গঙ্গার উৎপত্তি
১
হরিনামামৃত পানে বিমোহিত
সদা আনন্দিত নারদঋষি,
গাহিতে গাহিতে অমরাবতীতে
আইল একদা উজলি দিশি।
২
হরষ অন্তরে মহা সমাদরে
স্বগণ সংহতি অমর পতি,
করি গাত্রোত্থান, করিয়া সম্মান
সাদর সম্ভাষে তোষে অতিথি।
৩
পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া মুনিরে পূজিয়া
চন্দ্রাগ্নি প্রভৃতি অমরগণ;
করিয়া মিনতি কহে ঋষিপতি
“কহ কৃপা করি করি শ্রবণ,
8
কি রূপে উৎপতি হলো ভাগীরথী
গাও তপোধন প্রাচীন কথা।
বেদের উকতি, তোমার ভারতী,
অমৃত লহরী সদৃশ গাথা।”
৫
গুণী বিশারদ মুনি সে নারদ,
ললিত পঞ্চমে মিলায়ে তান,
আনন্দে ডুবিয়া নয়ন মুদিয়া।
তুম্ব বাজাইয়া ধরিল গান।
৬
“হিমাদ্রি অচল দেবলীলাস্থল
যোগীন্দ্রবাঞ্ছিত পবিত্র স্থান;
অমর কিন্নর যাহার উপর
নিসর্গ নিরখি জুড়ায় প্রাণ।
৭
যাহার শিখরে সদা শোভ করে
অসীম অনন্ত তুষার রাশি;
যাহার কটিতে ছুটিতে ছুটিতে
জলদকদম্ব জুড়ায় আসি।
৮
যেখানে উন্নত মহীরুহ যত
প্রণত উন্নত শিখর কায়;
সহস্র বৎসর অজর অমর
অনাদি ঈশ্বর মহিমা গায়।
৯
সেই হিমগিরি শিখর উপরি
অঙ্গিরাদি যত মহর্ষিগণ
আসিত প্রত্যহ, ভকতির সহ
ভজিতে ব্রহ্মাণ্ড আদিকারণ।
১০
হেরিত উপরে নীলকান্তি ধরে
শূন্য ধূ ধূ করে ছড়ায়ে কায়;
হেরিত অযুত অযুত অদ্ভুত
নক্ষত্র ফুটিয়া ছুটিছে তায়।
১১
মণ্ডলে মণ্ডলে শনি শুক্র চলে
ঘুরিয়া ঘেরিয়া আকাশময়;
হেরিত চন্দ্রমা অতুল উপমা
অতুল উপমা ভানু উদয়।
১২
চারি দিকে স্থিত দিগন্ত বিস্তৃত
হেরিত উল্লাসে তুষার রাশি;
বিস্ময়ে প্লাবিত বিস্ময়ে ভাবিত
অনাদি পুরুষে আনন্দে ভাসি।”
১৩
বলিতে বলিতে আনন্দ বারিতে
দেবর্ষি হইল রোমাঞ্চ কায়;
ঘনঘনস্বর গভীর, প্রখর
তান্পূরা ধ্বনি বাজিল তায়।
১৪
গাহিল নারদ, ভাবে গদগদ,
“এমন ভজন নাহি রে আর,
ভূধর শিখরে ডাকিয়া ঈশ্বরে
গাহিতে অনন্ত মহিমা তাঁর।
১৫
ইহার সমান ভজনের স্থান
কি আছে মন্দির জগত মাঝে;
জলদ-গর্জ্জন তরঙ্গ-পতন
ত্রিলোক চমকি যেখানে বাজে।
১৬
কিবা সে কৈলাস বৈকুণ্ঠ নিবাস
অলকা আমরা নাহিক চাই;
জয় নারায়ণ বলিয়া যেমন
ভুবনে ভুবনে ভ্রমিতে পাই।”
১৭
নারদের বাণী শুনি অভিমানী
অমর মণ্ডলী বিমর্ষ হয়;
আবার আহ্লাদে গভীর নিনাদে
সঙ্গীত তরঙ্গ বেগেতে বয়!
১৮
“ঋষি কয় জন সন্ধ্যা সমাপন
করি এক দিন বসিলা ধ্যানে;
দেবী বসুন্ধরা মলিনা কাতরা
কহিতে লাগিলা আসি সেখানে;”
১৯
‘রাখ ঋষিগণ—সমূলে নিধন
মানব সংসার হলো এবার;
হলো ছার খার ভুবন আমার
অনাবৃষ্টি তাপ সহে না আর।’
২০
শুনে ঋষিগণ করে দৃঢ় পণ
যোগে দিল মন একান্ত চিতে;
কঠোর সাধন ব্রহ্ম আরাধনা
করিতে লাগিলা মানব-হিতে।
২১
মানব মঙ্গলে ঋষির সকলে
কাতরে ডাকিছে করুণাময়;
মানবে রাখিতে নারায়ণ চিতে
হইল অসীম করুণোদয়।
২২
দেখিতে দেখিতে হলো আচম্বিতে
গগন-মণ্ডল তিমিরময়;
মিহির নক্ষত্র তিমিরে একত্র
অনল বিদ্যুৎ অদৃশ্য হয়।
২৩
ব্রহ্মাণ্ড ভিতর নাহি কোন স্বর,
অবনী অম্বর স্তম্ভিত প্রায়;
নিবিড় আঁধার জলধি হুঙ্কার
বায়ু বজ্রনাদ নাহি শুনায়।
২৪
নাহি করে গতি গ্রহদলপতি
অবনী-মণ্ডল নাহিক ছুটে;
নদ-নদী-জল হইল অচল
নির্ঝর না ঝরে ভূধর ফুটে।
২৫
দেখিতে দেখিতে পুনঃ আচম্বিতে
গগনে হইল কিরণোদয়;
ঝলকে ঝলকে অপূর্ব্ব আলোকে
পূরিল চকিতে ভুবনত্রয়!
