[একাদশ খৃষ্টাব্দে ফরাসীদেশে আবেলার্ড নামক একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি তর্কশাস্ত্র অধ্যাপনা করাইয়া প্রভূত যশস্বী হন। অন্যান্য শিষ্যের ন্যায় ইলইজা নাম্নী এক সম্ভ্রান্ত কন্যা তাহার নিকট অধ্যয়ন করিতেন। এই কামিনী অত্যন্ত রূপবতী এবং বুদ্ধিমতী ছিলেন। ক্রমে গুরুশিষ্যের ভাবান্তর হইয়া উভয়ের প্রতি উভয়ের আসক্তি জন্মে, এবং সেই কলঙ্ক দেশমধ্যে প্রচারিত হয়। তাহাতে ইলইজার পিতৃব্য অসহ্য রোষপরতন্ত্র হইয়া ইলইজাকে একটী কনভেণ্টে আবদ্ধ করিয়া রাখেন, এবং আবেলার্ডকে ক্ষতদেহ করিয়া অবমানিত করেন। রোমান কাথলিকদিগের মধ্যে সংসারবিরাগী-ধর্ম্মাকাঙ্ক্ষী স্ত্রীপুরুষগণ যে আশ্রমে বাস করে, তাহার নাম কনভেণ্ট। ইলইজা সেই আশ্রমে অবরুদ্ধ হইয়া বহু কষ্টে দিনপাত করিত। এবং আবেলার্ডও প্রাগুক্ত রূপে অবমানিত হইবার পর সংসারে বিরাগী হইয়া অন্য এক আশ্রমে প্রস্থান করেন। ইহাদিগের পরস্পরের প্রণয়ঘটিত উপাখ্যান ইউরোপীয় নানা ভাষায় আছে। আলেকজন্দর পোপ নামক একজন ইংরাজী কবি এই উপাখ্যান অবলম্বনে একটী কবিতা লেখেন; তদ্দৃষ্টে “মদনপারিজাত” নাম দিয়া নিম্নোক্ত কবিতা লিখিত হইয়াছে।] ত্যজিয়ে সংসারধর্ম্ম তপস্বিনী হয়েছি, মায়ামোহ আশাতৃষ্ণা বিসর্জ্জন দিয়েছি! পরিয়ে বল্‌কল সাজ কমণ্ডলু করে, ধরেছি কঠোর ব্রত কানন ভিতরে। দিবাসন্ধ্যা পূজা ধ্যান দেব-আরাধনা করি, তবু মনে কেন হয় সে ভাবনা? যার জন্যে দেশত্যাগী কেন পুনরায় অশান্ত হৃদয় হেন তারি দিকে ধায়? কেন রে উন্মাদমন কেন দিলি তুলে যে বাসনা এত দিন আছিলাম ভুলে? জ্বালাতে নির্ব্বাণ বহ্নি কেন দিলি দেখা অরে সুধাময় লিপি দয়িতের লেখা? আয় তোরে বুকে রাখি বহু দিন পরে পেয়েছি নাথের লেখা অমৃত অক্ষরে! এজগতে ভালবাসা ভুলিবার নয়, মদনের পারিজাত ব্রহ্মাণ্ড ঘোষয়! ক্ষমা কর যোগী ঋষি জিতেন্দ্রিয় জন, ক্ষমা কর সতী সাধ্বী তপস্বিনীগণ! অয়ি শান্ত সুপবিত্র আশ্রমমণ্ডল, তরু, বারি, লতা, পত্র যথায় নির্ম্মল, নিষ্পাপ নিষ্কাম চিন্তা যথায় নিয়ত পরমার্থ ধ্যানে মুগ্ধ আনন্দে জাগ্রত, ক্ষমা কর এ দাসীরে, কলুষচিন্তায় কলুষিত করিলাম তোমা সবাকায়। আসিলাম যবে হেথা করে মহাব্রত ভাবিলাম হব শীঘ্র তোমাদেরি মত; ধবল শিলার সম স্বেদক্লেদহীন, ধবল শিলার সম মমতাবিহীন। কই হলো? অসাধ্য সে পবিত্র কামনা; জীবিত থাকিতে, নাথ, যাবে না বাসনা। অর্দ্ধেক দিয়াছি প্রাণ ঈশ্বর সেবিতে, অর্দ্ধেক রেখেছি, হায়, নাথেরে পূজিতে। অনাহার জাগরণে হলো দেহ ক্ষয়, তবু দেখ স্বভাবের গতিরোধ নয়। কাটালাম এতকাল সন্তাপে সস্তাপে, সে নাম দেখিবামাত্র তবু চিত্ত কাঁপে। কাঁপিতে কাঁপিতে নাথ খুলি এ লিখন; প্রতি ছত্রে করিতেছি অশ্রু বিসর্জ্জন। যেখানে তোমার নাম দেখি, প্রাণেশ্বর, সেইখানে