আমি একাকিনী যবে চলি রাজ পথে         নব-অভিসার সাজে,       নিশীথে নীরব নিখিল ভুবন,       না গাহে বিহগ, না চলে পবন,       মৌন সকল পৌর ভবন         সুপ্ত নগর মাঝে, শুধু আমার নুপুর আমারি চরণে         বিমরি বিমরি বাজে;       অধীর মুখর শুনিয়া সে স্বর         পদে পদে মরি লাজে! আমি চরণ শব্দ শুনিব বলিয়া         বসি বাতায়ন কাছে,—       অনিমেষ তারা নিবিড় নিশায়,       লহরীর লেশ নাহি যমুনায়,       জনহীন পথ আঁধারে মিশায়,         পাতাটি কাঁপে না গাছে; শুধু আমারি উরসে আমারি হৃদয়         উলসি বিলসি নাচে,       উতলা পাগল করে কলরোল         বাঁধন টুটিলে বাঁচে। আমি কুসুম শয়নে মিলাই সরমে,—         মধুর মিলন রাতি;       স্তব্ধ যামিনী ঢাকে চারিধার,       নির্ব্বাণ দীপ, রুদ্ধ দুয়ার,       শ্রাবণ গগন করে হাহাকার         তিমির শয়ন পাতি’; শুধু আমার মাণিক আমারি বক্ষে         জ্বালায়ে রেখেছে বাতি;       কোথায় লুকাই, কেমনে নিবাই         নিলাজ ভূষণ ভাতি। আমি আমার গোপন মরমের কথা         রেখেছি মরম তলে।       মলয় কহিছে আপন কাহিনী,       কোকিল গাহিছে আপন রাগিণী,       নদী বহি চলে কাঁদি একাকিনী         আপনার কলকলে। শুধু আমার কোলের আমারি বীণাটি         গীত ঝঙ্কার ছলে       যে কথা যখন করিব গোপন         সে কথা তখনি বলে। ১৫ ই মাঘ, ১৩০২। — চিত্রা (1896)