(অর্জ্জুনের প্রতি দ্রৌপদী।) [ যৎকালে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পাশক্রীড়ায় পরাজিত ও রাজচ্যুত হইয়া বনে বাস করেন, বীরবর অর্জ্জুন বৈরনির্যাতনের নিমিত্ত অস্ত্রশিক্ষার্থ সুরপুরে গমন করিয়াছিলেন। পার্থের বিরহে কাতরা হইয়া, দ্রৌপদী দেবী তাঁহাকে নিম্ন-লিখিত পত্রিকাখানি এক ঋষি পুত্ত্রের সহযোগে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ] হে ত্রিদশালয়-বাসি, পড়ে কভু মনে এ পাপ সংসার আর? কেন বা পড়িবে? কি অভাব তব, কান্ত, বৈজয়ন্ত-ধামে? দেব-ভোগ-ভোগী তুমি, দেবসভা মাঝে আসীন দেবেন্দ্রাসনে! সতত আদরে৫ সেবে তোমা সুরবালা,—পীনপয়োধরা ঘৃতাচী; সু-ঊরু রম্ভা, নিত্য-প্রভাময়ী স্বয়ম্প্রভা; মিশ্রকেশী—সুকেশিনী ধনী! উর্ব্বশী—কলঙ্ক-হীনা শশীকলা দিবে! নিবিড়-নিতম্বী সহা সহ চিত্রলেখা১০ চারুনেত্রা; সুমধ্যমা তিলোত্তমা বামা; সুলোচনা সুলোচনা, কেহ গায় সুখে; কেহ নাচে,—দিব্য বীণা বাজে দিব্য তালে; মন্দার-মণ্ডিত বেণী দোলে পৃষ্ঠদেশে! কস্তুরী কেশর ফুল আনে কেহ সাধে!১৫ কেহ বা অধর-মধু যোগায় বিরলে, সুমৃণাল-ভুজে তোমা বাঁধি, গুণনিধি! রসিক নাগর তুমি; নিত্য রসবতী সুরবালা;—শত ফুল প্রফুল্ল যে বনে, কি সুখে বঞ্চিত, সখে, শিলীমুখ তথা?২০ নন্দন-কাননে তুমি আনন্দে, সুমতি, ভ্রম নিত্য! শুনিয়াছি ঋতুরাজ না কি সাজান সে বনরাজী বিরাজি সে বনে নিরন্তর; নিরন্তর গায় পাখী শাখে; না শুখায় ফুলকুল; মণি মুক্তা হীরা২৫ স্বর্ণ মরকতে বাঁধা সরোরোধঃ যত! মন্দ মন্দ সমীরণ বহে দিবা নিশি গন্ধামোদে পূরি দেশ। কিন্তু এ বর্ণনে কি কাজ? শুনেছে দাসী কর্ণে মাত্র যাহা, নিত্য স্বনয়নে তুমি দেখ তা, নৃমণি!৩০ স্বশরীরে স্বর্গভোগ! কার ভাগ্য হেন তোমা বিনা, ভাগ্যবান্, এ ভব-মণ্ডলে? ধন্য নর-কুলে তুমি! ধন্য পুণ্য তব! পড়িলে এ সব কথা মনে, শূরমণি, কেমনে ভাবিব, হায়, কহ তা আমারে,৩৫ অভাগী দাসীর কথা পড়ে তব মনে? তবে যদি নিজগুণে, গুণনিধি তুমি, ভুলিয়া না থাক তারে,—আশীর্ব্বাদ কর, নমে পদে, ধনঞ্জয়, দ্রুপদ-নন্দিনী— কৃতাঞ্জলি-পুটে দাসী নমে তব পদে!৪০ হায়, নাথ, রথা জন্ম নারীকুলে মম! কেন যে লিখিলা বিধি এ পোড়া কপালে হেন তাপ; কোন্ পাপে দণ্ডিলা দাসীরে এ রূপে, কে কবে মোরে? সুধিব কাহারে? রবি-পরায়ণা, মরি, সরোজিনী ধনী,৪৫ তবু নিত্য সমীরণ কহে তার কানে প্রেমের রহস্য কথা! অবিরল লুটে পরিমল! শিলীমুখ, গুঞ্জরি সতত, (কি লজ্জা!) অধর-মধু পান করে সুখে! সৃজিলা কমলে যিনি, সৃজিলা দাসীরে৫০ সেই নিদারুণ বিধি? কারে নিন্দি, কহ অরিন্দম? কিন্তু কহি ধর্ম্মে সাক্ষী মানি, শুন তুমি, প্রাণকান্ত! রবির বিরহে, নলিনী মলিনী যথা মুদিত বিষাদে; মুদিত এ পোড়াপ্রাণ তোমার বিহনে!