কেঁদে উঠে আমার অন্তর! কতই আনন্দ আর কতই বিষাদ আছে ও মধুর নামে কে জানে আস্বাদ। কত বার ধীরে ধীরে করি উচ্চারণ, কত বার ফিরে ফিরে করি নিরীক্ষণ। ফেলি কত দীর্ঘশ্বাস সে সব স্মরিয়ে আছি হেথা একাকিনী সে সব ত্যজিয়ে। যেখানে আমার নাম দেখিবারে পাই, সেইখানে, প্রাণনাথ, আতঙ্কে ডরাই। পাছে কোন অমঙ্গল সঙ্গে থাকে তার, অমঙ্গল হেতু, নাথ, আমি হে তোমার। না পারি পড়িতে আর, সহে না হৃদয়; শোকের সমুদ্র হেরি চতুর্দ্দিকময়। অদৃষ্টে কি এই ছিল সেই ভালবাসা এইরূপে হলো শেষ, শেষে এই দশা! সে যশ-পিপাসা আর সে হেন প্রণয় পত্রের কুটীরে হলো এইরূপে লয়। যত পার হেন লিপি লিখ তবু নাথ, করিব তোমার সঙ্গে শোক-অশ্রুপাত, মিশাইব দীর্ঘশ্বাস তোমার নিশ্বাসে, কাঁদিব তোমার সঙ্গে চিত্তের উন্নাসে; ঘুচাইতে এ যন্ত্রণা সাধ্য নাই কার, তাই নিবেদন করি লিখ যত পার। অনাথা দুঃখীর দুঃখ করিতে সাত্ত্বনা হয়েছে লিপির সৃষ্টি বিধির বাসনা। বুঝি কোন নির্ব্বাসিত পুরুষপ্রেমিক, অথবা রমণী কোন প্রেমের পথিক, ঘুচাতে বিচ্ছেদজ্বালা আরাধনা করে শিখেছিল এ কৌশল বিধাতার বরে। প্রাণভোরে অন্তরের কথা প্রকাশিতে এমন উপায় আর নাই এ মহীতে। নাসা, কণ্ঠ, চক্ষু কিম্বা ওষ্ঠে যাহা নয়, লিপির অক্ষরে ব্যক্ত হয় সমুদয়। খুলে দেয় একেবারে প্রাণের কপাট, ধারে না লজ্জার ধার, থাকে না ঝঞ্ঝাট। উদয়-ভূধর হতে অস্তাচলে যায়, প্রণয়ী জনের কথা গোপনে জানায়। জান ত হে প্রিয়তম! প্রথমে কেমন সখাভাবে কত ভক্তি করেছি যতন। জানি নাই প্রথম সে প্রেমের সঞ্চার ভাবিতাম যেন কোন দেবের কুমার; ঈশ্বর আপনি যেন স্বহস্তে করিয়া নির্ম্মাণ করিলা তোমা নিজ রশ্মি দিয়া; সুধাংশুর অংশু যেন করে একত্রিত, সহাস্য নয়নে তব করিলা স্থাপিত। নেত্রে নেত্রে মিলাইয়া স্থিরদৃষ্টি হয়ে দেখিয়াছি কতবার পবিত্র হৃদয়ে। গাহিতে যখন তুমি অমর শুনিত কি মধুর শাস্ত্রালাপ বদনে ক্ষরিত! সে সুস্বরে কার মনে না হয় প্রত্যয়— প্রেমেতে নাহিক পাপ ভাবিনু নিশ্চয়। ভক্তি ছিঁড়ে পড়িলাম ইন্দ্রিয়কুহকে ভজিনু নাগর ভাবে প্রাণের পুলকে। দেবপুত্র ভাবিতাম, তা হোতে অধিক প্রিয়তম হলে নাথ হইয়ে প্রেমিক। তোমা হেন কান্ত যদি মর্ত্তভূমে পাই, ঋষি হয়ে স্বর্গসুখ ভুঞ্জিতে না চাই। যে ভাবে অধিক সুখ সে যাক সেখানে, আমি যেন তোমা লয়ে থাকি এ ভুবনে। অয়ি নাথ! কত জন, আছে ত স্মরণ, বলেছিল পতিভাবে করিতে বরণ; তখনি দিয়াছি শাপ হোক্‌ বজ্রাঘাত, পরিণয় সংস্কার যাক্‌ রে নিপাত। হাতে সুতো বেঁধে কভু প্রেমে বাধা যায়? বন্ধন দেখিলে প্রেম তখনি পলায়। স্বাধীন মকরকেতু, স্বাধীন প্রণয়, না বুঝে অবোধ লোক চাহে পরিণয়। পরিণয়ে ধন হয়, নাম হয়, যশ, প্রণয় নহেক ধন বিভবের বশ। ভূমণ্ডলপতি যদি চরণে আমার ধরে দেয় ভূমণ্ডল, সিংহাসন