চিন্তাতরঙ্গিণী (হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
সম্পাদক
শ্রীসজনীকান্ত দাস
ব ঙ্গী য় - সা হি ত্য - প রি ষ ৎ
২৪৩।১, আপার সারকুলার রোড
কলিকাতা-৬
প্রকাশক
শ্রীসনৎকুমার গুপ্ত
বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ
প্রথম সংস্করণ—জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬১
মূল্য বারো আনা
শনিরঞ্জন প্রেস, ৫৭ ইন্দ্র বিশ্বাস রোড, কলিকাতা-৩৭ হইতে
শ্রীরঞ্জনকুমার দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
৭.২—২২. ৫. ৫৪
ভূমিকা
অক্ষয়চন্দ্র সরকার লিখিয়াছেন—
“যে বৎসর হেমচন্দ্র হাইকোর্টের ওকালতিতে নাম লেখান, সে বৎসরেই অর্থাৎ ১৮৬১ খৃষ্টাব্দে তাঁহার ‘চিন্তাতরঙ্গিণী’ প্রকাশিত হয়। এই তাঁহার প্রথম কবিতা-গ্রন্থ।...কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অল্পকাল পরেই অভিনব শিক্ষা-বিভ্রাটের দুইটী শোককর দৃষ্টান্ত দেখিতে পাওয়া গেল। ধর্ম্মহীন লক্ষ্যহীন শিক্ষায় শিক্ষিতের হৃদয়ে ঘোরতর অশান্তি আনিল। একই বৎসরের মধ্যে দুইজন ‘সুশিক্ষিত’ এই অশান্তির আবেগে উদ্বন্ধনে প্রাণত্যাগ করিলেন। একজন,—প্রসিদ্ধ পণ্ডিত শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্যের ভ্রাতা রামকমল ভট্টাচার্য্য। আর একজন,—খিদিরপুরের ৺যোগেন্দ্র ঘোষের ভ্রাতা—শ্রীশচন্দ্র ঘোষ। শ্রীশচন্দ্র হেমচন্দ্রের প্রতিবেশী বাল্যবন্ধু। দুইজনে এক বৎসরে ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে বি. এ. পাশ করেন। শ্রীশচন্দ্রের নিজকৃত উৎকট অকালমৃত্যুতে হেমবাবু প্রথমে অত্যন্ত শোকার্ত্ত, পরে গভীর চিন্তাকুলিত হইলেন। তাহারই ফল—‘চিন্তাতরঙ্গিণী’। এই বিষম চিন্তা-তরঙ্গভরেই হেমবাবুর কবিতার প্রথম বিকাশ।”—‘কবি হেমচন্দ্র’ (১৩৩৫), পৃ. ৬, ৩০।
হেমচন্দ্রের বয়স তখন ২৩ পূর্ণ হয় নাই। আচার্য কৃষ্ণকমলও তাঁহার স্মৃতিকথায় এই বিষয়ে বলিয়াছেন—
“...হেমবাবুর চিন্তাতরঙ্গিণী...তাঁহারই পাড়ার কোনও গৃহস্থ বাড়ীর একটা ঘটনা অবলম্বনে রচিত হইয়াছিল।...আমিই [ হাবড়ার ‘হিতকরী পত্রিকা’য় ] প্রথম উহার সমালোচনা করি। দেখাইয়া দিই যে, হেমবাবুর ‘কেন বা হইবে আন, পুরুষের শত টান’ ইত্যাদি, বায়রণের ‘Man's love of man's life is a thing apart (Don Juan, Canto I) ইত্যাদির অনুবাদ। অনুবাদ হিসাবেও বটে, আর কবিতা হিসাবেও বটে, মোটের উপর ভালই বলিয়াছিলাম।” —‘পুরাতন প্রসঙ্গ,’ ১ম পর্য্যায়, পৃ. ৭৪-৭৫।
আচার্য কৃষ্ণকমল ও সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ কাউয়েলের চেষ্টায় ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দেই ‘চিন্তাতরঙ্গিণী’ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এল. এ, পরীক্ষার পাঠ্য নির্দিষ্ট হয়।
শ্রীমন্মথনাথ ঘোষ তাঁহার ‘হেমচন্দ্রে’র ১ম খণ্ডে (১৩২৬) ১২৬-১৩২ পৃষ্ঠায় ‘চিন্তাতরঙ্গিণী’ সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন।
আমরা ইহার প্রথম সংস্করণ সংগ্রহ করিতে পারি নাই, সুতরাং পরবর্তী সংস্করণের পাঠ গ্রহণ করিয়াছি।
‘চিন্তাতরঙ্গিণী’র পৃষ্ঠা-সংখ্যা ছিল ৩০। আখ্যাপত্রটি এইরূপ ছিল—
