লবঙ্গলতার কথা। আমি মনে করিয়াছিলাম, রজনীর এই বিস্ময়কর কথা শুনিয়া, অমরনাথ আগুনে সেঁকা কলাপাতের মত শুকাইয়া উঠিবে। কই, তাহা ত কিছু দেখিলাম না। তাহার মুখ না শুকাইয়া বরং প্রফুল্ল হইল। বিস্মিত হতবুদ্ধি, যা হইবার তাহা আমিই হইলাম। আমি প্রথমে তামাসা মনে করিলাম, কিন্তু রজনীর কাতরতা, অশ্রুপাত এবং দার্ঢ্য দেখিয়া আমার নিশ্চয় প্রতীতি জন্মিল যে রজনী আন্তরিক বলিতেছে। আমি বলিলাম, “রজনী! কায়েতের কুলে তুমি‍ই ধন্য! তোমার মত কেহ নাই। কিন্তু আমি তোমার দানগ্রহণ করিব না।” রজনী বলিল, “না গ্রহণ করেন আমি ইহা বিলাইয়া দিব।” আমি। অমরনাথ বাবুকে? রজনী। আপনি উঁহাকে সবিশেষ চিনেন না; আমি দিলেও উনি লইবেন না। ল‍ইবার অন্য লোক আছে। আামি। অমরনাথ বাবু কি বল? অমর। আমার সঙ্গে কোন কথা হইতেছে না, আমি কি বলিব। আমি বড় ফাঁপরে পড়িলাম; রজনী যে বিষয় ছাড়িয়া দিতেছে, তাহাতে বিস্মিত; আবার অমরনাথ যে বিষয় উদ্ধারের জন্য এত করিয়াছিল, যাহার লোভে রজনীকে বিবাহ করিবার জন্য উদ্যোগ করিতেছে, সে বিষয় হাত ছাড়া হইতেছে, দেখিয়াও সে প্রফুল্ল। কাণ্ডখানা কি? আমি অমরনাথকে বলিলাম যে, যদি স্থানান্তরে যাও, তবে আমি রজনীর সঙ্গে সকল কথা মুখ ফুটিয়া কই। অমরনাথ অমনি সরিয়া গেল। আমি তখন রজনীকে বলিলাম, “সত্য সত্যই কি তুমি বিষয় বিলাইয়া দিবে?” “সত্য সত্যই। আমি গঙ্গাজল নিয়া শপথ করিয়া বলিতেছি।” আমি। আমি তোমার দান লই, তুমি যদি আমার কিছু দান লও। রজনী। অনেক লইয়াছি। আমি। আরও কিছু লইতে হইবে। রজনী। একখানি প্রসাদি কাপড় দিবেন। আমি। তা না। আমি যা দিই, তাই নিতে হইবে। রজনী। কি দিবেন? আমি। শচীন্দ্র বলিয়া আমার একটি পুত্র আছে। আমি তোমাকে শচীন্দ্রদান করিব। স্বামীস্বরূপ তুমি তাহাকে গ্রহণ করিবে। তুমি যদি তাহাকে গ্রহণ কর, তবেই আমি তোমার বিষয় গ্রহণ করিব। রজনী দাঁড়াইয়াছিল, ধীরে ধীরে বসিয়া পড়িয়া, অন্ধনয়ন মুদিল। তার পর, তাহার মুদিত নয়ন হইতে অবিরল জলধারা পড়িতে লাগিল—চক্ষের জল আর ফুরায় না। আমি বিষম বিপদে পড়িলাম। রজনী কথা কহে না—কেবল কাঁদে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি রজনী? অত কাঁদ কেন?” রজনী কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, “সে দিন গঙ্গার জলে আমি ডুবিয়া মরিতে গিয়াছিলাম—ডুবিয়াছিলাম, লোকে ধরিয়া তুলিল। সে শচীন্দ্রের জন্য। তুমি যদি বলিতে, তুমি অন্ধ, তোমার চক্ষু