষীণ জ্ঞানগুণে, ভয় হয় দেখে শুনে, পাছে কপাল বিগুণে, হারাই পূর্ব্ব মূলধন! যদি অনুরাগ পাই, আনন্দের সীমা নাই, এ কাহেতে একযাই দিব দরশন!