চিন্তাতরঙ্গিণী/ “পৃথিবীর সার পদার্থ মনুষ্য,/ মনুষ্যের সার পদার্থ মন।”/ কলিকাতা সংস্কৃত যন্ত্র।/ সন ১২৬৮।/ ইংরেজী ১৮৬১। / মূল্য ৷৹ চারি আনা।
চিন্তাতরঙ্গিণী
“পৃথিবীর সার পদার্থ মনুষ্য,
মনুষ্যের সার পদার্থ মন।”
শীতল বাতাস বয়, জলের কল্লোল।
রাঙা রবিছবি লয়ে খেলায় হিল্লোল॥
ধীরে ধীরে পাতা কাঁপে, পাখী করে গান।
লোহিতবরণ ভানু অস্তাচলে যান॥
বিচিত্র গগনময় কিরণের ঘটা।
হরিদ্রা, পাটল, নীল, লোহিতের ছটা॥
হেরিয়া ভবের শোভা জুড়ায় নয়ন।
শীতল শরীর সেবি মলয় পবন॥
হেন সন্ধ্যাকালে যুবা পুরুষ নবীন।
ভ্রময়ে নদীর কূলে একা একদিন॥
ললাটের আয়তন, সুচারু বরণ।
লোচনের আভা তার মুখের কিরণ॥
দেখিলে মানুষ বলি মনে নাহি লয়।
সুরপুরবাসী বলি মনে ভ্রম হয়॥
শাপেতে পড়িয়া যেন ধরার ভিতরে।
পূর্ব্বকথা আলোচনা করিছে কাতরে॥
এক দৃষ্টে এক দিকে রহি কত ক্ষণ।
কহিতে লাগিল যুবা প্রকাশি তখন॥
“দেবের অসাধ্য রোগ, চিন্তার বিকার।
প্রতিকার নাহি তার বুঝিলাম সার॥
নহিলে এখনো কেন অন্তর আমার।
ব্যথিত হতেছে এত, দহনে তাহার॥
চারি দিকে এই সব জগতের শোভা।
কিছুই আমার কাছে নহে মনোলোভা॥
এই যে আরক্তময় ভানুর মণ্ডল।
এই সব মেঘ যেন জ্বলন্ত অনল॥
এই যে মেঘের মাঝে দিবাকরছটা।
সোনার পাতায় যেন সিঁদুরের ঘটা॥
এই শ্যাম দূর্ব্বাদল এই নদীজল।
মণ্ডিত লোহিত রবিকিরণে সকল॥
নিরানন্দ রসহীন সকলি দেখায়।
নয়নের কাছে সব ভাসিয়া বেড়ায়॥
মনের আনন্দে অই পাখী করে গান।
জানায় জগতজনে রবি অস্ত যান॥
উর্দ্ধপুচ্ছ গাভী অই পাইয়া গোধূলি।
ধাইতেছে ঘরমুখে উড়াইয়া ধূলি॥
কৃষক, রাখাল, আর গৃহী যত জন।
সেবিয়া শীতল বায়ু পুলকিত মন॥
পৃথিবীর যত জীব প্রফুল্ল সকল।
অভাগা মানব আমি অসুখী কেবল॥
ত্যজি গৃহকারাগার এনু নদীতটে।
দেখিতে ভবের শোভা আকাশের পটে॥
ভাবিনু শীতল বায়ু পরশিলে গায়।
চিন্তার বিষের দাহ নিবারিবে তায়॥
চিন্তা-বিষে মন যার জরে এক বার।
নিরুপায় সেই জন, বুঝিলাম সার॥
এ ছার”—এমন কালে, প্রিয়সখা তার।
আসি, পাশে দাঁড়াইয়া, করে নমস্কার॥
“একাকী এখনো হেথা কিসের কারণ।”
বলিয়া সুধায় তায়, সেই বন্ধু জন॥
“এস এস এস ভাই, প্রাণের কমল।
দেখ বুকে হাত দিয়ে হলো কি শীতল॥
ভেবেছি আমি হে সার, নরক সংসার।
প্রাণী ধরিবার ঘোর কল বিধাতার॥
সাধু পুরুষের নয় রহিবার স্থান।
ভীষণ নরককুণ্ড কূপের সমান॥
দৌরাত্ম্য, নিষ্ঠুরাচার, ধরা অলঙ্কার।
দ্বেষ, পরহিংসা, আর নৃশংস আচার॥
দম্ভ, অহঙ্কার, মিথ্যা, চুরি, পরদার।
প্রতারণা, প্রতিহিংসা, কোপ অনিবার॥
নরহত্যা, অনিবার্য্য সংগ্রাম দুরন্ত।
কত লব নাম তার নাহি যার অন্ত॥
পরিপ্লুত বসুন্ধরা এই সব পাপে।
স্মরণ করিতে দেহ থর থর কাঁপে॥
প্রতিকার কিসে তার বল দেখি ভাই।
এই দেখ নদীজলে ঝাঁপ দিতে যাই॥”
এই কথা বলি তারে আলিঙ্গন করি।
যেতে চায় নরসখা, সখা রাখে ধরি॥
ছি ছি ভাই পাগলের মত কত বল।
কাপুরুষকথা কেন মুখে এ সকল॥
এ কথা শুনিলে তব পিতা কি ভাবিবে।
এ কথা শুনিলে জগতারা কি বলিবে॥
সে যে এ জগততারা রমণীর মণি।
তোমা বই জানে না হে, সরলা কামিনী॥
মনে কর সেই নিশি এই নদীজলে।
ভাসে তরি, তার পরি ঘুমায় সকলে॥
প্রমত্ত তটিনী করে শশি আলিঙ্গন।
তারকামালায় ঘেরা বিমল গগন॥
ধূ ধূ করে চারি দিক্ হু হু করে প্রাণ।
আর পারে নাবিকেরা করে সারি গান॥
ভূতল আকাশ আর তরঙ্গিণীজল।