ফুটাইরা দিব—আমি তাহা চাহিতাম না―আমি শচীন্দ্র চাহিতাম। শচীন্দ্রের অপেক্ষা এ জগতে আর কিছুই নাই—আমার প্রাণ তাঁহার কাছে, দেবতার কাছে ফুলের কলিমাত্র—শ্রীচরণে স্থান পাইলেই সার্থক। অন্ধের দুঃখের কথা শুনিবে কি?” আমি রজনীর কাতরতা দেখিয়া কাতর হইয়া বলিলাম, “শুনিব।” তখন রজনী কাঁদিতে কাঁদিতে, হৃদয় খুলিয়া, আমার কাছে সকল কথা বলিল। শচীন্দ্রের কণ্ঠ, শচীন্দ্রের স্পর্ণ, অন্ধের রূপোন্মাদ! তাহার পলায়ন, নিমজ্জন, উদ্ধার সকল বলিল। বলিয়া বলিল, “ঠাকুরাণি, তোমাদের চক্ষু আছে—চক্ষু থাকিলে এত ভালবাসা বাসিতে পারে কি?” মনে মনে বলিলাম, “কাণি! তুই ভালবাসার কি জানিস্! তুমি লবঙ্গলতার অপেক্ষা সহস্রগুণে সুখী।” প্রকাশ্যে বলিলাম, “না, রজনি আমার বুড়া স্বামী—আমি অত শত জানি না। তুমি শচীন্দ্রকে তবে বিবাহ করিবে, ইহা স্থির?” রজনী বলিল, “না।” আমি। সে কি? তবে, এত কথা কি বলিতেছিলে— এত কাঁদিলে কেন? রজনী। আমার সে সুখ কপালে নাই, বলিয়াই এত কাঁদিলাম। আমি। সে কি? আমি বিবাহ দিব। রজনী। দিতে পারিবেন না। অমরনাথ হইতে আমার সর্ব্বস্ব। অমরনাথ আমার বিষয় উদ্ধারের জন্য যাহা করিয়াছেন, পরের জন্য পরে কি তত করে? তাও ধরিনা, তিনি আপনার প্রাণ দিয়া আমার প্রাণরক্ষা করিয়াছেন। রজনী সে বৃত্তান্ত বলিল। পরে কহিল, যাঁহার কাছে আমি এত ঋণী, তিনি আমার যাহা করিবেন তাহাই হইবে। তিনি যখন অনুগ্রহ করিয়া আমাকে দাসী করিতে চাহিয়াছেন, তখন আমি তাঁহারই দাসী হইব, আর কাহারও নহে।” হরি! হরি! কেন বাছাকে সন্ন্যাসী দিয়া ঔষধ করিলাম! বিবাহ ব্যতীতও বিষয় থাকে—রজনী ত এখনই বিষয় দিতে চাহিতেছে। কিন্তু ছি! রজনীর দান লইব? ভিক্ষা মাগিয়া খাইব—সেও ভাল। আমি বলিয়াছি—আমি যদি এই বিবাহ না দিই ত আমি কায়েতের মেয়ে নই। আমি এ বিবাহ দিবই দিব। আমি রজনীকে বলিলাম, “তবে আমি তোমার দান লইব না। তুমি যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে দান করিও।” আমি উঠিলাম। রজনী বলিল, “আর একবার বসুন। আমি অমরনাথ বাবুর দ্বারা একবার অনুরোধ করাইব। তাঁহাকে ডাকিতেছি।” অমরনাথের সঙ্গে আর একবার সাক্ষাৎ আমার ইচ্ছা। আমি আবার বসিলাম। রজনী অমরনাথকে ডাকিল। অমরনাথ আসিলে, আমি রজনীকে বলিলাম, “অমরনাথ বাবু এ বিষয়ে যদি অনুরোধ করিতে চাহেন, তবে সকল কথা কি তোমার সাক্ষাতে খুলিয়া বলিতে পারিবেন? আপনার প্রশংসা আপনি দাঁড়াইয়া শুনিও না।” রজনী সরিয়া গেল। — রজনী (1877)