রত্নস্তান—আকাঙ্ক্ষা-তবন—তধ্নিবাসীদিগের নৃশংস ব্যবহার ও কঠোর রীতি নীতি। চলিতে চলিতে হেরি এক স্থানে অপূর্ব্ব নব অঞ্চল, তরুশিরে ফল অতি মনোহর কনকের পত্রদল। ছুটেছে সে দিকে কত শত প্রাণী কত শত আসি কাছে, ফল পত্র হেরি তরুর শিখরে উৰ্দ্ধমুখ হ’য়ে আছে। কোথাও তরুতে ঝরিছে রজত বহিছে সুরভি বাস, প্রাণিগণ তায় ঘেরিয়া চৌদিকে করিছে কত উল্লাস। আশ্চর্য্য প্রকৃতি তরু সে সকল, ঘুরিছে প্রদেশময়, কভু মধ্যদেশে, কতু প্রান্তভাগে, তিলেক সুস্থির নয়; ভ্রমিছে তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে প্রাণী হেরি কত জন, তরু সরি সরি চলে যেই দিকে সে দিকে করে গমন; ভ্রমে কত তরু, ভ্রমে তরু-পার্শ্বে প্রাণী হেন কত শত, সদা উৰ্দ্ধশ্বাস, সদা উৰ্দ্ধবাহু, অবিশ্রান্ত, অবিরত; ভ্রমে ক্ষিপ্তপ্রায় পথে নাহি চায় তরু না পরশে তবু, ছুটিতে ছুটিতে ত্যজি নাভিশ্বাস তরুমূলে পড়ে কভু। কত তরু পুনঃ দেখি স্থানে স্থানে স্থির হৈয়ে সেথা আছে; ঘোর বিসম্বাদ মহা গণ্ডগোল হয় নিত্য তার কাছে; কত যে দুর্ব্বাক্য অশ্রাব্য কটূক্তি সতত সেখানে হয়, শুনিতে জঘন্য, ভাবিতে জঘন্য, মুখেতে বক্তব্য নয়। কোন প্রাণী যদি করে আকিঞ্চন পরশিতে তরু-অঙ্গ, আঘাত, চীৎকার, কতই প্রকার কে দেখে সে প্রাণিরঙ্গ! দেখিলে তখন সে সব বিকট ক্রুরমতি ভয়ঙ্কর, মনে নাহি লয় সেই সব জন বসুন্ধরাবাসী নর! সবার বাসনা উঠে তরু’পরে, উঠিতে না পায় কেহ, এমনি অদ্ভুত বিপরীত মতি প্রাণীর পিশাচদেহ; কেহ যদি কভু সহি বহু ক্লেশ উঠে কোন তরু’পরে, তখনি চৌদিকে শত শত জন তারে আক্রমণ করে, ফেলে ভূমিতলে পাদ পৃষ্ঠ ধরি খণ্ড খণ্ড করে তুর্ণ, নখ-দন্তাঘাতে নির্দ্দয় প্রহারে অস্থি মুণ্ড করে চূর্ণ; আরোহী যে জনে না পারে ধরিতে, অস্ত্রে কাটে হস্ত পদ, এমনি বিষম বাসনা দুরন্ত এমনি ঈর্ষা দুর্ম্মদ; তবু সে পরাণী উঠে তরুশিরে আনন্দে কাঞ্চন বাঁধে; ফুটিয়া বসন থাকিয়া থাকিয়া মণি-আভা নেত্র ধাঁধে; ছিন্ন হস্ত পদ কত প্রাণী হেন হেরি সেথা তরু’পরে উঠে অকাতরে কত তরু বাহি ক্ষত অঙ্গে রক্ত ঝরে; সে রুধির-ধারা নাহি করে জ্ঞান প্রাণী সে কাঞ্চন পাড়ে, কনকের পাতা কনকের ফল যতনে বসনে ঝাড়ে। এইরূপে সেথা উঠে নিত্য প্রাণী, কভু আইসে কোন জন অতি দূর হৈতে সে প্রাণিমণ্ডলী নিমিষে করি লঙ্ঘন; বিজুলির গতি উঠে তরু’পরে কেহ না ছুঁইতে পায়, তরুর শিখরে উঠেছে যখন তখন সকলে চায়। তরু হৈতে পুনঃ রতন পাড়িয়া নামে শেষে ধরাতলে; তরুতলস্থিত প্রাণিগণ এবে কেহ নাহি কিছু বলে; যায় দম্ভ করি দেখায়ে রতন ভয়ে সবে জড়সড়, না পারে ছুঁইতে না পারে চলিতে চরণে যেন নিগড়। বুঝিয়া তখন