কলিকাতায় গমনকালে, আমি একা রজনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গেলাম না। কুটুম্বগৃহহইতে তিনকড়িনামে একজন প্রাচীনা পরিচারিকা সমভিব্যাহারে লইয়া গেলাম। এ সতর্কতা রজনীর মন প্রসন্ন করিবার জন্য। গমনকালে রজনীকে জিজ্ঞাসা করিলাম— “রজনী—তোমাদের বাড়ী কলিকাতায়—কিন্তু তুমি এখানে আসিলে কিপ্রকারে?” রজনী বলিল, “আমাকে কি সকল কথা বলিতে হইবে?” আমি বলিলাম, “তোমার যদি ইচ্ছা না হয় তবে বলিও না?” বস্তুতঃ এই অন্ধ স্ত্রীলোকের বুদ্ধি, বিবেচনা, এবং সরলতায় আমি বিশেষ প্রীত হইয়াছিলাম। তাহাকে কোন প্রকার ক্লেশ দিবার আমার ইচ্ছা ছিল না। রজনী বলিল, “যদি অনুমতি করিলেন, তবে কতক কথা গোপন রাখিব! গোপালবাবু বলিয়া আমার একজন প্রতিবাসী আছেন। তাঁহার স্ত্রী চাঁপা। চাঁপার সঙ্গে আমার হঠাৎ পরিচয় হইয়াছিল। তাহার বাপের বাড়ী হুগলী। সে আমাকে বলিল, ‘আমার বাপের বাড়ী যাইবে?’ আমি রাজি হইলাম। সে আমাকে একদিন সঙ্গে করিয়া গোপালবাবুর বাড়ীতে লইয়া আসিল। কিন্তু তাহার বাপের বাড়ী আমাকে পাঠাইবার সময় আপনি আমার সঙ্গে আসিল না। তাহার ভাই হীরালালকে আমার সঙ্গে দিল। হীরালালও নৌকা করিয়া আমায় হুগলী লইয়া চলিল।” আমি এইখানে বুঝিতে পারিলাম যে রজনী হীরালাল সম্বন্ধে কথা গোপন করিতেছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “তুমি তাহার সঙ্গে গেলে?” রজনী বলিল, “ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু যাইতে হইল। কেন যাইতে হইল, তাহা বলিতে পারিব না। পথিমধ্যে হীরালাল আমার উপর অত্যাচার করিতে লাগিল। আমি তাহার বাধ্য নহি দেখিয়া, সে আমাকে বিনাশ করিবার জন্য, গঙ্গার এক চরে নামাইয়া দিয়া নৌকা লইয়া চলিয়া গেল।” রজনী চুপ করিল—আমি হীরালালকে ছদ্মবেশী রাক্ষস মনে করিয়া, মনে মনে তাহার রূপধ্যান করিতে লাগিলাম।— তার পর রজনী বলিতে লাগিল, “সে চলিয়া গেলে, আমি ডুবিয়া মরিব বলিয়া জলে ডুবিলাম।” আমি বলিলাম, “কেন? তুমি কি হীরালালকে এত ভালবাসিতে?” রজনী ভ্রূকুটী করিল। বলিল, “তিলার্দ্ধ না। আমি পৃথিবীতে কাহারও উপর এত বিরক্ত নহি।” “তবে ডুবিয়া মরিতে গেলে কেন?” “আমার যে দুঃখ, তাহা আপনাকে বলিতে পারি না!” “আচ্ছা। বলিয়া যাও।” “আমি জলে ডুবিয়া ভাসিয়া উঠিলাম। একখানা গহনার নৌকা যাইতেছিল। সেই নৌকার লোক আমাকে ভাসিতে দেখিয়া উঠাইল। যে গ্রামে আপনার সহিত সাক্ষাৎ সেইখানে একজন আরোহী নামিল। সে নামিবার সময়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘তুমি কোথায় নামিবে?’ আমি বলিলাম, আমাকে যেখানে নামাইয়া দিবে, আমি সেই খানে নামিব। তখন সে জিজ্ঞাসা করিল, ‘তোমার বাড়ী কোথায়?’ আমি বলিলাম, কলিকাতায়। সে বলিল, ‘আমি কালি আবার কলিকাতায় যাইব। তুমি আজ আমার সঙ্গে আইস। আজি আমার বাড়ী থাকিবে। কালি তোমাকে কলিকাতায় রাখিয়া আসিব।’ আমি আনন্দিত হইয়া তাহার সঙ্গে উঠিলাম। সে আমাকে সঙ্গে লইয়া চলিল। তার পর আপানি সব জানেন।” আমি বলিলাম, “আমি যাহার হাত হইতে তোমাকে মুক্ত করিয়াছিলাম, সে কি সেই?” “সে, সেই” আমি রজনীকে কলিকাতায় আনিয়া, তাহার কথিতস্থানে অন্বেষণ করিয়া, রাজচন্দ্র দাসের বাড়ী পাইলাম। সেইখানে রজনীকে লইয়া গেলাম। রাজচন্দ্র কন্যা পাইয়া বিশেষ আনন্দপ্রকাশ করিল। তাহার স্ত্রী অনেক রোদন করিল। উহারা আমার কাছে রজনীর বৃত্তাত্ত সবিশেষ শুনিয়া বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল। পরে রাজচন্দ্রকে আমি নিভৃতে লইয়া গিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “তোমার কন্যা গৃহত্যাগ করিয়া গিয়াছিল কেন জান?” রাজচন্দ্র বলিল, “না। আমি তাহা সর্ব্বদাই ভাবি, কিন্তু কিছুই ঠিকানা করিতে পারি নাই।” আমি বলিলাম, “রজনী জলে ডুবিয়া মরিতে গিয়াছিল কি দুঃখে জান?” রাজচন্দ্র বিস্মিত হইল। বলিল, “রজনীর এমন কি দুঃখ, কিছুই ত ভাবিয়া পাই নাই। সে অন্ধ, এটি বড় দুঃখ বটে, কিন্তু তার জন্য এত দিনের পর ডুবিয়া মরিতে যাইবে কেন? তবে, এত বড় মেয়ে, আজিও তাহার বিবাহ হয় নাই। কিন্তু তাহার জন্যও নয়। তাহার ত সম্বন্ধ করিয়া বিবাহ দিতে ছিলাম। বিবাহের আগের রাত্রেই পলাইয়াছিল।” আমি নুতন কথা পাইলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, “সে পলাইয়াছিল?” রাজ। হাঁ। আমি। তোমাদিগকে না বলিয়া? রাজ। কাহাকেও না বলিয়া। আমি। কাহার সহিত সম্বন্ধ করিয়াছিলে? রাজ। গোপাল বাবুর সঙ্গে। আমি। কে গোপাল বাবু? চাঁপার স্বামী। রাজ়। আপনি সবই ত জানেন। সেই বটে। আমি একটু আলো দেখিলাম। তবে চাঁপা সপত্নীযন্ত্রণাভয়ে রজনীকে প্রবঞ্চনা করিয়া ভ্রাতৃসঙ্গে হুগলি পাঠাইয়াছিল। বোধ হয় তাহারই পরামর্শে হীরালাল উহার বিনাশে উদ্যোগ পাইয়াছিল। সে কথা কিছু না বলিয়া রাজচন্দ্রকে বলিলাম, “আমি সবই জানি। আমি আরও যাহা জানি তোমায় বলিতেছি। তুমি কিছু লুকাইও না।” রাজ। কি—আজ্ঞা করুন! আমি। রজনী তোমার কন্যা নহে। রাজচন্দ্র বিস্মিত হইল। বলিল, “সে কি! আমার মেয়ে নয় ত কাহার?” “হরেকৃষ্ণ দাসের “ রাজচন্দ্র কিছুক্ষণ নীরব হইয়া রহিল। শেষে বলিল, “আপনি কে তাহা জানি না। কিন্তু আপনার পায়ে পড়ি, এ কথা রজনীকে বলিবেন না।” আমি। এখন বলিব না। কিন্তু বলিতে হইবে। আমি যাহা জিজ্ঞাসা করি, তাহার সত্য উত্তর দাও। যখন হরেকৄষ্ণ, মরিয়া যায়, তখন রজনীর কিছু অলঙ্কার ছিল? রাজচন্দ্র ভীত হইল। বলিল, “আমি ত, তাহার অলঙ্কারের কথা কিছু জানি না। অলঙ্কার কিছুই পাই নাই।” আমি। হরেক্বষ্ণের মৃত্যুর পর তুমি তাহার ত্যক্ত সম্পত্তির সন্ধানে সে দেশে আর গিয়াছিলে? রাজ। হাঁ, গিয়াছিলাম। গিয়া শুনিলাম, হরেকৃষ্ণের যাহা কিছু ছিল তাহা পুলিষে লইয়া গিয়াছে। আমি। তাহাতে তুমি কি করিলে? রাজ। আমি আর কি করিব? আমি পুলিষকে বড় ভয় করি, রজনীর বালাচুরি মোকদ্দমায় বড় ভুগিয়াছিলাম। আমি পুলিষের নাম শুনিয়া আর কিছু বলিলাম না। আমি। রজনীর বালাচুরি মোকদ্দমা কিরূপ? রাজ। রজনীর অন্নপ্রাশনের সময় তাহার বালা চুরি গিয়াছিল। চোর ধরা পড়িয়াছিল। বর্দ্ধমানে তাহার মোকদ্দমা হইয়াছিল। এই কলিকাতা হইতে বর্দ্ধমানে আমাকে সাক্ষ্য দিতে যাইতে হইয়াছিল। বড় ভুগিয়াছিলাম। আমি পথ দেখিতে পাইলাম। — রজনী (1877)