তরু বায়ু তারারাজি চাঁদের মণ্ডল॥
চক্ষে দেখা যায় আর কানে শুনা যায়।
বোধ হয় প্রেমসুধা মাখা সমুদায়॥
তুমি কাছে শুয়ে, জল নাচি নাচি চলে।
অশ্রুজলে ভিজি রামা এইরূপে বলে॥
‘আমি নারী অভাগিনী, পতিকোলে বিরহিণী,
না জানি করিছি কত পাপ।
সে ঠেলে চরণে ক’রে, ত্যজিলাম যার তরে,
জননী ভগিনী ভাই বাপ॥
কথা যার মধুময়, মন যার প্রেমালয়,
সে কেন আমারে করে হেলা।
দেখে কি সে দেখে না, ভেবে কি সে ভাবে না,
অদ্ভুত পুরুষের খেলা॥
কেন বা হইবে আন্, পুরুষের শত টান,
শস্ত্র শাস্ত্র সংগ্রাম ভ্রমণ।
রাজনীতি, রাজদ্বার, ব্যবসা, কৃষি, বিচার,
দ্যূতক্রীড়া রমণীরঞ্জন॥
পুরুষের এই সব, পুরুষ নারী বিভব,
সবে নিধি অমূল্য রতন।
সেই ধ্যান সেই ধন, সেই প্রাণ সেই মন,
তবু তায় করে অযতন॥
যা হোক জীবন ছার, রাখিব না আমি আর,
নদীজলে হইবে মগন।
এত বলি উঠে গিয়া, তরিপৃষ্ঠে দাঁড়াইয়া,
একে একে খোলে আভরণ॥
সাক্ষী করে চন্দ্র তারা, গণ্ড বেয়ে অশ্রুধারা,
দর দর বিগলিত হয়।
‘অভাগী পরাণে মরে, বলো সবে প্রাণেশ্বরে,
এ যাতনা আর নাহি সয়॥'
এত বলি তোমা পানে, পূর্ণ দৃষ্টি রামা হানে,
শ্বাস ত্যজি ঝাঁপ দিতে যায়।
তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে, তোমার দোহাই দিয়ে,
কত করে নিবারি তায়॥
এখনো নয়নে বারি ঝরে বুঝি তার।
এই সে কাঁদিতেছিল নিকটে আমার॥
দুই কর করে ধরি সজল নয়নে।
বলে মোরে ধীরে ধীরে করুণ বচনে॥
‘সুধাইও, ওহে ভাই, তোমার সখারে।
কি কারণ অযতন করেন আমারে॥
দাসী প্রতি প্রতিকূল এত কেনে হন।
বারেক তুলিয়া মুখ কথা নাহি কন॥
কোন্ অপরাধে আমি আছি অপরাধী।
অহরহ ভাবি তাই, দিবানিশি কাঁদি॥
বল তিনি কোন্ দোষ দেখেন আমার।
কি করিলে পরিতোষ হইবে তাঁহার॥
ভেবে দেখ, তারে তুমি কত দুখ দাও।
ভাল করে সাজা, বুঝি, এবে দিতে চাও॥
সহায়বিহীনা, ভাই, রমণী অবলা।
সংসার-সাগর মাঝে স্বামী মাত্র ভেলা॥
একে ত নারীর জাতি পরের অধীনা।
তাহাতে অভাগা দেশে দাসী মত কেনা॥
পৃথিবী-ভিতরে জানে পরিবার জন।
রন্ধনশালার সীমা-ভিতরে ভ্রমণ॥
সে যদি পতির প্রেমে হইল বিমুখ।
এর চেয়ে তার তরে আর কি অসুখ।
বিল দেশাচার দোষে পরের নন্দিনী।
কি কারণ অকারণ দুখের ভাগিনী॥
সত্য বটে তোমা দোঁহে বিস্তর প্রভেদ।
সত্য তার মনে মাখা অজ্ঞানের ক্লেদ॥
তুমি বই সেই ক্লেদ বল কে মুছাবে।
অজ্ঞান আঁধার ঘোর আর কে ঘুচাবে॥
বিদ্যাহীনা সেই জনা জানে না সকল।
ধর্ম্মাধর্ম্ম কর্ম্মাকর্ম্ম কিসের কি ফল॥
পতি পুত্র গুরুজনে কিরূপ আচার।
কি করিলে সুস্থ থাকে দেহ আপনার॥
তুমি যদি অবহেল অন্য কোন্ জন।
এই সব শিখাইবে করিয়া যতন॥
প্রকৃতির অট্টালিকা কে দেখাবে তায়।
কে কাণ্ডারি হবে তার জীবনের নায়॥”
“অহে সখে, কি বলিবে, বুঝি হে সকল।
বুঝাইতে নারি ভাই মনেরে কেবল॥
কেমনে এমন দেহ ধারণ করিব।
কেমনে সংসার-পাপে ডুবিয়া রহিব॥
আমার আমার করি সকলে পাগল।
হায় রে আপন পর জানে না কমল॥
মনের মতন লোক মেলে না রে ভাই।
বল বল সাধু জন কোথা গেলে পাই॥
ধর্ম্মশীল অকুটিল আছে কয় জনা।
কে না মিথ্যা বলে, কে না করে প্রতারণা॥
ইচ্ছা করে একেবারে পৃথিবী যুড়িয়া।
নূতন মানবজাতি আনি হে গড়িয়া॥
কেন ভগবান হেন পৃথিবী রচিল।
কলুষ পাথারে পরে কেন ডুবাইল॥
মাটির শিকলে কেন আত্মা মন বাঁধা।
আলো আঁধারিয়া করি কেন দেন ধাঁধা॥