মম চিত্তভাব আশা কহে “বৎস, শুন ভেবো না বিস্ময় এই তরুদলে এমনি আশ্চর্য্য গুণ— ছলে কিম্বা বলে কিম্বা সে কৌশলে যে পারে উঠিতে শিরে, তাহারে এখানে কভু কেহ আর পরশিতে নারে ফিরে; অন্তরে দাঁড়ায়ে শ্বাপদ যেমন গজ্জিবে তখন সবে; অথবা নিকটে আসিয়া সত্বরে পদধূলি তুলি লবে।” জিজ্ঞাসি আশারে এত কষ্টে সবে রতন সঞ্চয় করে; কি বাসনা সিদ্ধি, কিবা মোক্ষপদ, কোথা পায় পুনঃ পরে। আশা কয় “এথা আসিতে আসিতে দেখিলে যতেক জন দিব্যাসমে বসি দিব্য মণি শিরে অপূর্ব্ব শোভা ধারণ; দেখিলা যতেক মাতঙ্গ ঘোটক হেম রৌপ্যময় যান; দেখিলা যতেক দাতা ভোক্তা প্রাণী ভুঞ্জে সুখে পদ মান; এই তরু শস্য পত্রাদি চয়ন আগে করি গেলা তারা, তাই সে এখন ভোগে সে ঐশ্বর্য্য ধরাতে আশ্চর্য্য ধারা।” বলিতে বলিতে আশা চলে আগে পশ্চাতে পশ্চাতে যাই, সে অঞ্চল মাঝে আসি এক স্থানে চকিত অন্তরে চাই। দেখি সেইখানে প্রাণী কত জন ভ্রমিছে প্রমত্তভাব; দামিনীর ছটা মুখেতে যেমন নিত্য হয় আবির্ভাব; করেতে উলঙ্গ করাল কৃপাণ ঝকিছে তড়িদুবৎ; নক্ষত্র-পতন- বেগেতে তাহারা ছুটি ভ্রমে সর্ব্বপথ; কেহ অশ্ব’পরে করি সিংহনাদ ঝড়গতি সদা ফিরে, যেন অভিলাষ গগনমণ্ডল আকর্ষণ করি চিরে; কেহ চলে দম্ভে উন্মত্ত কুঞ্জরে ক্ষিতি কাঁপে টল টল, বৃংহতি-নিৰ্ঘোষ ছাড়িয়া কর্কশ চলে দর্পে মদকল; কেহ মত্তমতি ধায় পদব্রজে তরঙ্গ যে ভাবে ধায়, তুলি দীপ্ত অসি ঘন, শূন্যপথে, বজ্রধ্বনি নাসিকায়; হেন মত্তভাব প্রাণী সে সকল ভ্রমে নিত্য সেই স্থানে, পদতলে দলি ক্ষুব্ধ ধরাতল গগনে কটাক্ষ হানে; নিরখি সেখানে কাচ-বিনির্ম্মিত কত চারু অট্টালিকা— চারু শুভ্র ভাতি প্রভা মনোহর প্রকাশে যেন চন্দ্রিকা; হৈম ধ্বজদণ্ডে শত শত ধ্বজা শ্বেত রক্ত নীল গীত অট্টালিকা-চূড়ে উড়িছে সতত গগন করি শোভিত। ছুটিতে ছুটিতে প্রাসাদ নিকটে সবে উপনীত হয়, না চিন্তি ক্ষণেক করে আরোহণ চিত্তে ত্যজি মৃত্যুভয়। প্রাসাদ-শরীরে প্রাণীর শৃঙ্খল আরোপিত কাঁধে কাঁধে, লম্ফে লম্ফে এরা সে প্রাণি-শৃঙ্খলে শিখরে উঠে অবাধে; উঠে যত দূর ক্রমে গৃহচূড়া উঠে তত শূন্য ভেদি; অসম সাহসে প্রাণী সে সকল উঠে অভ্র-অঙ্গ ছেদি; উঠে যেন ক্রমে দূর অন্তরীক্ষে আকাশে মিলিত হয়; ঘেরি যেন দেহ সৌদামিনী সহ জলদ সুস্থির রয়। কোন বা প্রাসাদ মাঝে মাঝে কভু অতি গুরুতর ভারে পড়ে ভূমিতলে বিচ্ছিন্ন হইয়া চূর্ণ কাচ চারি ধারে; প্রাণীর সোপান, আরোহী সে জন, কাচ-বিনির্ম্মিত গেহ নিমিষে অদৃশ্য নাহি থাকে কিছু, নাহি থাকে প্রাণী কেহ। না পড়ে যাহারা উঠিয়া শিখরে, ঘন সিংহনাদ ছাড়ে; পড়িছে প্রাসাদ চারি দিকে যত নিরখি আনন্দ বাড়ে। সে প্রাসাদমালা