তার, তুচ্ছ করে দূরে ফেলি; মনে যদি ধরে ভিকারীর দাসী হয়ে থাকি তার ঘরে। যে রমণী সে সৌভাগ্য ভুঞ্জে চিরকাল কত ভাগ্যবতী সেই, হায় রে কপাল! কিবা সুধাময় সেই সুখের সময়, সুখের সাগর যেন উচ্ছসিত হয়। পরাণে পরাণ বাঁধা প্রণয়ের ভরে, পরিপূর্ণ পরিতোষ প্রেমীর অন্তরে। আশার থাকে না ক্ষোভ, ভাষার যোজনা হৃদয়ে হৃদয়ে কথা প্রকাশে আপনা। সেই সুখ—সুখ যদি থাকে মহীতলে— পারিজাত মদনের ছিল কোন কালে। সে সুখের দিন এবে কোথায় গিয়েছে, কোথা পারিজাত কোথা মদন রয়েছে! কি হলো কি হলো হয় একি সর্ব্বনাশ, নাথের দুর্দ্দশা এত, কোরে নগ্নবাস কে করিল অস্ত্রাঘাত! কোথায় তখন ছিল দাসী পারিজাত অভাগী দুর্জন? সেই দণ্ডে, প্রাণনাথ, তীক্ষ্ণ অস্ত্র ধরে নিবারণ করিতাম পাষণ্ড বর্ব্বরে। দুজনে করেছি পাপ দুজনে সহিব লজ্জা করে, প্রাণনাথ, কি আর বলিব। অশ্রু বিসর্জ্জনে এবে মিটাই সে সাধ; দগ্ধ বিধি ঘটাইলি ঘোর পরমাদ! আনিল আমায় হেথা যে বিষম দিনে, বসাইল ধরাতলে পবিত্র অজিনে, পরাইল বৃক্ষছাল দণ্ড দিল হাতে, ভাব কি সে দিন আমি ভুলেছিনু নাথে? প্রাণেশ্বর, চারিদিকে ঋষিগণ যত করে মন্ত্র উচ্চারণ আমি ভাবি তত তোমার বদন-ইন্দু, তোমার লোচন, মনে মনে করি তব গুণেরি কীর্ত্তন; নয়নের কোণে মাত্র বেদী পানে চাই মনে সুধু কিসে পুনঃ ফিরে কাছে যাই। যৌবন রূপের ঘটা তখনো অতুল, হেরে চমৎকৃত হলো যত ঋষিকুল; সংশয়ে বিস্ময়ে ভাবে এ হেন বয়সে রমণী ইচ্ছায় কভু আশ্রমে কি আসে? সত্য ভেবেছিলা তারা মিথ্যা কথা নয়— যুবতীর যোগ ধর্ম্ম মিথ্যা সমুদয়। যাই হোক্‌, নাই হবে গতি মুক্তি মম বারেক নিকটে এস অহে প্রিয়তম। সেই রূপে নয়নের বিষাক্ত অমৃত করি পান মনসাধে হব বিমোহিত, অধরে অধর দিয়ে হয়ে অচেতন মূর্চ্ছাভাবে বক্ষঃস্থলে দেখিব স্বপন। না না না, দুরন্ত আশা হও রে অন্তর, এসো নাথ ধর্ম্মপথে লও হে সত্বর, পুণ্যধামে পুণ্যজন যে আনন্দ পায় শিখাও এ অভাগীরে, স্নিগ্ধ কর কায়। আহা এই শুদ্ধ শান্ত আশ্রম ভিতরে কতই পুণ্যাত্মা জীব আনন্দে বিহরে; তরু লতা আদি হেথা সকলি নির্ম্মল, সকলেই ভক্তিরসে সদাই বিহ্বল। পর্ব্বত শিখর গুলি সুন্দর কেমন উঠিয়াছে চারিধারে মেঘের বরণ; শাল, তাল, তমালের তরু সারি সারি শুনাইছে মৃদুস্বর দিবস শর্ব্বরী; সুর্য্যকরে দীপ্ত হয়ে স্রোতকুল যত শিখরে শিখরে আহা ভ্রমে অবিরত; করে কুলুকুলু ধ্বনি গিরিপ্রস্রবণ, গুহার ভিতরে আহা মধুর শ্রবণ। সন্ধ্যা সমীরণে এই হ্রদের উপরে তরঙ্গ খেলায় যবে কিবা শোভা ধরে। হেন স্নিগ্ধ তপোবন ভিতরে আমার ঘুচিল না এ জনমে ইন্দ্রিয় বিকার। হে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডপতি করুণা নিদান, করুণা কটাক্ষপাতে কর পরিত্রাণ। দেও, দেব, দেখাইয়ে মুক্তির আলয়, ভক্তি ভাবে লইলাম তোমারি আশ্রয়।