চতুর্থ সর্গ — দশরথের প্রতি কেকয়ী
(দশরথের প্রতি কেকয়ী।)
[ কোন সময়ে রাজর্ষি দশরথ কেকয়ী দেবীর নিকট এই প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যে তিনি তাঁহার গর্ভজাত-পুত্র ভরতকেই যুবরাজপদে অভিষিক্ত করিবেন। কালক্রমে রাজা স্বসত্য বিস্তৃত হইয়া কৌশল্যানন্দন রামচন্দ্রকে সে পদ-প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করাতে, কেকয়ী দেবী মন্থরা নাম্নী দাসীর মুখে এ সংবাদ পাইয়া, নিম্ন লিখিত পত্রিকাখানি রাজসমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ]
এ কি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে,
রঘুরাজ? কিন্তু দাসী নীচকুলোদ্ভবা,
সত্য মিথ্যা জ্ঞান তার কভু না সম্ভবে!
কহ তুমি;—কেন আজি পুরবাসী যত
আনন্দ-সলিলে মগ্ন? ছড়াইছে কেহ৫
ফুলরাশি রাজপথে; কেহবা গাঁথিছে
মুকুল কুসুম ফল পল্লবের মালা
সাজাইতে গৃহদ্বার—মহোৎসবে যেন?
কেন বা উড়িছে ধ্বজ প্রতি গৃহচূড়ে?
কেন পদাতিক, হয়, গজ, রথ, রথী১০
বাহিরিছে রণবেশে? কেন বা বাজিছে
রণবাদ্য? কেন আজি পুরনারী-ব্রজ
মুহুর্মুহুঃ হুলাহুলি দিতেছে চৌদিকে?
কেন বা নাচিছে নট, গাইছে গায়কী?
কেন এত বীণা-ধ্বনি? কহ, দেব, শুনি,১৫
কৃপা করি কহ মোরে,—কোন্ ব্রতে ব্রতী
আজি রঘু-কুল-শ্রেষ্ঠ? কহ, হে নৃমণি,
কাহার কুশল-হেতু কৌশল্যা মহিষী
বিতরেন ধন-জাল? কেন দেবালয়ে
বাজিছে ঝাঁঝরি, শংখ, ঘণ্টা ঘটারোলে?২০
কেন রঘু-পুরোহিত রত স্বস্ত্যয়নে?
নিরস্ত্র জন-স্রোতঃ কেন বা বহিছে
এ নগর-অভিমুখে? রঘু-কুল-বধূ
বিবিধ ভূষণে আজি কি হেতু সাজিছে—
কোন্ রঙ্গে? অকালে কি আরম্ভিলা, প্রভু,২৫
যজ্ঞ? কি মঙ্গলোৎসব আজি তব পুরে?
কোন্ রিপু হত রণে, রঘু-কুল-রথি?
জন্মিল কি পুত্ত্র আর? কাহার বিবাহ
দিবে আজি? আইবড় আছে কি হে গৃহে
দুহিতা? কৌতুক বড় বাড়িতেছে মনে!৩০
কহ, শুনি, হে রাজন্; এ বয়েসে পুনঃ
পাইলা কি ভাগ্য-বলে—ভাগ্যবান্ তুমি
চিরকাল!—পাইলা কি পুনঃ এ বয়েসে—
রসময়ী নারী-ধনে, কহ, রাজ-ঋষি?
হা ধিক্! কি কবে দাসী—গুরু জন তুমি!৩৫
নতুবা কেকয়ী, দেব, মুক্তকণ্ঠে আজি
কহিত,—‘অসত্য-বাদী রঘু-কুল-পতি!
নির্লজ্জ! প্রতিজ্ঞা তিনি ভাঙ্গেন সহজে!
ধর্ম্ম-শব্দ মুখে,—গতি অধর্ম্মের পথে!’
অযথার্থ কথা যদি বাহিরায় মুখে৪০
কেকয়ীর, মাথা তার কাট তুমি আসি,
নররাজ; কিম্বা দিয়া চূণ কালি গালে
খেদাও গহন বনে! যথার্থ যদ্যপি
অপবাদ, তবে কহ, কেমনে ভঞ্জিবে
এ কলঙ্ক? লোক যাঝে কেমনে দেখাবে৪৫
ও মুখ, রাঘবপত্তি, দেখ ভাবি মনে।
না পড়ি ঢলিয়া আর নিতম্বের ভরে!
নহে গুরু উরু-দ্বয়, বর্ত্তুল কদলী-
সদৃশ! সে কটি, হায়, কর-পদ্মে ধরি
যাহায়, নিন্দিতে তুমি সিংহে প্রেমাদরে৫০
আর নহে সরু, দেব! নম্র-শিরঃ এবে
উচ্চ কুচ! সুধা-হীন অধর! লইল
লুটিয়া কুটিল কাল, যৌবন-ভাণ্ডারে
আছিল রতন যত, হরিল কাননে
নিদাঘ কুসুম-কান্তি, নীরসি কুসুমে!৫৫
কিন্তু পূর্ব্ব-কথা এবে স্মর, নরমণি!—
সেবিনু চরণ যবে তরুণ যৌবনে,
কি সত্য করিলা, প্রভু, ধর্ম্মে সাক্ষী করি,
মোর কাছে? কাম-মদে মাতি যদি তুমি
বৃথা আশা দিয়া মোরে ছলিলা, তা কহ;—৬০
নীরবে এ দুঃখ আমি সহিব তা হলে!