উপরে আশ্চর্য্য প্রাণী এক হেরি ভ্রমে, বিজুলির লতা ক্রীড়া করে যেন প্রাসাদশিখরে ক্রমে। আরোহী প্রাণীরা নিকটে আইলে মুকুট তুলিয়া ধরে; অধৈর্য্য হইয়া প্রাণী সে সকল কিরীট শিরেতে পরে; পরিয়া উজ্জ্বল কিরীট মস্তকে বেগে নামে ধরাতলে; ছাড়িয়া হুঙ্কার কাঁপায়ে মেদিনী মহাদম্ভ তেজে চলে; বলে গর্ব্ব করি “পৃথিবী সৃজন বল সে কাহার তরে, না যদি সম্ভোগ করিবে এ ধরা কেন বিধি সৃজে নরে। সুর-বীর্য্য ধরি যে আসে মহীতে তাহারি উচিত হয়। ভুঞ্জিতে ধরাতে ঐশ্বর্য্য প্রতাপ, পশু যারা ভাবে ভয়। ধর্ম্ম লৈয়ে ভাবে পাবে কর্ম্ম-ফল পাবে মোক্ষপদ, হায়! মর্ত্ত্যে ইন্দ্রালয় করিতে পারিলে স্বৰ্গপুরী কেবা চায়। হেন গর্ব্বভাব চলে দর্প করি প্রাণী সে সকল হেরি, অশ্রত নয়নে শত শত প্রাণী চলে চারি দিক্‌ ঘেরি; কেহ বলে কোথা জনক আমার, কেহ বলে ভ্রাতা কই, কেহ বলে ফিরে দেও ধরানাথ নাহি সে সম্বল বই। এইরূপে কত রমণী বালক ক্রন্দন করিয়া ধীরে, গলবস্ত্র হয়ে চলে কৃতাঞ্জলি সঙ্গে সঙ্গে সদা ফিরে। না শুনে সে বাণী সে ক্রন্দনস্বর সে প্রাণী শার্দ্দুল-প্রায় অসি হেলাইয়া চমকে চমকে উন্মত্ত ভাবেতে ধায়; যে পড়ে সম্মুখে কি পুরুষ নারী কিবা বৃদ্ধ শিশু প্রাণী খণ্ড খণ্ড করে তখনি সে জনে শাণিত কৃপাণ হানি। দেখিলাম কত শিশু এইরূপে কত যে অনাথা নারী করিল বিনাশ সদা-মত্ত-মন সেই সব অস্ত্রধারী; নাহি করে দয়া প্রাণে নাহি মায়া কত প্রাণী হেন বধে, কমল-কোরক শুণ্ডেতে ছিঁড়িয়া হস্তী যেন চলে মদে; কেহ উত্তরাস্যে কেহ বা পশ্চিমে পূর্ব্ব দিকে কোন জন, দেখি সেই সব উন্মত্ত পরাণী দাপটে করে গমন; উত্তর পশ্চিমে প্রাণী দুই এক কিঞ্চিৎ সঙ্কোচে যায়, কেশরি-গর্জ্জনে পূর্ব্ব দিকে হায় ছুটে কত মহাকায়। দেখিয়া তখন হৃদয়ে যেমন রুধির হইল জল; যেন বিষপানে জ্বলিল পরাণ, দেহ হৈল শূন্যবল। কহিনু আশায় এই কি তোমার আনন্দ-কানন-স্থান! আসিলে এখানে জুড়ায় তাপিত হৃদয় শরীর প্রাণ! ঈষৎ লজ্জিত ভাবে কহে আশা "শুন রে বালকমতি, আমার সেবক প্রাণী যত এথা এ নহে তাদের গতি; দুরাকাঙ্ক্ষা নামে দুরাত্মা পরাণী কখন পশে এথায়, দুর্দ্দম প্রতাপ দাপট তাহার, নিবারিতে নারি তায়; ভুলাইয়া প্রাণী ফেলয়ে কুপথে অহি সম পূর্ণ-ছল, বারেক যাহারে সে জন পরশে করে তারে করতল; নাহি থাকে আর অধিকার মম সে প্রাণী পশ্চাতে ধায়, নাহি জানি পরে হয় কিবা গতি বৃথা সে দোষ আমায়; চল এই দিকে দেখিবে সেখানে কিবা এ পুরী-মহিমা, কেন এত জন প্রবেশে পুরীতে ভাবিয়া এত গরিমা।” আমি কহি, চল ওই দিকে যাই শুনি যেন কোলাহল, নিরখিব কিবা কেন কোলাহল হয় পুরি সে অঞ্চল। অনেক