মনে হয় ভেদ করি দেহের পিঞ্জর।
বিভুপাশে গিয়ে যোড় করি দুই কর॥
সুধাই এ নরলোক সৃজন কারণ।
আর আর লোক সব করি দরশন॥
সঠিক বলি হে তোমা না করি গোপন।
এত দিন কোন কালে ফুরাইত রণ॥”
সুধু সেই অভাগিনী তোমা কয় জন।
পরকালভয়, ভাবি, পিতার কারণ॥”
বলিতে বলিতে দোঁহে কথায় ভুলিয়া।
নদী হতে কতদূরে আইল চলিয়া॥
রমণীয় রূপ ধরে ভূতল গগন।
পরিয়া শারদ শশী রজত ভূষণ॥
আলো পেয়ে কাক ডাকে দিবস ভাবিয়া।
রজনীরমণ হাসে রহস্য দেখিয়া॥
শীতল বাতাস বয়, যুড়ায় শরীর।
পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির॥
বিমল গগনে হাসে চাঁদের মণ্ডল।
নীল জলে যেন শ্বেত কমলের দল॥
চারি দিকে প্রকৃতির শোভা অগণন।
মহিমা হেরিয়া হয় ভকতি-জনন॥
যোড় করে দুই জনে মুদিল নয়ন।
অমনি গ্রামের মাঝে বাজিল বাজন॥
ত্যক্ত হয়ে নরসখা কমলে সুধায়।
এখন কিসের তরে বাজনা বাজায়॥
কমল বলিল, আজি সপ্তমী রজনী।
অধীর হইয়া নর কহিছে তখনি॥
“দুর্ব্বল মানব-মন সেই সে কারণ।
পূজে ভবদেব করি প্রতিমা গঠন॥
সাকার স্বরূপে তাই নিরাকারে ভাবে।
মাটি পূজা করি ভাবে মোক্ষপদ পাবে॥
একবার এরা যদি প্রকৃতিমন্দিরে।
প্রবেশি ডাকিতে পারে জগতবন্ধুরে॥
শিব দুর্গা কালী নাম ভুলিবে সকল।
পরব্রহ্ম নাম মাত্র জপিবে কেবল॥
কি ছার অমরপুর, তাঁর পুর কাছে।
কোথায় দেবের বৃন্দ তাঁর কাছে আছে॥
কি প্রতিমা দশভুজা করেছে গঠন।
সে কি তাঁর রূপ, যাঁর ব্রহ্মাণ্ড সৃজন॥
কথায় সৃজন যাঁর, কথায় প্রলয়।
দশভূজা নারীরূপ তাঁরে কি সাজায়॥
কিবা জবা বিল্বদলে তুষিবে সে জনে।
ধরা পূর্ণ ফলে ফুলে করেছে যে জনে॥
কিবা ধূপ দীপ গন্ধ তাঁর যোগ্য দান।
যেই জন ধূপ ধুনা কস্তুরি নিদান॥
কি মন্দিরে তাঁর মূর্ত্তি করিবে ধারণ।
সসাগরা ক্ষিতি ব্যোম যাঁহার রচন॥
সার মন্ত্র জানি এক পরব্রহ্মনাম।
মুক্তিপদ জানি সেই পরব্রহ্মধাম॥”
এত বলি ধীরে ধীরে তুলিয়া বয়ান।
কুতূহলে দোঁহে মিলে করে বিভুগান॥
“আনন্দে মিলাও তান, গাও রে বিভুর গান,
জয় জগদীশ বল মন।
ত্যজ রে অনিত্য খেলা, ত্যজ রে পাপের মেলা,
ভজ রে তাঁহার শ্রীচরণ॥
মহিমার ধ্বজা লয়ে, বিমানে বিরাজ হয়ে,
চারি দিকে তারাগণ ধায়।
সাজিয়া মোহন সাজে, বসিয়া ভবের মাঝে,
শশধর তাঁর গুণ গায়।
দিবস হইলে পরে, প্রচণ্ড রবির করে,
প্রকাশে তাঁহার মহাবল।
স্থাবর জঙ্গম জল, ব্যোম বায়ু মহীতল,
তাঁর গুণ গাহিছে কেবল॥
ভজ রে তাঁহার নাম, খোঁজ রে তাঁহার ধাম,
সেই জন ভবের ভাণ্ডারী।
সেই প্রভু ভয়ঙ্কর, যমে যাঁরে করে ডর
সেই জন ভবের কাণ্ডারী॥
করেছি অনেক পাপ, সহিব অনেক তাপ,
দয়াময় দয়া করো নরে।
ঠেল না চরণে করে, দেখা যেন পাই পরে,
এই নিবেদন পাপী করে॥”
গান করি সমাপন, প্রিয় সখা দুই জন,
কিছু পরে ঘরে দেখা দিল।
সখাকর করে ধরি, কমল বিনয় করি,
এই কথা তখন বলিল॥
“বৃথা চিন্তা কর দূর, রণমাঝে হও শূর,
কি কারণ এত ভয় পাও।
বিপদে যে ভয় পায়, লোকে দেখি হাসে তায়,
পুরুষের প্রতাপ দেখাও॥
এখন বিদায় চাই, ঘোর নিশি ঘরে যাই,
দেখো ভাই, থাকে যেন মনে।
অরুণ না দেখা যায়, পাখী না কাকলি গায়,
হেন কালে মিলিব দুজনে॥”
ভোরে উঠি, গুটি গুটি, চলিল কমল।
নব নব পাতা সব, করে দলমল॥
দুই চারি তারা ধরি প্রহরীর বেশ।
ধিকিধিকি, ঝিকিমিকি, করে নিশি শেষ॥
পায় পায় সখা যায়, নরসখাবাসে।
