[ ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত ] হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক শ্রীসজনীকান্ত দাস বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ ২৪৩/১, আপার সারকুলার রোড, কলিকাতা-৬ প্রকাশক শ্রীসনৎকুমার গুপ্ত বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ প্রথম সংস্করণ— আষাঢ়, ১৩৬০ মূল্য দেড় টাকা শনিরঞ্জন প্রেস, ৫৭ ইন্দ্র বিশ্বাস রোড, কলিকাতা-৩৭ হইতে শ্রীরঞ্জনকুমার দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত ৭°২—৩, ৩. ৭. ৫৩ ভূমিকা হেমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চিন্তাতরঙ্গিণী’ (১৮৬১) একটি কাহিনীকাব্য। “তাঁহারই পাড়ার কোনও গৃহস্থ-বাড়ির একটা ঘটনা [আত্মহত্যা] অবলম্বনে রচিত হইয়াছিল।” ঠিক তিন বৎসরের মধ্যে রচিত দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বীরবাহু’ও কাহিনী, কিন্তু ইহাতে বিষয়-বস্তুর আমূল পরিবর্তন ঘটিয়াছে। যে কারণে হেমচন্দ্রের খ্যাতি, সেই দেশপ্রেম ইহাতেই সর্বপ্রথম উদ্বুদ্ধ হইয়াছে—অবশ্য কোনও ইতিবৃত্তমূলক কাহিনীকে অবলম্বন করিয়া নহে, সম্পূর্ণ কাল্পনিক অবাস্তব একটি গল্পকে আশ্রয় করিয়া। ইহাতে বিষয়-বস্তু ও ভাষার দিক দিয়া তাঁহার পরীক্ষার আরম্ভ মাত্র হইয়াছে। পরিণতি বা সঙ্গতির সুষমা নাই। অক্ষয়চন্দ্র সরকার ঠিকই বলিয়াছেন— বীরবাহুকাব্যে একদিকে যেমন দেশভক্তির অঙ্কুর দেখা গিয়াছে, অন্য দিকে সেইরূপ, ভাষা ও ছন্দের উপর হেমচন্দ্রের আধিপত্য-সঞ্চার দেখা যাইতেছে।—‘কবি হেমচন্দ্র,’ ২য় সং., পৃ. ৭ কাহিনীর অনৈতিহাসিকতার কথা কবি স্বয়ং সরলভাবে “বিজ্ঞাপনে” স্বীকার করিয়াছেন এবং আখ্যাপত্রের কবিতাটিতে তাঁহার উদ্দেশ্য সম্বন্ধেও স্পষ্ট আভাস দিয়াছেন। ইহা ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। পৃষ্ঠা-সংখ্যা ছিল ৯৪। আখ্যাপত্রটি এইরূপ— বীরবাহু কাব্য। শ্রীহেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত।—‘Italia! Oh Italia......of thy distress. Byron. কলিকাতা। শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ১৮২ সংখ্যক ভবনে স্ট্যান্‌হোপ্ যন্ত্রে মুদ্রিত। সন ১২৭১ সাল। শ্রীমন্মথনাথ ঘোষ তাঁহার ‘হেমচন্দ্র’ প্রথম খণ্ডের (১৩২৬) ১৪২-১৬০ পৃষ্ঠায় ‘বীরবাহু’ সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছেন। হেমচন্দ্রের জীবিতকালের সংস্করণগুলি মিলাইয়া বর্তমান সংস্করণের পাঠ নির্ণীত হইয়াছে। বীরবাহু কাব্য “Italia Oh Italia! thou who hast The fatal gift of beauty, which became A funeral dower of present woes and past, On thy sweet brow is sorrow plough’d by shame, And annals graved in characters of flame. Oh God! that thou wert in thy nakedness, Less lovely or more powerful, and could’nt claim. Thy right, and drive the robbers back, who press To shed thy blood, and drink the tears of thy distress.” BYRON. আর কি সে দিন হবে, জগৎ জুড়িয়া যবে, ভারতের জয়কেতু মহাতেজে উড়িত। যবে কবি কালিদাস, শুনায়ে মধুর ভাষ, ভারতবাসীর মন নানা রসে তুষিত॥ যবে দেব-অবতংস, রঘু কুরু পাণ্ডুবংশ, যবনে করিয়া ধ্বংস ধরাতল শাসিত। ভারতের পুনর্ব্বার, সে শোভা হবে কি আর। অযোধ্যা হস্তিনা পাটে হিন্দু যবে বসিত॥ বিজ্ঞাপন প্রায় তিন বৎসর হইল আমি “চিন্তাতরঙ্গিণী” নামে একখানি অতি ক্ষুদ্র কাব্য প্রচার করিয়াছি। সেইখানি এক্ষণে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিগ্রহণেচ্ছু ছাত্রগণের প্রথম পরীক্ষার অন্যতম পাঠ্যগ্রন্থস্বরূপ নিয়োজিত হইয়াছে। অতঃপর জনসমাজে সমধিক পরিচিত হইবার অভিলাষে আর একখানি কাব্য প্রচার করিতেছি। কিন্তু নিতান্ত সঙ্কুচিত-চিত্তে এই কার্য্যে প্রবৃত্ত হ‍ইলাম। একালে গ্রন্থ,—বিশেষতঃ কবিতা গ্রন্থ, প্রচার করা দুঃসাহসের কর্ম্ম; কপাল গুণে হয় ত যশের, নয় ত কঠিন গঞ্জনার ভাগী হইতে হয়। কিন্তু মনুষ্যের মন এত অস্থির এবং তাহার চিত্ত এত যশোলোলুপ যে, জানিয়া শুনিয়াও কেহ এই দুরূহ পথের পথিক হইতে সহজে নিবৃত্ত হয় না। ভাগ্যে যাহাই ঘটুক, একবার চেষ্টা করিয়া দেখি, সকলেই আপনাকে এইরূপে আশ্বাস দিয়া থাকে। আমিও তদ্রূপ একজন। উপাখ্যানটি আদ্যোপান্ত কাল্পনিক, কোন ইতিহাসমূলক নহে। পুরাকালে হিন্দুকুলতিলক বীরবৃন্দ স্বদেশরক্ষার্থ কি প্রকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, কেবল তাহারই দৃষ্টান্তস্বরূপ এই গল্পটি রচনা করা হইয়াছে। অতএব এই ঘটনার কালনির্ণয়ার্থ হিন্দুদিগের পুরাবৃত্ত অনুসন্ধান করা অনাবশ্যক। খিদিরপুর। ১২৭১ সাল ৩১এ বৈশাখ। } শ্রীহেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরবাহু যামিনী পোহায়ে যায়, ভূষা পরি উষা ধায়, আগেভাগে ছুটে গিয়ে পথসজ্জা করিছে। অরুণে করিয়া সঙ্গে, অলক্ত লেপিয়া রঙ্গে, দুই ধারে রাঙা রাঙা ঘনগুলি থুইছে॥ সুধাকরে কোলে করি, শ্বেত সাটী দিয়া ধীরি, মধুমাখা মুখ তার ভাল করে ঢাকিছে। চন্দ্রের খেলনাগুনি তারাপুঞ্জ গুণি গুণি, অঞ্চলের শেষ ভাগে একে একে বাঁধিছে॥ তুষিতে দিবার রাজা, ভাল ভাল মুক্তা মাজা, শ্যাম ধরাতল বুকে সারি সারি গাঁথিছে। রঞ্জিতে তাঁহারি মন, প্রমুদিত পুষ্পবন, তরু’পরে থরে থরে ফুলমালা বাঁধিছে॥ বিহগ গাহক তায়, দিবাকর-গুণ গায়, তার সনে তালে তালে সমীরণ নাচিছে। জয় দিবাকর বলি, উর্দ্ধমুখে পুটাঞ্জলি, পূর্ব্বাননে দ্বিজগণ স্তবধ্বনি করিছে॥ হেন গ্রীষ্ম-প্রাতঃকালে, কান্যকুব্জ-মহীপালে, কনোজের যুবরাজ আসি পদে নমিল। যদি অনুমতি পাই, গ্রীষ্ম-উপবনে যাই, এই কথা বীরবাহু সসম্ভ্রমে কহিল॥ শুনি আলিঙ্গন দিয়ে, স্নেহে শিরঘ্রাণ নিয়ে, রণবীর মহারাজ আশীর্ব্বাদ করিল। পিতার আদেশ পেয়ে, ত্বরায় আসিয়া ধেয়ে, হেমলতা-সন্নিধানে উপনীত হইল॥ এস প্রিয়ে দুই জনে, গিয়ে গ্রীষ্ম-উপবনে, মিথুন দম্পতি সম বনে বনে ভ্রমিব। মালতীর মালা পরি, পদ্মপাতে ছত্র করি, দোঁহে মেলি ফুলকুল-পরিমল লুটিব॥ স্রোতকুলে দোঁহে মেলি, করিব সলিল-কেলি, বাহুতে বাহুতে বাঁধি স্রোতধারা ধরিব। রাজহংস পিছে পিছে, যাব বারি সিঁচে সিঁচে, পদ্মবন মাঝে গিয়া সরোবরে ভাসিব॥ মৃণাল আনিয়া তুলে, বসিয়া তরুর মূলে, হরিণী-শাবকে কোলে ধরি দোঁহে খাওয়াব। সারসে আনিয়া ধরে, রক্ত-জবা মালা করে, দুই জনে সযতনে গলদেশে পরাব॥ এক দিকে কেতকিনী, এক দিকে কমলিনী, দুই ধারে রাশি করি ভ্রমরারে খেপাব। তোমার অঞ্চল দিয়ে, কোকিলারে লুকাইয়ে, ব্যাকুল করিয়া পিকে ডালে ডালে ডাকাব॥ গত গ্রীষ্মে কত খেলা, করিয়া কেটেছ বেলা, সে সব স্মরণ প্রিয়ে হয় কি হে মনেতে। চল গিয়ে পুনরায়, বিহরিব দুজনায়, বিষম গ্রীষ্মের তাপ জুড়াইব বনেতে॥ শুনিয়া স্বামীর কথা, হরষিতা হেমলতা দ্রুতগতি পতিকর করতলে চাপিয়া। বলে, এ কি নররায়, সে কি কভু ভুলা যায়, এ জগতে এই প্রাণ এ দেহেতে ধরিয়া॥ সে সব হইলে মনে, ভুলি স্বর্ণ সিংহাসনে, তিলেক থাকিতে হেথা চিতে আর লয় না। উপবন-বিলাসিনী, সেই সব সীমন্তিনী সহ বিহরিতে বনে আর দেরি সয় না॥ পাসরিয়া সমুদায়, মন সেই বনে ধায়, ভাবি সেই ভাবে আছি তরুতলে বসিয়া। হেন কালে বন-বালা, বনফুলে গাঁথি মালা, হাসি হাসি গলদেশে দেয় যেন আসিয়া॥ সেই ভাবে কয় জনে, বসিয়া কুসুমাসনে, কামিনী-তরুর ডালে পুষ্পদোলা দুলায়ে। কেশে ফুল সাজাইয়ে, করে করতালি দিয়ে, ধীরে ধীরে দোলে পদে রুণু বোল বাজায়ে॥ কভু ফুলধনু করে, প্রতি জনে জনে ধরে, চাপিয়া হরিণী ’পরে বনমাঝে বিহরে। কভু মোরে রাখি মাঝে, সাজ করি নানা সাজে, নাচি নাচি কয়জনে চারি দিকে বিচরে॥ চল নাথ সেই স্থানে, বিলম্ব সহে না প্রাণে, গিয়া বন-কন্যাগণে আলিঙ্গনে তুষিব। তুষিতে তোমার মন, নানাবিধ আয়োজন, নানা ভাবে নানা রসে নানা খেলা খেলিব॥ শুনি প্রেয়সীর ভাষ, বীরবাহু মনোল্লাস, স্নেহভরে প্রমদারে আলিঙ্গন করিল। পরে ডাকি অনুচর, আদেশিলা বীরবর, দাস দাসী আদি সবে আয়োজনে মাতিল॥ নগরে উঠিল গোল, নিনাদে বাদ্যের রোল, দুর্গে দুর্গে ধনুর্ঘোষে নভঃভেদ করিল। স্বর্ণদণ্ড শিরোপরে, রক্ত নীল বর্ণ ধরে, থরে থরে ঘরে ঘরে পতাকায় ছাইল॥ চলিল নৃপতি-সুত, গজ বাজী যুথে যূথ, বাদ্যোদ্যম কোলাহলে ত্রিভুবন পূরিয়া। গর্জ্জনে মেদিনী টলে, টঙ্কারিল হেন বলে, ভীষণ কোদণ্ড-ছিলা রণ রণ করিয়া॥ পুরোভাগে যুবরাজ, শিরে পরি বীরসাজ, এইরূপ প্রথা সেই কালে তথা আছিল। শাণিত লৌহের তাজ, শাণিত লৌহের সাজ, বাহু উরু শির বক্ষ পৃষ্ঠদেশ ঢাকিল॥ সুদীর্ঘ সবল কায়, সিংহগ্রীবা লাজ পায়, আজানুলম্বিত বাহু রিপুবর্গ-দলন। মুখভাতি রবি-দেখা, ললাটে অভয়-লেখা, গভীর বুদ্ধির চিহ্ন-ধরা দুই নয়ন॥ বামে নারী হেমলতা, যেন তড়িতের লতা, ইন্দ্র-ভয়ে আসি পাশে অনুগতা হইল। চারি দিকে কোলাহল, লয়ে নিজ দলবল, কনোজরাজার পুত্ত্র উপবনে চলিল॥ গমনে পবন, রথ-বাজিগণ, পলকে যোজন পথ এড়ায়। ধরণী বিমানে, চলে কোন্ খানে, কে জানে কখন কোথায় ধায়॥ ক্ষেত মাঠ মরু, গিরি বারি তরু, স্রোতোধারা মত বহিয়া যায়। প্রহর ভিতরে, নানা শোভা ধরে, গ্রীষ্ম-উপবন প্রকাশ পায়॥ বিশাল তমাল, প্রসারিয়া ডাল, জানাইছে নাম বিপিন মাঝে। তার সঙ্গে সঙ্গে, উঠি নানা রঙ্গে, তাল নারিকেল গুবাক সাজে॥ কোন ভাগে তার, সুন্দর আকার, শিহরে কদম্ব দাড়িম্ব পাশে। অশোকে দেখিয়া, রহস্য করিয়া, কোথা বা বেহায়া শিমুল হাসে॥ মুকুলে পূরিত, শাখা অবনত, কোথা রহে চূত গরবে ভরা। কোথা তরুরাজ বটের বিরাজ, দেহেতে প্রাচীন পল্লব পরা॥ কোথা মুখ তুলে, তেজে বুক খুলে, সূর্য্যমুখী চায় ভানুর করে। কোথা সুশোভন, কামিনীর বন, খুলে দেয় মন সৌরভ-ভরে॥ কোথা বা শেফালি, রসে দেহ ঢালি, আবেশে ধরণী-উরসে পড়ে। কোথা বা গোলাপ, করিতে আলাপ, প্রফুল্ল মল্লিকা শাখীতে চড়ে॥ কোথা কেতকিনী, যেন পাগলিনী, আলুথালু বেশে পড়িয়া রয়। অবকাশ পেয়ে, ধীরে ধীরে ধেয়ে, সেইখানে আসি সমীর বয়॥ ক্রমে সন্নিধান, উত্তরিল যান, হরিষে দুজনে প্রবেশে বনে। যত তরুদল, মহা কুতূহল, কুসুম বরিষে হরিষ মনে॥ যত পাখিগণ, করিয়া স্মরণ, নৃপসূতা কত বাসেন ভাল। কুলায় ত্যজিয়া, বাহিরে আসিয়া, কাকলি করিয়া ঢাকিল ডাল॥ সারস সারসী, দোঁহারে পরশি, পশ্চাতে চলিল মরাল সনে। তৃণ পরিহরি, অঙ্গভঙ্গি করি, হরিণী ধাইল হরিষ মনে॥ এইরূপে যত, যত অনুগত, সবে ক্রমাগত যুটিল আসি। এমন সময়ে, ফুল-ডালি লয়ে, বনবালা দল আসিল হাসি॥ সখী সম্বোধনে, প্রতি জনে জনে, আলিঙ্গন দানে তুষি সবায়। কুশল বারতা, শুধি হেমলতা, নিকুঞ্জ ভিতরে সকলে যায়॥ হেরিয়া বসন্ত-শোভা বসুন্ধরা মাঝে। ঋতুমহোৎসবে সুখে বামাগণ সাজে॥ রাজবালা বনবালা সখী কয় জন। সবে কৈল সমরূপ বসন ভূষণ॥ তেয়াগি নেতের বাস রতনের দাম। অরণ্য-কুসুমে বেশ কৈল অভিরাম॥ নবীন বল্কল পরি লাজ সম্বরিয়া। ধরিল বিচিত্র বেশ কুসুম পরিয়া॥ মুক্তামালা বিনিময়ে বনমালা-দলে। সযতনে কণ্ঠহার করিলেন গলে॥ কর্ণবালা করবালা করি তিরোহিত। শ্রুতিমূলে ঝুম্‌কা ফুল হৈল বিরাজিত॥ কপালের সিঁথি শোভা আভা লুকাইল। কৃষ্ণচূড়া কেশমূলে আসি দেখা দিল॥ নিতম্বে মেখলা ঘুচে লোহিত গোলাপ। নাভিপদ্ম সনে আসি করিল আলাপ॥ চরণে নূপুরধ্বনি আর না বাজিল। রক্তজবা অরুণের আভা প্রকাশিল॥ এইরূপে বল্কবাস পুষ্প আভরণ। করে বীণা বাঁশী আদি করিয়া ধারণ॥ চলিল যথায় চূত কাতর হৃদয়। মাধবী তুলিতে কোলে অধোমুখে রয়॥ নিকটে আসিয়া বীণা বাঁশী বাজাইয়া। মাধবীলতায় চুয়া চন্দন ঢালিয়া॥ মুকুলিত চূতশাখা নোয়াইয়া করে। চূত-মাধবীতে বিয়া দিল সমাদরে॥ এইরূপে কত খেলা খেলিতে লাগিল। পশু পক্ষী আদি সবে হরিষে ভাসিল॥ হীনবল প্রভাকর প্রদোষ হইল। বিপিন ভ্রমিয়া নৃপতনয় ফিরিল॥ তৃণাসনে কয় জনে বসিয়া তখন। ভোজন করিয়া ক্ষুধা করি নিবারণ॥ পুনরায় বনলীলা আরম্ভ করিল। রাজপুত্র এই বার সংহতি চলিল॥ হ্রদতটে নারীগণ আসিয়া তখন। বলে চল বারি’পরে করিগে ভ্রমণ॥ বলি পদ্মফুলে গাঁথা ভেলার উপরে। রাজবালা বনবালা উঠে পরে পরে॥ ধারে ধারে সারি সারি বসিল কজন। অবশেষে বীরবাহু কৈল আরোহণ॥ কাণ্ডারীর বেশে হাতে কেরুয়া ধরিয়া। নীল জলে পদ্ম-ভেলা চলিল বাহিয়া॥ ধীর সমীরণে বারি-হিল্লোল বহিছে। ভেলা পাশে আসি ধীরে কল্লোল করিছে॥ বারি বায়ু হিল্লোলেতে পুলকিত কায়। বাঁশী-সুরে রামাগণ সারিগান গায়॥ তাহে সে হ্রদের শোভা অমর-লষিত। চারি দিকে ছয় ঘাট স্ফাটিক-রচিত॥ শ্বেত পাষাণেতে তার বান্ধা চারি ধার। ধবল অচলে যেন জলদ-সঞ্চার॥ পশ্চিম কূলেতে শোভে বনদারুদাম। বিশাল তমাল শাল দেখিতে সুঠাম॥ পূর্ব্বকূলে সুরসাল ফলতরুচয়। দাড়িম্ব শ্রীফল আম্র স্বাদু সমুদয়॥ দক্ষিণে কুসুমবনে ফুলের সৌরভ। জানাইছে জীবলোকে কানন-বৈভব॥ উত্তরেতে অট্টালিকা বিচিত্রগঠন। দ্বার প্রসারিয়া বায়ু করে আরোহণ॥ সরোবর-মধ্যভাগে অতি মনোহর। ক্ষুদ্রকায় দ্বীপ এক রহে বারি’পর॥ নবদূর্ব্বা পরিপূর্ণ শ্যামল বরণ। নির্ম্মল গগনে যেন মেঘের সৃজন॥ তাহাতে নির্ঝর-বারি নিয়ত নির্গত। যেন বিন্দু বিন্দু বারি পড়ে অবিরত॥ নৃপসুত বিনোদিনী সহ ভাসে জলে। হেরি ভানু ত্বরা করি নিজধামে চলে॥ বিশাল শালের আড়ে লুকাইল রবি। ক্রমে পূবে দেখা দিল শশধর ছবি॥ হেরিয়া কুমুদী জলে ঈষৎ হাসিল। তমালের ডালে ডালে কোকিলা ডাকিল॥ বারি’পরে সন্ধ্যাকালে বসন্ত-সমীরে। রসিল শরীর মন নেহারি শশীরে॥ বিনোদ-শয়নে তনু জুড়াবার তরে। বীরবাহু পদ্মভেলা ফিরালেন ঘরে॥ হেন কালে যোগিনীর বেশে একজন। ঘাটের উপরে আসি দিল দরশন॥ মৃগচর্ম্ম পরিধান, মুখে শিব-গুণগান, করতলে ত্রিশূলের ফলা। গলিত জটিল কেশ, মহাযোগিনীর বেশ, রুদ্রকরমালাময় গলা॥ শেষ যৌবনের ভরে, দেহ ঢল ঢল করে, অস্তমান ভানুর তুলনা। এক ধ্যানে এক মনে, রত তীর্থদরশনে, পরিহরি বিষয়-বাসনা॥ চকিত নয়নতারা, যেন মৃগী মৃগহারা, চেতনা হারায়ে পথে চলে। আগমন করি ধীরে, আসিয়া হ্রদের তীরে, চরণ ক্ষালন কৈলা জলে॥ পাষাণ সোপানোপরি, বসি শ্রম দূর করি, অট্টহাসি হাসিয়া উঠিলা। বিস্ময়প্লাবিতমনে, বিলাসিনীগণ সনে, যোগিনীরে কুমার পূজিলা॥ সভয়ে বিনয় বাণী, জুড়িয়া যুগল পাণি, বীরবাহু অভয় মাগিল। কেন কৈলা উপহাস, কি দোষে দূষিত দাস, এই কথা বলি সুধাইল॥ শুনি রামা ঘোর রবে, কহে তবে শুন সবে, এ ভবে নাহিক সুখলেশ। সকলি কালের খেলা, মিছামিছি যায় বেলা, দেখিতে থাকে না কিছু শেষ॥ যা কিছু দেখিবে আজি, সকলি সে ভোজবাজি, কাল আর পাবে না সে সবে। আজি ধরাপতি যেই, কাল দীনহীন সেই, এই ভাবে যায় দিন ভবে॥ কত যে ভূপতি-সুতা, কত রূপগুণযুতা, বিপাকে পড়িয়া ভোগে কত। যোগিনীর বেশে আজি, এই দেখ আছি সাজি, পথে মাঠে ভ্রমি অবিরত॥ প্রখর ভানুর করে, স্বেদজল নাহি ঝরে, শীতে দেহ কণ্টকিত নয়। নগর অটবী মরু, কিবা কাঁটা লতা তরু, এবে মোরে সকলি ত সয়॥ শয়নের ক্লেশ নাই, তরুতলে নিদ্রা যাই, একাকিনী বিঘোর যামিনী। ক্ষীর নবনীত সর, ভুলিয়াছি দেশ ঘর, ভুলিয়াছি জনক জননী॥ বলিতে বলিতে ক্রোধে, কণ্ঠদেশে শ্বাস রোধে, বহ্নিকণা নয়নে জ্বলিল। ফুলিতে লাগিল জটা, করেতে ত্রিশূল-ছটা, ঘন ঘন কাঁপিয়া উঠিল॥ তখন ভৈরব স্বরে, ভৈরবী নিনাদ করে, শোন্ রে পাপিষ্ঠ মুসলমান। বাল্যে বিনাশিয়া পতি, মোর কৈলি এই গতি, মম বাক্য না হইবে আন॥ টুটিবে সম্পদ বল, রাজ্য যাবে রসাতল, বাতি দিতে বংশে নাহি রবে। ব্রতে যদি ফল হয়, দেবে যদি পূজা লয়, ইহার অন্যথা নাহি হবে॥ বলি রোষে কম্পমান, যেন শ্যামা মূর্ত্তিমান্, ঘোর রবে হুঙ্কার ছাড়িল। শুনি সেই গরজন, জ্ঞানহীন নারীগণ, দেখি রামা নীরব হইল॥ ক্ষণেক নীরব থাকি, কোপানল চাপি রাখি, যোগিনীর বাক্‌স্রোত পুনঃ বেগে বহিল। আপনার পরিচয়, পূর্ব্বাপর সমুদয়, অগ্নিকণা সম রামা বরিষণ করিল॥ দ্বারকা নগরী কাছে, সর্প নামে পুরী আছে, তার অধীশ্বর রাজা সর্পেশ্বর আছিল। নির্ম্মল ক্ষত্রিয়বংশ, তাহে তেঁহ অবতংস, কুক্ষণে তাঁহার ঘরে মম জন্ম হইল॥ কুক্ষণে সর্পেশ-পতি, মম মনোমত পতি, আনিবারে স্বয়ম্বরা উপক্রম করিল। কুক্ষণে আমার মন, করি তাঁরে বিলোকন, অম্বরের ভূপতির প্রেম-ডোরে পড়িল॥ স্বয়ম্বরা হয়ে দোঁহে, যাইতে পতির গেহে, পথি মাঝে দুষ্ট যবনের হাতে পড়িয়া। তুমুল সংগ্রাম করি, পতি যান স্বর্গপুরী, হেরি চিতহারা হয়ে পড়িলাম ঢলিয়া॥ জ্ঞান পেয়ে পুনরায়, রুধির শুকায়ে যায়, যবনের গৃহমাঝে পড়ে আছি দেখিনু। হেরে হয়ে নিরুপায়, পড়িলাম দস্যু-পায়, নানা মতে নানা ছলে নরাধমে তুষিনু॥ সে দিন কৌশল করি, সেই স্থানে কাল হরি, পরদিন লুকাইয়া ভিখারিণী হইনু। পরে পরদেশে গিয়া, গেরুয়া বসন নিয়া, এইরূপ যোগিনীর যোগবেশ ধরিনু॥ তদবধি দেশে দেশে, ফিরিতেছি এই বেশে, বারাণসী বৃন্দাবন হরিদ্বার ভ্রমিনু। মানসরোবরহ্রদ, জ্বালামুখী পঞ্চনদ, অবশেষে কৈলাস পর্ব্বতোপরি উঠিনু॥ হেরিলাম বৃষভেতে, শিব শিবা আনন্দেতে, পাষাণ আকৃতি ধরি বিরাজিত রয়েছে। সুখের কৈলাস ধাম, কেবলি রয়েছে নাম, দেবের বিভব যত সমূলেতে ঘুচেছে॥ জগতে পবিত্র স্থান, গিয়াছে তাহারো মান, সে পুরীও ম্লেচ্ছপদ অপবিত্র করেছে। যেখানে পিনাকধারী, পিনাকে সন্ধান ধরি, অমরের রিপুকুল অকাতরে বধেছে॥ সেইখানে যবনেতে, আরোহিয়া হিমপথে, অভয় হৃদয়ে পার্ব্বতীয় অজা বধিছে। আজি সেই শূন্যময়, কৈলাস নীরব রয়, দু এক ময়ুর শুধু মাঝে মাঝে জাগিছে॥ কত বার রুদ্রনাম, গালবাদ্যে ডাকিলাম, প্রাণী মাত্র তবু তথা নয়নে না দেখিনু। তখন উদ্দেশ ধরি, শিবমূর্ত্তি পূজা করি, দর্শন-আশয়ে নামি বারাণসী চলিনু॥ গিয়া আনন্দের ভরে, হেরিব অনাদীশ্বরে, ভাবি অন্নপূর্ণা-পুরে উপনীত হইনু। দেখি বুদ্ধি হই হারা, চান্দ্র কলঙ্কের পারা, প্রাচীন দেউল-ভিতে দর্‌গা গাঁথা দেখিনু॥ প্রাণভয়ে বিশ্বেশ্বর, দেখিলাম স্থানান্তর, অন্য পুরী নির্ম্মাইয়া গুপ্তভাবে জাগিছে। নাহি সে সোণার কাশী, পাষাণের বারাণসী, পাষণ্ডপ্লাবিত হয়ে পাপস্রোতে ভাসিছে॥ অন্তরে হতাশ হয়ে, কাশীতে বিদায় লয়ে, চলিলাম কুরুক্ষেত্রে কত আশা করিয়া। আসি কুরুরণস্থলে, আর না চরণ চলে, বসিনু প্রভাসতীরে মনোদুখে ভাসিয়া॥ পাপিষ্ঠ যবন নাশ, করিতে অন্তরে আশ, পাণ্ডুপুত্র নাম ধরি কতই যে কাঁদিনু। সব হৈল অকারণ, না আইল কোন জন, ডুবেছে ভারত-ভাগ্য তবে সত্য জানিনু॥ তখন বুঝিনু সার, ভূভারতে কেহ আর, ক্ষত্রিকুল মহাধর্ম্ম নাহি কিছু লভেছে। জানিলাম বীরবংশ, কুরুক্ষেত্রে হয়ে ধ্বংস, বীরনাম জন্মশোধ ভূমণ্ডলে ঘুচেছে॥ আজি বুঝিলাম মর্ম্ম, কেন ক্ষত্রিয়ের ধর্ম্ম, ভারত ভিতরে আর দরশন হয় না। কেন বা যবন-দল, ধরে এত বাহুবল, কেন হিন্দুমহিলার কুলমান রয় না॥ ভারতে কনোজ ধাম, প্রসিদ্ধ পবিত্র নাম, তুমি সেই কনোজের বংশধর হইয়া। এই ভাবে অকারণে, বৃথা কাল বনে বনে, অপচয় করিতেছ রামাগণে লইয়া॥ আসিতেছে কত দূরে, রণবেশে তূণ পূরে, পাঠান দুরন্তদল মনে তা ত ভাব না। কহিলাম সমাচার, দেখো যেন পুনর্ব্বার, অই কামিনীরে মোর মত দুঃখী করো না॥ শুনি যোগিনীর কথা রোমাঞ্চিত কায়। বিদায় লইয়া বীর কনোজেতে যায়॥ অনল-শিখরে যেন ধাতুর প্রবাহ। শমন-ভবনে যেন দাহন-কটাহ॥ ভাবনা-অনলে হৃদি তাপিল তেমনি। বনিতা বিপিন হ্রদ ভুলিল তখনি॥ জ্বলিল চিন্তার শিখা হৃদয় ভিতরে। ভূত ভবিষ্যৎ ভাব জাগিল অন্তরে॥ যে ভারতে দেবগণ মানব-লীলায়। সুরপুরী পরিহরি করিত আলয়॥ যে ভারতে মহাবল দনুজের দল। সুর-শরাঘাত-জ্বালা করিত শীতল॥ যে ভারতে সৌরকুল মহাবীরগণ। রাক্ষস দানবে রণে করিত দমন॥ দিলীপ সগর রঘু দশরথ বীর। যে ভারতে রিপুদলে করিত অস্থির॥ যে ভারত-বীরবৃন্দ-সমর-কৌশল। দেখিতে বিমানে দেব বসিত সকল॥ সে ভারতে আমা হেন কাপুরুষদল। আজি জনমিয়া ধরা করে রসাতল॥ এইরূপ বিষময় চিন্তায় মগন। বাহ্যজ্ঞান বীরবাহু হারায়ে তখন॥ বিচিত্র স্বপনে দেখে গগন ভিতরে। বিপরীত নানা ছবি শূন্য আলো করে॥ এক ধারে নারী এক রহে তরুতলে। তাঁরে হেরি রাক্ষসেরা অধোমুখে চলে॥ অন্য পাশে একজন যবন ভূপতি। শত হিন্দুনারী ধরি করয়ে দুর্গতি॥ এক পাশে আখণ্ডল সহ নিজগণ। গাণ্ডীব নিনাদে দূরে করে পলায়ন॥ আর পাশে ডানি হাতে তরবারি ধরি। কোরাণ ধরিয়া বামে রহে এক পরী॥ তাহারে হেরিয়া যত ক্ষত্রিয়তনয়। করপুটে পদতলে হেঁটমুখে রয়॥ এক ধারে যযাতির পুত্ত্র কয় জন। ছদ্মবেশে দূর দেশে রহে সংগোপন॥ স্থানান্তরে ম্লেচ্ছদূত করিয়া গর্জ্জন। হিন্দুরে সৎকার-কার্য্যে করে নিবারণ॥ দেখিয়া দুর্জ্জয় কোপ জ্বলিয়া উঠিল। ঘন দেহ চমকিয়া উঠিতে লাগিল॥ অন্তরের কোপ তবে অন্তরে চাপিয়া। থাকিয়া থাকিয়া বীর উঠিল কাঁপিয়া॥ যেন গগনের দর্প, বায়ুর নিস্বন। শুনি ধরা ক্রোধভরে করয়ে কম্পন॥ কিম্বা যেন ঘোর মেঘ সাগর-গর্জ্জনে। জানায় আপন দর্প ডাকিয়া সঘনে॥ সেই ভাবে বীরবাহু হুহুঙ্কারধ্বনি। করি দেখা দিল আসি যথা নরমণি॥ হেন কালে মহাবেগে দূত এক জন। ভূপতি সমীপে আসি করে নিবেদন॥ মহারাজ, সর্ব্বনাশ বৈরীপক্ষ এল। কর রক্ষা নৈলে রাজ্য রসাতল গেল॥ দুরন্ত পাঠান-সৈন্য চতুরঙ্গ দলে। কালান্ত কালের দূত সাজি এল বলে॥ সিন্ধুরাজ্য শেষ ভাগে কাবুলের দেশ। তাহার নৃপতি নাম সুলতান বকেশ॥ তাঁর সেনাপতি নাম আলি মহম্মদ। খেদাইয়া দিল্লীরাজে নিল রাজপদ॥ লুটিল মথুরাপুরী কুল্লী কলিঞ্জর। কান্যকুব্জ লুটিবারে আসে অতঃপর॥ এখনো সময় আছে রিপু আছে দূরে। অবিলম্বে ম্লেচ্ছসেনা দেখা দিবে পুরে॥ শুনি নরপতি মনে বিপদ্ গুণিল। বুদ্ধিহারা মন্ত্রীগণ মন্ত্রণা ভুলিল॥ ক্রোধেতে কম্পিত দেহ যুবরাজ কয়। এ কি কাজ মহারাজ ক্ষত্রি হয়ে ভয়॥ জনম সফল তাঁর ধন্য বীর সেই। বিক্রমে বৈরীর মুণ্ড খণ্ড করে যেই॥ কিবা হবে মাংসপিণ্ড এ দেহ ধরিয়া। বৈরী যদি যশঃনিধি লইল হরিয়া॥ অশীতি বরষ প্রাণে জীয়ে কি হইবে। যুগে যুগে মহীতলে সুকীর্ত্তি ঘুষিবে॥ যবনে করিব জয় রণে মহাশয়। সাহসে করুন ভর নাহিক সংশয়॥ মহাবল রিপুদল সত্য বটে মানি। কালের কুটিল গতি তাও ভাল জানি॥ কিন্তু পুরাতন কথা গাঁথা আছে মনে। একা বীর কত বৈরী বিনাশিল রণে॥ একা ইন্দ্র দৈত্যবংশ করিল দলন। একা রঘু বসুন্ধরা করিল শাসন॥ একা দশানন করে ত্রিভুবন জয়। একা রামবাণে দশানন-কুল লয়॥ একা কুরু ভূমণ্ডলে একছত্র কৈল। একা পার্থ লক্ষ্য ভেদি পাঞ্চালী হরিল॥ বীর্য্য যার ধরা তার বিধির নির্ণয়। কালে হয় কালে বুদ্ধি কালে পায় ক্ষয়॥ দুর্জ্জয় পাঠান বড় দুরন্ত হইল। অটল সৌভাগ্য বলি অন্তরে ভাবিল॥ হস্তিনা মথুরা কুল্পী আদি কলিঞ্জর। লুটিয়া কনোজ লোভে আসে অতঃপর॥ কেন রে করিস দম্ভ রবে না এ দিন। দ্বিপ্রহরে মেঘে সূর্য্য কখন মলিন॥ কখন প্রবল নদ শুকাইয়া যায়। কভু উচ্চ গিরিচূড়া ভূতলে লুটায়॥ শতগিরি-অবলম্ব ভূমিকম্পে কভু। শতমূল বটবৃক্ষ ছিন্নমূল কভু॥ জলবিন্দু পাষাণে কখন করে ভেদ। মহাপরাক্রান্ত রাজ্য কখন উচ্ছেদ॥ পবিত্র কনোজপুরী ক্ষত্রিয়ের বাস। তাহারে লুটিবি বলি করিলি রে আশ॥ তবে ত পুরুষ আমি বীরবাহু নাম। তবে ত প্রসিদ্ধ পুরী কনোজেতে ধাম॥ তবে মম রণবীর ঔরসে জনম। তবে ধরি বাহুবল বীর্য্য পরাক্রম॥ মহারাজ শ্রীচরণে এই নিবেদন। পরিজন সকলেরে করুন পালন॥ রণক্ষেত্রে গিয়া শত্রু করিব নিধন। সত্য সত্য এই সত্য করিলাম পণ॥ হেরি বীরবাহু-দর্প প্রফুল্ল সকলে। রাজ-আজ্ঞা পেয়ে বীর রণবেশে চলে॥ সেনাপতি-পদে বীর হইল বরণ। শুনি “জয় যুবরাজ” নাদে সেনাগণ॥ নাহিক ভয়ের লেশ, করিয়া সমর-বেশ, রাজসুত হেমলতা-ঘরে গিয়া ভেটিল। প্রেয়সি বিদায় চাই, সমর জিনিতে যাই, বলি বীরবর প্রমদার কর ধরিল॥ পতি রণমাঝে যান, আকুল রমণী-প্রাণ, কতই বিষম ভাব উথলিল হৃদয়ে। শুখাইল তনুলতা, শোকভরে অবনতা, শশধর লীন যেন হয় রাহু-উদয়ে॥ ধরিয়া পতির হাত, কি কব হৃদয়নাথ, কঠিন ক্ষত্রিয়কুলে নারী-জন্ম ধরেছি। মায়া মোহ পরিণয়, উদ্‌যাপন সমুদয়, ক্ষত্রিয় ধর্ম্মের লাগি জন্মশোধ করেছি॥ যবনে নাশিতে যাবে, জগতে সুযশ পাবে, এমন সময়ে নাথ কি বলিব তোমারে। মন বোঝে না ত তবু, প্রাণ কেঁদে উঠে কভু কভু তব সনে যেতে বলিতেছে আমারে॥ গত নিশি দুঃস্বপন, করিয়াছি দরশন, তাই প্রাণনাথ, প্রাণ আকুলিত হয়েছে। তাই নাথ এত ক্ষণ, না করিয়া আলিঙ্গন, অবশ হইয়া মম বাহুযুগ রয়েছে॥ গত নিশি শেষ যাম, অলক্ষণ দেখিলাম, ভাবিলে শোণিত-বিন্দু দেহে আর রয় না। তোমারে হৃদয়ে লয়ে, জলনিধি পার হয়ে, পলাতে বাসনা যেন কেহ দেখা পায় না॥ দেখিনু ময়ুরী হেরে, ময়ূর যেমনি ফেরে, অমনি নিদয় ব্যাধ খর শর মারিল। ফুটাইতে ফুল-কলি, যেই দেখা দিল অলি, অমনি প্রলয়-বায়ু হু হু করে বহিল॥ যেই “বারি বারি” করে, চাতকী কাতর স্বরে, উঠিল গগনোপরে অমনি সে মরিল। বিনা মেঘে বজ্রাঘাত, হয়ে শিরে অকস্মাৎ, সেই পাখী ভূমিতলে লুটাইয়া পড়িল॥ বিশাল তরুর পাশে, তরুলতা ধেয়ে আসে, হেন কালে কাঠুরিয়া সেই তরু কাটিল। কমলিনী বারি’পরে, যেই খোলে রবিকরে, অমনি সে কাল মেঘ আসি ভানু ঢাকিল॥ আরো কত অলক্ষণ, দেখিলাম অগণন, না জানি কপালে বিধি কিবা লিপি লিখেছে। বুঝি লীলা সমাপন, ব্রত হলো উদ্‌যাপন, মোর প্রতি কোন দেব বুঝি কোপ করেছে॥ যা হবার হবে তাই, আজ্ঞা দেহ সঙ্গে যাই, তব অনুগামী হয়ে রিপুকুলে নাশিব। অথবা তোমার সনে, যুঝিয়া সমুখ রণে, দুই জনে একেবারে সুরলোকে পশিব॥ শুনি খেদে মহাবীর, ভাবিয়া করিয়া স্থির, অবশেষে অঙ্গুলির অঙ্গুরীয় খুলিয়া। “কি জানি কি হবে রণে, দেখো প্রিয়ে রেখো মনে” পরাইল প্রমদারে এই কথা বলিয়া॥ সময় বহিয়া যায়, দিনের সংক্ষেপ তায়, নিরুপায়ে যুবরাজ রণমুখে চলিল। কাষ্ঠপুতলির ন্যায়, যেই দিকে স্বামী যায়, হেমলতা এক দৃষ্টে সেই দিকে রহিল। সেনা লয়ে বীরবাহু হয়ে অগ্রসর। নেপালের পথে আসি রহিল সত্বর॥ পরদিন অপরাহ্ণে রিপু দেখা দিল। সম্মুখীন সমুদায় মেদিনী ঢাকিল॥ অর্দ্ধচন্দ্র-শোভা নীল পতাকা উড়িল। যোজন ব্যাপিয়া শত্রুশিবিরে ছাইল॥ ক্রমে দিবা অবসান সূর্য্য লুকাইল। আঁধার বিছায়ে নিশি আকাশে বসিল॥ অমর-আলয়ে সিদ্ধা সন্ধ্যা দিল ঘরে। অমনি তারার আলো ধিকি ধিকি করে॥ দ্বিতীয়ার চন্দ্রকলা ঈষদ্ হাসিল। জ্যোৎস্না-আলো পেয়ে দশ দিক্ প্রকাশিল॥ বীরবাহু বৈরিপক্ষ করিতে বীক্ষণ। হিমগিরিশৃঙ্গোপরি কৈল আরোহণ॥ প্রকাণ্ড-প্রকৃতি দেখে যবনের সেনা। শিরেতে ধবল বাস যেন ভাসে ফেনা॥ শ্রবণে কুণ্ডল দোলে করে শরাসন। পৃষ্ঠে তূণ কটিতটে কৃপাণ বন্ধন॥ হেরি মনে মনে বীর ভাবিতে লাগিল। ভারতের পূর্ব্বকথা স্মরণ হইল॥ কেশরি-নিনাদ-স্বরে গর্জ্জিয়া তখন। বলে কোথা কার্ত্তবীর্য্য রহিলে এখন॥ কোথায় গাণ্ডীবধারী পাণ্ডব-প্রধান। কোথা ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য্য, কর্ণ মতিমান্॥ কোথা অভিমানী মহারাজা দুর্য্যোধন বারেক কটাক্ষে হের হস্তিনা-ভবন॥ যে ভবনে রাজসূয়-যজ্ঞ অধিষ্ঠান। সেই পুরী আজি জয় কৈল মুসলমান॥ তবে রে যবন তোর নিকট মরণ। স্ববংশে আমার শরে হইবি নিধন॥ পূর্ব্বদিকে প্রভাকর, বাজিল দুন্দুভিস্বর, রণ রণ মহাশব্দে ধনুর্ঘোষ নাদিল। ভাঙ্গিল আকাশ-খণ্ড, রণভূমি লণ্ডভণ্ড, তাল তাল শররাশি প্রভারাশি ঢাকিল॥ সমকক্ষ দুই বল, হুঙ্কারে সেনার দল, হিন্দু ম্লেচ্ছ রণরব এক ঠাঁই মিলিল। ম্লেচ্ছ “মহম্মদ” ডাকে, “হর হর” হিন্দু হাঁকে, মহাক্রোধে দুই দল সমরেতে মাতিল॥ ভাসায়ে দু’কূল যেন, নদী ছুটে ধায় হেন, বীরগণ মহাদম্ভে বেগে আসি মিলিল। ঘোটকে ঘোটক সঙ্গে, বারণে বারণে রঙ্গে, পদাতি ধানুকী ঢালী যেবা যারে ঝাঁকিল॥ যোজন-বিস্তার বন, অনলে করে দাহন, বিশাল বৃক্ষের কাণ্ড ধরণীতে লুটে রে। অথবা নিদাঘ কালে, ঢাকিয়া আঁধার জালে, বায়ুপথে ঘন ঘোর যেন রণ করে রে॥ অথবা জলধি-জল, ঝটিকা করিলে বল, হুহুঙ্কার নাদ ছাড়ি তীরেতে আছাড়ে রে। রণভূমি টল টল, হেন তেজে যোঝে বল, সমকক্ষ দুই পক্ষ কেহ কারে নারে রে॥ বেলা অপরাহ্ণ হয়, তবু রণ ভঙ্গ নয়, মরি বাঁচি পণ করি মহাযুদ্ধ করে রে। হেন কালে বৈরিপক্ষ, করিয়া করিয়া লক্ষ্য, বীরবাহু-বক্ষদেশ বাণে বিদ্ধ করে রে॥ সেনাপতি মূর্চ্ছা যায়, সেনাগণ ভয় পায়, আরো পরাক্রমে রিপু একেবারে ঝাঁপে রে। সহিতে না পারি রণ, ভঙ্গ দিল সৈন্যগণ, জয় মহম্মদ বলি রিপুদল হাঁকে রে॥ গর্জ্জিল পাঠান-সৈন্য সমর জিনিয়া। যেন বিষধর গর্জ্জে দংশন করিয়া॥ মদগর্ব্বে মাতোয়াল পাঠান চলিল। রাজধানী-সন্নিধানে আসি উতরিল॥ সমাচার পেয়ে রণবীর সাজে রণে। যুঝিতে প্রাচীন রাজা চলে প্রাণপণে॥ অবশিষ্ট দলবল সংহতি করিয়া। কান্যকুব্জ-প্রান্তভাগে রহেন আসিয়া॥ ক্রমশঃ পাঠান-সৈন্য আসিয়া ফুটিল। হিন্দু ম্লেচ্ছ বীরগণ যুঝিতে লাগিল॥ অসংখ্য পাঠান-সেনা অন্তরে উল্লাস। হিন্দু সৈন্য ভগ্নশেষ অন্তরে হুতাশ॥ তবু রণে যমদূত সমান যুঝিল। বিপক্ষ সেনার দল বিস্তর বধিল॥ সহিতে না পারি শেষে বিমুখ হইল। নগর-প্রাচীর মধ্যে গিয়া লুকাইল॥ পাঠান মাতিয়া আরো প্রাচীর ঘেরিল। ধরিতে কনোজ-রাজে সন্ধান করিল॥ হেথা কান্যকুব্জপতি জ্বালি চিতানল। নিবাইল শোক তাপ সকল জঞ্জাল॥ বীরভার্য্যা বীরকন্যা হেমলতা নারী। চলে ত্যজিবারে দেহ লয়ে সহচরী॥ শুনি নগরের লোক চলিল সকলে। আবাল বনিতা বৃদ্ধা পড়িল অনলে॥ স্মরিয়া পিতার পদ স্মরি প্রাণনাথে। ঝাঁপ দেয়, হেন কালে কেহ ধরে হাতে॥ ফিরে দেখে বিনোদিনী দুরন্ত পাঠান। হেরিয়া পড়িল ভূমে হারাইয়া জ্ঞান॥ আনন্দে পাঠান-সৈন্য জয়ধ্বনি দিল। সুলতানে তুষিতে সঙ্গে করিয়া চলিল॥ জ্ঞান পেয়ে রাজসুতা মরমে মরিল। মানভয়ে বিনোদিনী কাঁপিতে লাগিল॥ রাহুর তরাসে যেন আকাশের শশী। নিষাদের ভয়ে যেন মৃগী বনে পশি॥ দুঃশাসন-করে যেন দ্রুপদকুমারী। জনকদুহিতা যেন রথে রাঘবারি॥ সেই ভাবে কাতরে রোদন করে ধনী। তাহে উচাটিতমনা ভাবি গুণমণি॥ প্রাণনাথ কার সাথে কোন পথে রয়। সেই কথা হেমলতা-মনে সদা হয়॥ তাপে তনু জর জর ঝর ঝর আঁখি। ব্যাধের জালেতে যেন কাননের পাখী॥ শরীর বেড়িয়া ফণী উঠিলে বুকেতে। যেন শীর্ণ দেহ হয় মনের দুখেতে॥ ভয়েতে মুদিত আঁখি মলিন বদন। কাঁপে ওষ্ঠাধর, গণ্ড পাণ্ডুর বরণ॥ সেইরূপ অবয়ব ধূলায় ধূসর। দিল্লীরাজপুরে সতী কাঁদে উচ্চস্বর॥ কোথা মাতা, কোথা পিতা, কোথা প্রাণনাথ। হেমলতা-শিরে হেথা হয় বজ্রাঘাত॥ কাল-ভুজঙ্গেতে তারে করে গো দংশন। সতীত্ব হরিতে চায় দুরাত্মা যবন॥ কেন নাথ অভাগীরে ফেলি চলি গেলা। এ জনম মত ফুরাইল খেলাদেলা॥ মা বলা ফুরালো মা গো জনম মতন। এই বার হারালে মা ‘অঞ্চলের ধন’॥ হয়ে রাজকুলবধূ রাজকুলবালা। পেয়ে বীরবর পতি এত হলো জ্বালা॥ হায় বিধি, এত যদি ছিল তোর মনে। কেন রে জনম দিলি ভূপতি-ভবনে॥ কেন কাঙালিনীকন্যা না করিলি এরে। যদি ছিল এত সাধ ফেলিবারে ফেরে॥ যদি রাজকুলে মোরে করিলি সৃজন। উচ্চ আশা দিয়ে বিড়ম্বিলি কি কারণ॥ কেন জরা-কুষ্ঠরোগী না করিলি মোরে। হেন পোড়া রূপ দিতে কে বলিল তোরে॥ কেন ধীর বীর পতি দিলি অনুপম। কেন মজাইলি শেষে বিপাকে বিষম॥ একান্ত করিয়া অন্ধ না গঠিলি কেন। তবে কি সহিতে হত যন্ত্রণা এমন॥ অনায়াসে নরাধম চোরে ভজিতাম। দাসীভাবে অনুগতা হয়ে সেবিতাম॥ ভুলিতাম মাতা পিতা পতি পরিজন। হায় পুনঃ না দেখিব সে সব বদন॥ না শুনিব জননীর আদরের বাণী। হায় বুঝি এত ক্ষণে ছেড়েছে পরাণি॥ কোথায় প্রাণের নাথ, কাঁদে হেমলতা। করুণা করিয়া আসি কহ দুটি কথা॥ অমৃতপূরিত ভাষা করাও শ্রবণ। বারেক হেরিব তব হিমাংশুবদন॥ বারেক হৃদয়ে থুয়ে সে কর-কমল। এক বার নাথ বলে ডাকিব কেবল॥ এত বলি ধীরে ধীরে, তিতিয়া নয়ন-নীরে, পতিপ্রাণা সতী, বিষ অধরেতে তুলিল। অরে নরাধম অরি! তোর ক্রোধ হেয় করি, এই দেখ্ তোরি ঘরে তোরি বন্দী মরিল॥ পান করে হলাহল, আর কি করিবি বল, কেমনে পামর আর দুরাকাঙ্ক্ষা সাধিবি। যে রক্ত-মাংসের তরে, অবলা আনিলি ধরে, এবে তার শবাকার দেখি ডরে পলাবি॥ চক্ষু কর্ণ নাসা আর, সর্ব্বাঙ্গ হইবে ছার, খানকত সাদা সাদা হাড় শুধু দেখিবি। সেই নেত্র নীলোৎপল, সে অধর বিম্বফল, সেই নাসা সেই কর্ণ সে বদন বিমল। সেই পীন পয়োধর, সেই নিতম্বের ভর, সেই মৃদু বাহুলতা করতল কোমল॥ জিনিয়া নবনী সর, সেই যে মাংসের থর, সেই চারু রূপছটা শশধরগঞ্জনা। সেই কেশ সেই বেশ, কিছুই না রবে শেষ, গুটিকত কীটাণুরে করাইবে পারণা॥ তবে কেন বৃথা ছায়া, লাগিয়া করিস মায়া, দিনকত জন্যে এত বাড়াবাড়ি ভাল না। তোরো ত হইবে নাশ, যেতে হবে যমপাশ, হেন দিন চিরদিন কভু কারো সয় না॥ ভাবিয়া ভাবিয়া, গরল লইয়া, ভূতলে বসিয়া, উদাস মনে; উদরে দেখিয়া, গুমিয়া গুমিয়া, কাঁদিয়া কাঁদিয়া বিরসাননে, বলে শিলাময়, যত গেহচয়, করি অনুনয়, ছাড়িয়া দাও! ছেড়ে দেহ দ্বার, ঘোর অন্ধকার, হয়ে অগ্রসর, অরণ্যে যাও॥ শৃঙ্গী নখী সনে, একা রব বনে, তবু এ সদনে রব না আর। বিকট সাপিনী, করিয়ে সঙ্গিনী, রব একাকিনী, কি ভয় তার॥ গো মেষ চরাব, মাঠে মাঠে যাব, ভিক্ষা মাগি খাব, ভ্রমিব বনে। এ যমপুরীতে, পরাণ ধরিতে, নারিব থাকিতে, রাখিব ধনে॥ অহে শশধর! ভাবিয়া কাতর, বল হে সত্বর, কোথায় যাই। অরণ্যে ভূতলে, কিম্বা বহ্নি জলে, দেহ যুক্তি বলে, কোথা পলাই॥ অহে লিপিকর! দিয়ে বংশধর, শেষে বিষধর, অঙ্কে সঁপিলে। অতি দুরাচার, ধর্ম্ম নাহি যার, হাত দিয়ে তার, প্রাণে বধিলে॥ কোথা দশ মাসে, গিয়া মনোল্লাসে, বসি পতিপাশে, চাঁদে দেখাব। কোথা দিবানিশি, একাসনে বসি, লয়ে সুতশশী, দোঁহে খেলাব॥ কোথা অন্ন দিয়ে, বুকে করে নিয়ে, পতিকোলে থুয়ে, হৃদি জুড়াব। করি অতিবাদ, তাহে সাধে বাদ, হলে সেই সাধ, কিসে পূরাব॥ অরে প্রজাপতি! তোরে করি নতি, আর এ দুর্গতি, মোরে দিস নে। উম্মাদিনী করে, নে রে জ্ঞান হরে, আর এত করে, জ্বালাইস নে॥ এত বলি চিতহারা, খসা চাঁদখানি পারা, হয়ে হেমলতা ভূমে পড়ে। হেন কালে সৌদামিনী, স্বরূপা কোন কামিনী, ক্রোড়ে করে আসি উভরড়ে॥ যেন কোন রাহী জন, পথি মাঝে দরশন, করি মণি সযতনে লয়। ঝেড়ে ফেলি ধূলিগুলি, বাসে বাঁধি রাখে তুলি, যায় যায় পুনঃ নিরখয়॥ সেইরূপে সেই নারী, মুছায় নয়ন-বারি, অনিমেষে মুখপানে চায়। নাহি নড়ে নাহি চড়ে, নেত্রে না পলক পড়ে, এক ভাবে বসে রহে ঠায়॥ সেই নারী কোন্ জন, কেন তথা কি কারণ, কি জন্য সে এত শোকময়। ভাবে বুঝি সেই ধনী, হবে চুরিকরা মণি, ইথে কিছু নাহিক সংশয়॥ না হলে দুখের দুখী, এত সে মলিনমুখী, হবে কি কারণ তার তরে। ঠেকে শিক্ষা করে যেই, সার-গ্রহ করে সেই, তাদৃশ না পারে অন্য পরে॥ কিবা শোভা দিল তায়, বাক্যে নাকি বলা যায়, কোকনদে শ্বেতপদ্ম যেন। অথবা চপলা-ছাদ, ঘেরিয়া গগন-চাঁদ, অচলা হইয়া রহে যেন॥ দুটি ফুল কাছে কাছে, এক্‌টি তার শুখায়েছে, এক্‌টি ঊর্দ্ধ এক্‌টি অধোভাগে। ছায়া পড়ি দুটি কালো, তার মাঝে কিছু আলো, পড়িয়াছে এক্‌টি অগ্রভাগে॥ সেইরূপে দুই জন, এর কোলে অন্য জন, কত ক্ষণ সমভাবে যায়। মেঘচাপা চাঁদ যেন, ধীরে ধীরে ফুটে হেন, হেমলতা সেই ভাবে চায়॥ দেখে চক্ষে বহে বারি, অচেনা জনেক নারী, কোলে করি অনিমেষ রয়। চিনিতে না পারি তারে, চেয়ে দেখে বারে বারে, মন বুঝি সেই নারী কয়॥ সখি নাহি ভয়, আমি ভিন্ন নয়, তব ভগ্নীসমা জেনো আমারে। পিতা রাজ্যেশ্বর, দিল্লী-মহীধর, আমি ভাগ্যফলে ভজি ইহারে॥ রণে করি জয়, মোরে ধরি লয়, এই দুরাশয় মোরে ছলিল। ধর্ম্ম করি নষ্ট, করি জাতিভ্রষ্ট, শেষে দাসীভাবে ঘরে রাখিল॥ শুনি আর বার, রাজ্য করি ছার, কোন রাজকন্যা পুনঃ হরিল। মনে ব্যথা পেয়ে, তাই এনু ধেয়ে, ভাবি কার ভাগ্য পুনঃ ভাঙিল॥ পরে দেখি মুখ, বিদরিল বুক, পূর্ব্বকথা যত মনে পড়িল। তাহে চমৎকার, তব ব্যবহার, দেখি কুতূহল আরো বাড়িল॥ তুমি যত ক্ষণ সেই দুষ্ট জন, কাছে কর যোড় করি কাঁদিলে। কত দিব্য দিলে, কত বুঝাইলে, শেষে আজি ক্ষম বলি যাচিলে॥ আমি তত ক্ষণ, হয়ে অদর্শন, গৃহমাঝে থাকি সব দেখেছি। পরে যোগ পেয়ে, আসিয়াছি ধেয়ে, অন্তরালে থাকি সব শুনেছি॥ শেষে কোলে করি, এই আছি ধরি, আজি হতে সখী তব হয়েছি। আমি ভাগ্যবতী, কারে বলে সতী, অদ্যাবধি তাহা ভাল জেনেছি॥ বিজন অরণ্যে যেন স্বজন মিলিল। বালুকাবিকীর্ণ ভূমে সরসী যুটিল। তাদৃশ প্রসন্নমতি তেয়াগি ভূতল। উঠে বৈসে হেমলতা দেহে পেয়ে বল॥ জুড়িয়া যুগল পাণি সজল নয়নে। হেমলতা কয় কথা কাতর বচনে॥ “দয়াময়ি তব কাছে এই ভিক্ষা চাই। কি উপায়ে বল তার কাছে রক্ষা পাই॥” শুনি দিল্লী-মহীপাল-তনয়া কহিল। অশ্রুনীরে দুনয়ন ভাসিতে লাগিল। বলে সখি কুল মান গিয়াছে সকল। ভজিয়া যবনরাজে পীয়েছি গরল॥ আজি সেই তাপ, সখি, শীতল করিব। দিয়াছি আমার ধর্ম্ম, তোমার রাখিব॥ মম বাক্যে অনাদর বুঝি বা না হবে। চুরিকরা ধন বলি বুঝি বাক্য রবে॥ যাই দেখি একবার ম্লেচ্ছরাজ-পাশে। বুঝিব আমায় ভাল বাসে কি না বাসে॥ এত বলি দিল্লীপতি-দুহিতা চলিল। আসি ম্লেচ্ছ মহীপতি কাছে দেখা দিল॥ দূরেতে আসিছে হেরি, আর না সহিল দেরি, শশব্যস্ত পাতসাহ পথি মাঝে ভোটল। “এ কি ভাগ্য আজি মোর, নিজে ধরা দিল চোর,” বলি রসবতী-হাত রসভাবে ধরিল॥ “যেবা চোর সাধু সেই, মনে মনে জানে সেই, কেন মিছে নারী ভাবি কর মোরে ছলনা। এ কি শুনি অপরূপ, ওহে চতুরের ভূপ, পেয়েছ নবীনা নারী মোরে নাকি চাহ না! সে যা হৌক বল দেখি, উন্মাদ হয়েছ হে কি, হেন মতি কি কারণ ভুলিতে কি পার না? এত সেবাদাসী রয়, তবু তাহে নাহি হয়, কেন পরনারী তরে কর এত বাসনা? কেন পিতা মাতা মনে, পীড়া দাও প্রিয়জনে, কেন এত সতী নারী মনে দেও বেদনা? কেন দাও এত তাপ, কেন কর এত পাপ, নারীবধ কত পাপ মনে কি তা জান না? হেমলতা নামে যারে, রাখিয়াছ কারাগারে, বিষপানে মরে সেই মনেতে কি ভাব না। একে অতি সতী নারী, তাহে গর্ভভরে ভারী, তবু সে রমণী তরে কিছু দয়া হয় না॥ যা পেয়েছ রাখ তাই, অতি লোভে কাজ নাই, দিল্লীরাজপাটে বসে কুমন্ত্রণা ভেব না। আমার বচন ধর, তাহারে মোচন কর, অতিশয় কোন কর্ম্ম কোন কালে ভাল না॥” সুপ্ত ব্যাঘ্র যেন আমিষের গন্ধ পেলে। কালসর্প শিরে যেন পদাঘাত মেলে॥ পতঙ্গ যেমন শোভা করি দরশন। ভোলা কথা মনে হলে উন্মাদ যেমন॥ শুনিয়া পাঠানরাজ চমকি তেমতি। আকুল নয়নে চায় কামাতুর মতি॥ বলে কোথা আন তারে দেখিবারে চাই। পেয়েছি নবীনা নারী ছাড়ি দিব নাই॥ মরুক বাঁচুক আর যা ইচ্ছা করুক। পেয়েছি সুধার ভাণ্ড নিবারিব ভুক॥ জানে না সুলতান আমি বিজয়ী জগতে। তিলার্দ্ধ রাখি নে স্থান এই ভূভারতে॥ আমি তারে কত করে আপনি সাধিনু। অবশেষে হাতে ধরা স্বীকার করিনু॥ মম বাক্যে অবহেলা করে সেই জন। দেখিব কেমনে তারে রাখে কোন্ জন॥ অনেক সাধিয়া শেষে সান্ত্বনা করিল। তথাপি আসক্তি-কোপ ঘুচাতে নারিল॥ বিস্তর কাঁদিয়া, করি বিস্তর সাধনা। অবশেষে এই মাত্র পূরিল কামনা॥ যে অবধি হেমলতা প্রসব না হবে। সে অবধি দাসীভাবে পুষ্পোদ্যানে রবে॥ এ দিকেতে বীরবর, মহা অরণ্য ভিতর, চেতনা পাইয়া চক্ষু চান। অতি ভীম দরশন, বিজন গহন বন, চারি দিকে দেখিবারে পান॥ শোণিতে লেপিত বাস, নয়নের জ্যোতিঃ হ্রাস, শরাঘাতে দেহ অবসাদ। হৃদয়ে বাণের ফলা, ভাঙিয়া পড়েছে শলা, তবু বীর ভাবে না বিষাদ॥ নাহিক ত্রাসের লেশ, ধরিয়া শরের শেষ, টান দিয়া তুলিয়া ফেলিল। কোথায় বিপক্ষ দল, কোথা আপনার বল, কেন তথা ভাবিতে লাগিল॥ হেন কালে দেখে চেয়ে, নিজ অশ্ব আসে ধেয়ে, সংগ্রামের সাজ পরিধান। শরীরে শোণিত ঘর্ম্ম, হেরিয়া বুঝিলা মর্ম্ম, এই মোরে কৈল পরিত্রাণ॥ রণভূমি পরিহরি, আমারে পৃষ্ঠেতে করি, অশ্ববর আসিয়াছে বনে। এই কথা বীরবর, স্থির করি তার পর, ভাবিতে লাগিলা মনে মনে॥ কোন পক্ষে হইল জয়, কোন পক্ষে পরাজয়, সমাচার কিছুই না পাই। বলি অশ্বে করি ভর, চলিলেন বীরবর, দেখেন সংগ্রামে কেহ নাই॥ তখন কাতর মন, যেন দ্রুত সমীরণ, চলিলেন ধাইয়া নগরে। দেখে যত গৃহদ্বার, হইয়াছে ছারখার, অগ্নিকুণ্ড জ্বলে ধূ ধূ স্বরে॥ অসহ্য শোকের ভার, সহিতে না পারি আর, বীরবর কহিল কুপিয়া। ভাল আশা করিলাম, ভাল দেখা পাইলাম, বড় সাধ মিটিল আসিয়া॥ করিয়া বিপক্ষ নাশ, আসিব প্রেয়সী পাশ, পূরাব পিতার মনস্কাম। ঘুচিল সে অভিলাষ, লাভে হৈল বনবাস, লাভে হতে ভার্য্যা হারালাম॥ এই কি ঘটিল শেষে, প্রবেশিয়া এই দেশে, মম পত্নী যবনে হরিল। করীতে হেলায়ে শুণ্ড, উপাড়িয়া তরুকাণ্ড, দশনেতে লতিকা ধরিল॥ অরে নিদারুণ চোর! সে জন কি করে তোর, সে যে নারী অবলা ললনা। সে যে অতি নিরমল, কোমল কমলদল, তারে কেন দিলি রে বেদনা॥ দিল্লী জয় করে তোর, এত কি বাড়িল জোর, মোর প্রিয়া করিলি হরণ। তবে ক্ষত্রিসুত হই, সত্য সত্য সত্য ক‍ই, এবে তোর নিকট মরণ॥ অস্থি মাংস যত দিন, দেহে রবে তত দিন, তোর মন্দ করিব সাধন। প্রমদার বিমোচন, যবনকুল নিধন, অদ্যাবধি এই মম পণ॥ কিবা জলে কিবা স্থলে, কিবা বলে কি কৌশলে, দুই ব্রত সংকল্প আমার। আজি কিম্বা পরদিন, কিম্বা অন্য কোন দিন, পরিচয় পাবি রে তাহার॥ স্বদেশ করিলি জয়, তাহে আর থাকা নয়, তাতে প্রিয়া বদ্ধ তোর ঘরে। এই দেখ অদ্যাবধি, ভ্রমিব গিয়া জলধি, দেশত্যাগী হব তোর তরে॥ অল্পদিনে পাবি টের, কোন কর্ম্মে কিবা ফের, জানিবি রে পুরুষ কেমন। থাক্ নিয়ে ধরাতল, আছে রে বারিধি জল, তাহে তরি করিব চালন॥ লক্ষ তরি ভাসাইব, ম্লেচ্ছদেশ মজাইব, বাণিজ্য করিব ছারখার। তোর সিংহাসন পাত, ম্লেচ্ছকুল ভস্মসাৎ‍, প্রেয়সীরে করিব উদ্ধার॥ খেদ করি বীরবর উঠিলা তরণী। কলিঙ্গরাজের রাজ্যে চলিলা তখনি॥ শ্বশুরের সৈন্য লয়ে পুন যাব রণে। কলিঙ্গ উদ্দেশে চলিলেন এই মনে॥ গঙ্গানীরে তরিখানি ভাসিয়া ভাসিয়া। গঙ্গাসাগরের জলে পড়িল আসিয়া॥ মোচাখোলাখানি যেন ভাসে সেই তরি। তাহে চাপি বীরবাহু নত শির করি॥ চূর্ণফণা ফণী যেন ভগ্নচূড়া শিলা। অধোশির হয়ে বীর তেমতি রহিলা॥ কত ক্ষণ লুকাইয়া হৃদয়ের ভার। প্রকাশি কাতরে শেষে কহেন কুমার॥ এই কি কপালে ছিল জগন্মান্যা ভূমি। আমি হৈনু দেশত্যাগী বন্দী রৈলে তুমি॥ রত্নগর্ভা ভূমি তুমি জগতের সার। কত নদ হ্রদ গিরি তব অলঙ্কার॥ উচ্চ হিমগিরিচূড়া হিমানী-মণ্ডিত। গর্ব্ব করি স্থির বায়ু করিছে খণ্ডিত॥ অরুণের রথরোধকারী বিন্ধ্যগিরি। অগস্ত্য ঋষিরে শিরে নোয়াইছে ধীরি॥ গোমুখীবাহিনী গঙ্গা যমুনাতে মেলি। দিবা রাতি কলনাদে করিতেছে কেলি॥ নর অংশে জন্ম সেই রাম নারায়ণ। তোমারে জননীভাবে করিলা পালন॥ তোমার সেবায় পঞ্চ পাণ্ডু ছিল রত। পূজিল তোমায় রাজা বিক্রম আদিত॥ অমর বাল্মীকি ঋষি সুমধুর স্বরে। রাখিয়াছে তব যশ ত্রিভুবন ভরে॥ বেদব্যাস মহাঋষি ভারত রচিয়া। প্রচারিলা তব নাম জগৎ জুড়িয়া॥ সরস্বতীবরপুত্র কবি কালিদাস। তব যশ রঘুবংশে করিলা প্রকাশ॥ ভবভূতি তব নাম অনাশ্য অক্ষরে। গাঁথিয়া থুইয়া গেছে মানব-অন্তরে॥ এবে সেই দেশমান্যা ভারত-বক্ষেতে। ম্লেচ্ছকুল পদ দলে নিরখি চক্ষেতে॥ ঘুচিল মনের সাধ জনম মতন। ভাঙিল নিদ্রার ঘোর ভাঙিল স্বপন॥ যবনে করিয়া ছন্ন তোমার মোচন। কত দিন মনে মনে করিলাম পণ॥ পুনশ্চ হিন্দুর রাজ্য স্থাপন করিব। পুনর্ব্বার অলঙ্কারে তোমারে তুষিব॥ পুনঃ নির্ম্মাইব পুরী যত হৈল গত। গঙ্গা যমুনার তীরে ছিল যত যত॥ বিজয়দুন্দুভি পুনঃ হরিষে বাজাব। ভারত জাগিল বলি ভূতলে জানাব॥ হায়! আশা ফুরাইল জনম মতন। অদৃষ্টে আছিল শেষে জলধি-ভ্রমণ॥ মনোহর নব-দূর্ব্বা-কোমল আসনে। বসি আর না দেখিব শোভিত গগনে॥ তরলতরঙ্গা কল-নাদিনীর তীরে। আর না যূড়াব চক্ষু ভ্রমিব না ফিরে॥ নবীন পল্লবছায়া তলেতে বসিয়া। আর না শুনিব গান হরিষে ভাসিয়া॥ বিদায় জনমভূমি জনম মতন। বিদায় ভারতবাসী স্বজাতীয়গণ॥ বিদায় জননী তাত পুরবাসী জন। বিদায় জনম শোধ প্রাণের রতন॥ জীবিত আছ কি প্রিয়ে ভাব কি আমারে। কোন্ ভাবে কার কাছে রেখেছে তোমারে॥ ধিক্ ক্ষত্রিকুলে ধিক্; ধিক্ মম নাম। পতি হয়ে নারীরক্ষা কার্য্য নারিলাম॥ একে শত্রু তাহে ম্লেচ্ছ তাহে প্রাণপ্রিয়া। কেমনে ধরিব কায়া জানিয়া শুনিয়া॥ হে বরুণ, কেন মোরে পাতালে না লহ। জীবিত রাখিয়া কেন দহন করহ॥ কোথায় লুকালে বজ্র অহে সুরপতি। নরাধমশিরে হানি বিনাশ দুর্গতি॥ দ্রব হ রে মাংসপিণ্ড, চূর্ণ হ রে হাড়। অথবা সর্ব্বাঙ্গ দেহ হয়ে যা পাহাড়॥ বলিতে বলিতে বীর ঢলিয়া পড়িল। যেন বজ্রাঘাতে দীর্ঘ তরু উপাড়িল॥ একাকী জলধিজলে তরিতে শুইয়া। তরঙ্গবেগেতে তরি চলিল ভাসিয়া॥ সমস্ত রজনী জলে ভাসিয়া ভাসিয়া। অরুণ-উদয়ে কূলে লাগিল আসিয়া॥ কূলে উঠি বীরবর পান সমাচার। সেই ত কলিঙ্গদেশ কলিঙ্গরাজার॥ সমাচার পেয়ে তবে চলিলেন বীর। যেন রাহুগত ভানু ক্রোধেতে অধীর॥ গিয়া শ্বশুরের পদে করি নমস্কার। নিবেদিলা পূর্ব্বাপর যত সমাচার॥ শুনি ক্রোধে কম্পমান কলিঙ্গভূপাল। জ্বলিয়া উঠিলা যেন কালান্তের কাল॥ তখনি অমাত্যগণে একত্র করিয়া। সমরে সাজহ বলি কহেন রুষিয়া॥ সংগ্রামে সাজিল সেনা দেখিতে বিকট। সাজিল বারণ বাজী সংগ্রাম-শকট॥ হেরিয়া প্রফুল্ল মনে ভূপতিনন্দন। শ্বশুরের পদযুগ করিয়া বন্দন॥ কহেন আমারে পান দেহ মহীপতি। বিনাশিব রিপুদল ঘুচাব অখ্যাতি॥ সসৈন্যে ঘেরিব দিল্লীরাজে দিল্লীপুরে। মম বলে রিপুদর্প পলাইবে দূরে॥ নিরুদ্বেগে মহারাজ থাকুন আলয়ে। করুন আশীষ রিপু যাবে যমালয়ে॥ এত বলি বীরবাহু বন্দিয়া রাজায়। শিবিরে আসিয়া পরে বার দিল রায়॥ রাজপুত্রে নেহারিয়া আনন্দিত মনে। মহাকোলাহলে হুঙ্কারিল সৈন্যগণে॥ ভূপতি দিলেন পান, বীরবাহু রণে যান, কলিঙ্গরাজার সৈন্য চতুরঙ্গে চলিল। গিয়া সাগরের তীর, একত্রেতে যত বীর, সহস্র তরণীপৃষ্ঠে সকলেতে উঠিল॥ কিবা শোভা দিল তায়, যেন জলে ভাসি যায়, সুশোভিত একখানি দারুময় নগরী। মহা ব্যাকুলিত মন, সচঞ্চল দু’নয়ন, উঠিলেন বীরবর শ্রেষ্ঠ তরি উপরি॥ গঙ্গাসাগরের দিকে চলিল উত্তর মুখে, উৎকল প্রভৃতি দেশ বাম ভাগে রহিল। এইরূপে দিনকত নিরুৎপাতে হয় গত, একদিন অকস্মাৎ বিঘ্নপাত হইল॥ বায়ুকোণে দিল দেখা, কালিম জলদরেখা, ঢাকিল রবির কর নভোদেশ ব্যাপিল। গর্জ্জিল জলদজাল, যেন প্রলয়ের কাল, সহস্র কেশরীনাদে জলদল নাদিল॥ মাতিল তরঙ্গকুল, হুল হুল কুল কুল, ডাক ছাড়ি লম্ফ দিয়া শূন্যমার্গে উঠিল। প্রলয় পবন হাঁকে, স্তব্ধ বসুমতী কাঁপে, তরুলতা গুল্ম লয়ে দিগন্তরে ছুটিল॥ বজ্রের চিচ্চিড় ধ্বনি, বাতাসের হন্‌হনি, সমুদ্র-মেঘের নাদে ত্রিভুবন চমকে। প্লাবন করিতে সৃষ্টি, উল্কাপাত শিলাবৃষ্টি, অবিচ্ছেদে মুষলের ধারা বর্ষে ঝমকে॥ দশ দিক্ অন্ধকার শূন্য জল একাকার, হই হই রব মাত্র শুনা যায় শ্রবণে। চমকে চিকুররেখা, তাহে মাঝে যায় দেখা, জলধিতরঙ্গরঙ্গ চমকিত নয়নে॥ পর্ব্বত করিয়া তুচ্ছ, উথলে হিল্লোল উচ্চ, হুলুস্থুলু চারি কূল ব্রহ্মডিম্ব ফুটিছে। দনুজ সহস্র জন, করি ভীম গরজন, আকাশমণ্ডল যেন হাতে হাতে লুফিছে॥ অথবা অনন্ত যেন, প্রসারি সহস্র ফণ, তারা সূর্য্য গ্রহগণে ধরি ধরি গিলিছে। কিম্বা যেন দেব দৈত্য, অমৃত লভিতে মত্ত, পুনর্ব্বার বরুণের রাজ্য ছার করিছে॥ দেবকীর্ত্তি ভয়ঙ্কর, পৃথিবী সহে না ভর, কি করিবে তার মাঝে মানুষের সামর্থ্য। যত তরি দল বল, সব গেল রসাতল, দৈব বল বাদী হয়ে পাড়ে ঘোর অনর্থ॥ ভাগ্যবলে বীরবর, তরিকাষ্ঠে করি ভর, ক্ষিপ্ত বরুণের করে পরিত্রাণ পাইল। কোমরে বন্ধন অসি, পৃষ্ঠে ধনুর্ব্বাণ-রাশি, অকূল বারিধিজলে ভাসি ভাসি চলিল॥ অকূল অগাধ জল, তিলেক নাহিক স্থল, তাহে পুনঃ বহুবিধ জলচর খেলিছে। দেখি ভাবি নিরুপায়, কি করে কোথায় যায়, বীরবাহু মনে মনে অই কথা তুলিছে। হেন কালে দেখে দূরে, বেলা ধূধূ ধুধু করে, হেরিয়া কুণ্ঠিতমনে সেই মুখে চলিল। তরঙ্গে তরঙ্গে ভাসি, ক্রমশ নিকটে আসি, চক্ষু মেলি মনোহর দ্বীপ এক হেরিল॥ নন্দন কানন সম, উপবন মনোরম, তাহে শোভা করে হেরি তীরে গিয়া উঠিল। যেন অমরের পতি, হারায়ে অমরাবতী, ঘৃণা লজ্জা ভরে অধঃমুখে বনে চলিল॥ লতা পুষ্প ফল শোভা, যাহে মুনি-মনোলোভা, না পারে সে বনশোভা শোকানল নাশিতে। শিশু যদি শোক পায়, ভুলালে সে শোক যায়, জ্ঞানিচিত্তশোকানল নাহি ঘুচে বাঁচিতে॥ যেই জন শিশুকালে, মা বলে জননীকোলে, ছুটোছুটি করে আসি স্তন্য পান করেছে। যেই জন নিশাভাগে, নারী সনে অনুরাগে নিরমল পূর্ণমাসী শশধরে হেরেছে॥ পীড়াতুর শয্যাগত, প্রাণবায়ু ওষ্ঠাগত, হয়ে যেবা প্রিয়জন-প্রিয়ভাষা শুনেছে। গৃহবাসে কিবা সুখ, প্রবাসেতে কি অসুখ, বনবাসে কি যাতনা সেই জন বুঝেছে॥ সেই যন্ত্রণার ভার, বহে বীর অনিবার, তাহে অতি ব্যাকুলিত হারা পত্নী ভাবিয়ে। বীর্য্যবিন্দু আছে যার, সেই জন বুঝে সার, আছে বা না আছে শোক অই শোক জিনিয়ে॥ তাহে মহাবীর্য্যবান, ক্ষত্রিকুলে অধিষ্ঠান, তাহে রাজবংশধর বয়োগর্ব্বে গর্ব্বিত। তাহে রণে পরাজিত, প্রণয়িনী অপহৃত, এমন সন্তাপ কিসে হবে বল স্থগিত॥ হীনবীর্য্য হলে পরে, বুঝি বা সে শোকভরে, উন্মাদ হইত কিম্বা আত্মহত্যা সাধিত। মহাতেজধারী বীর, তাই আছিলেন স্থির, শালতরু রহে যেন হয়ে বজ্রদণ্ডিত॥ গম্ভীর প্রকৃতি যার, বাহ্যে স্বল্প শোক তার, কিন্তু হৃদে নিরবধি চিন্তা-ফণী দংশিছে। মেঘের সৃজন যেন, নহে চক্ষে দরশন, কিন্তু বাষ্প নিরবধি শূন্য ভেদি উঠিছে॥ বীরবাহু-শোকভার, বাহিরিতে নারি আর, অন্তঃশীলা ভাবে শেষে উথলিতে লাগিল। নয়নের জ্যোতিঃ হারা, ধরিয়ে উদাসী ধারা, জনশূন্য কাননেতে ধীরে ধীরে চলিল॥ যে পথ দেখিতে পায়, সেই পথে চলে যায়, সুপথ কুপথ কিছু নাহি করে গণনা। শীতল তরুর তলে, শীতল তড়াগজলে, কভু বসে, কভু ভাসে, সমভাবে রয় না॥ নাহি সংখ্যা কত বার, ভ্রমিল নৃপকুমার, দ্বীপখণ্ড চতুর্ভাগ সমুদায় ঘেরিয়া। সে কি তাঁর বাসস্থান, যাঁর দর্পে কম্পমান, ছিল মহা মহা বীর ভূভারত ব্যাপিয়া॥ অই ভাবে পর্য্যটন, ইতস্ততঃ কত ক্ষণ, করি বীর তরুতলে অধোমুখে বসিল। হেন কালে দিবাকর, লুকায়ে প্রখর কর, দূরেতে সাগরগর্ভে ধীরে ধীরে পশিল॥ কদিনের কষ্টভোগে আচ্ছন্ন শরীর। ভাবিতে ভাবিতে ঢুলে পড়িলেন বীর॥ হেন কালে অকস্মাৎ সংগীতের ধ্বনি। শুনা গেল বামাসুরে, মধুর গাঁথনি॥ একেবারে চারি দিক্ পূরিয়া উঠিল। নিদ্রা ভাঙ্গি রাজপুত্ত্র শ্রবণে মোহিল॥ আড়ষ্ট হইয়া রায় কায়মনচিতে। মোহিনী সংগীত সুর লাগিলা শুনিতে॥ দেবী উপদেবী কিবা অপ্সরী কিন্নরী। কে গাহিল অই মধু সংগীতলহরী॥ কিছুই বুঝিতে নারি ব্যাকুল অন্তর। কি শুনিল রাজপুত্র ভাবিয়া কাতর॥ অনতিবিলম্বে হেরে নারী ছয় জনা। ধবল বসন পরা কনকবরণা॥ করে বীণা সুমধুর হৃদে মতিমালা। তার পাশে দুই বেণী করিছে উজলা॥ গণ্ড গ্রীবা নেত্রশোভা শ্রুতি দন্তপাঁতি। ওষ্ঠাধর পয়োধর নাসাননভাতি॥ মনোলোভা শোভা কিবা বাহু কটিদেশ। মৃদু গতি সুবলনি তরুণ বয়েস॥ আরক্ত অরুণ পদ শ্যাম ধরাতলে। যেন ভাসে কোকনদ নীল হ্রদজলে॥ চপল নয়নে চেয়ে দেখেন রাজন। মানবী বেশেতে এরা এল কোন জন॥ ও দিকে মানবরূপ হেরিয়া সে বনে। রমণী কজনে দেখে চকিত নয়নে॥ এ চাহে উহার মুখ না সরে ভারতী। দাঁড়াইয়া রহে যেন পাষাণ মূরতি॥ নৃপতিতনয় তবে বিনয় বচনে। কহিলেন মৃদুভাষে প্রিয় আলাপনে॥ কেবা বট দেখা দিলে এমন সময়। কিবা জাতি কিবা নাম কোথা বা আলয়॥ মানব-সন্তান আমি বিধাতা বিমুখ। বিপাকে পড়িয়া তাই পাই বহু দুখ॥ মায়াবিনী-বেশে কেবা দিলে দরশন। ঘুচাহ মনের ধাঁধা কহিয়া বচন॥ বলিতে বলিতে কথা শশী দেখা দিল। বীণা বাজাইয়া বামা সবে লুকাইল॥ অপূর্ব্ব রমণীকার্য্য দেখিয়া শুনিয়া। যামিনী পোহান ভূপ ভাবিয়া ভাবিয়া॥ ঘুচিল নিশির ঘোর অরুণ উঠিল। তীরে আসি পূর্ব্বমুখে চাহিয়া রহিল॥ দেখিতে ঊষার খেলা, নৃপসুত ভোর বেলা, ভ্রমিতে লাগিলা বনে বনে। পশু পক্ষী আদি মেলি, সকলেতে করে কেলি, দেখি হরষিত হন মনে॥ পরিমল-ভরে ভারী, সে ভার সহিতে নারি, পুষ্পদল পত্র পরে হেলি। অধরে ঈষৎ হাস, খুলিয়ে বুকের বাস, সমীরণ সহ করে কেলি॥ পাখীতে ধরিছে তান, শুনি উথলিছে প্রাণ, পবন মাতিয়া ফেরে ঘুরে। হেন কালে রাজসুত, মহা কুতূহলযুত, নারীগণে দেখিলেন দূরে॥ ধীরেতে নিকটে গিয়ে, তরুপাশে দাঁড়াইয়ে, কৌতুকে দেখেন মহামতি। শেফালি বকুলকুল, আদি নানাজাতি ফুল, শোভে উভে কদম্ব সংহতি॥ তৃণ শৈবালের দল, ঢাকিয়াছে ধরাতল, লতিকা বেষ্টিত চারি পাশ। কণ্ঠায় ফুলের মালা, বাহুতে ফুলের বালা, হৃদি’পরে ফুলময় বাস॥ সকলি ফুলের সৃষ্টি, সদা হয় ফুলবৃষ্টি, চারি দিক্ ফুলে ঢাকা রয়। কদম্ব তরুর মূলে, সাজায়ে কমল ফুলে, ফুলবেদী ’পরে বসি রয়॥ অঞ্জলি অঞ্জলি করি, ফুল রাখে শিরোপরি, কভু হৃদে করয়ে স্থাপন। নয়নেতে অশ্রু ঝরে, স্নেহেতে আদর করে, কত ভাবে করিছে যতন॥ ছয় জনে মুখে মুখে, বসি রহে মনোদুখে, সদা হয় পুষ্প বরিষণ। মিলায়ে বীণার তান, খেদসুরে করে গান, শুনিয়া দ্বিভেদ হয় মন॥ নারী-কীর্ত্তি মনোহর, নিরখিয়া বীরবর, নিকটে গেলেন যুবরায়। করপুটে বেদীপাশে, দাঁড়ায়ে বিনীত ভাষে, মৃদুস্বরে চান পরিচয়॥ নিরখিয়া চমকিয়া, গানেতে বিশ্রাম দিয়া, নারীগণে উঠে যেতে চায়। অনেক মিনতি করি, বুঝায়ে অনেক করি, নারীগণে বসাইলা রায়॥ অনুরোধ-ডোরে বাঁধা, দ্বিমনা লাগিল ধাঁধা, রমণীমণ্ডলী পড়ে গোলে। কিছু পরে কোন জন, শুন তবে দিয়া মন, বলে আরম্ভিলা মধু বোলে॥ “বরুণতনয়া, পাতালে ধাম। ভগিনী কজনা, শুনহ নাম॥ ‘মুকুতাবিলাসী,’ ‘রতনকান্তি’। ‘তরঙ্গবাহিনী,’ ‘নয়নভ্রান্তি’॥ ‘প্রবালমালিনী,’ কজনা এই। ‘নলিনীনয়না,’ ভনিছে যেই॥ সাগরে সাগরে ভ্রমণ করি। মাণিক মুকুতা দেখিলে ধরি॥ এই উপবনে আসিয়া বসি। শ্রম নাশি পুনঃ সাগরে পশি॥ আগে ছিনু সবে শত সোদরা। গিয়াছে সকলি আছি আমরা॥ শাপেতে পড়িয়া গিয়াছে তারা। আঁখিতারা মোরা হয়েছি হারা॥ হলো বহু দিন প্রভাত কালে। সকলে পশিনু জলধিজলে॥ সারা দিন জলে ধরিনু মণি। ভানু অস্ত যান আসে রজনী॥ দেখিয়া তপন-মূরতি-শোভা। আমরা কজনে হইনু লোভা॥ ধরিব বলিয়া ধাইনু পাছে। যত দূরে যাই না পাই কাছে॥ ক্রমশ নামিছে দেখিতে পাই। না পারি ধরিতে কতই যাই॥ পড়ে অই ফেরে পোহায় রাতি। পাতালপুরেতে না জ্বলে বাতি॥ আমাদেরি কাছে আছিল মণি। আঁধারে সকলে যাপে রজনী॥ পরদিন প্রাতে সরোষ-মন। পিতৃশাপে সবে হলো নিধন॥ ক্রোধেতে কহেন, আমারে হেলা। আর না সলিলে করিবি খেলা॥ যে রবির তরে ভুলিলি বাপে। নিয়ত দহিবি তাহারি তাপে॥ পুষ্পবেশে রবি ধরণী’পরে। নিয়ত পুড়িবি প্রখর করে॥ কত যে সাধিনু ধরিয়া পায়। করুণা উদয় না হলো তায়॥ কুমারী আছিনু মোরা কজন। তাই সে জীবনে আছি এখন॥ তাই উষাকালে আসি এখানে। ফুলকেলি সবে করি যতনে॥ দ্বিতীয় প্রহর সময়ে তাই। তরুমূলে আসি জলে ভিজাই॥ তাই সে প্রদোষে পশিয়া বনে। হৃদে থুয়ে ফুল কাঁদি কজনে॥ প্রহর বাড়িছে আসি এখন।” বলি লুকাইল নারী কজন॥ নৃপতি-নন্দন, ব্যাকুলিতমন, চলিল সমুদ্রতটে। অতি কুলক্ষণ, ভীম দরশন, অপূর্ব্ব ঘটনা ঘটে॥ নারী ছয় জন, করিয়া বেষ্টন, করে গরজন ফণী। জিহ্বা লক্ লক্, শিরে ধ্বক্ ধ্বক্, জ্বলিছে রতন-মণি॥ কুণ্ডল করিয়া, পুচ্ছ প্রসারিয়া, দুই দিকে দুই নাগে। সতেজে দাঁড়ায়ে, ফণা প্রসারিয়ে, দুলিছে ফুলিছে রাগে॥ চপলা যেমন, খেলিছে তেমন, সুতীক্ষ্ণ রসনা-পাতা। বহে ঘন ঘন, নাসিকা-পবন, ডাকিছে যেমন জাঁতা॥ বিষময় বায়ু, শোষিতেছে আয়ু, পতিতা ফণার তলে। নারী কয় জনা, মুদিতনয়না, ভাসিছে জলধিজলে॥ ক্ষণেক অতীত, যদ্যপি হইত, একেবারে যেতো প্রাণ। নৃপতি-নন্দন, লয়ে শরাসন, গুণেতে আঁটিল বাণ॥ দিয়া ডানি আঁখি, নিরখি নিরখি, সতেজে নিক্ষেপে তীর। তিলার্দ্ধ ভিতরে, ফণা ভেদ করে, অহিযুগে মারে বীর॥ ত্যজিয়া তখন, অসি শরাসন, ঝাঁপ দিয়া পড়ে নীরে। অহি-দেহ ধরি, আনে করে করি, টানিয়া তুলিল তীরে॥ পরে অসিখান, লয়ে খান খান, করিয়া কুণ্ডল কাটে। অচেতন তনু, নৃপ-অঙ্গজনু, খুলে নিল পাটে পাটে॥ খুলে ধীরি ধীরি, রাখে সারি সারি, কখানি রজত-দেহ। দেখে সেই কায়া, প্রাণে ধরে মায়া, না কান্দি না রহে কেহ॥ আঁখি ছল্ ছল্, তুলে আনি জল, ঢালে শিরে বীরবর। সলিলে সিঞ্চিত, পুষ্প সুবাসিত, রাখিল চেতনাকর॥ ঘোর হলাহল, ঘেরে কণ্ঠস্থল, রহিল সে দিনভোর। ঘুচিল জ্বলন, জাগিল চেতন, হইল যখন ভোর॥ চেতন পাইয়া, উঠিয়া বসিয়া, নারী কয় জনে কয়। তুমি মহাশয়, অতি দয়াময়, মনুষ্য বুঝি বা নয়॥ না হলে কেমনে, সঁপিলে জীবনে, স্বদেহ অকুতোভয়ে। করুণা করিলে, প্রাণদান দিলে, বিনা স্বার্থপর হয়ে॥ অহে নরবর, বল অতঃপর, কেমনে তুষিব মন। কিবা উপকার, করিব তোমার, দিব কিবা ধন জন॥ শুনি বীরবাহু কন, দিবে কিবা ধন জন, জগতের সুখ-নীরে সন্তরণ করেছি। পিয়েছি সম্পদ্-রস, শিরেতে ধরেছি যশ, স্নেহরসে স্নান করি সুখে কাল হরেছি॥ মিটেছে সম্ভোগ সাধ, অপযশ অপবাদ, দৈব বিড়ম্বনা-পাশে এবে বাঁধা পড়েছি। থেকে বীর্য্য বাহুবল, ভাগ্যদোষে অসম্বল, হয়ে শৈলশৃঙ্গ-চাপা সিংহ মত রয়েছি॥ প্রতি-উপকারে মন, যদি কৈলে রামাগণ, দ্বিধাচ্ছেদ করি তবে চিন্তাভার নাশহ। কোন্ দিকে কোন্ পুর, কান্যকুব্জ কত দূর, কদিনের পথ হবে সবিশেষ বলহ॥ যদি জান বল আর, হেমলতা নাম তার, সেই নারী কোন্ ভাবে কার কাছে রয়েছে। কি করে সে রাত্রি দিবা, প্রাণে বাঁচি আছে কিবা, শোক-চিতানলে পুড়ে তনুত্যাগ করেছে॥ সে নারী আমার প্রিয়া, তারে হরে লয়ে গিয়া, নষ্ট ভাবে দুষ্ট রিপু সংগোপনে রেখেছে। যদি তারে কোন জন, করে থাক দরশন, বল তবে প্রেয়সীর কিবা দশা হয়েছে॥ অশ্রুপাতে দুই আঁখি, গেছে কিম্বা আছে বাকি, কিম্বা প্রিয়া একেবারে অভাগারে ভুলেছে। অস্থি মাংস ঠাঁই ঠাঁই, এখনো কি হয় নাই, এখনো কি ম্লেচ্ছবংশ ধরা মাঝে রয়েছে॥ দুরন্ত দস্যুর কাজ, করিয়ে পাঠানরাজ, এখনো কি যমহস্তে পরিত্রাণ পেয়েছে। মা গো ও মা জন্মভূমি আরো কত কাল তুমি, এ বয়সে পরাধীনা হয়ে কাল যাপিবে। পাষণ্ড যবন দল, বল আর কত কাল, নিদয় নিষ্ঠুর মনে নিপীড়ন করিবে॥ কতই ঘুমাবে মা গো, জাগো গো মা জাগো জাগো, কেঁদে সারা হয় দেখ কন্যা পুত্ত্র সকলে। ধূলায় ধূসর কায়, ভূমে গড়াগড়ি যায়, একবার কোলে কর ডাকি গো মা মা বলে॥ কাহার জননী হয়ে, কারে আছ কোলে লয়ে, স্বীয় সুতে ঠেলে ফেলে কার সুতে পালিছ। কারে দুগ্ধ কর দান, ও নহে তব সন্তান, দুগ্ধ দিয়ে গৃহমাঝে কালসর্প পুষিছ॥ মোরে দিলে বনবাস, প্রিয়া আছে কার পাশ, হায় কত পীড়া পাও হে সুধাংশুবদনে! কোথা বসো কোথা যাও, কিবা পর কিবা খাও, হায় পুনঃ কত দিনে জুড়াইব নয়নে॥ বিস্মিত রমণীদল দেখিয়া শুনিয়া। কিঞ্চিৎ বিলম্বে কহে সুস্থির হইয়া॥ কামিনী লাগিয়া তব কামনা পূরাব। হেমলতা অন্বেষণে পৃথিবী বেড়াব॥ বিরল তটিনী-তট, হ্রদ, সরোবর। অরণ্য, নিকুঞ্জ, মাঠ, মরু, মহীধর॥ প্রাতঃ, সন্ধ্যা, নিশা, উষা, মধ্যাহ্ন সময়। ভ্রমিব খুঁজিব তাঁরে জানিহ নিশ্চয়॥ নিরুদ্বেগে বীরবর থাক এই বনে। ত্বরায় আসিব ফিরে, ভাবিহ না মনে॥ চলিলাম বীর তব নারী-অন্বেষণে। মঙ্গল বারতা আনি জুড়াব শ্রবণে॥ হেরিব কেমন তিনি যাঁর স্বামী তুমি। বুঝি বা তেমন আর ধরে নাকো ভূমি॥ কেন ভাব যুবরাজ যুবতী লাগিয়া। কামনা পূরাব তব কামিনী আনিয়া॥ বলিয়া চলিয়া গেল কুমারীর দল। নৃপতিনন্দন গেলা যথা বনস্থল॥ একা বীরবর রহিলেন সেই বনে। পূর্ব্বকথা সমুদয় উথলিল মনে॥ মানসে গমন, নৃপতিনন্দন, হেরিল জনমস্থল। নদ, হ্রদ, গিরি, ধীরি ধীরি ধীরি, দেখা দিল দলে দল॥ যে শিখরে বনে, মৃগয়া কারণে, অনুচর সনে গেলা। যে তটিনী-কূলে, যে তরুর মূলে, বসিয়া কাটিলা বেলা॥ যে তড়াগ-জলে, বয়স্যের দলে, লয়ে করেছিলা কেলি। যত স্নেহাস্পদ, প্রিয় প্রেমাস্পদ, উঠিলা একত্রে মেলি॥ রণবীর তাত, রাণী চন্দ্রা মাত, বধূকোলে দেখা দিলা। ভগ্নী পরিজন, প্রিয় সখীগণ, স্মৃতিপথে আরোহিলা॥ প্রেম-অশ্রুধারা, তিতি নেত্র-তারা, গণ্ডদেশ বহি পড়ে। তাপিত হৃদয়, নৃপতি-তনয়, কাঁদে যত মনে পড়ে॥ পিতা নরপাল, কেন এ জঞ্জাল, আমি এ কাঙ্গাল বেশে। ভ্রমিয়া বেড়াই, যথা তথা ঠাঁই, পড়িয়া থাকি বিদেশে॥ এ কি চমৎকার, কোথা গৃহদ্বার, কোথা আমি বনবাসী। সে নিকুঞ্জবনে, প্রমোদ-কাননে, বৃথা মুঞ্জে পুষ্পরাশি॥ বৃথা গুঞ্জে অলি, পিক কলকলি, বৃথা মন্দানিল বয়। বৃথা শিখিদ্বয়, প্রদোষ সময়, বকুলতলায় রয়॥ বৃথা বারি’পরে, কুমুদ বিহরে, ইঙ্গিতে নেহারে শশী। বৃথা ধরাতল, হন সুশীতল, নীহারের রসে রসি॥ বৃথা কেতকিনী, হয়ে পাগলিনী, মাতায় বিপিনবাসী। তরু আলিঙ্গিতা, বৃথা তরুলতা, ঢলিয়া পড়য়ে হাসি॥ কোথা সে আমার, এই সব যার, পুনঃ কি সে জনে পাব। এ অমা ঘুচিবে, সে শশী উঠিবে, পুনঃ কি সে সুধা খাব॥ বলিয়া কাঁপিয়া তাপিত হৃদয়ে, শিখর উপরে উঠিল। জগত যুড়িয়া এমন সময়ে, নিবিড় আঁধারে ঢাকিল॥ ক্রমশ সরিয়া সাগর ভিতরে মলিন তপন ডুবিল। দেখিতে দেখিতে গগন মাঝেতে রজনীভূষণ ভাসিল॥ পুলকিত দেহে বীর-চূড়ামণি বিষম চিন্তায় পড়িল। ভাবিতে ভাবিতে সকলি ভুলিয়া অপূর্ব্ব স্বপন দেখিল॥ যেন ভূমণ্ডল অনল-শিখায় চলাচল সহ দহিছে। ঊনপঞ্চাশৎ পবন যেমন তাহার সহিত বহিছে॥ দশদিক্‌পাল নিজগণ সঙ্গে উর্দ্ধমুখে সবে ছুটিছে। খেচর ভূচর জলচর আদি হতাশ অন্তরে হাঁকিছে॥ রেণুময় ধরা বারি বায়ু রেণু রেণু রেণু হয়ে উড়িছে। চরাচর পুরে হাহাধ্বনি শুধু পুনঃ পুনঃ পুনঃ উঠিছে॥ সেই সর্ব্বভুক্-শিখা-প্রান্তদেশে এলায়িত কেশে দাঁড়ায়ে। নবীনা কামিনী যেন পাগলিনী রহে ভুজযুগ বাড়ায়ে॥ অশ্রুপূর্ণ আঁখি সেই পাগলিনী শিশু এক করে ধরিয়া। “ধর বংশধরে, পুত্র কোলে কর” বলি যেন দিল ফেলিয়া॥ বলি বহ্নিগর্ভে প্রবেশিল রামা বীরেন্দ্র বিপদ্ গণিল। ত্যজি দীর্ঘশ্বাস “হায় রে অদৃষ্ট” বলিয়া ঢলিয়া পড়িল॥ প্রসারিত কর পদ অধোভাগে শির। শিখর হইতে নীচে পড়ি গেলা বীর॥ অভ্রভেদী গিরিচূড়া দৃষ্টি-অগোচর। নিম্নদেশে ভীম নাদে গর্জ্জিছে সাগর॥ কেশাগ্র পশিলে সেই অগাধ জীবনে। বসুন্ধরা বীরশূন্য হতো সেই ক্ষণে॥ কিন্তু ভাগ্যবলে সেই দণ্ডে সেই স্থানে। অকস্মাৎ দেখা দিল নারী ছয় জনে॥ দেখিল সুন্দর রূপ নর একজন। পবনবেগেতে শূন্যে হতেছে পতন॥ হেরিয়া সদয় মনে কয় জনে মেলি। ক্রোড় পাতি বসিয়া রহিলা উরু ফেলি॥ নিমেষ ভিতরে সেই নারী-উরুদেশে। অচেতন দেহখানি প্রবেশিল এসে॥ নিসাড় শরীর সেই মুদিত নয়ন। বদন নেহারি চমকিত রামাগণ॥ নয়নে নয়নে বাঁধা রহে পরস্পর। গণ্ড বহি অশ্রুবারি বহে নিরন্তর॥ পশ্চাতে চিনিতে পারি করে হায় হায়! বলে মরি এ কি হেরি মরি এ কি দায়! কমল-লাঞ্ছন করে কমল তুলিয়া। নীরস কমল-আস্যে ধীরেতে সেঁচিয়া॥ কমল আসন হতে তুলি ছটি পাতা। তাহাতে সংলগ্ন কৈলা ছটি বাহুলতা॥ যেন মহার্ণবশায়ী মহাবিষ্ণু পাশে। ছয় লক্ষ্মী মৃদু মন্দ ব্যজন বিন্যাসে॥ দণ্ড দুই গত পরে জাগিল চেতন। উন্মীলিত নেত্রে বীর করে নিরীক্ষণ॥ স্বপন-দর্শনপ্রায় দেখে সারি সারি। বিমল গগনে ভাসে সুধাংশুলহরী॥ কখন ভাবেন ছয় অচলা চপলা। একত্রেতে বসি যেন করিতেছে খেলা॥ কভু ভাবে যেন বিধি বিরলে বসিয়া। নিজ মনোরমা রামা সৃজন করিয়া॥ না হইয়া তৃপ্তমন দেন বিসর্জ্জন। পুনর্ব্বার নবনারী করেন সৃজন॥ বিচিত্র ভাবিয়া শেষে উঠিয়া বসিল। দেখিয়া মোহিনীগণ প্রফুল্ল হইল॥ জ্ঞানের অঙ্কুর হেরি মিলাইয়া তান। বীণাযন্ত্র করে ধরি আরম্ভিল গান॥ এমনি মধুর স্রোত তাহাতে বহিল। শুনি বীণাপাণি দেবী অন্তরে মোহিল॥ মনোল্লাসে বাগীশ্বরী ত্যজিয়া স্বরূপ। আবির্ভূতা হইলেন ধরি বাক্যরূপ॥ কবিকণ্ঠে তাই দেবী করেন নিবাস। বাগীশ্বরী নাম তাই ভুবনে প্রকাশ॥ অমরমোহন সেই শুনি বীণাবাণী। বীরবাহু পুনর্ব্বার লভিলা পরাণী॥ সহাস বদনে, কমল আসনে, নৃপতিনন্দনে বসায়ে। মৃদু মন্দ হাসি, অধরে প্রকাশি, পিকবর ভাষ শুনায়ে॥ মধু মধু স্বরে, গলে গলে ধরে, বলে নৃপবরে ভেব না। পেয়েছি তোমার, আশার আধার, ঘুচাব এবার যাতনা॥ শুন হে স্বরূপ, হেরিলাম ভূপ, অপরূপ-রূপ কামিনী। ভাগীরথীতীরে, যামিনী গভীরে, দাঁড়ায়ে মন্দিরে মোহিনী॥ রূপে রাজরাণী, বেশে কাঙালিনী, গোময়ে দামিনী যেমনি। আকুল-লোচনা, বিশীর্ণা বিমনা, বিয়োগ-বাসনা-কারিণী॥ অতি মনোহর, শিশু-শশধর, হৃদয় উপর রাখিয়া। চপলনয়না, পলাতে বাসনা, দেখিছে ললনা চাহিয়া॥ হেরে হয় মনে, যেন বা মদনে, হৃদয়ে যতনে ধরিয়া। যমে দিতে ফাঁকি, নিরখি নিরখি, ধাইছে চমকি ছুটিয়া॥ বলে “ওহে নাথ, দেও হে সাক্ষাৎ‍, লহ তব সাথ আমারে। এ যাতনা-ভার, সহে না’ক আর, দিনু সমাচার তোমারে॥ ওহে সুধারাশি, করুণা প্রকাশি, মম তাপ নাশি যাও হে। আছেন যেখানে, আমার কারণে, তুমি সেইখানে ধাও হে॥ তাঁর অনুগতা, দাসী হেমলতা, হয়েছে অনাথা বলিও। বাঁধি কারাগারে, নিবান্ধব পুরে, রিপু রাখে তাঁরে কহিও॥ তব বংশধরে, হৃদয়েতে ধরে, তব নাম করে কাঁদিছে। অহে নিশাপতি, মম এ দুর্গতি, সদা দিবা রাতি জ্বলিছে॥ তাঁহারে ভাবিয়ে, আশাপথ চেয়ে, মনেরে বুঝায়ে রেখেছি। বাসনা পূরাব, তনয়ে দেখাব, পরাণ যুড়াব ভেবেছি॥ শুন হে পবন তুমি হে ভ্রমণ, কর হে ভুবন ব্যাপিয়া। যথা মম পতি, তথা কর গতি, মম এ দুর্গতি ভাবিয়া॥ শূন্যোপরে আর, বাস অন্য যার, মিনতি সবার চরণে করুণা করিয়া, সমাচার দিয়া, সঙ্গে আন গিয়া সে জনে॥” অই কথা মুখে, সদা মনোদুখে, ধীরে অধোমুখে কাঁদিছে। নীলোৎপলদল, নয়নকমল, উথলিয়া জল বহিছে॥ এই দেখ রায়, হেরিনু যাহায়, কাজ কি কথায় শুনিয়ে। অপরূপ রূপ, দেখে সেই রূপ, আনিলাম ভূপ আঁকিয়ে॥ এই কথা বলে, কুমারী সকলে, কোলে দিল ফেলে তুলিয়ে॥ নিরখি কুমার, চুম্বি বারম্বার, হৃদয় উপর ধরিল। যেন ফাঁকি দিয়ে, যমে পরাজিয়ে, কারে লুকাইয়ে রাখিল॥ দণ্ড দুই পরে, চিত্র হৃদে ধরে, কুমারীগণেরে বলিল। চল সেই স্থানে, যুড়াইব প্রাণে, দেখিব কেমনে বাঁচিল॥ অপরূপ রপছটা, প্রচারি প্রচুর ঘটা, নব রসে নৃপতিনন্দনে সুখে ভুলায়ে। পূরাইতে মনোরথে, চলিলা জলধি-পথে, অঞ্চলে বাদাম তুলি বায়ুভরে দুলায়ে॥ তড়িতের আভা সম, শোভা ধরি অনুপম, উত্তরিল তড়িতের বেগে গঙ্গাপুলিনে। সৃষ্টি সৃজিতের শোভা, নানাবিধ মনোলোভা, দেখে নব নব ভাব প্রমুদিত নয়নে॥ নূতন পুরুষ নারী, নূতন ভূষণ তারি, নূতন বসন ঘর গিরিগুহা কানন। তাহে নব দারুদাম, তাহে পুষ্প অভিরাম, তাহে ফল সুরসাল অপরূপ ঘটন॥ নব নদী নব নদ, নব দীঘি নব হ্রদ, নব পাখী ডালে বসি নব তান উগারে। গগনে নূতন তারা, নূতন নূতন ধারা, দেখে দশদিক্‌ময় নাহি পায় বিচারে॥ নব ভাবে দ্রবীভূত, হয়ে হিন্দু রাজসুত, ম্লেচ্ছ অধিকারে আসি দিল্লীপুরী লভিল। গঙ্গার উত্তর তীরে, পরশি গঙ্গার নীরে, দিল্লীশ্বর-অট্টালিকা শোভা করে দেখিল॥ সুবর্ণ রচিত কেতু, যেন সুবর্ণের সেতু, তদুপরি সারি সারি শশিকলা প্রতিমা। তার অধোভাগে যত, মণি মুক্তা মরকত, দুলিয়া ছাদের ধারে প্রকাশিছে গরিমা॥ সেই প্রাসাদের ধারে, দাঁড়াইয়া এক দ্বারে, সমুখের সুবর্ণের আবরণ খুলিয়া। কঙ্কাল বিগতপ্রাণা, দাঁড়াইয়া এক জনা, বিমর্ষ বিমনা ভাবে বাহু’পরে হেলিয়া॥ অধোদিকে দরশন, অনিমেষ দু নয়ন, নিরবধি অশ্রুবারি দর দর দরিছে। রাহুগত শশধরে, যেন বিলোকন করে, বিমুদিত ইন্দীবর জলাশয়ে ডুবিছে॥ বাম কক্ষে সুপ্রকাশ, কুমার সদৃশাভাস, সুকুমার মনোহর শিশু কোলে খেলিছে। ধরিয়া জননী-গলে, আধ বোলে মা মা বলে, মার মুখে মুখ দিয়ে করতালি তালিছে॥ হেরিয়া তনয় দারা, প্রেমেতে বহিল ধারা, পুলকিত দেহে লোম কণ্টকিত হইল। উজলে বিশাল আঁখি, উতলা পরাণ-পাখী, আলিঙ্গন-অভিলাষে বাহুযুগ খুলিল॥ আনন্দে প্রফুল্লকায়, দাঁড়াইলা যুবরায়, সাগরতনয়াগণে একে একে নমিল। এখন বিদায় চাই, স্মরি যেন দেখা পাই, এই নিবেদন ঐ শ্রীচরণে রহিল॥ তথাস্তু বলিয়া তবে, বর দিলা নারী সবে, পরে রাজতনয়েরে পদ্মাসনে বসায়ে। প্রবাল মুকুতা চুনি, গুণে গাঁথি গুণি গুণি, সবে হাতে হাতে ধরি দিল শিরে পরায়ে॥ দেবকন্যা-বর লও, পূর্ণমনস্কাম হও, অরি দমি দারা সুতে উদ্ধারিয়া আনহ। স্বরাজ্যে গমন করি, বসুন্ধরা যশে ভরি, ক্ষত্রিয়-কুলের নাম অকলঙ্ক করহ॥ পুনঃ প্রণমিলা রায়, সাগর-দুহিতা যায়, নৃপতিনন্দন-গুণ বীণা-তানে ধরিয়া। সেই সুমধুর স্বর, সমীরণে করি ভর, হেমলতা-শ্রুতিমূলে প্রবেশিল আসিয়া॥ শুনি চমকিয়া ধনী, দেখে চেয়ে নরমণি, ঊর্দ্ধমুখে নদীতটে সেই দিকে নেহারে। হেরি রোমাঞ্চিত কায়, তরুণী শিহরি তায়, পাষাণ-প্রতিমা সমা রহে বাহ্য আকারে॥ কুমার উপায় ভাবে, কিসে দারা সুতে পাবে, ক্ষণেক ভাবিয়া শেষে রাজপথে চলিল। হেথা রামা সচেতন, না হেরিয়া প্রাণধন, বিস্ময়ে বিরস ভাবে নিরাসনে বসিল॥ জীবন-সঙ্কট-স্থলে, একা বীরবাহু চলে, অনুবল নাহি অন্য জন। হৃদয়ে নাহিক ত্রাস, বীরমদে মনোল্লাস, দিল সিংহদ্বারে দরশন॥ দেবতার বেশ ধরা, দেবমাল্য শিরে পরা, দেখে ভ্রমে দাঁড়াইল দ্বারী। “পাতসাহে দরশন, করিবারে আগমন, এই ভেট ভেজ রে আমারি॥” নকীব ফুকারি ধায়, সুলতান সমীপে যায়, করপুটে সমাচার কহে। “মল্যুক আলম্‌গীর, পরিরূপা এক বীর, সিংহদ্বারে দাড়াইয়া রহে॥ রাজ-পরিচ্ছদ তাঁর, মণিমাল্য চমৎকার, কিরীট-সদৃশ শোভে শিরে। কটিতটে দুলায়িত, অসি খড়্গ সুনিশিত, পৃষ্ঠদেশে সজ্জিত তূণীরে॥ ভাবে বুঝি অনুমান, রাজকুলে অধিষ্ঠান, পড়িয়াছে কোন বা বিপাকে। আপনারে দরশন, করিবারে আগমন, নিবেদিতে কহিল আমাকে॥” শুনি পাতসাহ কন, কর তাঁরে আনয়ন, বুঝিব সে ফেরে বা কি ফেরে। সুলতান-আদেশ পায়, নকীব ফিরিয়া যায়, বীরবরে আনে সঙ্গে করে॥ মহাতেজা মহাবীর, নেহারিয়া আলম্‌গীর, বসিবারে ইঙ্গিত করিল। বুঝি অনুচরগণ, আনি স্বর্ণসিংহাসন, বীরবাহু পশ্চাতে রাখিল॥ না পরশি সে আসন, ক্রোধ করি সম্বরণ, ব্যঙ্গভাবে দর্প করি কন। শুন ম্লেচ্ছ অধিরাজ, আসনে নাহিক কাজ, এই মত করিয়াছি পণ॥ রণে জয় যত ক্ষণ, না করিব উপার্জ্জন, তত ক্ষণ আসন না লব। এই দৃঢ় ব্রত ধরি, দিগন্ত ভ্রমণ করি, জিনিয়াছি রাজপুত্র সব॥ তুমি ম্লেচ্ছ মহীপাল, ক্ষত্রিবংশ-মহাকাল, পৃথিবী পূরিয়া তব যশ। যেই বীরবাহু-ডরে, কাঁপিত অসুর নরে, তাঁরে রণে করিয়াছ বশ॥ ধরিয়াছ তাঁর নারী, তার নাকি রূপ ভারি, পরস্পর এই কথা জানি। আলম্‌গীর তব পাশে, আসিয়াছি রণ আশে, আপনারে ধন্য করে মানি॥ সেই নিরুপমা নারী, রণে জিনে লব তারি, হারি যদি নিজ নারী দিব। কক্ষযুদ্ধে মম পণ, সমতুল্য সহ রণ, অন্য জনে কভু না ভেটিব॥ যদি থাকে মান ভয়, যদ্যপি সাহস হয়, আশু রণে ভেটহ আমারে! নতুবা আনিয়া তায়, মম পদে দেহ রায়, অপযশ ঘুচিবে সংসারে॥ সে ত চুরি করা ধন, জান ত চোরা রাজন, চোরা ধন বাট্‌পাড়ে লয়। প্রকাশিব বাহুবল, পাঠাইব রসাতল, অধর্ম্মের ধন নাহি রয়॥ শুন হে যবনপতি, যদি চাহ দিব্য গতি, বীর আলিঙ্গনে তোষ মোরে। সত্য সত্য সত্য কই, যদি ক্ষত্রিসুত হই, এই খড়্গে নিপাতিব তোরে॥ যদি কাপুরুষ হও, আমার শয়ণ লও, রাজকন্যা কর পরিহার। ত্যজ রাজসিংহাসন, ত্যজ অসি শরাসন, লোকালয়ে থাকিও না আর॥ বলি কৈলা নিষ্কাশন, সূর্য্যদীপ্তি দরশন, শাণিত কৃপাণ করতলে। যেন দেব পুরন্দর, ঐরাবতে করি ভর, অশনি নিক্ষেপে ধরাতলে॥ ক্ষান্ত হৈল ভীম নাদ, শত্রুগণে পরমাদ, ভাবে কে আইল ছদ্মবেশে। সমরে দৈবের বশ বিনা রণে অপযশ, বিস্তর চিন্তিয়া কহে শেষে॥ অন্তর কম্পিত ডরে, বাহ্যে আস্ফালন করে, বলে রে বর্ব্বর শোন্ বাণী। মুহূর্ত্তে কাটিয়া মুণ্ড করিতে পারি রে খণ্ড, কেবল লোকের লাজ মানি॥ কেবা পিতা কোথা বাস, জাতি বৃত্তি অপ্রকাশ, রাখি রণ মাগিলি আসিয়া। তোরে রে করিলে নাশ, না হইবে ধর্ম্ম হ্রাস, বরং পুণ্য পাপী-বিনাশিয়া॥ কিন্তু রণে দিলে ক্ষান্ত, কুযশ হবে একান্ত, বিপক্ষ হাসিবে সর্ব্বক্ষণ। স্বজাতি-গৌরব যাবে, হিন্দুকুল শোভা পাবে, আস্পর্দ্ধা করিবে দুষ্ট জন॥ অতএব তোর সনে, ভেটিব রে কক্ষরণে, যেবা হও ছদ্মবেশধারী। সমুচিত ফল পাবি, শমনভবনে যাবি, তথা পাবি মনোমত নারী॥ বলি ভঙ্গ দিল বার, উজির আদেশে তাঁর, রাজপুত্ত্রে দিল বাসস্থান। বহু দেশ দেশান্তর, ঘুষিল এ সমাচার, জানিল সমূহ রাজস্থান॥ নানা রূপ গুণ যুত, হিন্দু ম্লেচ্ছ রাজস্থত, দিল্লীধামে আসি দেখা দিল। লোকে পূর্ণ রাজধানী, দিবানিশি বাদ্যধ্বনি, কোলাহলে নগর পূরিল॥ ক্রোশ যুড়ি রণভূমি হইল নির্ম্মাণ। চারি দিকে উচ্চ মঞ্চ বসিবার স্থান॥ স্তবকে স্তবকে রহে মঞ্চের বিধান। পৃথক্ পৃথক্ ভাগে হিন্দু মুসলমান॥ লৌহ ধাতুময় মঞ্চ সুবর্ণে মণ্ডিত। রতন ঝালর তাহে করে চমকিত॥ রক্ত চন্দ্রাতপ ছটা মস্তক উপরে। তাহে মণি মরকত ঝলমল করে॥ অমূল্য বসন দেহে শ্রবণে কুণ্ডল। হিন্দু ম্লেচ্ছ রাজগণ মণ্ডলে মণ্ডল॥ মস্তকে মুকুটশ্রেণী তারকার মালা। কটিদেশে কটিবন্দে কৃপাণ উজালা॥ ত্রিকোটি দেবতা যেন লঙ্কেশ-সভায়। স্ববাহনে সজ্জীভূত হয়ে শোভা পায়॥ রণভূমি শিরোভাগে বিচিত্র কাণ্ডার। তাহার ভিতরে রহে রমণী-ভাণ্ডার॥ দেবেন্দ্রভবনে যেন দেব-বিলাসিনী। সেইরূপ শোভা পায় যত বিনোদিনী॥ কাণ্ডারের বহির্ভাগে রণভূমিস্থলে। স্বতন্ত্র সোনার মঞ্চ ধ্বক্ ধ্বক্ জ্বলে॥ ম্লানমুখী নারী এক তাহার উপরে। করেতে কপোল রাখি ভাবিছে কাতরে॥ যেন সুধাহীন শশী খসে ভূমিতলে। যেন সীতা রাবণের রথে কাঁদি চলে॥ এই ভাবে বহুবিধ জনসমাবেশ। দুই দিকে দুন্দুভির ধ্বনি হয় শেষ॥ সাজ রে সাজ রে স্বরে বাজে ভেরি তূরী। অমনি প্রহরীদল দাঁড়াইল ভূরি॥ উত্তর দক্ষিণে শেষে প্রচণ্ড কিরণ। দুই সূর্য্য সম দোঁহে দিল দরশন॥ শিরোদেশে শিরস্ত্রাণ করে করপাল। বামে বর্ম্ম পৃষ্ঠে তূণ ভল্ল সুবিশাল॥ সিংহের গর্জ্জনে দোঁহে ছাড়ে সিংহনাদ। কেশরীী-কুঞ্জরে যেন ঘোর বিসম্বাদ॥ শুনি চমকিয়া লোকে সবিস্ময়ে চায়। ভয়ে হেমলতা-তনু শুখাইয়া যায়॥ না পড়ে চক্ষের পাতা ঘন বহে শ্বাস। কি হবে কপালে ভাবি মনে গণে ত্রাস॥ হেন কালে হুহুঙ্কারে করি আস্ফালন। সমরে মাতিল দোঁহে ভীমদরশন॥ রণতরঙ্গে, বিহরে রঙ্গে, ঘন ঘোর রব করে রে। করিছে ঝম্প, ধরণীকম্প, করাল কৃপাণ ধরে রে॥ যেন কৃতান্ত, করিতে অন্ত, শূলপাণি শূল ধরে রে। যেন চামুণ্ডা, ঘুরায়ে খাণ্ডা, রক্তবীজাসুরে মারে রে॥ কাঁপায়ে বর্ম্ম, ঠুকিছে চর্ম্ম, অসি স্বন্ স্বন্ ফেরে রে। করিয়া লক্ষ্য, অরাতি-বক্ষ, দোঁহে দোঁহাকারে ঘেরে রে॥ ভীম দাপটে, অস্ত্র সাপটে, অসি ঝন্ ঝন্ করে রে। খড়্গ ধমকে, বহ্নি চমকে, ভূমি টলমল টলে রে॥ কোপে কম্পিত, অসি উত্থিত, করি বীরবাহু ঝাঁপে রে। যবন-মুণ্ড, করিয়া খণ্ড, ভূমিতলে আনি পাড়ে রে॥ পরমানন্দে, ভূপালবৃন্দে, সাধু সাধু সাধু বলে রে। কাঁপায়ে সিন্ধু, হরিষে হিন্দু, জয়বাদ্য করি চলে রে॥ কাটিয়া যবনমুণ্ড ডাকি উচ্চৈঃস্বরে। যবন-ভূপালবৃন্দে সম্বোধন করে॥ কহিলেন বীরবাহু মহাবীরদাপে। কেশরীগর্জ্জনে যেন মহারণ্য কাঁপে॥ অরে রে নিষ্ঠুর জাতি পাপিষ্ঠ বর্ব্বর। পূরাব যবন-রক্তে শমন-খর্পর॥ সাক্ষাতে হেরিলি কার কত বাহুবল। এবে রে যবনরাজ্য গেল রসাতল॥ করতল দিল্লীপুরী করেছি রে আজি। আরো দেখাইব শীঘ্র অসি ভল্ল বাজি॥ আমি রে ক্ষত্রিয়পুত্র নহি রে যবন। পালিব ক্ষত্রিয়ধর্ম্ম রাখি নিজ পণ॥ প্রিয়ার উদ্ধার ম্লেচ্ছরাজ্য ভস্মসাৎ। অথবা সংগ্রামে দেহ করিব নিপাত॥ এই যে করেছি সত্য কভু না ছাড়িব। সদলে সম্মুখরণে পুনশ্চ সাজিব॥ যত দিন ম্লেচ্ছহীন না হইবে দেশ। তত দিন না ছাড়িব সংগ্রামের বেশ॥ না ভেটিব হেমলতা না হেরিব সুতে। ম্লেচ্ছ নাম যত দিন জাগিবে ভারতে॥ বলি রুধিরাক্ত অসি ফিরায়ে শিরেতে। হিন্দু-নরপালগণে কহেন ক্রোধেতে॥ ধিক্ ক্ষত্রিকুলে ধিক্ হিন্দুরাজগণ। একেবারে বীর্য্য বলে দিলে বিসর্জ্জন॥ জগদ্বিখ্যাত কুলে জন্মিয়া ভারতে। সমর্পিলে রাজ্য দেশ বিপক্ষ-করেতে॥ নারিলে বিধর্ম্মীগণে রণে পরাজিতে। বৃথায় মানবজন্ম লাগিলে হরিতে॥ থাকে যদি বীর্য্য বল সাজ হে সমরে। হের দুষ্ট ম্লেচ্ছদল আস্ফালন করে॥ পূর্ব্বকালে মহীতলে ক্ষত্রিয়-মণ্ডল। প্রচণ্ড প্রতাপে রিপু কৈল করতল॥ সেই চন্দ্রসূর্য্যবংশ অবতংস হয়ে। শান্তভাবে যপ কাল বৈরীদণ্ড লয়ে॥ কেন তবে কুরুক্ষেত্রে কর তীর্থ জ্ঞান। কেন তবে নিজধর্ম্মে কর অভিমান॥ কেন পর অসি চর্ম্ম বর্ম্ম শিরস্ত্রাণ। তূণ, ধনু, বীরধটি কেন পরিধান॥ যদি এ জগতে যশ চাহ চিরকাল। যদি এড়াইতে চাহ বিপক্ষ-জঞ্জাল॥ যদি চাহ অকণ্টকে ভুঞ্জিবারে রাজ। এস হে সমরে সাজি রিপুজয় সাজ॥ এস রাখি রাজ্য দেশ শাসি ধরাতল। দেখ চেয়ে রণবেশে বিপক্ষের দল॥ হত ম্লেচ্ছ মহীপাল, কুপিল যবন দল, নাশিবারে বিপক্ষেরে ক্রোধভরে চলিল। দেখি হিন্দুরাজগণ, হয়ে ক্রোধান্বিত মন, মহাক্রোধে রিপুদলে সমরেতে ভেটিল॥ জ্বলিল সমরানল, কাঁপিল ধরণীতল, একেবারে শত শূর সমরেতে মাতিল। সিংহনাদ ধনুর্ঘোষে, বাসুকি টলিল ত্রাসে, অসি ভল্ল বাণ খড়্গে নভোদেশ ঢাকিল॥ ভয়ঙ্কর-দরশন, ধায় অস্ত্র অগণন, রণভূমি ভীষণ শ্মশানসজ্জা সাজিল। কাটা মুণ্ড কাটা কর, কাটা পদ কাটা ধড়, গভীর শোণিতস্রোতে শত শত ভাসিল॥ কেহ করে হাহাকার, কেহ বলে মার মার, ভীম শব্দ কোলাহলে স্বর্গ মর্ত্ত পূরিল। হুয়া রবে ডাকে শিবা, বায়সেরা উর্দ্ধগ্রীবা, ভয়ঙ্কর রণভূমি ঘোররূপে ঘেরিল॥ রুধিরে বহিল ফেনা, মাতিল শমন-সেনা, উর্দ্ধভাগে বিকট গৃধিনী দল উড়িল। বাজিল তুমুল রণ, দুই পক্ষ বীরগণ, মরি বাঁচি পণ করি যুঝিবারে লাগিল॥ হারিল যবন দল, হিন্দুপক্ষে কোলাহল, বিজয় হুঙ্কার নাদে চরাচর পূরিল। রণে রিপু পরাজয়, করি হিন্দু রাজচয়, বীরবাহু সঙ্গে আসি আলিঙ্গন করিল॥ সর্ব্ব জনে সম্ভাষিয়ে, নিজ পরিচয় দিয়ে, অতঃপর বীরবর আদি অন্ত কহিল। তখন ভূপতিগণ, মহা আনন্দিত মন, দিল্লীরাজসিংহাসনে অভিষেক করিল॥ যথাবিধি উপহারে, সন্তোষিয়া সবাকারে, সমূহ ভূপালে ভেট নানাবিধ ভেটিল। বিদায় লইয়া রায়, মহিষী নিকটে যায়, বিরস বিধুরা রামা নিরাসনে হেরিল॥ কাঁদিয়া সে বিনোদিনী, ধরণী লুটায়ে ধনী, প্রাণেশ্বর-পদতলে কর যুড়ি নমিল। সাদরে সম্ভাষ করি, হৃদয়ে হৃদয় ধরি, পুলকিত দেহে বীর প্রমদারে তুলিল॥ কাঁদিয়া তখন, হেমলতা কন, প্রেমে গদ গদ বাণী। আজি সুপ্রভাত, অয়ি প্রাণনাথ, পুনঃ দেহে এল প্রাণী॥ অসুখ-শর্ব্বরী, তিরোহিত করি, সুখ-প্রভাকর চায়। হৃদয় ভিতরে, পরাণে কি করে, বুঝিতে নারি হে রায়॥ এ ষোড়শ মাস, ছিল অপ্রকাশ, আজি হেরি দিনমণি। অই দেখ চেয়ে, সরোবর ছেয়ে, বিকসিত কমলিনী॥ আজি অকস্মাৎ, অই শুনি নাথ, কোকিল ঝঙ্কার করে। আজি ধরাতলে, নিরখি সকলে, অপরূপ শোভা ধরে॥ গত কল্য প্রাতে, যাহার সাক্ষাতে, পেয়েছি অপার শোক। আজি সেই জন, করি দরশন, পেতেছি পরমলোক॥ যেই চন্দ্রানন, করি বিলোকন, দিবস রজনী গেলো। আজি সেই ধন, করি পরশন, আরো সুখবোধ হলো॥ করি প্রণিপাত, এই ধর নাথ, জীবন সফল কর। দুখের তনয়, সুখের সময়, হৃদয় মাঝারে ধর॥ আমি অভাগিনী, আজন্ম দুখিনী, জানি নাকো তোমা বই। তোমারি আশায়, এমন দশায়, নিবান্ধব-পুরে রই॥ কৌমারী দশায়, সখী ক জনায়, শিখিলাম শিশুপাঠ। প্রথম যৌবনে, সহচরী সনে, শিখিলাম গীত নাট॥ যৌবন মাঝারে, প্রণয়ে তোমারে, সেবেছি ধরম পালি। পরে পরবাসে, মনের হুতাশে, সাজায়েছি ফুলডালি॥ তোমারি কারণে, যবন-ভবনে, সহিত যবনবালা। তরুমূলে জল, ঊষা সন্ধ্যাকাল, দিয়াছি গেঁথেছি মালা॥ সুলতান-আগারে, ফুল যোগাবারে, আছিল আমার ভার। তোমারি কারণ, নৃপতি-নন্দন, সহিয়াছি দাসীভার॥ আহা কত বার, সুচিকণ হার, গাঁথিয়ে সুন্দর করি। বকুলের তলে, বসি ধরাতলে, কেঁদেছি হৃদয়ে ধরি॥ সকলি সফল, আজি মহাবল, মিটেছে মনের সাধ। এখন বাসনা, পূরাব কামনা, ঘুচাব কুলের বাদ॥ রাজার দুহিতা, রাজার বনিতা, জনম ক্ষত্রিয়কুলে। অশুচি যবন, করি পরশন, ধরিয়া আনিল চুলে॥ আমার গরিমা, তোমার মহিমা, টুটিল আমারি তরে। সে কলঙ্করাশি, সমূলে বিনাশি, যশ রাখি ক্ষিতি ভরে॥ তোমার মহিষী, তোমার প্রেয়সী, যেই নারী হতে চায়। অণু মাত্র দাগ, অহে মহাভাগ, নাহি যেন থাকে তায়॥ অনলে প্রবেশ, করিব প্রাণেশ, ঘুচাব বেদনা তব। মানের গৌরব, কুলের সৌরভ, প্রাণ দিয়ে কিনি লব॥ নারী হেমলতা, সতী পতিব্রতা, ঘুষিবে ভুবনত্রয়। ভূপতি-মণ্ডলে, নিয়ত সকলে, বলিবে তোমার জয়॥ এত বলি নন্দনের চন্দ্রানন চেয়ে। অশ্রুধারা পড়ে হেমলতাগণ্ড বেয়ে॥ প্রমদার সাহঙ্কার ভারতী শুনিয়া। প্রমাদ গণিল বীর বিষাদ ভাবিয়া॥ কখন বাখানে মনে প্রেয়সীহৃদয়। কখন অন্তরে হয় করুণা উদয়॥ কভু খেদে পূর্ব্বকথা করিয়া স্মরণ। প্রমদারে আলিঙ্গিয়ে করেন রোদন॥ নানামত বাক্যে বীর সান্ত্বনা করিল। তথাপি প্রেয়সীপণ অন্যথা নহিল॥ মোহবশে মহীপতি নীরব রহিলা। পতিরে প্রণমি রামা কাতরে চলিলা॥ প্রবেশি মহিলাপুরে সখী সম্বোধনে। তুষি দিল্লীরাজকন্যা প্রেম-আলিঙ্গনে॥ এত দিন দুই জনে ছিলাম সজনি। অদ্যাবধি একাকিনী পোহাবে রজনী॥ আজি আর প্রিয়সখি অভাগিনী তরে। যপিতে হবে না নিশি কাতর অন্তরে॥ বিদায় জনমশোধ দেহ আলিঙ্গন। আজি সখি পাপদেহ করিব পতন॥ অকলঙ্ক কুলে কালি রাখিব না আর। ঘুচাইব বল্লভের কুযশের ভার॥ চিতার দহনে দেহ অশুচি শুধিব। ভূমণ্ডলে ক্ষত্রিকুলখ্যাতি প্রকাশিব॥ প্রিয় সখি এক মাত্র করি নিবেদন। মা’র সম স্নেহে শিশু করিহ পালন॥ বলিতে বলিতে আঁখি করে ছল্‌ছল্। অনর্গল রাজকন্যাচক্ষে বহে জল॥ সজনী-প্রতিজ্ঞা শুনি, অন্তরে বিষাদ গুণি, দিল্লীশ্বর-কন্যা কাঁদি সখী-করে ধরিল। এমন বিষম পণ, সজনি রে কি কারণ, কে তোমারে হেন কথা বল দেখি বলিল॥ প্রাণপতি আজি তোর, সংহার করিয়া চোর, মিটাইতে মনসাধ তোর পাশে আসিল। বুঝিবারে তাঁর মন, তাই কি করিলি পণ, এত কষ্টে তাঁর ভাগ্যে এই ফল ফলিল॥ ছি ছি সখি এ কি কথা, দিও না রে এত ব্যথা, নিদয় হইয়া আমা সবাকারে ভুলো না। অই দেখ মা মা বলে, শিশু তোর আসে চলে, উহারে জনমশোধ পরিহার করো না॥ সখি রাজস্থানময়, সবে তোমা সতী কয়, পরিচয় দিতে আর হবে না রে তোমারে। যে ভাবে রিপুর ঘরে, আছিলে পরাণ ধরে, সেই কথা চিরদিন ঘুষিবে এ সংসারে॥ সজনি বিনয় করি, এই দেখ্ হাতে ধরি, এ বিষম পণে আর মনে স্থান দিও না। ক্ষত্রিকুল-চূড়ামণি, তাঁরে শোক দিয়া ধনি, ভারতের লোকে আর বিপাকেতে ফেল না॥ তুমি কৈলে তনুত্যাগ, রাজপুত্ত্র মহাভাগ, সংসারে বিরাগ করি রাজ্যপদ ত্যজিবে। পুনঃ হিন্দু রাজগণে, ম্লেচ্ছ পরাজিবে রণে, পুনর্ব্বার এই রাজ্য করতল করিবে॥ তাই বলি ত্যজ পণ, রাজকার্য্যে দেহ মন, পতি সহ দিল্লীরাজসিংহাসনে বসিয়া। প্রজার পালন কর, রিপু-অহঙ্কার হর রাখ ধরাতলে নাম ম্লেচ্ছদল শাসিয়া॥ এইরূপে নানামত, সান্ত্বনা করিয়া কত, ঘুচাইল হেমলতা-প্রাণনাশ-বাসনা। দিল্লীরাজকন্যা সনে, হরিষ বিষাদ মনে, পতি-পাশে ধীরে ধীরে চলিলেন ললনা॥ বীরবাহু হর্ষমন, প্রমদারে আলিঙ্গন, করি রাজপুত্ত্রগণে নিমন্ত্রিয়া আনিলা। সকলের অনুমতি, পাইয়া সানন্দ মতি, হেমলতা সনে দিল্লী-সিংহাসনে বসিলা॥ লোকেতে আনন্দময়, নগরে উৎসব হয়, বীরবাহু রাজপদে অভিষেক হইল। হেমলতা বাম পাশে, রতিরূপ পরকাশে, জয় জয় কোলাহলে চারি দিক্ পুরিল॥ সম্পুর্ণ Public domainPublic domainfalsefalse