নীতিগর্ভ কাব্য। ১ (ময়ূর ও গৌরী।) ময়ূর কহিল কাদি গৌরীর চরণে, কৈলাস-ভবনে;— “অবধান কর দেবি, আমি ভৃত্য নিত্য সেবি প্রিয়োত্তম সূতে তর এ পৃষ্ঠ-আসনে। রথী যথা দ্রুত রথে, চলেন পবন-পথে দাসের এ পিঠে চড়ি সেনানী সুমতি; তবু, মাগো, আমি দুখী অতি! করি যদি কেকা-ধ্বনি, ঘৃণায় হাসে অমনি খেচর, ভুচর জন্তু;—মরি, মা, শরমে! ডালে মূঢ় পিক যবে গায় গীত, তার রবে মাতিয়া জগৎ-জন বাখানে অধমে! বিবিধ কুসুম কেশে, সাজি মনোহর বেশে, বরেন বসুধা দেবী যবে ঋতুবরে কোকিল মঙ্গল-ধ্বনি করে। অহরহ কুহুধ্বনি বাজে বনস্থলে; নীরবে থাকি, মা, আমি; রাগে হিয়া জ্বলে! ঘুচাও কলঙ্ক শুভঙ্করি, পুত্ত্রের কিঙ্কর আমি এ মিনতি করি, পা দুখানি ধরি। ” উত্তর করিলা গৌরী সুমধুর স্বরে;— “পুত্ত্রের বাহন তুমি খ্যাত চরাচরে, এ আক্ষেপ কর কি কারণে? হে বিহঙ্গ, অঙ্গ-কান্তি ভাবি দেখ মনে! চন্দ্রককলাপে দেখ নিজ পুচ্ছ-দেশে; রাখাল রাজার সম চুড়াখানি কেশে! আখণ্ডল-ধনুর বরণে মণ্ডিলা সু-পুচ্ছ ধাতা তোমার সৃজনে! সদা জ্বলে তব গলে স্বর্ণ হার ঝল ঝলে, যাও, বাছা, নাচ গিয়া ঘনের গর্জ্জনে, হরষে সু-পুচ্ছ খুলি শিরে স্বর্ণ-চূড়া তুলি; করগে কেলি ব্রজ-কুঞ্জ-বনে। করতালি ব্রজাঙ্গনা দেবে রঙ্গে বরাঙ্গনা — তোষ গিয়া ময়ূরীরে প্রেম-আলিঙ্গনে! শুন বাছা, মোর কথা শুন, দিয়াছেন কোন কোন গুণ, দেব সনাতন প্রতি-জনে; সু-কলে কোকিল গায়, বাজ বজ্র-গতি ধায়, অপরূপ রূপ তব, খেদ কি কারণে?”— নিজ অবস্থায় সদা স্থির যার মন, তার হতে সুখীতর অন্য কোন জন? ২ (কাক ও শৃগালী।) একটি সন্দেশ চুরি করি, উড়িয়া বসিলা বৃক্ষোপরি, কাক, হৃষ্ট-মনে; সুখাদ্যের বাস পেয়ে, আইল শৃগালী ধেয়ে দেখি কাকে কহে দুষ্টা মধুর বচনে;— “অপরূপ রূপ তব, মরি! তুমি কি গো ব্রজের শ্রীহরি,— গোপিনীর মনোবাঞ্ছা?—কহ গুণমনি! হে নব নীরদ-কান্তি, ঘুচাও দাসীর ভ্রান্তি, যুড়াও এ কান দুটি করি বেণু-ধ্বনি! পুণ্যবতী গোপ-বধূ অতি! তেঁই তারে দিলা বিধি, তব সম রূপ-নিধি— মোহ হে মদনে তুমি; কি ছার যুবতী? গাও গীত, গাও, সখে করি এ মিনতি! কুড়াইয়া কুসুম-রতনে, গাঁথি মালা সুচারু গাঁথনে, দোলাইয়া দিব তব * * * * দাসীর সাধনে * * বাজাও মধুর * * বাস-বসে মাতি * * * * * মজিল * * * মুখ খুলি * * * * * * খে মু * * * * * * গীত আ * * * ৩ (রসাল ও স্বর্ণ-লতিকা।) রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণ লতিকারে;— “শুন মোর কথা, ধনি, নিন্দ বিধাতারে! নিদারুণ তিনি অতি; নাহি দয়া তব প্রতি; তেঁই ক্ষুদ্র-কায়া করি সৃজিলা তোমারে! মলয় বহিলে, হায়, নতশিরা তুমি তায়, মধুকর-ভরে তুমি পড় লো ঢলিয়া; হিমাদ্রি সদৃশ আমি, বন-বৃক্ষ-কুল-স্বামী, মেঘলোকে উঠে শির আকাশ ভেদিয়া! কালাগ্নির মত তপ্ত তপন তাপন,— আমি কি লো ডরাই কখন? দূরে রাখি গাভী-দলে, রাখাল আমার তলে বিরাম লভয়ে অনুক্ষণ,— শুন, ধনি, রাজ-কাজ দরিদ্র পালন! আমার প্রসাদ ভুঞ্জে পথ-গামী জন। কেহ অন্ন রাঁধি খায় কেহ পড়ি নিদ্রা যায় এ রাজ-চরণে। শীতলিয়া মোর ডরে সদা আসি সেবা করে মোর অতিথির হেথা আপনি পবন! মধু-মাখা ফল মোর বিখ্যাত ভুবনে! তুমি কি তা জাননা, ললনে? দেখ মোর ডাল-রাশি, কত পাখী বাঁধে আসি বাসা এ আগারে! ধন্য মোর জনম সংসারে! কিন্তু তব দুখ দেখি নিত্য আমি দুখী; নিন্দ বিধাতায় তুমি, নিন্দ, বিধুমুখি! ” * * * মধুরস্বরে * * * * রে, * * * * * * *; * * * * * * * * * প্রভু, * * * দয়ামি * * * * * যথা * * যুদ্ধার্থ গম্ভীরতার বাণী তব পানে! সুধা-আশে আসে অলি, দিলে সুধা যায় চলি,— কে কোথা কবে গো দুখী সখার মিলনে?” “ ক্ষুদ্র-মতি তুমি অতি ” রাগি কহে তরুপতি, “নাহি কিছু অভিমান? ধিক্‌ চন্দ্রাননে!” নীরবিলা তরুরাজ, উড়িল গগনে যমদূতাকৃতি মেঘ গম্ভীর স্বননে; আইলেন প্রভঞ্জন, সিংহনাদ করি ঘন, যথা ভীম ভীমসেন কৌরব-সমরে। আইল খাইতে মেঘ দৈত্যকুল রড়ে; ঐরাবত পিঠে চড়ি রাগে ছাঁত কড়মড়ি, ছাড়িলেন বজ্র ইন্দ্র কড় কড় কড়ে! ঊরু ভাঙ্গি কুরুরাজে বধিলা যেমতি ভীম যোধপতি; মহাঘাতে মড় মড়ি রসাল ভূতলে পড়ি, হায়, বায়ুবলে হারাইলা আয়ু-সহ দর্প বনস্থলে! ঊর্দ্ধশির যদি তুমি কুল মান ধনে; করিওনা ঘৃণা তবু নীচশির জনে! এই উপদেশ করি দিলা এ কৌশলে॥ সমাপ্ত। I. C. Bose & Co., Stanhope Press, 172, Bow-Bazar Road, Calcutta.