মনোহরা, জগতারা, দেখে পতিপাশে॥
পাখা হাতে, প্রাণনাথে করিছে সেবন।
সারা নিশি, কাছে বসি, অলস নয়ন॥
সে বরণ, সে বদন, সে নয়ন চুল।
সে বলন, সে চরণ, বরণ হিঙ্গুল॥
দিন দিন, বিমলিন, শুখাইয়া যায়।
জাগরণে, বরাননে বিরস দেখায়॥
তবু তার, রূপভার, হেরিলে নয়ন।
কভু আর ভোলা ভার, জনম মতন॥
পায় পায়, কাছে যায়, কমল সুধীর।
অপরূপ, দেখে রূপ, দোঁহে হয়ে স্থির॥
নিরমল, যেন জল, করে পরিষ্কার।
সেইরূপ অপরূপ, হয় রূপ তার॥
মুখভাতি, স্থিরজ্যোতি, ক্রমশ উজ্জ্বল।
প্রসারিত, সঙ্কুচিত, ললাটের স্থল॥
ওষ্ঠাধর, থর্ থর্, কাঁপে ঘনে ঘন।
যেন কোন, সুস্বপন, করে দরশন॥
থেকে থেকে, একে একে, প্রফুল্ল সকল।
নাসা, কর্ণ, গণ্ড, বর্ণ, হয় সমুজ্জ্বল॥
অপরূপ, সেই রূপ, হেরি পতিব্রতা।
ভাবে দেব, কোন দেব সনে কন কথা॥
দণ্ড দুই, কাল বই, নরসখা জাগে।
দেখে সতী, একমতি, বসে শিরোভাগে॥
হৃষ্টমতি, দ্রুতগতি, প্রিয়াকর ধরে।
চমকিত, পুলকিত, কয় দ্রুতস্বরে॥
“মরি কি দেখিনু, কোনখানে ছিনু,
এখন কোথায় রই।
কোথা নিরমল, সেই সুধাজল,
সে মোহন পুরী কই॥
কোথা মনোলোভা, দশদিশশোভা,
অতুলিত আভা কই।
এ আলো সে নয়, এ বাতাস নয়,
এ যে পাখী ডাকে অই॥
সেরূপ সুন্দর, পুরী মনোহর,
নাহি ভূমণ্ডল মাঝে।
বিশ্ব বিনোদন, বিমল কিরণ,
তাপহীন শোভা সাজে॥
ভানু মহাবল, চন্দ্রমা শীতল,
দূরে নিরুজ্জ্বল রয়।
ঘোর ঘটা আল, শোভিতেছে ভাল,
তাহে পুরীশোভা হয়॥
গীত সুমধুর, পূরা অই পুর,
তাদৃশ নাহিক আর।
কস্তুরি জিনিয়া, ভবন পূরিয়া,
বহে গন্ধ চমৎকার॥
‘জরা মৃত্যু নাই,’ সর্ব্ব শুভ ঠাঁই,
চির আনন্দিত লোক।
নাহি অনাচার, বৈরী নাহি কার,
নাহি জানে কেহ শোক॥
মোহন মূরতি, অই পুরীপতি,
আসীন বেদির ’পরে।
ঝলমল করে, বেদি আভা ধরে,
নিন্দি রবি কোটি করে॥
মোহিত অন্তরে, আনন্দের ভরে,
যোড় করি উভ হাত।
সাধু যত জন, গাহন বাজন,
আর করে প্রণিপাত॥
প্রেমরোমাঞ্চিত, দেহ সকম্পিত,
গাহিল ভকত জন।
সংগীত শুনিল, ভকতি পূরিল,
পামর মানব মন॥
কি দেখিনু আহা, পুন কি রে তাহা,
কভু দেখিবারে পাব।
এ পাপে না রব, এ তাপ না সব,
ত্বরায় সেখানে যাব॥
নিরমল ঠাঁই, তাহে পাপ নাই,
সে যে সাধুজনধাম।
অই শুনা যায়, অই গীত গায়,
ডাকে মহাপ্রভুনাম॥
যেন কেহ মোরে, ‘লয়ে যাব তোরে’
বলিছে কানের কাছে।
তার সনে যাব, সুখধাম পাব,
আর কি তেমন আছে॥”
বলিতে বলিতে, কথা না থামিতে,
সম্বিত হারায় তেঁহ।
কমল কামিনী, ত্বরা বারি আনি,
সুশীতল করে দেহ॥
চেতন পাইয়া যুবা কাঁপিতে লাগিল।
আঁখিজলে যুবতীর বদন ভাসিল॥
তখন কমল একা বিপাকে পড়িয়া।
কহিতে লাগিল তারে সান্ত্বনা করিয়া॥
“সুবোধ হইয়া কেন অবোধ হইলে।
কি দেখি এতেক, সতি, আতঙ্ক ভাবিলে॥
সামান্য হয়েছে জ্বর, কত দিন রবে।
তার তরে এত বল ভাবিলে কি হবে॥
আশু যাতে রোগ যায় করহ উপায়।
আমি সদা কাছে রব ভয় কিবা তায়॥”
শুনিয়া সুন্দরী বারিধারা নিবারিল।
একমনে স্বামিসেবা করিতে লাগিল॥
ভালয় ভালয় রোগী নিরোগী হইল।
দুর্ব্বল শরীর তবু সবল নহিল॥
ভগ্ন দেহে ভগ্ন মনে বাড়িল হুতাশ।
পতি লাগি পতিব্রতা হইল হতাশ॥
নিরজনে এক দিন ডাকিয়া কমলে।
ছল্ ছল্ নেত্রে জল জগতারা বলে॥
“কপালে কি আছে মোর বুঝিতে না পারি।
কেহ আর নাই মোর আমি একা নারী॥
দেখ দেখি দিন তিনি শুকাইয়া যান।
উদাসীন ভাব সদা অলস নয়ান॥