৫৫ সাধে যদি শত অলি গুঞ্জরিয়া পদে; সহস্র মিনতি যদি করে কর্ণ-মূলে সমীরণ, ফোটে কি হে কভু পঙ্কজিনী, কনক-উদয়াচলে না হেরি মিহিরে, কিরীটি? আঁধার বিশ্ব এ পোড়া নয়নে,৬০ হায়রে, আঁধার নাথ, তোমার বিরহে— জীবশূন্য, রবশূন্য, মহারণ‍্য যেন! আর কি কহিব, দেব, ও রাজীবপ-দে? পাঞ্চালীর চির-বাঞ্ছা, পাঞ্চালীর পতি ধনঞ্জয়! এই জানি, এই মানি মনে।৬৫ যা ইচ্ছা করুন ধর্ম্ম, পাপ করি যদি ভালবাসি নৃমণিয়ে,—যা ইচ্ছা, নৃমণি! হেন সুখ ভুঞ্জি, দুঃখ কে ডরে ভুঞ্জিতে? যজ্ঞানলে জনমিল দাসী যাজ্ঞসেনী, জান তুমি, মহাযশা। তরুণ যৌবনে৭০ রূপ গুণ যশে তব, হায় রে, বিবশা, বরিনু তোমায় মনে! সখীদলে লয়ে কত যে খেলিনু খেলা, কহিব কেমনে? বৈদেহীর সুকাহিনী শুনি লোক মুখে শিবের মন্দিরে পশি পুষ্পাঞ্জলি দিয়া,৭৫ পূজিতাম শিবধনুঃ! কহিতাম সাধে,— ‘ঋষিবেশে স্বপ্ন আশু দেখাও জনকে (জানি কামরূপ তুমি! } দিতে এ দাসীরে সে পুরুষোত্তমে, যিনি দুই খণ্ড করি, হে কোদণ্ড, ভাঙ্গিবেন তোমায় স্ববলে!৮০ তা হলে পাইব নাথে, বলী-শ্রেষ্ঠ তিনি!’ শুনি বৈদর্ভীর কথা, ধরিতাম ফাঁদে রাজহংসে; দিয়া তারে আহার, পরায়ে সুবর্ণ ঘুংঘুর পায়ে, কহিতাম কানে,— ‘যমুনার তীরে পুরী বিখ্যাত জগতে৮৫ হস্তিনা;—তথায় তুমি, রাজহংসপতি, যাও শীঘ্র শূন্য পথে, হেরিবে সে পুরে নরোত্তমে; তাঁর পদে কহিও, দ্রৌপদী তোমার বিরহে মরে দ্রুপদ-নগরে!’ এই কথা কয়ে তারে দিতাম ছাড়িয়া।৯০ হেরিলে গগনে মেঘে, কহিতাম নমি;— ‘বাহন যাঁহার তুমি, মেঘ-কুল-পতি, পুত্রবধূ তাঁর আমি; বহ তুলি মোরে, বহ যথা বারি-ধারণ, নাথের চরণে! জল-দানে চাতকীরে তোষ দাতা তুমি,৯৫ তোমার বিরহে, হায়, তৃষাতুরা যথা সে চাতকী, তৃষাতুরা আমি, ঘনমণি! মোর সে বারিদ-পদে দেহ মোরে লয়ে!’ আর কি শুনিবে, নাথ? উঠিল যৎকালে জনরব—‘জতুগৃহে দহি মাতৃ-সহ১০০ ত‍্যজিলা অকালে দেহ পঞ্চ পাণ্ডুরথী’— কত যে কাঁদিনু আমি, কব তা কাহারে? কাঁদিনু—বিধবা যেন হইনু যৌবনে! প্রার্থিনু রতিরে পূজি,—হর-কোপানলে, হে সতি, পুড়িলা যবে প্রাণ-পতি তব,১০৫ কত যে সহিলা দুঃখ, তাই স্মরি মনে, বাঁচাও মদনে মোর,—এই ভিক্ষা মাগি!’ পরে স্বয়ম্বরোৎসব। আঁধার দেখিনু চৌদিক, পশিনু যবে রাজসভা-মাঝে! সাধিনু মাটিরে ফাটি হইতে দুখানি!