২৬
শূন্যে দিল দেখা কিরণের রেখা
তাহাতে আকাশে প্রকাশ পায়—
ব্রহ্ম সনাতন অতুল চরণ
সলিল নির্ঝর বহিছে তায়।
২৭
বিন্দু বিন্দু বারি পড়ে সারি সারি
ধরিয়া সহস্র সহস্র বেণী;
দাঁড়ায়ে অম্বরে কমণ্ডলু করে
আনন্দে ধরিছে কমলযোনি।
২৮
হায় কি অপার আনন্দ আমার
ব্রহ্ম সনাতন চরণ হতে;
ব্রহ্মা কমুণ্ডলে জাহ্নবী উথলে
পড়িছে দেখিনু বিমানপথে।
২৯
গভীর গর্জ্জনে দেখিনু গগনে
ব্রহ্মা কমণ্ডলু হতে আবার
জলস্তম্ভ ধায়, রজতের কায়,
মহাবেগে বায়ু করি বিদার।
৩০
ভীম কোলাহলে নগেন্দ্র অচলে
সেই বারিরাশি পড়িল আসি;
ভূধর শিখর সাজিয়া সুন্দর
মুকুটে ধরিল সলিল রাশি।
৩১
রজত বরণ স্তম্ভের গঠন
অনন্ত গগন ধরেছে শিরে,
হিমানী আবৃত হিমাদ্রি পর্ব্বত
চরণে পড়িয়া রয়েছে ধীরে।
৩২
চারি দিকে তার রাশি স্তূপাকার
ফুটিয়া ছুটিছে ধবল ফেনা;
ঢাকি গিরি চুড়া হিমানীর গুঁড়া
সদৃশ খসিছে সলিল কণা।
৩৩
ভীষণ আকার ধরিয়া আবার
তরঙ্গ ধাইছে আচল কায়;
নীলিম গিরিতে হিমানী রাশিতে
ঘুরিয়া ফিরিয়া মিশায়ে যায়।
৩৪
হইল চঞ্চল হিমাদ্রী অচল
বেগেতে বহিল সহস্র ধারা;
পাহাড়ে পাহাড়ে তরঙ্গ আছাড়ে
ত্রিলোক কাঁপিল আতঙ্কে সারা।
৩৫
ছুটিল গর্ব্বেতে গোমুখী পর্ব্বতে
তরঙ্গ সহস্র একত্রে মিলি,
গভীর ডাকিয়া আকাশ ভাঙ্গিয়া
পড়িতে লাগিল পাষাণ ফেলি।
৩৬
পালকের মত ছিঁড়িয়া পর্ব্বত
কুঁদিয়া চলিল ভাঙ্গিয়া বাঁধ,
পৃথিবী কাঁপিল তরঙ্গ ছুটিল
ডাকিয়া অসংখ্য কেশরি-নাদ।
৩৭
বেগে বক্রকায় স্রোতঃস্তম্ভ ধায়
যোজন অন্তরে পড়িছে নীচে;
নক্ষত্রের প্রায় ঘেরিয়া তাহায়
শ্বেত ফেনরাশি পড়িছে পিছে।
৩৮
তরঙ্গনির্গত বারিকণা যত
হিমানী চূর্ণিত আকার ধরে;
ধূমরাশি প্রায় ঢাকিয়া তাহায়
জলধনু শোভা চিত্রিত করে।
৩৯
শত শত ক্রোশ জলের নির্ঘোষ
দিবস রজনী করিছে ধ্বনি;
অধীর হইয়া, প্রতিধ্বনি দিয়া
পাষাণ খসিয়া পড়ে অমনি।
৪০
ছাড়ি হরিদ্বার শেষেতে আবার
ছড়ায়ে পড়িল বিমল ধারা;
শ্বেত সুশীতল স্রোতস্বতীজল
বহিল তরল পারা পারা।
৪১
অবনীমণ্ডলে সে পবিত্র জলে
হইল সকলে আনন্দে ভোর;
‘জয় সনাতনী পতিতপাবনি’
ঘন ঘন ধ্বনি উঠিল ঘোর।”
More from কবিতাবলী
More in Poetry
Poetry
Palanquin Bearers
Lightly, O lightly we bear her along, She sways like a flower in the wind of our song; She skims like a bird on the foam of a stream; She floats like a laugh from the lips of a dream. Gaily, O gaily we glide and we sing,...
Poetry
Where the Mind is Without Fear (Gitanjali 35)
Where the mind is without fear and the head is held high; Where knowledge is free; Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls; Where words come out from the depth of truth; Where tirel...
Poetry
Thou Hast Made Me Endless (Gitanjali 1)
Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life. This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed...
Comments (0)
Log in to join the conversation.