হয় হ’ল নয় নেই খেতে নাহি চান।
যখন তখন দেখি বিরস বয়ান॥
দুই চারি কথা কন সদাই নীরব।
বল কিছু স্থির হয়ে শুনিবেন সব॥
বুঝেছি অভাগী আমি বিধাতা বিমুখ।
কত সুখ আশে আগে নাচিত হে বুক॥
কত দিন কত মত ভেবেছি হে ভাই।
এবে বুঝি হ’ল ভোর, আর আশা নাই॥
এমন কি মহাপাপ করেছি হে আমি।
কে দিল আমারে শাপ, তাই হেন স্বামী॥
উপকথা ছেলেবেলা শুনেছিনু ভাই।
ক্রমাগত দিবানিশি মনে পড়ে তাই॥
অপরূপ পাখী পেয়ে নারী এক জন।
সোনার খাঁচায় থুয়ে করিত যতন॥
তারি সেবা আটপ’র সদত করিত।
পড়াত, খাওয়াত, হাতে তুলিত পাড়িত॥
এক দিন ফাঁকি দিয়া পাখী উড়ি যায়।
কেও কোথা তারে আর খুঁজিয়া না পায়॥
অন্য রোগ নহে, এ যে চিন্তারোগ কাল।
কি হবে বল হে সখে, বিষম জঞ্জাল॥
একবার তাঁরে তুমি বল ভাল করে।
অই দেখ আসিছেন, ঘাড় হেঁট করে॥”
“কেমন আছ হে আজি? নিরুত্তর কেন?
অতিশয় ম্লান ভাব দেখি কেন হেন?”
“আমার সংসারে আর থাকি কিবা ফল।
কি হবে থাকিয়া হেথা, প্রাণের কমল॥
দেশাচার-রাক্ষসীরে বধিতে নারিনু।
স্বদেশের দুঃখভার ঘুচাতে নারিনু॥
জনমদাতার ধার শোধিতে নারিনু।
দিন দিন মহাপাপে ডুবিতে লাগিনু॥
মনের বাসনা কই পূরাতে পারিনু।
মানবমণ্ডলী কই পবিত্র করিনু॥
প্রীতিবারি সমাজেতে সেচিলাম কই।
স্বার্থ, দ্বেষ, পরহিংসা, নাশিলাম কই॥
কই আপনার মন নিরমল হ’ল।
কই ধর্ম্মপথে মন স্থির হয় বল॥
হায় এ বয়সে কত পাপ করিলাম!
কত ছলিলাম, কত মিথ্যা বলিলাম॥
তাহে দিন দিন ক্ষীণ হয় বুদ্ধি বল।
পৃথিবীর ভার দিন বাড়াই কেবল॥
পিতৃগলগণ্ড হয়ে কত কাল রব?
অনুতাপশিখা আর কত কাল সব?
আহা কি সুখেতে কাল শিশুরা কাটায়!
অই দেখ নাচি নাচি কয় জনা ধায়॥
মনের সাধেতে খেলা কর এই বেলা।
এখনি হইবে সন্ধ্যা ভাসাইবে ভেলা॥
দিন কত থাক আর জানিবে তখন।
আনন্দের ধাম এই পৃথিবী কেমন॥
অই বেলা কত খেলা আমিও খেলেছি।
অই বেলা কত আশা আমিও করেছি॥
এখন বুঝেছি সার, অসার সংসার।
দণ্ড দুই আলো, পরে ঘোর অন্ধকার॥
ভবের এ নাট্যশালা ছায়াবাজি প্রায়।
দিন দুই ধুমধাম পরেতে ফুরায়॥
মধুময় শিশুকাল কত দিন রয়।
যৌবন সৌরভ দিন চারি বই নয়॥
বিষয়ী লোকের মান, আজি আর কালি।
প্রবল পবনে যেন উড়ে মরুবালি॥
বীরের বীরত্বগুণ প্রথম প্রথম।
বিস্তারিত দশ দিকে চাঁপাগন্ধ সম॥
কিন্তু যেন মধ্যাহ্নের প্রখর মিহির।
বৈকালে লুকায় আড়ে মেঘ সুগভীর॥
বিঘোর আঁধারময় এ ভব ভিতরে।
সুখ যাহা দেখ তাহা মুহূর্ত্তের তরে॥
অমানিশা, তাহে মেঘ, কালির বরণ।
তার মাঝে যেন সৌদামিনী দরশন॥
আঁধার নিশিতে যেন তারার পতন।
জলবিম্ব ক্ষণে যেন জলেতে মগন॥
শরতের মেঘ যেন ঘন ঘন ডাকে।
বৃথা আড়ম্বর উড়ে যায় ফাঁকে ফাঁকে॥
সাগরচরেতে যেন বালির নির্মাণ।
একটি তরঙ্গ পরে না থাকে নিশান॥”
“সে কি ভাই, হেন ভাব কেন হে তোমার।
ভগ্ন আশা কি কারণ হ’ল আর বার॥
কি ছার পাপের ঢেউ দেখি ভয় কর।
পায়ে করি ঠেলে দেও, নিজ বীর্য্য ধর॥
সাগরের মাঝে যেন অক্ষয় অচল।
বৃথায় প্রহারে ঝড় তরঙ্গের দল॥
সেইরূপ সাধুজন সংসার ভিতরে।
বদ্ধমূল স্থিরভাব আপনার ভরে॥
কিছু কাল কষ্ট পায় ধার্ম্মিক সুজন।
অনন্ত কালের তারা মুখের ভাজন॥
কে তোমারে বলিল হে অকর্ম্মণ্য তুমি।
তোমা মত লোক আছে তাই আছে ভূমি॥
সাধু মহাজন গুণে আছে ধরাতল।
নহিলে সে কোন্ কালে যেত রসাতল॥
