ভানু অস্ত গেল, গোধুলি আইল;— রবি-কর-জাল আকাশে উঠিল, মেঘ হ’তে মেঘে খেলিতে লাগিল, গগন শোভিল কিরণজালে;— কোথা বা সুন্দর ঘন কলেবর সিন্দূরে লেপিয়া রাখে থরেথর, কোথা ঝিকি ঝিকি হীরার ঝালর যেন বা ঝুলায় গগন ভালে। সোণার বরণ মাখিয়া কোথায় জলধর জ্বলে—নয়ন জুড়ায়, আবার কোথায় তুলারাশি প্রায় শোভে রাশি রাশি মেঘের মালা। হেনকালে একা গিয়া গঙ্গাতীরে হেরি মোনহর সে তট উপরে রাজধানী এক, নব শোভা ধরে, রয়েছে কিরণে হয়ে উজলা। দ্বিতালা ত্রিতালা চৌতালা ভবন, সুন্দর সুন্দর বিচিত্র গঠন, রাজবর্ত্ম পাশে আছে সুশোভন— গোধূলি রাগেতে রঞ্জিত কায়। অদূরে দুর্জ্জয় দুর্গ গড়খাই, প্রকাণ্ড মুরতি, জাগিছে সদাই, বিপক্ষ পশিবে হেন স্থান নাই— চরণ প্রক্ষালি জাহ্নবী ধায়। গড়ের সমীপে আনন্দউদ্যান, যতনে রক্ষিত অতি রম্যস্থান, প্রদোষে প্রত্যহ হয় বাদ্যগান, নয়ন, শ্রবণ, তনু জুড়ায়। জাহ্ণবী সলিলে এদিকে আবার দেখ জলযান কাতারে কাতার ভাসে দিবানিশি—গুণবৃক্ষ যার শালবৃক্ষ ছাপি ধ্বজা উড়ায়। অহে বঙ্গবাসি জান কি তোমরা? অলকা জিনিয়া হেন মনোহরা কার রাজধানী? কি জাতি ইহারা?— এ সুখ সৌভাগ্য ভোগে ধরায়। নাহি যদি জান, এসো এই খানে, চলেছে দেখিবে বিচিত্র বিমানে রাজপুরুষের বিবিধ বিধানে— গরবে মেদিনী ঠেকে না পায়। অদূরে বাজিছে। “রুল বৃট্যানিয়া,” শকটে শকটে মেদিনী ছাইয়া চলেছে দাপটে বৃটনবাসীয়া— ইন্দ্রের ইন্দ্রত্ব আছে কোথায়! হায় রে কপাল, ওদেরি মতন আমরাই কেন করিতে গমন না পারি সতেজে—বলিতে আপন যে দেশে জনম, যে দেশে বাস? ভয়ে ভয়ে যাই, ভয়ে ভয়ে চাই, গৌরাঙ্গ দেখিলে ভূতলে লুটাই, ফুটিয়ে ফুকারি বলিতে না পাই— এমনি সদাই হৃদয়ে ত্রাস। কি হবে বিলাপ করিলে এখন, হিন্দুকুললক্ষ্মী গিয়াছে যখন, মনের মাহাত্ম্য হয়েছে নিধন— তখনি সে সাধ ঘুচে গিয়াছে। সাজে না এখন অভিলাষ করা— আমাদের কাজ সুধু পায়ে ধরা— শিরেতে ধরিয়া কলঙ্ক পসরা ছুটিতে হইবে ওদেরি পাছে! হায় বসুন্ধরা তোমার কপালে এই কি ছিল মা, উদয়ের কালে জগত কাঁদায়ে কিরণ ডুবালে— পূরাতে নারিলে মনের আশা। রূপে অনুপম নিখিল ধরায় করিয়া বিধাতা সৃজালা তোমায়— দিলা সাজাইয়া অতুল ভূষায়— তোর কি না আজি এ হেন দশা! হায় রে বিধাতা, কেন দিয়াছিলি হেন অলঙ্কার? কেন না গঠিলি মরুভূমি করে—অরণ্যে রাখিলি, এ হেন যাতনা হতো না তায়! পারস্য পাঠান মোগল জাতি হরিতে ভারত কিরীটের ভাতি আসিত না হেথা, করিতে দুর্গতি— অভাগা হিন্দুরে দলিতে পায়! এই যে দেখিছ পুরী মনোহর শতগুণ আরো শোভিত সুন্দর, এই ভাগীরথী করে থরে থর ধাইত তখন কতই সাধে! গাইত তখন কতই সুস্বরে এই সব পাখী তরু শোভা করে, কতই কুসুম পরিমল ভরে ফুটিয়া থাকিত কত আহ্লাদে। আগেকার মত উঠিত তপন,— আগেকার মত চাঁদের কিরণ ভাসিত গগনে—গ্রহ তারাগণ ঘুরিত আনন্দে ঘেরিয়া ধরা;— যখন ভারতে অমৃতের কণা হতো বরিষণ, বাজাইত বীণা ব্যাস বাল্‌মীকি—বিপুল বাসনা ভারত হৃদয়ে আছিল ভরা। যখন ক্ষত্রিয় অতীব সাহসে ধাইত সমরে মাতি বীর-রসে, হিমালয়চুড়া গগন পরশে গাইত যখন ভারত নাম। ভারতবাসীরা প্রতি ঘরে ঘরে গাইত যখন স্বাধীন অন্তরে স্বদেশ মহিমা পুলকিত স্বরে,— জগতে ভারত অতুল ধাম। ধন্য বৃট্যানিয়া ধন্য তোর বল, এ হেন ভূভাগ করে করতল, রাজত্ব করিছ ইঙ্গিতে কেবল— তোমার তেজের নাহি উপমা। এখন কিঙ্কর হয়েছি তোমার মনের বাসনা কি কহিব আর, এই ভিক্ষা চাই করো গো বিচার— অথর্ব্ব দাসীরে করে গো ক্ষমা। দেখ্‌ চেয়ে দেখ্‌ প্রাচীন বয়েসে তোর পদতলে পড়িয়ে কি বেশে কঁদিছে সে ভূমি, পূজিত যে দেশে কত জনপদ গাহি মহিমা। আগে ছিল রাণী—ধরা রাজধানী, স্মরণে যেন গো থাকে সে কাহিনী, এবে সে কিঙ্করী হয়েছে দুখিনী বলিয়ে দম্ভ করো না গরিমা। তোমারো ত বুকে কত কত বার রিপু পদাঘাত করেছে প্রহার কালেতে না জানি কি হবে আবার এই কথা সদা করো গো মনে। পেয়েছ অমূল্য রতন ধরার করো না ইহারে চরণে প্রহার— দিও না যাতনা ভারত প্রাণে।