নিষেধ করিলা আমারে সে পথে যাইতে আশা; তবু কোন ক্রমে সম্বরিতে নারি পরাণীর সে পিপাসা। অনন্য-উপায় শেষে আশা মোরে লইয়া সে দিকে যায়; নিকটে আসিয়া অতি ধীরে ধীরে প্রচ্ছন্ন ভাবে দাঁড়ায়। দেখি সেইখানে তনু অস্থিসার প্রাণী এক বৃদ্ধ জরা; শত গ্রন্থিময় বস্ত্র ধূলিপূর্ণ মলিন বপুতে পরা; ধুলিপিণ্ডবৎ খাদ্য কিছু হাতে, কণা কণা করি তায় বাঁটিছে সকলে চারি দিকে প্রাণী ঘোর কোলাহলে ধায়; ক্ষুধার্ত্ত শার্দ্দূল সদৃশ ছুটিছে যুবা বৃদ্ধ কত প্রাণী, বিলম্ব না সয় বণ্টন করিতে কাড়ি লয় বেগে টানি; ক্ষুধানলে জ্বলে জঠর সবার কি করে অন্নের কণা, পরম্পরে সবে করে কাড়াকাড়ি, নিবারে ক্ষুধা আপনা। কত যে করুণ শুনি ক্ষুণ্ণ স্বর কত খেদবাক্য হায়! শুনে স্থির-চিত্তে বারেক যে জন জনমে না ভুলে তায়। দেখিলাম আহা কত শিশুমুখ বিশুষ্ক পুষ্পের মত, কত অন্ধ খঞ্জ রমণী দুর্ব্বল চেয়ে আছে অবিরত; অশ্রুজলে ভাসে গণ্ড বক্ষঃস্থল জনতা ভেদিতে চায়, নিকটে যে আসে অন্নকণা লৈয়ে লালচে নেহারে তায়। হায় কত জন অধীর ক্ষুধায় নিরখি সেখানে ধায়, দুর্ব্বল অবলা শিশু হস্ত হৈতে অন্ন কাড়ি লয়ে খায়। সে প্রাণিমণ্ডলী কত যে অধৈর্য্য কত যে কাতরে আসে করিয়া চীৎকার মুহূর্ত্তে মুহূর্ত্তে সেই বৃদ্ধ প্রাণী পাশে। কাঁদিতে কাঁদিতে অন্ন কণা কণা বণ্টন করে সে প্রাণী, নিত্য খিন্ন ভাব সদাই আক্ষেপে অতি কষ্টে কহে বাণী— কেন রে সকলে আ(ই)স এইখানে কোথা আর অন্ন পাব, বিধির বঞ্চনা! তোদের লাগিয়া বল আর কোথা যাব; এ পুরী-ভিতরে নাহি হেন স্থান না করি যেথা ভ্রমণ; নাহি হেন বৃত্তি চৌর্য্য কিম্বা ছল না করি যাহা ধারণ; তবু নাহি ঘুচে কাঙ্গালের হাল কি কব কপাল দুষ্ট; কোথা পাব বল আহার তোদের বিধাতা আমারে রুষ্ট; কেন এ পুরীতে করিস প্রবেশ ভুঞ্জিতে এ হেন ক্লেশ, প্রাণিরঙ্গভূমি ধনীর আশ্রয়, নহে কাঙ্গালের দেশ! তাপিত অন্তরে কহিনু আশায় আর না দেখিতে চাই, এ পুরী মহিমা গরিমা যতেক এখানে দেখিতে পাই, দেও দেখাইয়া বাহিরিতে দ্বার পুনঃ যাই সেই স্থান; আসি যেথা হৈতে, দেখিয়া এ সব অস্থির হয়েছে প্রাণ। মধুর বচনে আশা কহে “কেন উতলা হইছ এত, দেখাইব তোর বাসনা যেরূপ যেবা তব অভিপ্রেত; কর্ম্মভূমি নাম শুন এ নগরী কর্ম্মগুণে ফলে ফল, বালমতি তুমি বুঝিনু তোমার অন্তর অতি কোমল; কঠিন ধাতুতে নির্ম্মিত যে প্রাণী সেই বুঝে রঙ্গ এর; প্রাণিরঙ্গভূমে ভ্রমিতে আপনি বিরিঞ্চি ভাবেন ফের; চল এই দিকে তব মনোমত পদার্থ দেখিতে পাবে, এ পুরী-ভ্রমণ কৌতুক-লহরী তখন নাহি ফুরাবে।” এত কৈয়ে আশা চলে আগে আগে সভয়ে পশ্চাতে যাই; আসি কিছু দূর পুরী-মধ্যভাগে অচল দেখিতে পাই।