‘কি করিব আর আমি’ সদা বল ভাই।
দেখ দেখি মনে ভেবে কিছু কর নাই॥
এত জনে নীতি শিক্ষা কে করিল দান।
পাপ হতে এত জনে কে করিল ত্রাণ॥”
“সত্য বটে যা বলিলে বুঝিনু কমল।
আজি আর থাক্, কালি বলিহ সকল॥
নিদ্রা ইচ্ছা আজি কিছু হতেছে সকালে।
যত পার বলো সখে, কাল প্রাতঃকালে॥”
কমল চলিয়া যায়, নরসখা কয়।
“আর দেরি করা মোর পরামর্শ নয়॥
প্রাণের কমল শুনি, সকালে কি কবে।
কি করি থাকিতে আর নাহি পারি ভবে॥
যাই দেখি একবার বাহিরে বাতাসে।
দেখে আসি কমল ফিরিয়া নাকি আসে॥”
এত বলি অবিলম্বে বাহিরে আসিল।
নিরখি গগনশোভা কহিতে লাগিল॥
“থাক থাক শশধর, বিরাজ আকাশে।
তুমি না থাকিলে কে বা তিমিরে বিনাশে॥
মাসে মাসে তুমি ত হে কত দেশে যাও।
ভাল মন্দ কত লোক দেখিবারে পাও॥
অপটু আমার মত দেখেছ কি কারে।
আর আর লোক সব বলে কি বা তারে॥
অহে ও তারার বৃন্দ আকাশের বাতি।
লক্ষ লক্ষ যোজনেতে প্রকাশিছ ভাতি॥
কোথায় অভাগা হেন দেখেছ কি আর।
দেখে থাক বল তবে কিবা নাম তার॥
ধরাতল, তোর বুকে আর কত জন।
মোর মত কাপুরুষ করে জাগরণ॥—
কোথা যাও শশধর, রহ এক পল।
বারেক মনের সাধে হেরিব ভূতল॥”
বলিতে বলিতে শশী পশ্চিমে ডুবিল।
শ্বাস ত্যজি নরসখা গেহেতে পশিল॥
ঘোর নিদ্রা অভিভূত দেখিল সকলে।
আপন মন্দিরে তবে ধীরে ধীরে চলে॥
দেখে চেয়ে খাটে শুয়ে সোনার পুতলি।
ম্লানভাব যেন তবু হানিছে বিজুলী॥
জাগরণে অচৈতন্য নিদ্রা যায় সতী।
একদৃষ্টে দাণ্ডাইয়া রহে তার পতি॥
মুদিতনয়না মুখ হেরে বার বার।
কভু যায়, কভু আসে, কভু পাশে তার॥
কভু পুতুলের মত স্থিরতর রয়।
অবশেষে ধীরে ধীরে মৃদু স্বরে কয়॥
“বিদায় জনমশোধ দাও প্রণয়িনি।
রাখিতে না পারি আর এ পাপ পরাণী॥
এই বেলা সকালে সকালে ভঙ্গ দিব।
পলাব ভবের ব্যূহে আর না রহিব॥
অভেদ পাষাণে মোর মন বাঁধা প্রিয়ে।
আগে চলে যাই আমি তোমারে ফেলিয়ে॥
আমা বই জান না রে তুমি রে অবলা।
ভেবেছ উন্মাদ পতি হায় রে সরলা॥
ক্ষমা কর প্রেমময়ি, আমি অভাজন।
কপালে থাকে ত হবে পরেতে মিলন॥”
এত বলি ঘন ঘন করি দরশন।
নিঃশব্দ চরণে যুবা করিলা গমন॥
চকিত নয়নে সদা চারি দিকে চায়।
সদা ভয় জাগি পাছে কেহ টের পায়॥
পায় পায় উপনীত নিরূপিত ঘরে।
ধ্বড়্ ধ্বড্ পড়ে বুক ঘরের দুয়রে॥
সাহসে করিয়া ভর প্রবেশিল তায়।
সাংঘাতিক রজ্জু ঝোলে দেখিবারে পায়॥
আপাদ মস্তক দেখি অমনি শিহরে।
পরকালভয় তবে আক্রমণ করে॥
“পলাব, কি রব, কি জানি কি হবে পরে।
নতুবা, আর বা এ ভবে রব কি করে॥
অথবা, ভাসিয়া, ভাসিয়া, মিলিবে কূল।
যদি মাঝে ডুবে যাই তবে ত প্রতুল॥
কূল হতে সলিলেতে নামিয়াছি সবে।
এখনি কোমর জল পরে কি না হবে॥
এখনো ওঠে নি ঝড়, হয় নি তুফান।
না জানি তখন তবে হবে কত টান॥
সে পথে যে কাঁটা নাই জানিনু কেমনে।
তাই বলে এ নরকে পচিব কেমনে॥
হায় কি বা ছার কীট আমি হীন নর।
কোটি কোটি জীব আছে বিশ্বের ভিতর॥
অথবা অন্তরযামী জানেন সকল।
তবে ত ভুগিতে হবে সমুচিত ফল॥
কিন্তু তিনি দয়াময় পাতকিতারণ।
অবশ্য অবোধ বলি দণ্ড নিবারণ॥
দয়া না করিলে তিনি কেবা রক্ষা পাবে।
আমূল মানবজাতি নরকেতে যাবে॥
অবশ্য সদয় তিনি কাতর দেখিলে।
অবশ্য নিস্তার পাব তাপ নিবেদিলে॥”
এত বলি ধীরে ধীরে ফাঁস জড়াইল।
হাতে তুলি কতবার ভয়ে ছাড়ি দিল॥
কতবার জগতারা মনেতে পড়িল।
কতবার বৃদ্ধ পিতা স্মরণ হইল॥