১১০ দাঁড়াইয়া লক্ষ্য-তলে কহিনু, ‘খসিয়া পড় তুমি পোড়া শিরে বজ্রাগ্নি-সদৃশ, হে লক্ষ্য! জ্বলিয়া আমি যরি তব তাপে, প্রাণ-পতি জতুগৃহে জ্বলিলা যেমতি! না চাহি বাঁচিতে আর! বাঁচিব কি সাধে?”১১৫ উঠিল সভায় রব,—‘নারিলা ভেদিতে এ অলক্ষ্য লক্ষ্যে আজি ক্ষত্ররথী যত।’— জান তুমি, গুণমণি, কি ঘটিল পরে। ভস্মরাশি যারে গুপ্ত বৈশ্বানর-রূপে কি কাজ করিলা তুমি, কে না জানে ভবে,১২০ রথীশ্বর? বজ্রবাদে ভেদিল আকাশে মৎস্য-চক্ষুঃ তীক্ষ্ণ শর! সহসা ভাসিল আনন্দ সলিলে প্রাণ; শুনিনু সুবাণী (স্বপ্নে যেন!) ‘এই তোর পতি, লো পাঞ্চালি! ফুল-মালা দিয়ে গলে, বর নরবরে!’১২৫ চাহিনু বরিতে, নাথ, নিবারিলা তুমি অভাগীর ভাগ্য দোষে! তা হলে কি তবে এ বিষম তাপে, হায়, মরিত এ দাসী? কিন্তু বৃথা এ বিলাপ!—হুহুঙ্কারি রোষে, লক্ষ রাজরথী যবে বেড়িল তোমারে;১৩০ অম্বুরাশি-নাদ সম কম্বুরাশি যবে নাদিল সে স্বয়ম্বরে;—কি কথা কহিয়া সাহসিলা এ দাসীরে, পড়ে কি হে মনে? যদি ভুলে থাক তুমি, ভুলিতে কি পারে দ্রৌপদী? আসন্ন কালে সে সুকথা গুলি১৩৫ জপিয়া মরিব, দেব, মহাযন্ত্র জ্ঞানে! কহিলে সম্বোধি মোরে সুমধুর স্বরে;— ‘আশারূপে মোর পাশে দাঁড়াও, রূপসি! দ্বিগুণ বাড়িবে বল চন্দ্রমুখ হেরি, চন্দ্রমুখি! যত ক্ষণ ফণীন্দ্রের দেহে১৪০ থাকে প্রাণ, কার সাধ্য হরে শিরোমণি? আমি পার্থ!’—ক্ষম, নাথ, লাগিল তিতিতে অনর্গল অশ্রুজল এ লিপি! কেন না,— হায় রে, কেন না আমি মরিনু চরণে সে দিন!—কি লিখি, হায়, না পাই দেখিতে!১৪৫ আঁধা, বঁধু, অশ্রুনীরে এ তব কিঙ্করী!— এত দূর লিখি কালি, ফেলাইনু দূরে লেখনী! আকুল প্রাণ উঠিল কাঁদিয়া স্মরি পূর্ব্ব-কথা যত। বসি তরু-ফুলে, হায় রে, ভিভিন্ন, নাথ, নয়ন-আসারে!১৫০ কে মুছিল চক্ষুঃ জল? কে মুছিবে কহ? কে আছে এ অভাগীর এ ভবমণ্ডলে? ইচ্ছা করে ত্যজি প্রাণ ডুবি জলাশয়ে; কিম্বা পান করি বিষ; কিন্তু ভাবি যবে, প্রাণেশ, ত্যজিলে দেহ আর না পাইব১৫৫ হেরিতে ও পদযুগ,—সান্ত্বনি পরাণে, ভুলি অপমান, লজ্জা, চাহি বাঁচিবারে! অগ্নিতাপে তপ্তা সোণা গলে হে সোহাগে, পায় যদি সোহাগায়! কিন্তু কহ, রথি, কবে ফিরি আসি দেখা দেবে এ কাননে?১৬০ কহ ত্রিদিবের বার্ত্তা। কবীশ্বর তুমি, গাঁথি মধুমাখা গাথা পাঠাও দাসীরে। ইচ্ছা বড়, গুণমণি, পরিতে অলকে পারিজাত; যদি তুমি আন সঙ্গে করি, দ্বিগুণ আদরে ফুল পরিব কুন্তলে!