কামীর কুরীতি এই শুনেছি জগতে,
অবলার মনঃ চুরি করে সে সতত
কৌশলে, নির্ভয়ে ধর্ম্মে দিয়া জলাঞ্জলি;—
প্রবঞ্চনা-রূপ ভস্ম মাখে মধুরসে!৬৫
এ কুপথে পথী কি হে সূর্য্য-বংশ-পতি?
তুমিও কলঙ্ক-রেখা লেখ সুললাটে,
(শশাঙ্ক-সদৃশ) এবে, দেব দিনমণি!
ধর্ম্মশীল বলি, দেব, বাখানে তোমারে
দেব নর,—জিতেন্দ্রিয়, নিত্য সত্যপ্রিয়!৭০
তবে কেন, কহ মোরে, তবে কেন শুনি,
যুবরাজ-পদে আজি অভিষেক কর
কৌশল্যা-নন্দন রামে? কোথা পুত্র তব
ভরত,—ভারত-রত্ন, রঘু-চড়ামণি?
পড়ে কি হে মনে এবে পূর্ব্বকথা যত?৭৫
কি দোষে কেকয়ী দাসী দোষী তব পদে?
কোন্ অপরাধে পুত্র, কছ, অপরাধী?
তিন রাণী তব, রাজা! এ তিনের মাঝে,
কি ত্রুটি সেবিতে পদ করিল কেকরী
কোন্ কালে? পুত্র তব চারি, নরমণি!৮০
গুণশীলোত্তম রাম, কহ, কোন্ গুণে?
কি কুহকে, কহ শুনি, কৌশল্যা-মহিষী
ভুলাইলা মনঃ তব? কি বিশিষ্ট গুণ
দেখি রামচন্দ্রে, দেব, ধর্ম্ম নষ্ট কর
অভীষ্ট পূর্ণিতে তার, রঘুশ্রেষ্ঠ তুমি?৮৫
কিন্তু বাক্য ব্যয় আর কেন অকারণে?—
যাহা ইচ্ছা কর, দেব; কার সাধ্য রোধে
তোমায়, নরেন্দ্র তুমি? কে পারে ফিরাতে
প্রবাহে? বিতংসে কেবা বাঁধে কেশরীরে?
চলিল ত্যজিয়া আজি তব পাপ-পুরী৯০
ভিখারিণী-বেশে দাসী! দেশ দেশান্তরে
ফিরিব; যেখানে যাব, কহিব সেখানে
‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’
গম্ভীরে অম্বরে যথা নাদে কাদম্বিনী,
এ মোর দুঃখের কথা কব সর্ব্ব জনে!৯৫
পথিকে, গৃহস্থে, রাজে, কাঙালে, তাপসে,—
যেখানে যাহারে পাব, কব তার কাছে—
‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’
পুষি সারী শুক, দোঁহে শিখাব যতনে
এ মোর দুঃখের কথা, দিবস রজনী।১০০
শিখিলে এ কথা, তবে দিব দোঁহে ছাড়ি
অরণ্যে। গাইবে তারা বসি বৃক্ষ-শাখে,
‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’
শিখি পক্ষীমুখে গীত গাবে প্রতিধ্বনি—
‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’১০৫
লিখিব গাছের ছালে, নিবিড় কাননে,
‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’
খোদিব এ কথা আমি তুঙ্গ শৃঙ্গদেহে!
রচি গাথা, শিখাইব পল্লী-বাল-দলে।
করতালি দিয়া তারা গাইবে নাচিয়া—১১০
‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘুকুল-পতি!’
থাকে যদি ধর্ম্ম, তুমি অবশ্য ভুঞ্জিবে
এ কর্ম্মের প্রতিফল! দিয়া আশা মোরে,
নিরাশ করিলে আজি; দেখিব নয়নে
তব আশা-বৃক্ষে ফলে কি ফল, নৃমণি?১১৫
বাড়ালে যাহার মান, থাক তার সাথে
গৃহে তুমি! বামদেশে কৌশল্যা মহিষী,
(এত যে বয়েস, তবু লজ্জাহীন তুমি!)—
যুবরাজ পুত্র রাম; জনক-নন্দিনী
সীতা প্রিয়তমা বধূ;—এ সবারে লয়ে১২০
কর ঘর, নরবর, যাই চলি আমি!
পিতৃ-মাতৃ-হীন পুত্রে পালিবেন পিতা—
মাতামহালয়ে পাবে আশ্রয় বাছনি।
দিব্য দিয়া মানা তারে করিব খাইতে
তব অন্ন; প্রবেশিতে তব পাপ-পুরে।১২৫
চিরি বক্ষঃ মনোদুঃখে লিখিনু শোণিতে
লেখন। না থাকে যদি পাপ এ শরীরে;
পতি-পদ-গতা যদি পতিব্রতা দাসী;
বিচার করুন ধর্ম্ম ধর্ম্ম-রীতি-মতে!
ইতিশ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে কেকয়ীপত্রিকা নাম
চতুর্থ সর্গ।
More from বীরাঙ্গনা কাব্য
More in Poetry
Poetry
Palanquin Bearers
Lightly, O lightly we bear her along, She sways like a flower in the wind of our song; She skims like a bird on the foam of a stream; She floats like a laugh from the lips of a dream. Gaily, O gaily we glide and we sing,...
Poetry
Where the Mind is Without Fear (Gitanjali 35)
Where the mind is without fear and the head is held high; Where knowledge is free; Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls; Where words come out from the depth of truth; Where tirel...
Poetry
Thou Hast Made Me Endless (Gitanjali 1)
Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life. This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed...
Comments (0)
Log in to join the conversation.