অবশেষে প্রবল নিশ্বাস ত্যাগ করি।
চক্ষু মুদি দৃঢ় করি রজ্জু হস্তে ধরি॥
“ক্ষমা কর কৃপাসিন্ধু পাতকীর সখা।”
বলিতে বলিতে প্রাণ ত্যজে নরসখা॥
ভ্রান্ত হয়ে, অহে নর, কুমার্গে পশিলে।
কেমন করাল পরকাল না বুঝিলে॥
যাতনা এড়াব বলে পয়ান করিলে।
হায় কি হইবে সেই আশা না পুরিলে॥
তায় ভগবান্ ভোলা প্রতি ক্ষমাবান্।
না বুঝিলে জ্ঞানতত্ত্ব নিগূঢ় সন্ধান॥
কোটি কোটি পাপী তথা কৃতাঞ্জলি করে।
“ক্ষমা কর ক্ষমা কর” ডাকছে কাতরে॥
নিকটে যাইবা মাত্র নহিবে নিস্তার।
আগে হবে প্রায়শ্চিত্ত, পরেতে উদ্ধার॥
এর চেয়ে সে যাতনা বেশি যদি হয়।
তবে ত বিফল তব আশা সমুদয়॥
পরদিন মহাগোল করে পরিজন।
জগতারা উর্দ্ধতারা ভূতলে পতন॥
কমল আসিয়া দেখি ভাসে আঁখিজলে।
অধীর হইয়া ধীর কাঁদি কাঁদি বলে॥
কমল কাঁদিয়া কয়, “ধুলায় পড়িয়া রয়,
হেমময় প্রতিমার মত।
সঘনে বহিছে শ্বাস, বদনে না সরে ভাষ,
কপালে প্রহারচিহ্ন কত॥
এক পল স্থির নয়, কভু আঁখি মুদি রয়,
কভু দুই হাত বাড়াইয়া।
সহাস বদনে চায়, যেন কার দেখা পায়,
মনে করে রাখিব ধরিয়া॥
এস হে প্রাণের সখা, একবার দাও দেখা,
এরে তুমি ছাড়িলে কেমনে।
ছাড়িলে কেমন করে, সহচর কমলেরে,
কি ভাবিয়া ভঙ্গ দিলে রণে॥
কেন ফেরে পড়িলাম, কালি তোমা ছাড়িলাম,
কেন ভুলিলাম তব ছলে।
যত আশা মনে ছিল, একেবারে ফুরাইল,
একা রাখি আগে গেলে চলে॥
কমলে বাসিতে ভাল, কাছে রাখি চিরকাল,
মনোকথা বলিতে খুলিয়া।
মধুর কবিতাধার, হেরিলাম কতবার,
একাসনে দুজনে বসিয়া॥
কতবার একাসনে, দোঁহে মিলি সঙ্গোপনে,
পূজিলাম জগতের পতি।
এবে কেন একা রাখি, পলাইলে দিয়া ফাঁকি,
কে তোমারে দিল হেন মতি॥
এ পাপ করিলে কেন, কুমতি হইল হেন,
বৃদ্ধ পিতা কেন হে কাঁদালে।
পতিপ্রাণা সতী নারী, পরাণে মারিলে তারি,
বন্ধুজনে শোকেতে ভাসালে॥”
না ফুরাতে কথা, সুবর্ণের লতা,
ধীরে আঁখিপাতা মুদিল।
রাজার ভবন, বিজন কানন,
পিতা পুত্র বধূ মরিল॥
যত পরিজন, অতি ক্ষুণ্ণ মন,
স্বামিশূন্য গৃহ ত্যজিল।
বন্ধুজনগণে, নিরানন্দ মনে,
হাহা রবে দিক পুরিল॥
ছাড়িয়া নিশ্বাস, ত্যজি রিপুবাস,
প্রতিবাসিগণে চেতিল।
দিন দুই ধরি, আহা আহা করি,
পুন দেহযাগে পশিল॥
হাসি কান্না ভরা, এই বসুন্ধরা,
বিশ্ববিরচক রচিল।
সত্য নাম তাঁর, অনিত্য সংসার,
রচয়িতা সার ভাবিল॥
সম্পূর্ণ
Public domainPublic domainfalsefalse
More in Poetry
Poetry
Palanquin Bearers
Lightly, O lightly we bear her along, She sways like a flower in the wind of our song; She skims like a bird on the foam of a stream; She floats like a laugh from the lips of a dream. Gaily, O gaily we glide and we sing,...
Poetry
Where the Mind is Without Fear (Gitanjali 35)
Where the mind is without fear and the head is held high; Where knowledge is free; Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls; Where words come out from the depth of truth; Where tirel...
Poetry
Thou Hast Made Me Endless (Gitanjali 1)
Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life. This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed...
Comments (0)
Log in to join the conversation.