নবম সর্গ — শান্তনুর প্রতি জাহ্ণবী
শান্তনুর প্রতি জাহ্ণবী।
[ জাহ্ণবীদেবীর বিরহে রাজা শান্তনু একান্ত কাতর হইয়া রাজ্যাদি পরিত্যাগ পূর্ব্বক বহু দিবস গঙ্গাতীরে উদাসীনভাবে কালাতিপাত করেন। অষ্টম বসু অবতার দেবব্রত (যিনি মহাভারতীয় ইতিবৃত্তে ভীষ্ম পিতামহ নামে প্রথিত) বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে, জাহ্ণবীদেবী নিম্ন-লিখিত পত্রিকা খানির সহিত পুত্রবরকে রাজসন্নিধানে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ]
বৃথা তুমি, নরপতি, ভ্রম মম তীরে,—
বৃথা অশ্রুজল তব, অনর্গল বহি,
মম জলদল সহ মিশে দিবানিশি!
ভুল ভূতপূর্ব্বকথা, ভুলে লোক যথা
স্বপ্ন—নিদ্রা-অবসানে! এ চিরবিচ্ছেদে৫
এই হে ঔষধ মাত্র, কহিনু তোমারে!
হর-শির-নিবাসিনী হরপ্রিয়া আমি
জাহ্নবী। তবে যে কেন নরনারীরূপে
কাটাইনু এত কাল তোমার আলয়ে,
কহি, শুন। ঋষিশ্রেষ্ঠ বশিষ্ঠ সরোষে১০
ভূতলে জন্মিতে শাপ দিলা বসুদলে
যে দিন, পড়িল তারা কাঁদি মোর পদে,
করিয়া মিনতি স্তুতি নিষ্কৃতির আশে।
দিনু বর—‘মানবিনী ভাবে ভবতলে
ধরিব এ গর্ভে আমি তোমা সবাকারে।’১৫
বরিনু তোমারে সাধে, নরবর তুমি,
কৌরব! ঔরসে তব ধরিনু উদরে
অষ্টশিশু,—অষ্টবসু তারা, নরমণি!
ফুটিল এক মৃণালে অষ্ট সরোরুহ!
কত যে পুণ্য হে তব, দেখ ভাবি মনে!২০
সপ্তজন ত্যজি দেহ গেছে স্বর্গধামে।
অষ্টম নন্দনে আজি পাঠাই নিকটে;
দেবনররূপী রত্নে গ্রহ যত্নে তুমি,
রাজন্! জাহ্নবীপুত্ত্র দেবব্রত বলী
উজ্জ্বলিবে বংশ তব, চন্দ্রবংশপতি;—২৫
শোভিবে ভারত-ভালে শিরোমণিরূপে,
যথা আদিপিতা তব চন্দ্রচূড়-চুড়ে!
পালিয়াছি পুত্ত্রবরে আদরে, নৃমণি,
তব হেতু। নিরখিয়া চন্দ্রমুখ, ভুল
এ বিচ্ছেদ-দুঃখ তুমি। অখিল জগতে,৩০
নাহি হেন গুণী আর, কহিনু তোমারে!
মহাচল-কুল-পতি হিমাচল যথা;
নদপতি সিন্ধুনদ; বন-কুলপতি
খাণ্ডব; রথীন্দ্রপতি দেবব্রত রথী—
বশিষ্ঠের শিষ্যশ্রেষ্ঠ! আর কব কত?৩৫
আপনি বাগ্দেবী, দেব, রসনা-আসনে
আসীনা; হৃদয়ে দয়া, কমলে কমলা;
যমসম বল ভুজে! গহন বিপিনে
যথা সর্ব্বভুক বহ্নি, দুর্ব্বার সমরে!
তর পুণ্যবৃক্ষ ফল এই, নরপতি!৪০
স্নেহের সরসে পদ্ম! আশার আকাশে
পূর্ণশশী! যত দিন ছিনু তব গৃহে,
পাইনু পরম প্রীতি! কৃতজ্ঞতাপাশে
বেঁধেছ আমারে তুমি; অভিজ্ঞানরূপে
দিতেছি এ রত্ন আমি, গ্রহ, শান্তমতি।৪৫
পত্নীভাবে আর তুমি ভেবোনা আমারে!
অসীম মহিমা তব; কুল মান ধনে
নরকুলেশ্বর তুমি এ বিশ্বমণ্ডলে!
তরুণ যৌবন তব;—যাও ফিরি দেশে;—
কাতরা বিরহে তব হস্তিনা নগরী!৫০
যাও ফিরি, নরবর, আন গৃহে বরি
বরাঙ্গী রাজন্দ্রবালে; কর রাজ্য সুখে!
পাল প্রজা; দম রিপু; দণ্ড পাপাচারে—
এই হে সুরাজনীতি;—বাড়াও সতত
সতের আদর সাধি সৎক্রিয়া যতনে!৫৫
বরিও এ পুত্ত্রবরে যুবরাজ পদে
কালে। মহাযশা পুত্ত্র হবে তব সম
যশস্বি; প্রদীপ যথা জ্বলে সমতেজে
সে প্রদীপ সহ, যার তেজে সে তেজস্বী!
কি কাজ অধিক কয়ে? পূর্ব্বকথা ভুলি,৬০
করি ধৌত ভক্তিরসে কামগত মনঃ,
প্রণম সাষ্টাঙ্গে, রাজা! শৈলেন্দ্রনন্দিনী
রুদ্রেন্দ্রগৃহিণী গঙ্গা আশীষে তোমারে
যত দিন ভবধামে রহে এ প্রবাহ,
ঘোষিবে তোমার যশ, গুণ, ভবধামে!৬৫
কহিবে ভারভজন,—ধন্য ক্ষত্রফুলে
শান্তনু, তনয় যাঁর দেবব্রত রথী!
লয়ে সঙ্গে পুত্রধনে যাও রঙ্গে চলি
হস্তিনায়, হস্তিগতি! অন্তরীক্ষে থাকি
তব পুরে, তব সুখে হইব হে সুখী,৭০
তনয়ের বিধুমুখ হেরি দিবানিশি!
ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে জাহ্নবীপত্রিকা নাম
নামঃ সর্গঃ।
More from বীরাঙ্গনা কাব্য
More in Poetry
Poetry
Palanquin Bearers
Lightly, O lightly we bear her along, She sways like a flower in the wind of our song; She skims like a bird on the foam of a stream; She floats like a laugh from the lips of a dream. Gaily, O gaily we glide and we sing,...
Poetry
Where the Mind is Without Fear (Gitanjali 35)
Where the mind is without fear and the head is held high; Where knowledge is free; Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls; Where words come out from the depth of truth; Where tirel...
Poetry
Thou Hast Made Me Endless (Gitanjali 1)
Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life. This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed...
Comments (0)
Log in to join the conversation.