১৬৫ শুনেছি কামদা না কি দেবেন্দ্রের পুরী;— এ দাসীর প্রতি যদি থাকে দয়া হৃদে, ভুলিতে পার হে যদি সুর-বালা-দলে, এ কামনা কামধুকে কর দয়া করি পাও যেন অভাগীরে চরণ কমলে১৭০ ক্ষণ কাল! জুড়াইব নয়ন সুমতি ও রূপ-মাধুরী হেরি,—ভুলি এ বিচ্ছেদে; অপ্‌সরা-বল্লভ তুমি; নর-নারী দাসী; তা বল্যে করো না ঘৃণা—এ মিনতি পদে! স্বর্গ-অলঙ্কার যারা পরে শিরোদেশে,১৭৫ কণ্ঠে, হস্তে; পরে না কি রজত চরণে? কি ভাবে কাটাই কাল এ বিকট বনে আমরা, কহিব এবে, শুন, গুণনিধি। ধর্ম্ম-কর্ম্ম রত সদ্য ধর্ম্মরাজ-ঋষি; ধৌম্য পুরোহিত নিত্য ভূষেন রাজনে১৮০ শাস্ত্রালাপে। মৃগয়ায় রত ভ্রাতা তব মধ্যম; অনুজ-দ্বয়, মহা-ভক্তিভাবে, সেবেন অগ্রজ-দ্বয়ে; যথা সাধ্য, দাসী নির্ব্বাহে, হে মহাবাহু, গৃহ-কার্য্য যত। কিন্তু ক্ষুণ্ণমনা সবে তোমার বিহনে!১৮৫ স্মরি তোমা অশ্রুনীরে তিতেন নৃপতি, আর তিন ভাই তব। স্মরিয়া তোমারে, আকুল এ পোড়া প্রাণ, হায়, দিবা নিশি! পাই যদি অবসর, কুটীর তেয়াগি স্মৃতি-দূতী সহ, নাথ, ভ্রমি একাকিনী,১৯০ পূর্ব্বের কাহিনী যত শুনি তাঁর মুখে! পাণ্ডব-কুল-ভরসা, মহেষ্বাস, তুমি; বিমুখিবে তুমি, সখে, সম্মুখ-সমরে ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ শূরে; নাশিবে কৌরবে! বসাইবে রাজাসনে পাণ্ডু-কুল-রাজে;—১৯৫ এই গীত গায় আশা নিত্য এ আশ্রমে এ সঙ্গীত-ধ্বনি, দেব, শুনি জাগরণে। শুনি স্বপ্নে নিশাভাগে এ সঙ্গীত-ধ্বনি! কে শিখায় অস্ত্র তোমা, কহ সুরপুরে, অস্ত্রী-কুল-গুরু তুমি? এই সুর-দলে২০০ প্রচণ্ড গাণ্ডীব তুমি টঙ্কারি হুংকারে, দমিলা খাণ্ডব-রণে! জিনিলা একাকী লক্ষরাজে, রথীরাজ, লক্ষ্য-ভেদ-কালে। নিপাতিলা ভূমিতলে বলে ছদ্মবেশী কিরাতেরে! এ ছলনা, কহ, কি কারণে?২০৫ এস ফিরি, নররত্ন! কে ফেরে বিদেশে যুবতী পত্নীরে ঘরে রাখি একাকিনী; কিন্তু যদি সুরনারী প্রেম-ফাঁদ পাতি বেঁধে থাকে মনঃ, বঁধু, স্মর ভ্রাতৃ-ত্রয়ে— তোমার বিরহ-দুঃখে দুঃখী অহরহ!২১০ আর কি অধিক কব? যদি দয়া থাকে, আসি দেখ কি দশায় তোমার বিরহে, কি দশায়, প্রাণেশ্বর, নিবাসি এ দেশে! পাইয়াছি দৈবে, দেব, এ বিজন বনে ঋষিপত্নী পুণ্যবতী; পূর্ব্ব পুণ্য-বলে২১৫ স্বেচ্ছাচর পুত্র তাঁর! তেজস্বী সুশিশু দিবামুখে রবি যেন! বেদ অধ্যয়নে সদা রত! দয়া করি বহিবেন তিনি, মাতৃ-অনুরোধে পত্র, দেবেন্দ্র সদনে। যথাবিধি পূজা তাঁর করিও সুমতি।২২০ লিখিলে উত্তর তিনি আনিবেন হেথা। কি কহিনু, নরোত্তম? কি কাজ উত্তরে? পত্রবহ সহ ফিরি আইস এ বনে! ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে দ্রৌপদী-পত্রিকা নাম ষষ্ঠ সর্গ।